• ই-পেপার

বাংলাদেশ-ভারতে একই রক্তপ্রবাহ, গঙ্গা-পদ্মায় একই জলপ্রবাহ : অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতির বন্ধন

  • গোপালকৃষ্ণ গান্ধী

কর আদায় ও ব্যবসা প্রসারের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি

ফারুক মেহেদী

কর আদায় ও ব্যবসা প্রসারের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি

দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য যখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে, সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিএনপি জোট সরকার একটি বড় বাজেট দিয়েছে, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যবসা চাঙ্গা করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোসহ সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় মানুষের চাহিদা পূরণের বিশাল চাপ রয়েছে বিএনপি জোটের এই সরকারের ওপর। তাই স্বাভাবিকভাবেই এগুলো পূরণের সুযোগ নেবে এ সরকার।

তবে বড় বাজেট বাস্তবায়নের এই লক্ষ্যের মধ্যে বড় রাজস্ব আয় করারও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বড় রাজস্ব লক্ষ্য মানে বেশি বেশি কর আদায়। আর তা করতে হবে বলে স্বাভাবিকভাবেই করদাতা, বিশেষ করে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়বে। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে, বেশি রাজস্ব আদায়ও করতে হবে। তবে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাকে স্বস্তিও দিতে হবে, যাতে তাঁরা করের বোঝার কবলে পড়ে ব্যবসায় অব্যাহত লোকসান দিতে থাকেন কিংবা ব্যবসা গুটিয়ে চলে যান। এটির ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নতুন বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় দিক।   

দশকের পর দশক ধরে চলে আসা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়ন মডেল এখন কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে স্থবিরতার মুখে পড়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অর্থনীতির ক্ষত সারিয়ে তোলার জন্য ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকটের গভীরতা এতটাই বেশি যে এর প্রভাব দৈনন্দিন জনজীবনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

কর আদায় ও ব্যবসা প্রসারের মধ্যে ভারসাম্য জরুরিঅর্থনীতির বর্তমান অবস্থার পর্যালোচনায় দেখা যায় যে মূল্যস্ফীতি এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণকারী প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবে মুদ্রাপ্রবাহ কমানোর ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে। তবু খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমাগত সংকুচিত করছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাংকিং খাতের সংকট অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের হার, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দেশের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে। বর্তমানে মোট ঋণের একটি বিশাল অংশ খেলাপি হওয়ার কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অর্থের প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।

বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের চাহিদা আগের তুলনায় কমেছে, যার ফলে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গতি বেগবান হচ্ছে না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট কাটাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হলেও এর ফলে উৎপাদনমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা সামগ্রিক উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগকারীরা উচ্চ সুদের হার এবং অস্থির বিনিময় হারের কারণে নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন, যদিও সরকার দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম এমন শিল্পকাঠামো গড়ে তোলার পথে পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাব এখনো বড় একটি দুর্বলতা।

রাজস্ব আদায়ের করুণ দশা বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম উদ্বেগজনক দিক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কর-জিডিপি অনুপাত ৭-৮ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর ফলে সরকারের নিজস্ব আয় থেকে যে তহবিল হওয়ার কথা, সেটি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। ফলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ঠিকমতো বাস্তবায়িত হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে এডিপিতে খরচ করা গেছে মাত্র ৫৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটই ছিল দুই লাখ কোটি টাকা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় এই খাত থেকেও সরকার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পায়নি। ফলে রাজস্ব ঘাটতি এরই মধ্যে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

রাজস্ব ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকারকে বাধ্যতামূলকভাবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। এই অঙ্কও এক লাখ কোটি টাকার বেশি। এই ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট বা সরকারি ঋণের চাপে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যার ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে এবং অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প অর্থের অভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাকে কমিয়ে দিচ্ছে।

তাই সরকারকে যেমন ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন করতে সাত লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে, তেমনি এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে সরকারকে কর আদায় এবং ব্যবসা-বিনিয়োগের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে। এই সংকটময় সময়ে করের বোঝা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই কর আদায়কে শুধু বাধ্যতামূলক অর্থ সংগ্রহের উপায় হিসেবে না দেখে একে একটি সেবা ও উন্নয়নমুখী কাঠামোতে রূপান্তর করতে হবে। সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এই বাড়তি কর যাতে সক্ষম সব স্তর থেকে আদায় করা যায় তার একটি পথনকশা তৈরি করা। এটি কোনোভাবেই যেন যারা নিয়মিত বর্ধিত হারে কর দিচ্ছে, তাদের ওপর যাতে আরো চাপ না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। আর এটি না হলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহ হবে এবং অর্থনীতি আরো সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে।

