• ই-পেপার

ভারতে ব্রিটিশ শাসন ও অসচেতন ক্ষমতা দখলের ইতিহাস

  • সৈকত ইসলাম

ইতিহাসের জন্ম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তম

ইতিহাসের জন্ম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ১৯৫৫ সালে আবার আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে নিপীড়িত মানুষের জন্য মুসলিম বাদ দিয়ে আমজনতার দল আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। সাতচল্লিশের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির পর অনেক উথালপাথাল গেছে, বাঙালি জাতির ওপর অনেক আঘাত এসেছে। প্রথমেই আঘাত আসে ভাষার ওপর। ভাষা আন্দোলন সফলতা পায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এরপর ১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। সেখানে মুসলিম লীগ মুছে যায়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভবিষ্যদ্বাণীমতো তারা শুধু ৯টি আসন পায়। তার পরের ইতিহাস আরো করুণ। এত বিপুল সাড়া-জাগানো নির্বাচনের প্রতি পাকিস্তান তেমন কোনো সম্মান দেখায়নি। তাদের গোঁয়ার্তুমিতে সরকার বেশিদিন টিকতে পারেনি। সকালে-বিকেলে সরকার পরিবর্তন হয়। এভাবেই চলতে থাকে। হুজুর মওলানা ভাসানী-শামসুল হকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ গঠিত হয় প্রধানত টাঙ্গাইল দক্ষিণ উপনির্বাচনে শামসুল হকের বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে। খুব সম্ভবত মওলানা ভাসানী ব্রিটিশ ভারতে একবারই নির্বাচন করেছিলেন দক্ষিণ টাঙ্গাইল আসনে। তিনি পরিষদে এক দিনের জন্য বসতে পেরেছিলেন কি না, জানি না। তবে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মাইঠানের শামসুল হক এক দিনও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে অংশ নিতে পারেননি, যার ফলে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ গঠনের তিন বছর পরও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলায় আসতে পারেননি। সম্মেলনের দিন যদিও তিনি কলকাতা থেকে এসেছিলেন। তবে তাঁকে তখনকার পূর্ববঙ্গে নামতে দেওয়া হয়নি। নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে আবার ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর বলে তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়।

