দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য যখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে, সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিএনপি জোট সরকার একটি বড় বাজেট দিয়েছে, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যবসা চাঙ্গা করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোসহ সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় মানুষের চাহিদা পূরণের বিশাল চাপ রয়েছে বিএনপি জোটের এই সরকারের ওপর। তাই স্বাভাবিকভাবেই এগুলো পূরণের সুযোগ নেবে এ সরকার।
তবে বড় বাজেট বাস্তবায়নের এই লক্ষ্যের মধ্যে বড় রাজস্ব আয় করারও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বড় রাজস্ব লক্ষ্য মানে বেশি বেশি কর আদায়। আর তা করতে হবে বলে স্বাভাবিকভাবেই করদাতা, বিশেষ করে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়বে। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে, বেশি রাজস্ব আদায়ও করতে হবে। তবে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাকে স্বস্তিও দিতে হবে, যাতে তাঁরা করের বোঝার কবলে পড়ে ব্যবসায় অব্যাহত লোকসান দিতে থাকেন কিংবা ব্যবসা গুটিয়ে চলে যান। এটির ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নতুন বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় দিক।
দশকের পর দশক ধরে চলে আসা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়ন মডেল এখন কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে স্থবিরতার মুখে পড়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অর্থনীতির ক্ষত সারিয়ে তোলার জন্য ‘ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন’ বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকটের গভীরতা এতটাই বেশি যে এর প্রভাব দৈনন্দিন জনজীবনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার পর্যালোচনায় দেখা যায় যে মূল্যস্ফীতি এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণকারী প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবে মুদ্রাপ্রবাহ কমানোর ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে। তবু খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমাগত সংকুচিত করছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাংকিং খাতের সংকট অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের হার, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দেশের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে। বর্তমানে মোট ঋণের একটি বিশাল অংশ খেলাপি হওয়ার কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অর্থের প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।
বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের চাহিদা আগের তুলনায় কমেছে, যার ফলে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গতি বেগবান হচ্ছে না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট কাটাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হলেও এর ফলে উৎপাদনমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা সামগ্রিক উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগকারীরা উচ্চ সুদের হার এবং অস্থির বিনিময় হারের কারণে নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন, যদিও সরকার দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম এমন শিল্পকাঠামো গড়ে তোলার পথে পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাব এখনো বড় একটি দুর্বলতা।
রাজস্ব আদায়ের করুণ দশা বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম উদ্বেগজনক দিক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কর-জিডিপি অনুপাত ৭-৮ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর ফলে সরকারের নিজস্ব আয় থেকে যে তহবিল হওয়ার কথা, সেটি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। ফলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ঠিকমতো বাস্তবায়িত হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে এডিপিতে খরচ করা গেছে মাত্র ৫৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটই ছিল দুই লাখ কোটি টাকা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় এই খাত থেকেও সরকার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পায়নি। ফলে রাজস্ব ঘাটতি এরই মধ্যে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
রাজস্ব ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকারকে বাধ্যতামূলকভাবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। এই অঙ্কও এক লাখ কোটি টাকার বেশি। এই ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বা সরকারি ঋণের চাপে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যার ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে এবং অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প অর্থের অভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাকে কমিয়ে দিচ্ছে।