মোটাদাগে, ব্যবসা-বিনিয়োগের প্রসার আর কর আদায়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়াতে ফাঁকি কমানোতে জোর দিতে হবে। এ জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। করপ্রক্রিয়া যদি পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক এবং হয়রানিমুক্ত করা যায়, তবে মানুষ নিজের ইচ্ছায়ই রিটার্ন দাখিল করবে, যার ফলে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব বাড়বে অথচ ব্যবসায়ী বা নাগরিকের ভোগান্তি কমবে। এ ছাড়া করনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। উদ্যোক্তারা তখনই বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, যখন তাঁরা নিশ্চিত থাকবেন যে আগামী কয়েক বছর তাঁদের ব্যাবসায়িক পরিবেশ বা করের শর্ত হঠাৎ করে পরিবর্তিত হবে না। করকাঠামোকে বিনিয়োগবান্ধব করতে হলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দিতে হবে।

বিনিয়োগকে চাঙ্গা রাখার জন্য সরকারকে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত ওয়ানস্টপ সেবা প্রদান এবং সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করলে নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি আনবে। যখন ব্যবসা বাড়বে এবং মানুষের আয় বাড়বে, তখন পরোক্ষভাবেই সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। অর্থাৎ কর আদায় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, যদি সরকার করদাতাকে হয়রানি না করে বরং তাঁকে ব্যবসার প্রসারে সহায়তা করে। সংকটময় এই সময়ে উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে হলে কর ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা নয়, বরং স্বচ্ছতা, অটোমেশন এবং ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই কৌশল।

ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমাতে হলে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনার আমূল ডিজিটাল রূপান্তর প্রয়োজন, যাতে অডিট বা এনবিআরের অফিসে হয়রানি ছাড়াই উদ্যোক্তারা ঘরে বসে করসংক্রান্ত সব কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। করের উচ্চহার ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহ করে। তাই হার কমিয়ে করজাল সম্প্রসারণ করলে তা সরকারের রাজস্ব খাত ও ব্যবসায়ীউভয়ের জন্যই কল্যাণকর হবে। এর পাশাপাশি বর্তমান উচ্চ সুদহারের বাজারে উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে স্বল্প সুদে পুনরর্থায়ন স্কিম এবং ঋণ পুনর্গঠনের বিশেষ সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। লজিস্টিকস খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ব্যাবসায়িক লাইসেন্স ও অনুমতি প্রাপ্তি সহজ করা হলে বিনিয়োগের পথে থাকা আমলাতান্ত্রিক দেয়ালগুলো ভেঙে পড়বে।

রাজস্ব আদায়ের কৌশল হিসেবে জোরপূর্বক আদায়ের চেয়ে যদি ব্যবসা সহায়ক পরিবেশের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়, তবেই অর্থনীতিতে নতুন করে প্রাণ ফিরবে। নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক যৌক্তিকীকরণ এবং নির্দিষ্ট শিল্প খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর অবকাশ সুবিধা দিলে তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস জোগাবে। সরকার যখন করদাতার পরিধি বাড়াতে ডেটাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে এবং ব্যবসায়ীদের অংশীদার হিসেবে গণ্য করবে, তখনই ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের এই সমন্বিত প্রয়াসই পারে বর্তমান সংকট কাটিয়ে বিনিয়োগপ্রবাহকে চাঙ্গা করতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে।

সব শেষে বলব, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ধ কারখানা চালু, পুরনো ব্যবসার প্রসারসহ বিভিন্ন প্রণোদনামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য যে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেওয়ার ঘোষণা করেছে, এটি ভালো উদ্যোগ। এখন এর সুফল যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা পান সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এটি যেন বিগত সময়ের মতো লুটপাট কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে টাকা নিয়ে চম্পট দেওয়ার পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না হয়।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও

কালের কণ্ঠের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

শিশু নিপীড়ন বৃদ্ধির কারণ অবাধ ডিজিটাল অশ্লীলতা

ড. মো. ফখরুল ইসলাম

শিশু নিপীড়ন বৃদ্ধির কারণ অবাধ ডিজিটাল অশ্লীলতা

টিভিতে খবর দেখার সময় আমাদের বসার ঘরে বেশ কয়েকজন উপস্থিত। খবরের শুরুটা হলো শিশু রামিসা ধর্ষণ ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড নিয়ে। পরের খবরটাও চট্টগ্রামের শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত। সারা দেশ আজ এসব নির্মম ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে। ছাত্র-ছাত্রী এমনকি শিশুরাও মিছিল নিয়ে প্রতিবাদে শামিল হয়েছে। টিভিতে এসব দেখে একজন মন্তব্য করল, স্মার্টফোনে অশ্লীল কনটেন্ট দেখে কিছু মানুষ বিগড়ে যাচ্ছে। আরেকজন তার কথার প্রতিউত্তর দিয়ে বলল, আরে শুধু ওটা নয়। মূল কারণটা হলো মাদক। খবরে শুনলে না, রামিসাকে বাথরুমে আটকানোর আগে লোকটা ইয়াবা খেয়েছিল!

ওদের ভাষ্য শুনে মনে হলো, তাইতো। শিশু নিপীড়ন ও হত্যার কারণগুলো তো খবরেই বলা হয়েছে। আমার কাছেও ওদের কথার যুক্তি শুনে মনে হলো, অবাধ ইন্টারনেটের অশ্লীল ভিডিও, গেম, রিল এবং অনলাইনে মাদক কেনাবেচা, মাদকের সহজলভ্যতা এসব অপরাধের পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী। আমাদের চিরায়ত সামাজিক মূল্যবোধকে পিষে মেরে দ্রুত পারিবারিক ও সামাজিক ভাঙন সূচিত করার পেছনে পর্নো ও মাদক দৈত্য হয়ে ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে।

শিশু নিপীড়ন আজ বাংলাদেশের সমাজে সবচেয়ে আতঙ্কজনক অপরাধগুলোর একটি। প্রায় প্রতিদিন স্মার্ট ফোন বা সংবাদপত্র খুললেই কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার খবর চোখে পড়ে। এই ঘটনাগুলো শুধু আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়; এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণহীন মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের সম্মিলিত ফল।

শিশু নিপীড়ন বৃদ্ধির কারণ অবাধ ডিজিটাল অশ্লীলতাবাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনাকে এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে ধরা হয় না। এটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কোথাও স্কুলছাত্রী, কোথাও মাদরাসার বালক, কোথাও প্রতিবেশীর ঘরে খেলতে যাওয়া ছোট্ট শিশুকেউ নিরাপদ নয়। কেন মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে যে একটি শিশুকেও যৌন লালসার শিকার বানাতে দ্বিধা করছে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দুটি বিষয় বারবার সামনে আসে, মুঠোফোনে সহজলভ্য পর্নোগ্রাফি এবং নিয়ন্ত্রণহীন মাদক।

একসময় অশ্লীল কনটেন্টে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট মাধ্যম বা গোপন জায়গা প্রয়োজন হতো। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। স্মার্টফোন ও সস্তা ইন্টারনেটের কারণে যেকোনো ধরনের ভিডিও, ছবি বা কনটেন্ট কয়েক সেকেন্ডে হাতের মুঠোয় চলে আসছে। একটি শিশুও আজ মোবাইল ফোনে এমন সব কনটেন্ট দেখতে পারছে, যা তার মানসিক বিকাশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। শুধু শিশু নয়, কিশোর-তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের বড় একটি অংশও নিয়মিত পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে।