টাঙ্গাইল দক্ষিণ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ছিল অভিনব। সেখানে মূল প্রার্থী ছিলেন মুসলিম লীগের মাইঠানের বিদ্রোহী গ্রুপের অন্যতম নেতা শামসুল হক। অন্যদিকে মুসলিম লীগের প্রার্থী করটিয়ার প্রতাপশালী জমিদার কে কে পন্নী (খুররম খান পন্নী) ও আবু খান। আবু খান ওই সময়ে একজন বেশ নামকরা রাজনীতিবিদ ছিলেন। মনোনয়নপত্র জমা হলে খুররম খান পন্নীর সমর্থকরা আবু খানের বাড়ি যায়। তাঁকে পন্নী সাহেবের অনুরোধে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বলে। তিনি বলেন, কেন প্রত্যাহার করব? পন্নী সাহেব টাকা দিবেন। তোমরা কত টাকা দিবা? পরে ঠিক হয় তারা ছয় হাজার টাকা দেবে। তিনি রাজি হন। কয়েকটি স্কুলের নাম বলে তাদের সেখানে পাঠিয়ে দিয়ে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ এনে তাঁকে দিতে বলেন। পন্নী সাহেবের সমর্থকরা তাঁর কথামতো কাজ করে স্কুলে স্কুলে জমা দেওয়া টাকার রসিদ এনে দেয়। তখন আলাদা প্রচারণা না করে একসঙ্গে একই মঞ্চ থেকে প্রচার করা হতো। সে রকম একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় নাটিয়াপাড়ায়। লোক আর কত হবে, তিন-চার হাজার। পন্নীর লোকদের কয়েকজন বক্তৃতা করেছেন, শামসুল হকের সমপরিমাণ সমর্থক বক্তৃতা করেছেন। এবার এলো কে কে পন্নীর সমর্থকদের পালা। এবার উঠলেন স্বনামধন্য আবু খান। কিন্তু কে কে পন্নী আবু ইতিহাসের জন্ম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদীখানকে টাকা দিয়েছেন, বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছেএ নিয়ে জনমনে ভীষণ বিরূপ প্রতিক্রিয়া। আবু খানের নাম ঘোষণা করলে সবার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। যারা একসময় সম্মান করত, শ্রদ্ধা করত, তারাও বিরূপ সমালোচনা করতে থাকে। আবু খান নিষ্ঠাবান সাহসী মানুষ। তিনি দাঁড়ালে গুঞ্জন আরো বেড়ে যায়। একসময় তিনি চিৎকার করে ওঠেন, এই মিয়ারা থামেন। আমি শুধু শুধু বসে পড়ি নাই। কে কে পন্নী আমাকে ছয় হাজার টাকা দিছে। সেই টাকার ভারে বইসা পড়ছি। আপনাদেরও যদি পন্নী ছয় হাজার করে টাকা দেয়, তাহলে টাকার ভারে বইসা পইড়েন। তা না হলে ভোটটা মহাসংগ্রামী গরিব শামসুল হককেই দিয়েন। আবু খানের বক্তৃতার প্রভাব পড়েছিল অসম্ভব ধরনের। ভোটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনসহ দুই ডজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আসার পরও কে কে পন্নীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। তারপর তাঁকে কেন্দ্র করেই আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৪৩ আসনে জয়ী হয়েছিল। মুসলিম লীগ জয়ী হয়েছিল ৯টিতে, বাদবাকি সব কটিতে ফ্রন্ট। জন্মের পর থেকেই আওয়ামী মুসলিম লীগ দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসেন। এসেই তিনি দেশে মার্শাল ল জারি করেন, ভোটাধিকার কেড়ে নেন। পাকিস্তানিরা ভোট দিতে জানে না বলে ১৯৬২ সালের ২৮ এপ্রিল বনিয়াদি গণতন্ত্র বা বেসিক ডেমোক্রেসির নির্বাচন দেন। পূর্ব পাকিস্তানে ৪০ হাজার এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সব কটি প্রভিন্স মিলে ৪০ হাজার। অথচ আমরা পূর্ব পাকিস্তানিরা ছিলাম শতকরা ৫৬ জন, ওরা ছিল ৪৪ জন। ১০ শতাংশ কম। তার পরও সাম্যতা। বেসিক ডেমোক্রেসি নির্বাচন হয় ২৮ এপ্রিল। বর্ষীয়ান নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক আল্লাহর কাছে রাতদিন ফরিয়াদ করছিলেন, জারজার হয়ে কাঁদছিলেন—‘হে আল্লাহ দয়াময় প্রভু, আমরা যে পাকিস্তান তৈরি করেছি, সেই পাকিস্তানের আমিও ভোটার না। আল্লাহ তুমি এই নির্বাচনের আগে আমাকে উঠিয়ে নেও। আল্লাহ হয়তো তাঁর কথা শুনেছিলেন। মহান আল্লাহ ২৭ এপ্রিল তুলে নিয়েছিলেন। এরপর ছাত্র আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা কমিশন, ৭ জুন ছয় দফা, উনসত্তরের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ১১ দফার গণ-আন্দোলন, সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচন; যেখানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৬৭ আসন। হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের আওয়ামী লীগ আর নেত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে অনেক পার্থক্য। রাজনীতি হচ্ছে মানবসেবা। রাজনীতি লুটপাট ও শক্তি দেখানো নয়। আজকাল কেউ কেউ মনে করছেন, আওয়ামী লীগ আর কোনো দিন ফিরবে না। এটি পাকিস্তানিরাও ভেবেছিল। একাত্তরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা ভেবেছিল বাঙালি আর দাঁড়াতে পারবে না, কিন্তু দাঁড়িয়েছিল। যাঁরা বউয়ের কানের দুল, নাকের ফুল বিক্রি করে আওয়ামী লীগ নেতাদের খাইয়েছেন, সভা-সমাবেশে জোগান দিয়েছে, তাঁদের কথা বলছি না। বলছি হাইব্রিড সুবিধাবাদী নেতাদের কথা। তাঁদের জন্য বোন শেখ হাসিনাকে সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে অনুরোধ জানাচ্ছি। ক্ষমা চাওয়ায় কোনো দোষ নেই। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে ১৯৭৭ সালে সীমান্তে ছিলাম। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছি। দিনে একবার, দুই দিনে একবার খেয়েছি। তবু মনে কোনো আঘাত পাইনি। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতন হলে মোরারজি দেশাইয়ের জনতা পার্টির সরকারের কাছে আমি প্রধান শত্রুতে পরিণত হই। কারণ ইন্দিরা গান্ধী আমাকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন। তাই  মোরারজি দেশাই সরকারের আমি হয়েছিলাম প্রধান শত্রু। ১৯৭৯ সালে বিহারে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। গাড়িতে করে তিনি যেতে পারেননি, হাতির পিঠে চড়ে গিয়েছিলেন। সেখানে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল। ইন্দিরাজি বলেছিলেন, ভাইয়ো, আয়োর বহেনো গলতি হো গিয়া, মাফি মাংতা হু, মাফ করদো। এই মাফ চাওয়ার পর তিন মাসও লাগেনি সারা দেশ ইন্দিরাময় হয়ে গিয়েছিল। তাই ভেবে দেখতে বলছি। আজ ২৩ জুন নিরাপত্তা বাহিনী নাকি খুবই সতর্ক, আওয়ামী লীগ কিছু করতে পারে। মানুষ যা চায়, তা করলে আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই লাভবান হবে। কিন্তু জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গায়ের জোর দেখালে, অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড করলে ভালোর চেয়ে খারাপ হবে বেশি। তাই বলব, ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।

বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী গত ১৯ জুন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ২০০৩ সালে তাঁকে একুশে পদক দেওয়া হয়েছিল। একজন সত্যিকারের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাহিত্যিক, কবি, সর্বোপরি একজন ভালো মানুষকে আমরা হারালাম। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদীর কতটা মূল্যায়ন হয়েছে? তাহলে বলতেই হবে আমাদের দেশে গুণীজনের অনেক সময় সঠিক মূল্যায়ন হয় না, কবি আল মুজাহিদীরও তেমন হয়নি। ১৯৪৩ সালে পয়লা জানুয়ারি টাঙ্গাইলে তাঁর জন্ম। তিনি আমাদের আত্মীয়। তাঁর সঙ্গে আমার কবে কোথায় কিভাবে প্রথম পরিচয় হয়েছে বলতে পারব না। তবে বাষট্টির শিক্ষা কমিশন আন্দোলনের সময় করটিয়া সাদত কলেজ থেকে টাঙ্গাইল শহরে আসা মিছিলে শরিক হয়েছিলাম। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী হাই স্কুল, বিবেকানন্দ হাই স্কুল ও বিন্দুবাসিনী গার্লস স্কুলের মেয়েরা শরিক হয়েছিল। সেই মিছিলের একজন হিসেবে আমিও স্লোগান ধরেছি, স্লোগান দিয়েছি। সেখানে আরো নেতাদের মধ্যে ফজলুল করীম মিঠু, লতিফ সিদ্দিকী, ফজলুর রহমান খান ফারুক, আল মুজাহিদী, আতিকুর রহমান সালু, বুলবুল খান মাহবুব, এম এ রেজাসহ আরো অনেকে ছিলেন। মজার ব্যাপার, সেই শিক্ষা কমিশন বাতিলের মিছিলে পাকিস্তান জিন্দাবাদের সঙ্গে নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার স্লোগান হয়েছে। সেখানে আমিও স্লোগান দিয়েছি নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার। কেন দিয়েছি জানি না।

বাষট্টি থেকে চৌষট্টির মাঝামাঝিতে টাঙ্গাইলের রওশন সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনেও উপস্থিত হয়েছিলাম। তখন ছাত্রলীগের সভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণি অন্যান্য নেতাকে নিয়ে সেই সম্মেলনে গিয়েছিলেন। আমি তাঁর আগে অত উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা শুনিনি। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের বক্তৃতা ছিল অসাধারণ, ঘরের টিন খুলে পড়তে চাইত। শেখ ফজলুল হক মণির বক্তৃতা অত ক্ষুরধার ছিল না, কিন্তু তাঁর যুক্তি ছিল অসাধারণ। টাঙ্গাইলের সেই সফল সম্মেলনে টাঙ্গাইল মহকুমা ছাত্রলীগকে জেলার মর্যাদা দেওয়া হয় এবং কবি আল মুজাহিদীর লেখা ছাত্রলীগ জিন্দাবাদ ছাত্রলীগ জিন্দাবাদ কবিতাকে ছাত্রলীগ সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং যা পরে বছরের পর বছর গাওয়া হয়েছে, রেকর্ড করে বাজানো হয়েছে। সেই সম্মেলনে শওকত তালুকদারকে সভাপতি এবং লতিফ সিদ্দিকীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। আল মুজাহিদী শুধু একজন কবিই ছিলেন না, তিনি একজন আদর্শবান রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তিনি বাংলা ছাত্রলীগ করেছিলেন। তারপর ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর সঙ্গে রাজনৈতিক দল করেন। সর্বত্রই চেষ্টা করেছেন দেশের জন্য কিছু করতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরম দয়ালু আল্লাহ আমার ওপর দয়া করেছিলেন। ৩ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানি হানাদাররা টাঙ্গাইলে ঢোকার পথে সাটিয়াচরায় আমরা হানাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। ঢাকা থেকে অতটা পথ কোনো বাধা না পাওয়ায় তারা নিশ্চিন্তেই ছিল। কিন্তু ধল্যা-সাটিয়াচরার মাঝামাঝি আচমকা আমরা আক্রমণ করলে ওদের ২৫ থেকে ৩০টি গাড়ি রাস্তার নিচে পড়ে যায়। এতে শতেকখানি হানাদার আহত-নিহত হয়। ওদের মেশিনগান, রকেট লঞ্চার, ১২০ মিলি কামান বৃষ্টির মতো গোলাগুলি ছুড়তে থাকে। এতে আমাদের জমারত আলী দেওয়ানসহ ১৩-১৪ জন যোদ্ধা শহীদ হন।

