• ই-পেপার

দেশের বাজারে আজ সোনার ভরি কত?

বাংলা কিউআর: আর্থিক লেনদেনে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন

বাসস
বাংলা কিউআর: আর্থিক লেনদেনে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন

দেশে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরো সহজ, সাশ্রয়ী ও সর্বজনীন করতে বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করছে বাংলা কিউআর (কুইক রেসপন্স)। নগদবিহীন (ক্যাশলেস) এই ব্যবস্থা আরো সহজ ও স্বচ্ছ করবে লেনদেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলা কিউআর অনলাইন ভিত্তিক আর্থিক লেনদেনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বচ্ছ করতে ‘বাংলা কিউআর’কে একটি অভিন্ন ডিজিটাল লেনদেন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকে সারাদেশে বাংলা কিউআর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে। এর ফলে শপিংমল থেকে শুরু করে ফুটপাতের ব্যবসায়ী পর্যন্ত সর্বত্র একটি অভিন্ন কিউআর কোড ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সর্বজনীনতা ও কম খরচ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রচলিত কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট গ্রহণে যেখানে ব্যয়বহুল পয়েন্ট অব সেল (সিএম) মেশিনের প্রয়োজন হয়, সেখানে বাংলা কিউআর ব্যবহারে একটি সাধারণ কিউআর স্টিকারই যথেষ্ট হবে। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফুটপাতের দোকানদার কিংবা বিভিন্ন সেবাদাতাও সহজে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবেন। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলা কিউআর একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা। এতে কার্ড ক্লোনিং বা পিন চুরির মতো ঝুঁকি নেই। গ্রাহকের ব্যাংক বা মোবাইল ওয়ালেট অ্যাপ থেকেই সরাসরি লেনদেন সম্পন্ন হয়।

এদিকে বাংলা কিউআর -এর ব্যবহার সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে আহ্বায়ক করে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রথম বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য, বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের প্রতিনিধি এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের মাধ্যমে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমবে, লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ আরো সহজে আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারবে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংক পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এখন পুরো পৃথিবীই নগদবিহীন (ক্যাশলেস) লেনদেনে অভ্যস্ত। বাংলা কিউআর চালু হলে অবশ্যই ভালো হবে। উন্নত বিশ্বে তো এখন কেউ নগদ অর্থ বহন করে না। সবাই নগদবিহীন (ক্যাশলেস) লেনদেন করে। এটা চালু হলে ব্যবসায়ী থেকে ক্রেতাসহ সব মানুষই ব্যাপক সুবিধা পাবে। পাশাপাশি আমরা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লেনদেন করতে পারব।’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এখন অধিকাংশ পেমেন্টই ডিজিটাল মাধ্যমে করা যায়, সে যায়গায় আমরা এতদিন কিছুটা পিছিয়ে ছিলাম। বাংলাদেশের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার জন্য বাংলা কিউআর একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। বিশেষ করে পেমেন্ট, ফান্ড ট্রান্সাফারকে সহজ ও ঝামেলাহীন করে তুলবে এটি। এছাড়াও  এর মাধ্যমে সরকারের আর্থিক লেনদেনেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

তিনি আরো বলেন, এটি শুধু চালু করলেই হবে না। সরকারকে এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে, বিশেষ করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে। কারণ ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসিতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ফলে সবাইকে যদি সচেতন না করা যায়, তাহলে এটির সুবিধা কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে অর্থাৎ সর্বস্তরে পৌছানো যাবে না।

এ বিষয়ে নিউমার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী রহমত উল্লাহ বলেন, একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে যদি সব পেমেন্ট করা যায় তাহলে ক্যাশলেস লেনদেনের ক্ষেত্রে ঝামেলা অনেকটা কমে আসবে। এখন আলাদা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা কিউআর রয়েছে যেগুলো একসঙ্গে রাখা অনেক কঠিন। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক আল আমিন বলেন, অনলাইন পেমেন্টগুলোতে প্রধানত নিরাপত্তা  এবং ডিজিটাল যে ঝুঁকিসমূহ থাকে সেগুলোর যথাযথ সুরক্ষা প্রদান জরুরি। এগুলো মাথায় রেখেই হয়তোবা বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের কার্যাক্রম পরিচালনা করবে। পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন করতে হবে এর সহজ ব্যবহারবিধি সম্পর্কে। আর সবকিছু যদি যথাযথভাবে অনুসরণ করে তাহলে দেশের জনগণ সহজেই অনলাইনের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করতে পারবে এবং ঝুঁকি কমে যাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান এ বিষয়ে বলেন, বিএনপি সররকার বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে আধুনিকায়নের যে আশ্বাস দিয়েছে, এই অনলাইন নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা চালু তারই একটি অংশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যবসাকে সহজ করে দিতে চান, যেন মানুষ ব্যবসা করতে আগ্রহী হন। ক্যাশলেস লেনদেনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের নগদ টাকার পরিবর্তে অনলাইনে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে লেনদেন করতে পারবেন। এতে তাদের ব্যবসার নিরাপত্তা বাড়বে।