প্রযুক্তির এই অগ্রগতি যেমন আশীর্বাদ, তেমনি এর অপব্যবহার ভয়াবহ বিপদও তৈরি করেছে। অনলাইন পর্নোগ্রাফি মানুষের যৌন আচরণ ও চিন্তাকে বিকৃত করে। ধীরে ধীরে একজন ব্যক্তি স্বাভাবিক বিষয় থেকে বিকৃত ও নিষ্ঠুর যৌন আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছেন যে অতিরিক্ত পর্নোগ্রাফি মানুষের সহানুভূতি কমিয়ে দেয় এবং অন্যকে মানুষ নয়; বরং ভোগের বস্তু হিসেবে দেখতে শেখায়। যখন একজন মানুষ নারীকেও মানুষ হিসেবে নয়, শুধু যৌন বস্তু হিসেবে দেখতে শুরু করে তখন শিশু পর্যন্ত নিরাপদ থাকে না।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশু ধর্ষণের অভিযুক্তরা নিয়মিত পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। তারা বিশেষ করে বিকৃত ও সহিংস যৌন কনটেন্ট দেখে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাস্তব জীবনে সেই বিকৃত কল্পনাকে প্রয়োগ করার চেষ্টা থেকেই তারা শিশুদের টার্গেট করে। কারণ শিশুরা দুর্বল, সহজে ভয় পায় এবং প্রতিবাদ করতে পারে না। এভাবে পর্নোগ্রাফি মানুষের ভেতরের পশুত্বকে উসকে দেয়। তবে শুধু পর্নোগ্রাফি নয়, নিয়ন্ত্রণহীন মাদক এই সমস্যাকে আরো ভয়ংকর করে তুলছে। ইয়াবা, আইস, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সহজলভ্য। অনেক তরুণ রাত জেগে মাদক গ্রহণের পাশাপাশি পর্নো দেখে। এই দুটি বিষ একসঙ্গে মানুষের বিবেক, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতাকে ধ্বংস করে দেয়।

আজকের সমাজে আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পর্নোগ্রাফি ও মাদককে অনেক তরুণ স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। বন্ধুমহল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, কিছু ওয়েব সিরিজ ও অনলাইন কনটেন্ট এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করছে, যেখানে অশ্লীলতা ও নেশাকে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে অনেক কিশোর খুব অল্প বয়সেই এই জগতে ঢুকে পড়ে। প্রথমে কৌতূহল, পরে অভ্যাস, এরপর আসক্তি, এই ধাপগুলো অতিক্রম করে একজন তরুণ ধীরে ধীরে মানসিকভাবে বিকৃত হয়ে যায়।

অনেক পরিবারে বাবা-মা কর্মব্যস্ত। সন্তান ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোনে কী দেখছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের কনটেন্ট গ্রহণ করছে এসবের ওপর নজরদারি নিই। শিশুর হাতে অবাধে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হলেও তার ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে খুব কম পরিবারই সচেতন। ফলে অল্প বয়সেই শিশুরা পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে চলে আসছে, যা তাদের মানসিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একদিকে পর্নোগ্রাফি যৌন বিকৃতি তৈরি করছে, অন্যদিকে মাদক আত্মনিয়ন্ত্রণ ধ্বংস করছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা অনেক সময় সমস্যার মূল কারণ নিয়ে আলোচনা না করে শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রকাশ করি। ধর্ষণের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ হয়, মৃত্যুদণ্ডের দাবি ওঠে, কিন্তু কিছুদিন পর সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্রকে কঠোর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ডিজিটাল মনিটরিং প্রয়োজন। শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে অশ্লীল ও সহিংস কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জরুরি। শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই হবে না; প্রয়োজনে সচেতনতাও তৈরি করতে হবে। তরুণদের বোঝাতে হবে পর্নোগ্রাফি কোনো বিনোদন নয়; এটি মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির বড় উৎস।

দ্বিতীয়ত, মাদকের বিরুদ্ধে বাস্তবিক জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে হবে। শুধু ছোটখাটো বিক্রেতা নয়, বড় মাদকচক্র, সীমান্ত সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ যত দিন মাদক সহজলভ্য থাকবে, তত দিন সমাজে সহিংসতা ও যৌন অপরাধ কমানো কঠিন হবে।

তৃতীয়ত, পরিবারকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তানকে শুধু দামি ফোন বা ইন্টারনেট দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার মানসিক জগৎ, বন্ধুমহল ও অনলাইন অভ্যাস সম্পর্কে জানতে হবে। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা, আত্মসম্মান ও নিরাপত্তাবোধ শেখাতে হবে।

চতুর্থত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, ডিজিটাল নৈতিকতা, মাদকের ক্ষতি এবং যৌন অপরাধের ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। তরুণদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে, যাতে তারা বিপথে না যায়। আমরা সচেতন না হলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনের প্রথম শর্ত হলো, মাদকের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