আমরা যখন সাটিয়াচরা-নাটিয়াপাড়া থেকে টাঙ্গাইলের দিকে ফিরে যাই, তার আগেই আমাদের অনেক নেতা চলে গিয়েছিলেন। টাঙ্গাইল পুলিশ কোথের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। কিন্তু টাঙ্গাইল পুলিশ কোথে ফিরে দেখি একজন পুলিশ গার্ডের চেহারা বদলে গেছে। সে তালা খুলতে দেবে না। যুদ্ধে পরাজয়ের খবর তখনো টাঙ্গাইলে এসে পৌঁছেনি। তার পরও এই অবস্থা। থানায় পাকিস্তান পতাকা উঠে গেছে। পুলিশ কোথে পাহারাদার বদলে গেছে। কে একজন পুলিশ কোথের পাহারাদারের হাত থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে এক ধাক্কায় পুলিশ কোথের বারান্দার সামনে ফেলে দেয়। তালা খুলে অস্ত্র গাড়িতে তোলা হয়। এই সময় আমাদের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মুজাহিদী ৫-৬টি রিভলবারের মধ্য থেকে একটি তুলে নেন। একসময় মনে হয়েছিল, রিভলবারটি তাঁর হাত থেকে নিয়ে নিই। কিন্তু আল মুজাহিদীর মতো একজন নেতার হাত থেকে রিভলবারটি নেওয়া যুক্তিসংগত মনে হয়নি। তাই আর নিইনি। যুদ্ধ শেষে যেদিন আল মুজাহিদী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়, সেদিন প্রথমেই তিনি বলেছিলেন, কাদের, তুমি আজ কত বড় হয়েছ। ছোট্ট বাচ্চা রেখে গেলাম, আর তুমি আমাদের সবাইকে পিছে ফেলে শৌর্যে-বীর্যে, দেশপ্রেমে কত দূর এগিয়ে গেছ। আমার মনে হয়েছিল তুমি রিভলবারটি রেখে দেবে। কিন্তু তোমার পারিবারিক কৃষ্টি-সভ্যতার কথা চিন্তা করে ভেবেছিলামনা, তুমি রিভলবার রেখে দেবে না। দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আর আমার অস্ত্রের প্রয়োজন কী? তুমি এটি রেখে দাও। তোমার কাছেই নিরাপদ থাকবে। না, সেদিনও তাঁর রিভলবার আমি রাখিনি। বলেছিলাম, ওটা আপনার কাছেই রাখুন। নিরাপত্তার দায়ভার আমার ওপর থাক। বড় ভালো মানুষ ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী। আমি তাঁর থেকে তিন-সাড়ে তিন বছরের ছোট। আমাকে ভীষণ বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসতেন। যখনই কোনো কথা বলেছি, সেটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন, সম্মান করেছেন। দয়াময় আল্লাহ আমাকে তাঁর বায়তুল মোকাররমের জানাজায় শরিক হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এ জন্য দয়ালু আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। যখন ভালো মানুষের বড় বেশি দরকার, তখনই চলে গেলেন। আমি তাঁর উত্তরার বাড়িতে বহুবার গেছি। তাঁর ছেলেমেয়ের শুকনা মুখ দেখে নিজেকে সামাল দিতে পারিনি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, হে দয়াময় আল্লাহ দয়া করুন, বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদীর সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে বেহেশতবাসী করুন। তাঁর আত্মীয়-স্বজন, সন্তান-সন্ততি, নিকটজনদের আপনার পবিত্র আরশের ছায়াতলে রাখুন এবং তাদের এই শোক সইবার শক্তি দিন। আমিন।