প্রবাসীদের জন্য ‘এনআরসিটিএ’ হিসাব চালুর অনুমোদন

অনলাইন ডেস্ক
প্রবাসীদের জন্য ‘এনআরসিটিএ’ হিসাব চালুর অনুমোদন

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নতুন ধরনের হিসাব চালুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে প্রবাসীরা দেশের ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে (ওবিইউ) নন-রেসিডেন্ট কনভার্টিবল টাকা অ্যাকাউন্ট (এনআরসিটিএ) খুলতে পারবেন। এ হিসাবে রাখা আমানত ও অর্জিত সুদ বা মুনাফা অবাধে বিদেশে নেয়ার সুযোগ থাকবে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-১ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটকে (ওবিইউ) এ সুবিধা চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অফশোর ব্যাংকিং আইন, ২০২৪ এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর আওতায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এ নতুন হিসাব সুবিধা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনা, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ আরো বাড়বে।

প্রজ্ঞাপনের তথ্যানুযায়ী, প্রবাসীরা ওবিইউতে সঞ্চয়ী, চলতি বা মেয়াদি আমানত—যেকোনো ধরনের এনআরসিটিএ খুলতে পারবেন। তবে এসব হিসাব পরিচালিত হবে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এনে টাকায় রূপান্তরের মাধ্যমে।

এনআরসিটিএ হিসাবে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ জমা করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশ থেকে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা, ব্যক্তিগত বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব বা নন-রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট হিসাব থেকে টাকায় রূপান্তরিত অর্থ, অন্য এনআরসিটিএ থেকে স্থানান্তরিত অর্থ এবং হিসাবের অর্থের ওপর অর্জিত সুদ বা মুনাফা।

এছাড়া এনআরসিটিএ থেকে করা বিদেশি বিনিয়োগ বা বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে ফেরত আসা অর্থও এ হিসাবে জমা করা যাবে। নতুন ইস্যুতে শেয়ার কেনার জন্য দেওয়া অর্থের ফেরত, অন্যান্য অনুমোদিত রিফান্ড এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত অন্যান্য অর্থপ্রাপ্তিও এ হিসাবের আওতায় থাকবে।

নতুন এ হিসাবের আওতায় সংগৃহীত আমানত দেশের বিশেষায়িত অঞ্চলের (স্পেশালাইজড জোন) টাইপ-এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে টাকায় ঋণ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারবে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলো। তবে এসব ঋণ শুধু বেতন, মজুরি ও ইউটিলিটি বিলের মতো অনুমোদিত চলতি হিসাবের ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা যাবে। ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রফতানি আয় থেকে।

এছাড়া এনআরসিটিএ হিসাবের বিপরীতে দেশীয় ব্যাংকিং ইউনিট (ডিবিইউ) প্রবাসী বাংলাদেশী বা তাদের মনোনীত তৃতীয় পক্ষকে ঋণ দিতে পারবে। তবে এসব ঋণ পুনঃঋণ প্রদান, কৃষি, বাগানভিত্তিক কার্যক্রম বা আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য দেয়া যাবে না।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এনআরসিটিএ আমানত জামানত হিসেবে রেখে নেয়া ঋণের অর্থ বাংলাদেশে ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া নিজস্ব ব্যবহারের জন্য দেশে আবাসিক সম্পত্তি কেনা বা নির্দিষ্ট শর্তে এমন কিছু বিনিয়োগেও ব্যবহার করা যাবে, যেগুলো থেকে অর্থ বিদেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগ থাকবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোকে প্রবাসীদের জন্য এনআরসিটিএ খোলার ক্ষেত্রে অনলাইন ইন্টারঅ্যাকটিভ ওয়েব প্লাটফর্ম ও ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এর আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে হিসাবের বৈশিষ্ট্য, পরিচালন পদ্ধতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে

রেমিট্যান্সে দারুণ গতি, ২২ দিনে এলো ২৬ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
রেমিট্যান্সে দারুণ গতি, ২২ দিনে এলো ২৬ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা
সংগৃহীত ছবি

দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির সুবাতাস বইয়ে দিয়ে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের পালে হাওয়া লেগেছে। চলতি জুন মাসের প্রথম ২২ দিনে প্রবাসীরা বৈধ পথে ২১৫ কোটি ১০ লাখ (২১৫১ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২.৭৫ টাকা হিসাবে)। মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

তথ্য অনুযায়ী, একক মাস হিসেবে জুনের ২২ দিনে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। আগের বছর (২০২৫) জুন মাসের প্রথম ২২ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২১১ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

তবে একক মাসের চেয়ে চলতি পুরো অর্থবছরের হিসাবে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি বেশ আশাবাঞ্জক। পরিসংখ্যান বলছে, অর্থবছরের হিসাবে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২২ জুন পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ৯৬২ কোটি ডলার। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে (২২ জুন পর্যন্ত) তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৯০ কোটি ৮০ লাখ ডলারে।
এর মধ্যে কেবল ২২ জুনেই প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন ৬ কোটি ৭০ লাখ (৬৭ মিলিয়ন) ডলার।

কোরবানির পর থেকে ব্রয়লার মুরগির দাম কমছেই

বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের বিপরীতে মূল্য পতনে দিশেহারা খামারিরা

অনলাইন ডেস্ক
কোরবানির পর থেকে ব্রয়লার মুরগির দাম কমছেই
সংগৃহীত ছবি

ঈদুল আজহার পর ব্রয়লার মুরগির দাম ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় হাজার হাজার প্রান্তিক পোলট্রি খামারি লোকসানের মুখে পড়েছেন। পোলট্রি শিল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার পর মুরগির চাহিদা সব সময়ই কমে যায়, অনেক পরিবারের ফ্রিজারে কোরবানির মাংস সংরক্ষিত থাকার কারণে মুরগির চাহিদা কমেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পশুপাখির খাদ্যসহ অন্যান্য উপকরণের দাম কৃষকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় তারা ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ কমাতে পারছেন না। জুনের প্রথমার্ধে উত্তরাঞ্চলে ব্রয়লার মুরগির আনুমানিক উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি প্রায় ১৪০ টাকা হলেও বাজার চাহিদায় ভাটা থাকায় খামারিরা জীবন্ত ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১১০-১২০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

পঞ্চগড় জেলা সদরের পূর্ব জালাসির প্রান্তিক পোলট্রি খামারি আবদুল খালেক সম্প্রতি এক হাজার ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করেছেন ১১৫ টাকা কেজি দরে। হিসাব শেষে তার লোকসান হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। এর পরও নিজ বাড়ির আঙিনার দুটি পৃথক শেডে এক হাজার ৫০০ বাচ্চা তুলে লালন-পালন করছেন। তিনি বলেন, পোলট্রি খামার আমার নেশা এবং পেশা। ২০০১ সালে ১০০ বাচ্চা দিয়ে শুরু করে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এখন আমার দেড় হাজারের খামার। লাভ-লোকসান মিলিয়ে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোটামুটি চলছিলাম। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকে প্রতিটি ব্যাচে কমবেশি লোকসান হচ্ছে। এতে ডিলারের কাছে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকার দেনা হয়ে গেছি। 

জেলা সদরের শেখেরহাট এলাকার নারী খামারি জুলেখা বেগম (৫০) স্বামীর অসুস্থতার কারণে সংসারের হাল ধরতে ২০১১ সালে ৩০০ ব্রয়লার বাচ্চা দিয়ে খামার শুরু করেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর আয় বাড়াতে জমানো টাকায় খামারের আকারও বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু বাড়তি আয়ের বিপরীতে দিন দিন ডিলারের খাতায় ঋণের অঙ্ক বড় হচ্ছে উল্লেখ করে জুলেখা বেগম বলেন, যখন মুরগির কেজি ৬০ টাকা ছিল, তখন ফিডের বস্তা (৫০ কেজি) ছিল এক হাজার টাকা। আর বর্তমানে যখন ফিডের বস্তা তিন হাজার ৬০০ টাকা, তখন মুরগির কেজি ১১০ থেকে ১২০ টাকা। এখন বাচ্চা তুললেই লোকসান, তাই আপাতত খামার বন্ধ রেখেছি। 