উন্মুক্ত হোক মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

এ কে এম আতিকুর রহমান

উন্মুক্ত হোক মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে ২১ জুন দুদিনের এক সরকারি সফরে মালয়েশিয়া যান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। সফরকালে ২২ জুন তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। তিনি মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইবনে সুলতান ইস্কান্দরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সফরকালে তিনি মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করা ছাড়াও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ২২ জুন সন্ধ্যায় মালয়েশিয়া সফর শেষে তিনি চীন সফরের উদ্দেশ্যে কুয়ালালামপুর ত্যাগ করেন।

২২ জুন বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে কিছু সময়ের জন্য একটি একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের মধ্যে অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে খোলা মনে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদি, বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্তকরণ, বিভিন্ন কারণে অবৈধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়মিতকরণ ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, শিক্ষা, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন, আসিয়ান-এ বাংলাদেশের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার জন্য মালয়েশিয়ার সমর্থন, আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারি উদ্যোগে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

উন্মুক্ত হোক মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারআনুষ্ঠানিক বৈঠকটির সমাপ্তি ঘটে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতাসংক্রান্ত একটি দলিল এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় করার মাধ্যমে। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি কর্মী নিয়োগসহ যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করার আহবান জানান। এ ছাড়া অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ এবং সম্ভব হলে আটক বাংলাদেশিদের পুনরায় নিয়োগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে অনুরোধ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ যেন স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সাশ্রয়ী ব্যয়ের মধ্যে থাকে সে ব্যাপারে উভয় পক্ষের একমত পোষণের কথাটিও জানান। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার অব্যাহত সহায়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের আসিয়ান সেক্টরাল ডায়ালগে পার্টনার হওয়া এবং আঞ্চলিক সুসংহত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে মালয়েশিয়ার সমর্থনের বিষয় নিয়েও কথা বলেন।  

কুয়ালালামপুর অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রীর শেষ বৈঠকগুলো ছিল মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর এবং তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্যই মূলত ওই বৈঠকগুলোর আয়োজন করা হয়। তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা হয়। বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ আনা গেলে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরো শক্তিশালী ও প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও দৃঢ়তর হবে।   

২১ জুন সন্ধ্যায় কুয়ালালামপুর পৌঁছানোর পর রাতে স্থানীয় একটি হোটেলে আয়োজিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই অনুষ্ঠানে তিনি প্রবাসীদের নিজেদের দাবিদাওয়া থেকে বেরিয়ে এসে দেশের প্রতি তাদের কর্তব্য পালনের আহবান জানান এবং দেশের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করার অনুরোধ জানান। তিনি বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের সমস্যাসহ নতুন কর্মী নিয়োগের ব্যাপারে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার বিষয়ে বলেন, বহুদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে মানুষ কাজ নিয়ে মালয়েশিয়ায় যেতে পারছে না। এই সমস্যা কাটাতে আমরা মালয়েশিয়ার সরকারের সঙ্গে কথা বলব। একই সঙ্গে অনেক প্রবাসী বিভিন্ন কারণে মালয়েশিয়ায় আটক আছেন; তাঁরা দেশে ফিরতে পারছেন না। এসব মানুষ কিভাবে মুক্ত হবে, তা নিয়েও আলোচনা করব।

বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগের ব্যাপারটি আলোচনায় প্রাধান্য পেলেও সফরকালে এ ব্যাপারে কোনো সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়নি। তবে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। শিগগিরই দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বন্ধ শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা এবং নতুন কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে চুক্তি সম্পাদনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে বলে আশা করা যায়। তবে আমাদের প্রত্যাশা নতুন কর্মী নিয়োগ পদ্ধতি যেন কর্মিবান্ধব, বিশেষ করে ন্যূনতম অভিবাসন ব্যয়ের হয় সেদিকে উভয় পক্ষকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনোক্রমেই কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া আবারও যেন সিন্ডিকেটের বেড়াজালে আবদ্ধ না হয়ে যায়। এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মীদের প্রতি যেন আন্তর্জাতিক অভিবাসী নীতির প্রয়োগ হয় এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণ করা হয় সে ব্যাপারে বাংলাদেশ দূতাবাস ও সরকারের তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার যেসব ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন রয়েছে সেসব ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী প্রেরণে অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক। সেটি করা সম্ভব হলে মালয়েশিয়া থেকে প্রাপ্ত আমাদের রেমিট্যান্স অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে।