লেখক : রাজনীতিক

বহুমুখী ফসল : টেকসই কৃষির নতুন দিগন্ত

ড. মুহাম্মাদ আব্দুল হামিদ মিয়া

বহুমুখী ফসল : টেকসই কৃষির নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা বহুমুখী সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের সম্মিলিত একটি ক্ষেত্র, যেখানে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের সঠিক ব্যবহারের বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জমির সীমাবদ্ধতা, পানির সংকট, লবণাক্ততা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যমান কৃষিপদ্ধতি থেকে প্রত্যাশিত ফলন অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। অথচ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত কিছু চাষাবাদ পদ্ধতি এবং গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা গেলে একই জমি থেকে অধিক উৎপাদন, অতিরিক্ত আয় এবং পতিত জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে ফসলবিন্যাস, মিশ্রচাষ, বিনা চাষে আবাদ এবং স্থানীয় উদ্ভাবনী কৌশলের সমন্বিত প্রয়োগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পাশাপাশি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, সম্প্রসারণ সংস্থা এবং কৃষকদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাবও অনেক সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই কৃষির টেকসই উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এসব সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের অনেক এলাকায় এখনো আমন ধান কাটার পর জমি চাষ করে সরিষা আবাদ করা হয় এবং সরিষা সংগ্রহের পর পুনরায় জমি কর্দমাক্ত করে বোরো ধানের চারা রোপণ করা হয়। এতে আউশ বা পরবর্তী আমন মৌসুমের আগে দুটি ফসল পাওয়া গেলেও বোরো ধানের ফলনের যে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হয়, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নজরের বাইরে থেকে যায়। মূলত প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবই এই সমস্যার প্রধান কারণ। পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার চলনবিল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই পদ্ধতি প্রচলিত। প্রথম পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে বোরো ধানের চারার বয়স ৫০ দিনের বেশি হলে প্রতি হেক্টরে প্রতিদিন প্রায় ৬০ কেজি করে ফলন কমে। সেই হিসাবে পুরো এলাকায় মোট উৎপাদনের ক্ষতির পরিমাণ সহজেই অনুমান করা যায়।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্তপ্রবণ জেলাগুলোতে বিনা চাষে গম, মুগ ও সরিষা উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন। অস্ট্রেলিয়ার এসিআইএআরের অর্থায়নে এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার তত্ত্বাবধানে ড. নিয়োগীর নেতৃত্বে বাগেরহাট জেলায় সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, আমন ধানের জমিতে রিলে পদ্ধতিতে বিনা চাষে সরিষা আবাদ লাভজনক।

এই গবেষণায় আরো দেখা গেছে, জমিতে ফসল থাকলে গাছের ছায়ার কারণে মাটির পানি বাষ্পীভবনের হার কমে। ফলে অনাবাদি জমির তুলনায় মাটির লবণাক্ততা প্রায় ৪ ডিএস/মিটার পর্যন্ত কম থাকে। লবণাক্ত জমিতে বিনা চাষে ফসল উৎপাদনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এর অর্থ হলো, রবি মৌসুমে ধান ছাড়া অন্যান্য দানাদার ফসল ও বিশেষ করে পত্রবহুল সবজি বিনা চাষেই উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বোরো ধান আবাদ প্রসঙ্গে আরো দেখা যায়, বোরো ধান কাটার পর অনেক জমি রোপা আমনের জন্য দীর্ঘ সময় পতিত থাকে। কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে রোপা আউশ চাষ হলেও তা খুবই কম। এই অবস্থায় আগাম বোরো ধান চাষ করে তা কাটার পর আগের মতো বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও আমন একসঙ্গে বোনা যেতে পারে। এতে আউশ আগে পরিপক্ব হবে এবং তা কেটে নেওয়ার পর আমনগাছ রেখে দেওয়া যাবে, যা পরে পূর্ণাঙ্গ ফসলে পরিণত হবে। ফলে জমি পতিত থাকবে না। উফশী ধান প্রবর্তনের আগে এই পদ্ধতিই প্রচলিত ছিল। ভবিষ্যতে সেচনির্ভর বোরো চাষ ব্যাহত হলে এই পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, অর্থাৎ বোরো মৌসুমে বিকল্প ফসল চাষের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আখ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হলেও এটি সাধারণত এককভাবে চাষ করা হয়। যদিও আখের সঙ্গে সাথি ফসল চাষের প্রযুক্তি অনেক আগেই উদ্ভাবিত হয়েছে, তবু দীর্ঘ সময় জমি দখল করে রাখার কারণে এবং ধানের মতো প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদিত না হওয়ায় কৃষকরা একক আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে আখের আবাদ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ সুগারক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউট আখের জমিতে বোরো ও আউশ ধানকে সাথি ফসল হিসেবে চাষের একটি কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এতে আখের ফলন কমেনি, বরং একই জমি থেকে ধান উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়েছে। সাধারণত আখের জমিতে সেচ দেওয়া হয় না, কিন্তু বোরো ধানের জন্য এডব্লিউডি পদ্ধতিতে সেচ দেওয়ায় আখের ফলনও স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এই প্রযুক্তি আখ চাষিদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

একইভাবে তুঁতগাছের জমিতে অন্য ফসল চাষের সম্ভাবনা নিয়েও আগে তেমন ধারণা ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ সেরিকালচার রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, তুঁতগাছের সারির দূরত্ব সমন্বয় করে ফাঁকা জায়গায় পেঁয়াজ, রসুন, আলু, ডাল, তৈলবীজ, মিষ্টিকুমড়া ও অন্যান্য সবজি চাষ করে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশে কৃষি গবেষণার একটি প্রচলিত ধারা হলো, নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের আগে ফসল কর্তন ও পর্যালোচনা সভায় বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে বাস্তবে সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তাদের পক্ষে পুরো সময় উপস্থিত থাকা সম্ভব হয় না। ফলে গবেষণার ফলাফল মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বা অঙ্গীকার অনেক সময়ই পাওয়া যায় না। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় ও ধারাবাহিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষণার শুরু থেকেই প্রতিটি ধাপে তৈলবীজ, ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খামার ও সংস্থাগুলোকে, বিশেষ করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে তাঁরা প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করবেন এবং মাঠ পর্যায়ে তা প্রয়োগে আগ্রহী হবেন।