তাই সরকারকে যেমন ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন করতে সাত লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে, তেমনি এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে সরকারকে কর আদায় এবং ব্যবসা-বিনিয়োগের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে। এই সংকটময় সময়ে করের বোঝা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই কর আদায়কে শুধু বাধ্যতামূলক অর্থ সংগ্রহের উপায় হিসেবে না দেখে একে একটি সেবা ও উন্নয়নমুখী কাঠামোতে রূপান্তর করতে হবে। সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এই বাড়তি কর যাতে সক্ষম সব স্তর থেকে আদায় করা যায় তার একটি পথনকশা তৈরি করা। এটি কোনোভাবেই যেন যারা নিয়মিত বর্ধিত হারে কর দিচ্ছে, তাদের ওপর যাতে আরো চাপ না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। আর এটি না হলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহ হবে এবং অর্থনীতি আরো সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে।
মোটাদাগে, ব্যবসা-বিনিয়োগের প্রসার আর কর আদায়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়াতে ফাঁকি কমানোতে জোর দিতে হবে। এ জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। করপ্রক্রিয়া যদি পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক এবং হয়রানিমুক্ত করা যায়, তবে মানুষ নিজের ইচ্ছায়ই রিটার্ন দাখিল করবে, যার ফলে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব বাড়বে অথচ ব্যবসায়ী বা নাগরিকের ভোগান্তি কমবে। এ ছাড়া করনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। উদ্যোক্তারা তখনই বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, যখন তাঁরা নিশ্চিত থাকবেন যে আগামী কয়েক বছর তাঁদের ব্যাবসায়িক পরিবেশ বা করের শর্ত হঠাৎ করে পরিবর্তিত হবে না। করকাঠামোকে বিনিয়োগবান্ধব করতে হলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দিতে হবে।
বিনিয়োগকে চাঙ্গা রাখার জন্য সরকারকে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত ওয়ানস্টপ সেবা প্রদান এবং সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করলে নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি আনবে। যখন ব্যবসা বাড়বে এবং মানুষের আয় বাড়বে, তখন পরোক্ষভাবেই সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। অর্থাৎ কর আদায় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, যদি সরকার করদাতাকে হয়রানি না করে বরং তাঁকে ব্যবসার প্রসারে সহায়তা করে। সংকটময় এই সময়ে উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে হলে কর ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা নয়, বরং স্বচ্ছতা, অটোমেশন এবং ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই কৌশল।
ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমাতে হলে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনার আমূল ডিজিটাল রূপান্তর প্রয়োজন, যাতে অডিট বা এনবিআরের অফিসে হয়রানি ছাড়াই উদ্যোক্তারা ঘরে বসে করসংক্রান্ত সব কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। করের উচ্চহার ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহ করে। তাই হার কমিয়ে করজাল সম্প্রসারণ করলে তা সরকারের রাজস্ব খাত ও ব্যবসায়ী—উভয়ের জন্যই কল্যাণকর হবে। এর পাশাপাশি বর্তমান উচ্চ সুদহারের বাজারে উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে স্বল্প সুদে পুনরর্থায়ন স্কিম এবং ঋণ পুনর্গঠনের বিশেষ সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। লজিস্টিকস খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ব্যাবসায়িক লাইসেন্স ও অনুমতি প্রাপ্তি সহজ করা হলে বিনিয়োগের পথে থাকা আমলাতান্ত্রিক দেয়ালগুলো ভেঙে পড়বে।
রাজস্ব আদায়ের কৌশল হিসেবে জোরপূর্বক আদায়ের চেয়ে যদি ব্যবসা সহায়ক পরিবেশের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়, তবেই অর্থনীতিতে নতুন করে প্রাণ ফিরবে। নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক যৌক্তিকীকরণ এবং নির্দিষ্ট শিল্প খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর অবকাশ সুবিধা দিলে তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস জোগাবে। সরকার যখন করদাতার পরিধি বাড়াতে ডেটাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে এবং ব্যবসায়ীদের অংশীদার হিসেবে গণ্য করবে, তখনই ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের এই সমন্বিত প্রয়াসই পারে বর্তমান সংকট কাটিয়ে বিনিয়োগপ্রবাহকে চাঙ্গা করতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে।
সব শেষে বলব, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ধ কারখানা চালু, পুরনো ব্যবসার প্রসারসহ বিভিন্ন প্রণোদনামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য যে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেওয়ার ঘোষণা করেছে, এটি ভালো উদ্যোগ। এখন এর সুফল যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা পান সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এটি যেন বিগত সময়ের মতো লুটপাট কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে টাকা নিয়ে চম্পট দেওয়ার পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না হয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও
কালের কণ্ঠের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক



বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনাকে এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে ধরা হয় না। এটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কোথাও স্কুলছাত্রী, কোথাও মাদরাসার বালক, কোথাও প্রতিবেশীর ঘরে খেলতে যাওয়া ছোট্ট শিশু
আনুষ্ঠানিক বৈঠকটির সমাপ্তি ঘটে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতাসংক্রান্ত একটি দলিল এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় করার মাধ্যমে। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।