মালয়েশিয়ায় প্রায়শই অনিয়মিত বিদেশি শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ করা হয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে হয়তো শিগগিরই মালয়েশিয়া সরকার অবৈধভাবে সে দেশে অবস্থানরতদের ক্ষমা প্রদর্শনপূর্বক নিয়মিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এ ছাড়া অবৈধভাবে অবস্থানের কারণে আটক বাংলাদেশিদের পুনরায় নিয়োগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে যে অনুরোধ করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী, সে বিষয়েও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যেতে পারে। কারণ মালয়েশিয়ার অর্থনীতির জন্যই ওই সব কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। তবে বিষয়টি মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষকে অনবরত স্মরণ করিয়ে দিতে হবে।

একসময় মালয়েশিয়া থেকে ছাত্র আসত বাংলাদেশে লেখাপড়া করতে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে সেই চিত্রটি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। এখন বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছরই হাজার হাজার ছাত্র মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়ে থাকে। এই বাস্তবতার নিরিখে শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা ছাড়াও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।  

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়া সব সময়ই বাংলাদেশের পাশে থেকেছে। মায়ানমার ও মালয়েশিয়া উভয়েই আসিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। মালয়েশিয়া এর আগে কয়েকবার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনসহ অন্যান্য ইস্যুতে কার্যকর সমাধানের চেষ্টা করেছে। এ বিষয়ে আগামীতে বাংলাদেশ অবশ্যই মালয়েশিয়াকে পাশে পাবে। মালয়েশিয়া আসিয়ানে এই বিষয়টি নিয়ে মায়ানমারকে চাপ দিতে পারে। বাংলাদেশের আসিয়ান সেক্টরাল ডায়ালগে পার্টনার হওয়া এবং আঞ্চলিক সুসংহত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে মালয়েশিয়ার সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে কিভাবে এবং কতটুকু লাভবান হতে পারবে তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।     

দুই দেশের মধ্যে চলমান ব্যবসা-বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত ও বহুমুখী করা দরকার। ২০১০ সালে কুয়ালালামপুরে আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর মালয়েশীয় প্রতিপক্ষের বৈঠকের ধারাবাহিকতায় দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। মালয়েশিয়ার আগ্রহ থাকলেও ঢাকা তেমন একটা আগ্রহ না দেখানোর ফলে এফটিএ নিয়ে ২০১৪ সালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার মালয়েশিয়া ছেড়ে আসার আগ পর্যন্ত আর কোনো আলোচনায় বিষয়টি আসেনি। যাহোক বর্তমান সরকার যদি বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয় এবং চুক্তিটি সম্পাদনে আগ্রহ পোষণ করে, তাহলে সেটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ হবে। দুই দেশের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলতে পারে। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফরটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। মালয়েশিয়াকে অবশ্যই এ বিষয়টি স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কতটা বন্ধুত্বপূর্ণ, আন্তরিক এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এই অনুধাবনই বলে দেবে এ সফরের সাফল্য, আমরা সেই প্রত্যাশা পূরণের অপেক্ষায় রইলাম। 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

ভারতে ব্রিটিশ শাসন ও অসচেতন ক্ষমতা দখলের ইতিহাস

সৈকত ইসলাম

ভারতে ব্রিটিশ শাসন ও অসচেতন ক্ষমতা দখলের ইতিহাস

১৭০০ সালের গোড়ার দিকে ভারত ছিল বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। তখনকার হিসাব অনুযায়ী, ভারত বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশে অবদান রাখত এবং এর বড় অংশই ছিল কৃষি ও হস্তশিল্প নির্ভর। কিন্তু এর ঠিক ১০০ বছরের মধ্যেই এই সমৃদ্ধ দেশটি ব্রিটিশ শাসনের অধীন হয়ে পড়ে। এটি কি  ব্রিটিশ সরকারের কোনো সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার ফল ছিল,  নাকি  এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল এক জটিল রাজনৈতিক অবস্থা, স্থানীয় শাসকদের দ্বন্দ্ব, নাকি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ?