সব শেষে বলা যায়, বাংলাদেশের কৃষিতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে তা উন্নত প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে রূপান্তর করা অপরিহার্য। একই জমিতে বহুমুখী ফসল উৎপাদন, বিনা চাষে আবাদ, মিশ্রচাষ ও সাথি ফসলের সমন্বিত প্রয়োগ শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, বরং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার, খরচ হ্রাস এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পাশাপাশি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এবং কৃষকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও জ্ঞান বিনিময় নিশ্চিত করা না গেলে এসব সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব নয়। তাই মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সময়োপযোগী প্রযুক্তি বিস্তার এবং স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণই হতে পারে কৃষির টেকসই অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। এর মাধ্যমে পতিত জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ কৃষিকে আরো সহনশীল ও লাভজনক করে তোলা সম্ভব।

লেখক : ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস

সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

বুড়িগঙ্গার কান্না, সুমিদার হাসি : দুই নদীর দুই বাস্তবতা

মো. রায়হান

বুড়িগঙ্গার কান্না, সুমিদার হাসি : দুই নদীর দুই বাস্তবতা

সূর্য ওঠার আগেই জাপানের টোকিওর অনেক ফুটপাত এলাকার লোকজন ঝাড়ু দেয় স্বেচ্ছায়, বিনা পারিশ্রমিকে। বাড়ির বর্জ্য নির্দিষ্ট রঙের ব্যাগে আলাদা করে রাখা এখানে সামাজিক শিষ্টাচারের অংশ। নদীতে ময়লা ফেলা তো দূরের কথা, রাস্তায় থুতু ফেলাটাও এখানে চরম লজ্জার। জাপানে অধ্যয়নরত একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে এই দৃশ্যগুলো প্রতিদিন আমাকে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়, আমাদের দেশে কেন এটি সম্ভব হচ্ছে না?

বিশ্বে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের গ্রাউন্ডসওয়েল প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা আমাদের কৃষি জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করে দিতে পারে। তাপপ্রবাহ, অসময়ের বন্যা, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং ঘূর্ণিঝড়ের ক্রমবর্ধমান তীব্রতা এখন আর কোনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি আজকের রূঢ় বাস্তবতা। অথচ এই সংকট মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

জাপান ১৯৯৭ সালে কিয়েটো প্রটোকলের সূতিকাগার হয়েছিল। কারণ দেশটি পরিবেশ সংকটকে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে জাপান সরকার গ্রিন ট্রান্সফরমেশন পলিসির মাধ্যমে হাইড্রোজেন জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ করছে।

তবে জাপানের সাফল্যের মূল রহস্য সরকারের চেয়েও বেশি নাগরিকের মানসিকতায়। মোত্তাইনাই অর্থাৎ অপচয় না করার দর্শন, যা জাপানি সংস্কৃতির শিরায় মিশে আছে। টোকিওর সুমিদা নদী একসময় মারাত্মক দূষিত ছিল। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে নীতিগত দৃঢ়তা ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে আজ তা স্বচ্ছ ও প্রাণময়।

বিপরীতে, ঢাকার বায়ুমান সূচক বিশ্বের মধ্যে প্রায়ই শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় থাকে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালুসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলো আজ প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ হলেও তা এখনো আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের (ইআইএ) চেয়ে অর্থনৈতিক মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নাগরিক সচেতনতার অভাবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিগুলোও মুখ থুবড়ে পড়ছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে। বাজেটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রায় দুই হাজার ২৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ।

এ ছাড়া বাজেটে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক গাড়ির (ইভি) ওপর করভার কমানো হয়েছে। ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভি আমদানিতে মোট শুল্ক ৯৩ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব অত্যন্ত সময়োপযোগী। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়কর ছাড় এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবটি প্রশংসনীয়।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং অন্যান্য গবেষণা সংস্থার মতে, আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বরাদ্দের প্রায় ৭৯ শতাংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি বা কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের দখলে, যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করা। কিন্তু আইইইএফের হিসাব অনুযায়ী, এই লক্ষ্য পূরণে বার্ষিক যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, বর্তমান বাজেটে তার প্রতিফলন সামান্যই।

জাপানি মডেল থেকে শিক্ষা : ১. শিক্ষা ও আচরণগত পরিবর্তন : জাপানে যেমন শৈশব থেকে পরিবেশসচেতনতা শেখানো হয়, বাংলাদেশেও প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বর্জ্য পৃথককরণ এবং প্রকৃতি রক্ষার ব্যাবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা দরকার।

