ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনে দীনেশ ত্রিবেদীর চেয়ে উপযুক্ত নিয়োগ আর হতে পারত না। তাঁকে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই। দুই দশক ধরে আমি তাঁকে চিনি, বিশেষ করে ২০০৪ থেকে ২০০৯ সালে কলকাতার রাজভবনে কাজ করার সময় থেকে। সে কারণেই আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এই নিয়োগ যথার্থ হয়েছে।
তখন তিনি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক সহকর্মী। কলকাতার তাজ হোটেলে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘শুভ সন্ধ্যা, স্যার। আমি দীনেশ ত্রিবেদী। আপনার ভাই রাজমোহন গান্ধীকে চেনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।’ কিছুদিন পর নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গে আলোচনা করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি তৃণমূল প্রতিনিধিদল নিয়ে আমার কাছে আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দীনেশও। মমতা মজা করে বলেছিলেন, ‘তোমরা দুজনই গুজরাটি, গুজরাটিতে কথা বলো—কেম ছো, কেম ছো!’ (কেমন আছ, কেমন আছ)। কিন্তু আমরা কেউই গুজরাটিতে কথা বলিনি; উপস্থিত সবার বোঝার সুবিধার জন্য ইংরেজিতেই আলাপ চালিয়েছিলাম। তবু ভাষার একটি আলাদা সম্পর্ক তো থেকেই যায়, যা আমাকে দীনেশের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত করেছিল। পরে মমতা ও দীনেশের রাজনৈতিক বিচ্ছেদে আমি দুঃখ পেয়েছিলাম। মমতার জন্য, কারণ তিনি একজন তীক্ষ বুদ্ধি ও নিরপেক্ষ সহকর্মীকে হারিয়েছিলেন; আর দীনেশের জন্য, কারণ তাঁকে ‘দলবদলকারী’ আখ্যা পাওয়ার ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। তবে দুজনই যথেষ্ট দৃঢ়চেতা মানুষ; তাঁরা সেই বিচ্ছেদ সামলে নিয়েছেন।
গুজরাটি পরিবারে জন্ম হলেও দীনেশ ত্রিবেদী তাঁর শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন কলকাতায়। ফলে তিনি একজন বাংলাভাষী অবাঙালি। এই পরিচয় তাঁকে ভারতের সংসদ ও মন্ত্রিসভায় বাংলার এক স্বতন্ত্র উপস্থিতি দিয়েছিল এবং এখন ঢাকায় তাঁর দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে বিশেষভাবে উপযুক্ত করে তুলেছে।
ইতিহাসের দিকে সংক্ষেপে তাকালে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে ভারতের প্রথম হাইকমিশনার হিসেবে সুবিমল দত্তকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা, ভারতের দীর্ঘতম মেয়াদের পররাষ্ট্রসচিব এবং সাবেক রাষ্ট্রপতির সচিব। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া সুবিমল দত্ত ছিলেন একজন বাঙালি। তখনকার উষ্ণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এক বাঙালি হিন্দুকে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানোকে কেউ অস্বাভাবিক মনে করেনি। তাঁর অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে বাংলাদেশে তাঁর নিয়োগকে অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। পরে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ঢাকায় জন্ম নেওয়া আরেক বাঙালি সমর সেন।
বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনারদের তালিকায় আরো কয়েকজন বিশিষ্ট বাঙালির নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কূটনীতিক, পর্বতারোহী ও আলোকচিত্রী দেব মুখার্জি। আবার কয়েকজন অবাঙালি হাইকমিশনারও ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে বাংলার গভীর সম্পর্ক ছিল। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুচকুন্দ দুবে, যিনি বিহার-ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করলেও মাতৃভাষার মতো সাবলীল বাংলায় কথা বলতেন; কৃষ্ণন শ্রীনিবাসন, যিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাতনি বৃন্দার স্বামী এবং বিক্রম দোরাইস্বামী, যাঁর বাবা ভারতীয় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

সুতরাং ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনারদের বেশির ভাগেরই নিয়োগ ছিল স্বাভাবিক কূটনৈতিক নিয়োগ, তবে কিছু ক্ষেত্রে বাংলার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিদের বাছাই করা হয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন আরো দৃঢ় হয়েছে। দীনেশ ত্রিবেদী, যিনি বাংলা জানেন ও বাংলায় কথা বলতে পারেন, সেই মূল্যবান ধারাবাহিকতাই বজায় রাখছেন। তিনিই এই পদে প্রথম রাজনৈতিক বা কূটনীতিকের বাইরে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি।
বাংলাদেশে পৌঁছে তিনি বলেছিলেন, ভারতের ১৪০ কোটি এবং বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ একসঙ্গে অনেক বড় অর্জন করতে পারে। তাঁরা ‘একই আকাশ, একই বাতাস এবং একই বেদনা’ ভাগ করে নেয়। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যা-ই করি না কেন, একসঙ্গে করতে হবে; একা থেকে কেউ শক্তিশালী হতে পারে না।’ তাঁর এই বক্তব্য শুনে আমার মনে হয়েছে, এ কথা যথার্থ।