ভারতের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক সময় স্থানীয় রাজারা বাইরের শক্তিকে দেশে এনে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করার চেষ্টা করেছেন। বাবরের দিল্লি দখল তারই একটি উদাহরণ, যেখানে ইব্রাহিম লোদীর বিরুদ্ধে তাঁর শত্রুরা তাঁকে আমন্ত্রণ জানায়। পরে মোগলদের দুর্বলতার সময়েও এই ধরনের ঘটনা ঘটে। যেমন১৭৩৯ সালে ইরানের নাদির শাহ দিল্লি আক্রমণ করেন, আর সেই আক্রমণে মোগল দরবারের কিছু কর্মকর্তার গোপন ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই প্রবণতা অর্থাৎ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য বাইরের শক্তিকে ব্যবহার করার রেওয়াজ পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়ে ওঠে।

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি প্রথমে আসে বাণিজ্য করার জন্য। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুনাফা করা, শাসন করা নয়। লন্ডনের পরিচালকরা চেয়েছিলেন, কম্পানি যেন কোনো রাজনৈতিক ঝামেলায় না জড়ায়। তাঁরা নির্দেশ দিয়েছিলেন মোগল বা অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে সংঘর্ষ না করতে এবং যুদ্ধ খরচ কমাতে। কিন্তু বাস্তবে ভারতে যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা চলছিল, তা কম্পানির কর্মচারীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। এই বিশৃঙ্খলার বড় কারণ ছিল আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা। তখন বিভিন্ন প্রদেশে স্বাধীন রাজারা নিজেদের মতো শাসন চালাতে শুরু করেন। ফলে একটি কেন্দ্রীয় শক্তির অভাব দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় রাজারা নিজেদের ক্ষমতা রক্ষার জন্য বাইরের সাহায্য নিতে দ্বিধা করেননি।

অন্যদিকে বাংলার বণিক শ্রেণি এবং জমিদারদের মধ্যে অনেকেই চেয়েছিলেন এমন একটি শাসনকাঠামো, যেখানে ব্যবসার নিরাপত্তা থাকবে এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, যা এই ছোট ছোট রাজ্যের দুর্বল শাসকদের দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না। বিশেষত বাংলায় মুর্শিদকুলীর শাসনের পর তৈরি রাজনৈতিক অস্থিরতায় যখন স্থানীয় বণিক শ্রেণির স্বার্থ হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল, তখন তা তাদের  ইংরেজ কম্পানির সহায়তায় সিরাজকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিল। সিরাজউদ্দৌলার শাসনে যখন তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ হুমকির মুখে পড়ে, তখন তারা কম্পানির স্থানীয় কর্মকর্তাদের সহায়তায় সিরাজকে সরাতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীর বিজয় এই সহযোগিতারই ফল। অথচ যদি রবার্ট ক্লাইভ এই যুদ্ধে পরাজিত হতেন, তাহলে কম্পানিকে ভারত ছেড়ে পালাতে হতো এবং এই মাটিতে তাদের আর কোনো ভবিষ্যৎ থাকত না। লন্ডনের পরিচালকরাও এমন সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং এই ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের ঘোরতর বিরোধিতা করেছিলেন। এই সময় ইংরেজ কম্পানির কর্মচারীরা শুধু কম্পানির জন্য কাজ করছিলেন না, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবেও লাভবান হওয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন। অনেকেই মনে করতেন, শুধু কম্পানির বেতনে চলা সম্ভব নয়। তাই তাঁরা স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতা দখলে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। রবার্ট ক্লাইভের মতো কিছু কর্মকর্তা শুধু চাকরি না করে নিজস্ব রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সামরিক কৌশলে প্রচুর ধন-সম্পদ অর্জন করেন। তাঁদের অনেকেই সরাসরি কম্পানির নির্দেশ অমান্য করে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন।