২. জ্বালানিনীতির আমূল পরিবর্তন : জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি কমিয়ে সেই অর্থ সরাসরি সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের ওপর থেকে সব ধরনের অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা জরুরি।

৩. আইনের কঠোর প্রয়োগ ও কার্বন ট্যাক্স : শুধু বাজেট বরাদ্দ দিলেই হবে না, নদী-খাল দখলকারী এবং দূষণকারী ব্যক্তি-শিল্পের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে। জাপানের মতো বাংলাদেশেও পলিউটার পেজ নীতি কার্যকর করে দূষণকারীদের ওপর উচ্চহারে জরিমানা করতে হবে।

৪. জলবায়ু বাজেটের স্বচ্ছতা : প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার জলবায়ু সংবেদনশীল বরাদ্দের কথা বলা হলেও সেই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, তার সঠিক ট্যাগিং ও জনসমক্ষে নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করা প্রয়োজন।

৫. নগর পরিকল্পনায় পরিবেশকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে খাল, জলাশয়, উন্মুক্ত স্থান এবং সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার বাধ্যতামূলক অংশ করতে হবে।

টোকিওর সুমিদা নদীর পারে বসে যখন স্বচ্ছ জলে চেরি ফুলের প্রতিচ্ছবি দেখি, তখন বুড়িগঙ্গার কথা মনে পড়ে। যে নদী কয়েক শতক ধরে ঢাকার প্রাণ ছিল, আজ তা মৃতপ্রায়। দুটি দেশ, দুটি বাস্তবতা। পার্থক্যটা শুধু সম্পদের নয়, বরং শৃঙ্খলা, মানসিকতা ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের।

জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জন্য অস্তিত্বের লড়াই। জাপান তার পরিবেশ ঠিক করতে কয়েক দশক সময় পেয়েছে; আমাদের হাতে সেই বিলাসিতার সময় নেই। আমাদের বদ্বীপকে বাঁচাতে হলে আজই আমাদের জাপানিজ ডিসিপ্লিন আর বাংলাদেশি দেশপ্রেমের সমন্বয় ঘটাতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন স্নাতকোত্তর স্কুল

সুজুকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

সব্যসাচী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেক

ইকরামউজ্জমান

সব্যসাচী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেক

দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সব্যসাচী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেক আলো-ছায়ার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন গত ২০ জুন ৮০ বছর বছর বয়সে। কিংবদন্তি এই ক্রীড়াবিদের বিদায়ের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের একটি বহুল আলোচিত এবং সুবর্ণময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। ক্রীড়াঙ্গন হারিয়েছে এমন এক ব্যক্তিত্বকে, যিনি ছিলেন তাঁর ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে আলোচিত, গ্রহণযোগ্য এবং অসাধারণ একজন মানুষ। তিনি ক্রীড়াঙ্গনে যুগ যুগ ধরে আলোচিত, বিশ্লেষিত হয়েছেন ইতিবাচকভাবে। সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন প্রতিধ্বনি। মানুষ সব সময় ভালোবেসে তাঁর সান্নিধ্য চেয়েছে, তাঁকে সম্মান করেছেতিনি তাঁর মানবিক গুণাবলি, আন্তরিকতা এবং অমায়িক ব্যবহারের মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে চলতে চেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তাঁর নিজের তুলনা।

সব্যসাচী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেকদীর্ঘ ক্রীড়াঙ্গনের জীবনে খেলোয়াড়, কোচ, সংগঠক হিসেবে আবদুস সাদেকের বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের বিকাশে, ক্লাবের ক্রীড়াচর্চা, হকি ও ফুটবলে অসামান্য অবদান নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। তিনি নিজেই তাঁর তুলনা। একজন মানুষ ক্রীড়াঙ্গনকে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কিভাবে উপভোগ করতে পারেন খুব কাছে থেকে না দেখলে, না জানলে এটি লিখে বোঝানো মুশকিল। রেকর্ড বইয়ের সব নিছক পরিসংখ্যান থেকে মানুষ আবদুস সাদেক ছিলেন অনেক বড়। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আবদুস সাদেক ছিলেন ক্রীড়াঙ্গনে সুস্থ জীবনবোধ, ন্যায়নীতি ও আদর্শের প্রতীক। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনেক উঁচু একটি স্তম্ভ! দেশের ক্রীড়াঙ্গনের গৌরব। এই মানুষটি সারা জীবন ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ভেবেছেন। ভেবেছেন ক্রীড়াচর্চার বিষয়টি।