তথ্যপ্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা করে চাকরি না খুঁজে নিজে উদ্যোক্তা হতে জেলার জগদল ঠুটাপুখরী এলাকার পোলট্রির খামার গড়েছেন মো. রবিউল পারভেজ (২৭)। তিনটি শেডে পাঁচ হাজার মুরগির খামারে বর্তমানে রয়েছে মাত্র এক হাজার ৩০০ মুরগি। তাঁর মতে, ‘মুরগির দামের অস্থিরতা আমাকেও অস্থির করে তুলেছে। একবার দর ভালো পেলে তিনবার খারাপ যাচ্ছে। এতে ক্রমে মনোবল হারিয়ে ফেলছি। যখন ৫০০-১০০০-এর মুরগির খামার ছিল, তখন ভালোই ছিলাম। কিন্তু এখন বড় বিনিয়োগ করে ঝুঁকিও বাড়িয়ে ফেলেছি।’ তিনি জানান, পোলট্রি খামার ব্যবসায় বাচ্চার দর ও ফিডের দর যাই হোক, মূল বিষয় মুরগির মাংসের বাজারদর। গত কয়েক মাস ধরে খামার গেটে মুরগির অস্বাভাবিক দর পতনের কারণে ডিলারের কাছে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।

দেশে উত্তরাঞ্চলের আরেক জেলা ঠাকুরগাঁও সদরের হরিহরপুরের খামারি মো. রবিউল আউয়াল (৪০) তাঁর ১৫ হাজার ব্রয়লার লালন ক্ষমতার খামারে বর্তমানে আছে মাত্র তিন হাজার মুরগি। এ প্রতিবেদককে তিনি জানান, আগে ৫৫-৬০ টাকা দরে বাচ্চা কিনেও মুরগির বাজারদর ভালো থাকায় হাজারে ৫০-৭৫ হাজার টাকা লাভ করেছি। আর এখন মুরগির চাহিদা ও বাজার দরে ধস নামায় ১৫ টাকা দরে বাচ্চা কিনেও খামারির খরচ উঠছে না, বরং ব্যাচ শেষে ৫০-৭০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। তাঁর হিসাবে বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা হলেও বাজারদর ১১০ থেকে ১২০-১২৫ টাকার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এতে প্রতি কেজিতে আমাদের গড় লোকসান কমপক্ষে ২০ টাকা। যার খামার যত বড়, তার লোকসানের হিসাবও তত বড় উল্লেখ করেন তিনি। 

বাজার পরিস্থিতি নিয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে পঞ্চগড়ের পাইকারি মুরগি ব্যবসায়ী মাসুদ পোলট্রির স্বত্বাধিকারী মো. আমান আলীর (৩৩) মতে, পোলট্রি ব্যবসা ভালো নেই। এ খাতের খামারি ও ব্যবসায়ীরাও কেউই ভালো নেই। বাজারে পোলট্রি মুরগির চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে। সঙ্গে সঙ্গে গত কয়েক মাস ধরে খামার পর্যায়ে মুরগির দাম কমেছে। তিনি বলেন, ‘পঞ্চগড় ছাড়াও দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও থেকে আগে প্রতিদিন তিন গাড়ি (প্রতি গাড়িতে ২০০ কেজি) মুরগি এনে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করতাম। বর্তমানে তা কমে এক গাড়িতে নেমেছে।’ কোরবানির কারণে সব শ্রেণির ক্রেতার মুরগি কম কিনছেন। তা ছাড়া বাজারে মাছ ও সবজির সরবরাহ ও দাম কমেছে। মূলত এতে বাজারে মুরগির চাহিদ কমে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। 

এ বিষয়ে কাজী ফার্মসের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) সরদার সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে ব্রয়লার মুরগির দাম কম। মুরগির দাম কম থাকায় খামারিরা এক দিনের ব্রয়লার বাচ্চা কিনতে চাচ্ছেন না। ফলে এক দিনের বাচ্চার দামও কম এবং হ্যাচারিগুলো ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। আবার যখন ব্রয়লার মুরগির চাহিদা বাড়বে এবং খামারিরা ফের এক দিনের বাচ্চা কিনতে চাইবেন, তখন বাচ্চার দাম বাড়তে পারে। আর এমনটা যদি হয়, সরকারের পক্ষ থেকে হ্যাচারিগুলোর চলমান লোকসান পুষিয়ে নিতে তখনকার বাজারভিত্তিক দরে বাচ্চা বিক্রির সুযোগ দেওয়া যুক্তযুক্ত হবে। বাজার যখন ভালো থাকবে, তখন কোম্পানিগুলোকে বাজারের মন্দার সময়ের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায়, হ্যাচারি শিল্প সংকুচিত হয়ে পড়বে।’