ভারতের কিছু শহর তখন ধীরে ধীরে কম্পানির নিয়ন্ত্রণে আসছিল। কলকাতা, মাদ্রাজ, বোম্বে ছিল এর মধ্যে প্রধান। এই শহরগুলোতে কম্পানি ব্যবসা পরিচালনার জন্য আইন-আদালত, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং শৃঙ্খলার কাঠামো গড়ে তোলে। ফলে ভারতের অন্যান্য শহর; যেমনদিল্লি, আগ্রা, মুলতান থেকে অনেক ব্যবসায়ী এই নতুন শহরগুলোতে চলে আসতে শুরু করেন। কারণ তাঁরা এখানে নিজেদের পুঁজি বেশি নিরাপদ মনে করতেন। ধীরে ধীরে এই শহরগুলো শুধু ব্যবসার কেন্দ্রই নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রেও পরিণত হয়।

এই অনিচ্ছাকৃত ক্ষমতা দখলের পেছনে যে রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করেছে, তা অনেক গভীর। কম্পানির স্থানীয় কর্মচারীরা যেমন ব্যক্তিগত লাভের জন্য ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলেন, তেমনি স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও নিরাপত্তা এবং আইনি কাঠামোর কারণে কম্পানির শহরগুলোতে পুঁজি স্থানান্তর করতে রাজি হয়েছিলেন। এতে এক ধরনের পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করে। এই প্রক্রিয়ায় এক নতুন ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ইংরেজ কম্পানি ও স্থানীয় ধনী শ্রেণির মধ্যে, যাকে পরবর্তী সময়ে অনেক ইতিহাসবিদ অ্যাংলো-বানিয়া অর্ডার বলেছেন। এখানে কম্পানি একদিকে শাসনকাঠামো সরবরাহ করে, আর অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অর্থ ও প্রভাব দিয়ে সেই কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেন। এই সম্পর্কের মধ্যেই তৈরি হয় এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, যার ফলে ইংরেজরা আরো বেশি ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

এই সমীকরণে আমরা দেখতে পাই, কিভাবে একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থা ধীরে ধীরে একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়। এটি শুধু বাহ্যিক সামরিক বিজয়ের ফল নয়, বরং অভ্যন্তরীণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলাফল। এমনকি কম্পানির পরিচালকরাও এই পরিবর্তনের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। এই পুরো প্রক্রিয়াকে অনেক ইতিহাসবিদ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। কার্ল মার্ক্স এই ঘটনাকে সৃষ্টিশীল ধ্বংস বলেছেন। তাঁর মতে, ব্রিটিশরা যেমন ভারতের প্রথাগত সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংস করেছে, তেমনি কিছু নতুন কাঠামোও তৈরি করেছে; যেমনরেল, ডাকব্যবস্থা বা আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো। যদিও এগুলো স্থানীয় লোকজনের জন্য সর্বদা উপকারী ছিল না, তবু এগুলো এক নতুন বাস্তবতার সূচনা করে।

অন্যদিকে সাব-অলটার্ন স্কুলের ইতিহাসবিদরা বলতে চেয়েছেন, এই শাসনকাঠামো শুধু ইংরেজ আগ্রাসনের ফল নয়। বরং তাঁরা বলছেন, স্থানীয় অভিজাত শ্রেণি; যেমনজমিদার বা ব্যবসায়ীরা ব্রিটিশদের সঙ্গে মিলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, এই ধরনের ইতিহাসে শুধু বড় রাজা-বাদশাহ নন, সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ ও মতামতও গুরুত্বপূর্ণ।

ইংরেজদের ভারত শাসনের শুরুটা আসলে ছিল অনেকটা অসচেতন সাম্রাজ্যবাদ। অর্থাৎ তারা শুরুতে শাসনের উদ্দেশ্যে আসেনি, কিন্তু ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্থানীয় সহযোগিতা এবং কম্পানির কর্মচারীদের লোভ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা মিলিয়ে এক নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে। বাস্তবে ভারতবর্ষে কম্পানির সাম্রাজ্যিক উত্থান ছিল এক জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।

এই ইতিহাস আমাদের শেখায় যে কোনো শাসনের পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক আগ্রাসনের কারণে হয় না। এর পেছনে থাকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, স্থানীয় শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানীদের ভূমিকা। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস তাই শুধু সামরিক জয়ের কাহিনি নয়, এটি একটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা শাসনকাঠামোর গল্প, যা শুরু হয়েছিল ব্যবসার নামে এবং শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক পূর্ণাঙ্গ সাম্রাজ্যিক শাসনে।

লেখক : প্রাবন্ধিক