ঈদুল আজহার পর ব্রয়লার মুরগির দাম ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় হাজার হাজার প্রান্তিক পোলট্রি খামারি লোকসানের মুখে পড়েছেন। পোলট্রি শিল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার পর মুরগির চাহিদা সব সময়ই কমে যায়, অনেক পরিবারের ফ্রিজারে কোরবানির মাংস সংরক্ষিত থাকার কারণে মুরগির চাহিদা কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পশুপাখির খাদ্যসহ অন্যান্য উপকরণের দাম কৃষকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় তারা ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ কমাতে পারছেন না। জুনের প্রথমার্ধে উত্তরাঞ্চলে ব্রয়লার মুরগির আনুমানিক উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি প্রায় ১৪০ টাকা হলেও বাজার চাহিদায় ভাটা থাকায় খামারিরা জীবন্ত ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১১০-১২০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
পঞ্চগড় জেলা সদরের পূর্ব জালাসির প্রান্তিক পোলট্রি খামারি আবদুল খালেক সম্প্রতি এক হাজার ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করেছেন ১১৫ টাকা কেজি দরে। হিসাব শেষে তার লোকসান হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। এর পরও নিজ বাড়ির আঙিনার দুটি পৃথক শেডে এক হাজার ৫০০ বাচ্চা তুলে লালন-পালন করছেন। তিনি বলেন, পোলট্রি খামার আমার নেশা এবং পেশা। ২০০১ সালে ১০০ বাচ্চা দিয়ে শুরু করে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এখন আমার দেড় হাজারের খামার। লাভ-লোকসান মিলিয়ে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোটামুটি চলছিলাম। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকে প্রতিটি ব্যাচে কমবেশি লোকসান হচ্ছে। এতে ডিলারের কাছে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকার দেনা হয়ে গেছি।
জেলা সদরের শেখেরহাট এলাকার নারী খামারি জুলেখা বেগম (৫০) স্বামীর অসুস্থতার কারণে সংসারের হাল ধরতে ২০১১ সালে ৩০০ ব্রয়লার বাচ্চা দিয়ে খামার শুরু করেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর আয় বাড়াতে জমানো টাকায় খামারের আকারও বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু বাড়তি আয়ের বিপরীতে দিন দিন ডিলারের খাতায় ঋণের অঙ্ক বড় হচ্ছে উল্লেখ করে জুলেখা বেগম বলেন, যখন মুরগির কেজি ৬০ টাকা ছিল, তখন ফিডের বস্তা (৫০ কেজি) ছিল এক হাজার টাকা। আর বর্তমানে যখন ফিডের বস্তা তিন হাজার ৬০০ টাকা, তখন মুরগির কেজি ১১০ থেকে ১২০ টাকা। এখন বাচ্চা তুললেই লোকসান, তাই আপাতত খামার বন্ধ রেখেছি।
তথ্যপ্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা করে চাকরি না খুঁজে নিজে উদ্যোক্তা হতে জেলার জগদল ঠুটাপুখরী এলাকার পোলট্রির খামার গড়েছেন মো. রবিউল পারভেজ (২৭)। তিনটি শেডে পাঁচ হাজার মুরগির খামারে বর্তমানে রয়েছে মাত্র এক হাজার ৩০০ মুরগি। তাঁর মতে, ‘মুরগির দামের অস্থিরতা আমাকেও অস্থির করে তুলেছে। একবার দর ভালো পেলে তিনবার খারাপ যাচ্ছে। এতে ক্রমে মনোবল হারিয়ে ফেলছি। যখন ৫০০-১০০০-এর মুরগির খামার ছিল, তখন ভালোই ছিলাম। কিন্তু এখন বড় বিনিয়োগ করে ঝুঁকিও বাড়িয়ে ফেলেছি।’ তিনি জানান, পোলট্রি খামার ব্যবসায় বাচ্চার দর ও ফিডের দর যাই হোক, মূল বিষয় মুরগির মাংসের বাজারদর। গত কয়েক মাস ধরে খামার গেটে মুরগির অস্বাভাবিক দর পতনের কারণে ডিলারের কাছে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।
দেশে উত্তরাঞ্চলের আরেক জেলা ঠাকুরগাঁও সদরের হরিহরপুরের খামারি মো. রবিউল আউয়াল (৪০) তাঁর ১৫ হাজার ব্রয়লার লালন ক্ষমতার খামারে বর্তমানে আছে মাত্র তিন হাজার মুরগি। এ প্রতিবেদককে তিনি জানান, আগে ৫৫-৬০ টাকা দরে বাচ্চা কিনেও মুরগির বাজারদর ভালো থাকায় হাজারে ৫০-৭৫ হাজার টাকা লাভ করেছি। আর এখন মুরগির চাহিদা ও বাজার দরে ধস নামায় ১৫ টাকা দরে বাচ্চা কিনেও খামারির খরচ উঠছে না, বরং ব্যাচ শেষে ৫০-৭০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। তাঁর হিসাবে বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা হলেও বাজারদর ১১০ থেকে ১২০-১২৫ টাকার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এতে প্রতি কেজিতে আমাদের গড় লোকসান কমপক্ষে ২০ টাকা। যার খামার যত বড়, তার লোকসানের হিসাবও তত বড় উল্লেখ করেন তিনি।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে পঞ্চগড়ের পাইকারি মুরগি ব্যবসায়ী মাসুদ পোলট্রির স্বত্বাধিকারী মো. আমান আলীর (৩৩) মতে, পোলট্রি ব্যবসা ভালো নেই। এ খাতের খামারি ও ব্যবসায়ীরাও কেউই ভালো নেই। বাজারে পোলট্রি মুরগির চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে। সঙ্গে সঙ্গে গত কয়েক মাস ধরে খামার পর্যায়ে মুরগির দাম কমেছে। তিনি বলেন, ‘পঞ্চগড় ছাড়াও দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও থেকে আগে প্রতিদিন তিন গাড়ি (প্রতি গাড়িতে ২০০ কেজি) মুরগি এনে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করতাম। বর্তমানে তা কমে এক গাড়িতে নেমেছে।’ কোরবানির কারণে সব শ্রেণির ক্রেতার মুরগি কম কিনছেন। তা ছাড়া বাজারে মাছ ও সবজির সরবরাহ ও দাম কমেছে। মূলত এতে বাজারে মুরগির চাহিদ কমে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ বিষয়ে কাজী ফার্মসের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) সরদার সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে ব্রয়লার মুরগির দাম কম। মুরগির দাম কম থাকায় খামারিরা এক দিনের ব্রয়লার বাচ্চা কিনতে চাচ্ছেন না। ফলে এক দিনের বাচ্চার দামও কম এবং হ্যাচারিগুলো ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। আবার যখন ব্রয়লার মুরগির চাহিদা বাড়বে এবং খামারিরা ফের এক দিনের বাচ্চা কিনতে চাইবেন, তখন বাচ্চার দাম বাড়তে পারে। আর এমনটা যদি হয়, সরকারের পক্ষ থেকে হ্যাচারিগুলোর চলমান লোকসান পুষিয়ে নিতে তখনকার বাজারভিত্তিক দরে বাচ্চা বিক্রির সুযোগ দেওয়া যুক্তযুক্ত হবে। বাজার যখন ভালো থাকবে, তখন কোম্পানিগুলোকে বাজারের মন্দার সময়ের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায়, হ্যাচারি শিল্প সংকুচিত হয়ে পড়বে।’