দীনেশ মূলত একজন রাজনীতিক, সাহিত্যিক বা শিল্প-সংস্কৃতির মানুষ নন। তবে আকাশ, বাতাস ও বেদনার যে উপমা তিনি ব্যবহার করেছেন, তা যেন দুর্ভিক্ষপীড়িত ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট বাংলাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক সাংস্কৃতিক স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে উঠে এসেছে। সেই বাংলার কথা মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও গান, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র এবং অমর্ত্য সেনের দারিদ্র্যবিষয়ক গবেষণা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই তিনজনেরই বাংলাদেশের সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের জমিদারি ছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহে; সত্যজিৎ রায়ের পিতা ও পিতামহের জন্ম কিশোরগঞ্জে; আর অমর্ত্য সেনের পারিবারিক শিকড় ঢাকা ও মানিকগঞ্জে। দীনেশের বক্তব্য সেই বাংলারও স্মৃতি বহন করে, যাকে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের ছবিতে তুলে ধরেছিলেন আলোকচিত্রী সুনীল জানা এবং যাকে শিল্পী সোমনাথ হোর তাঁর তেভাগা আন্দোলন ও ১৯৪৬-৪৭ সালের দাঙ্গার চিত্রমালায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
দীনেশের বক্তব্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু তা সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর বক্তব্যকে যদি কেউ ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আত্মসাৎ করার কোনো অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বলে মনে করেন, তবে তা শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, সভ্যতাগত দিক থেকেও ভুল। তিনি এমন একটি অনুভূতির কথা বলেছেন, যা ভারত বিভাগের সময় থেকেই বিদ্যমান। অনেকেই তখন মনে করেছিলেন, রেডক্লিফ রেখা স্থায়ী হয়েছে, পাকিস্তান বাস্তবতা, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশও বাস্তবতা, কিন্তু তা সত্ত্বেও পারস্পরিক কল্যাণের জন্য অনেক কিছু একসঙ্গে করা সম্ভব।
জওয়াহেরলাল নেহরুর প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য কে সি নিয়োগী ১৯৪৯ সালের ১১ মার্চ সংসদে বলেছিলেন, ভারত ও পাকিস্তান সার্বভৌম রাষ্ট্র হয়েও যৌথ অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতে পারে, এমনকি একটি অর্থনৈতিক ও শুল্ক ইউনিয়নও গঠন করতে পারে।
আজকের পৃথিবীতে যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন কিংবা আফ্রিকান ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক জোট সক্রিয় রয়েছে, তখন দীনেশ ত্রিবেদীর আশাবাদকে শুধু গ্রহণযোগ্যই নয়, বাস্তববাদী ও প্রগতিশীল বলেও বিবেচনা করা যায়।
হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যদি পুরনো সেতুগুলোকে আরো মজবুত করে নতুন সেতু নির্মাণ করেন এবং দুই দেশের আলোচনায় অবিশ্বাস ও বিদ্বেষমূলক ভাষা কমাতে ভূমিকা রাখেন, তাহলে তা উভয় দেশের জন্যই কল্যাণকর হবে।
শেষে একটি ঘটনার কথা বলি। আজকের বাংলাদেশের অনেকের কাছে সেটি হয়তো খুব গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। কারণ এটি শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে। তবে এর নৃতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত সত্যতা তাঁরা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবেন।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরার পথে সদ্যঃস্বাধীন বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। জনতার অনুরোধে তিনি একটি সমাবেশে বাংলায় ভাষণ দেন। মঞ্চ থেকে নামার সময় এক ব্যক্তি একটি প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরেছিলেন। এতে লেখা ছিল ‘India-Bangladesh same blood. Ganga-Padma same flood.’ বাংলায় যার অর্থ—‘ভারত-বাংলাদেশ একই রক্ত, গঙ্গা-পদ্মা একই বন্যা।’
এটিই আমাদের দুই রাষ্ট্রের সার্বভৌম সত্য। এই সত্যই যেন আমাদের বন্ধুত্ব রক্ষা করে এবং অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
লেখক : মহাত্মা গান্ধীর দৌহিত্র, আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসের গবেষক, লেখক ও সাবেক কূটনীতিক
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল (২০০৪-২০০৯) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক



বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনাকে এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে ধরা হয় না। এটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কোথাও স্কুলছাত্রী, কোথাও মাদরাসার বালক, কোথাও প্রতিবেশীর ঘরে খেলতে যাওয়া ছোট্ট শিশু
আনুষ্ঠানিক বৈঠকটির সমাপ্তি ঘটে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতাসংক্রান্ত একটি দলিল এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় করার মাধ্যমে। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।