১৯৭০ সালে আবদুস সাদেক, ইব্রাহীম সাবের, সাব্বির ইউসুফ প্রমুখ খেলোয়াড় তখন ইস্পাহানি ক্লাবের হয়ে খেলেন। এই সময়ে আউটার স্টেডিয়ামের ঘাসের মাঠে হকি লীগ ও বিভিন্ন টুর্নামেন্টের খেলা অনুষ্ঠিত হতো। এক বিকেলে খেলার পর আবদুস সাদেক ভাইয়ের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তখন ন্যাশনাল ব্যাংকের কৃতী খেলোয়াড় সাবের আলী ভাই। মনে আছে, তখন আরো উপস্থিত ছিলেন খেলোয়াড় ও কোচ আবদুস সালাম ভাই। সেই সম্পর্কে কখনো ভাটা পড়েনি। বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে সাদেক ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। অনেক অনুষ্ঠানে আমরা দুজন একসঙ্গে উপস্থিত থেকেছি। কথা বলতে হয়েছে অনেক সময়। সাদেক ভাইয়ের সান্নিধ্য সব সময় উপভোগ করেছি। কালের কণ্ঠের ১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২০২৬-এর বিশেষ সংখ্যায় প্রত্যাশার পথরেখায় আমরা দুজন ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে এক পৃষ্ঠায় আমাদের মতামত ব্যক্ত করেছি। সাদেক ভাই হকি, ক্রীড়া পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্রীড়া প্রশাসন নিয়ে মূল্যবান সুপারিশ দিয়েছেন। সম্ভবত এটি ছিল তাঁর জীবনে মিডিয়ায় দেওয়া শেষ সুপারিশ। তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। তার পরও কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক শাহজাহান কবিরের সঙ্গে কথা বলেছেন।

আমি অনেক সময় না পেরে ভালোবাসার দাবির ওপর ভিত্তি করে অনেক কথা বলেছি তাঁকে। জানি না, কখনো কখনো এই বিষয়গুলো তাঁকে ধাক্কা দিয়েছে কি না। লিখতে বসে আমি এখন অনুতপ্ত। তবে আমি নিশ্চিত তিনি বুঝেছেন আমার মন খারাপ করার কারণ। তিনি চাইলে অনেক কিছু করতে পারতেন, কিন্তু করেননি। ক্রীড়া রাজনীতির শিকার হয়ে নীরবে হকি ফেডারেশন থেকে চলে এসেছেন। ক্ষতি হয়েছে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে হকির, বিশেষ করে মাঠের খেলার চর্চার! আবাহনী ক্লাবকে মাঠে নামানোর জন্য, (ফুটবল ও হকিতে) এই মানুষটি একসময়ে কী না করেছেন। দেখা গেল, একসময় পরিচালক হতে হলে তাঁকে মোটা অঙ্কের অনুদান দিতে হবে। আত্মমর্যাদাশীল ভদ্রলোক সেই পথে পা মাড়াননি। নীরবে সহ্য করেছেন। আমার কলামে এই বিষয়ে লিখেছিলাম। দুপুরে মোবাইলে বললেন, ইকরাম, আপনার লেখাটি পড়েছি। আপনি তো জানেন সবার পক্ষে সবকিছু সম্ভব নয়। মাঝেমধ্যে সাদেক ভাইকে ফোন করতাম তাঁর বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী। তাঁর সঙ্গে অনেক কিছুই শেয়ার করেছি। সাদেক ভাই ছিলেন আমার অভিভাবকতুল্য। তাঁকে সব সময় মিস করব। এই মানুষটি ভোলার নয়।

ছাত্রাবস্থায় সাংবাদিকতা করেছেন বাংলাদেশ অবজারভার এবং পরে বাংলাদেশ টাইমসে। টাইমসে সেই সত্তরের দশকে তাঁর স্পোর্টস রিপোর্টিং সচেতন ক্রীড়ামোদী মহলের নজর কেড়েছে।

ক্রীড়াপ্রেমী পরিবারের সন্তান আবদুস সাদেক। তাঁর ছোট ভাই বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান স্কুল ও কলেজে (আরমানিটোলা স্কুল) নিয়মিত খেলতেন। পূর্ব পাকিস্তান যুবদলের (হকি) অধিনায়কত্ব করেছেন। আহমেদ আকবর সোবহান রাইট হাফে খেলতেন। তিনি বাংলাদেশের ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে কুমিল্লার হয়ে খেলেছেন। আহমেদ আকবর সোবহানের গোলে কুমিল্লা জেলা ১৯৭৪ সালে প্রথম জাতীয় হকিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বাবা আলহাজ আবদুস সোবহান খেলাধুলা পছন্দ করতেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। খুব ভালো সাঁতারু ছিলেন। ভালো ব্যাডমিন্টনও খেলতেন। বাবা ছিলেন আইনজীবী।

আবদুস সাদেকের শুরু আরমানিটোলা স্কুল থেকে। ফুটবল, হকি, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকসসব জায়গায় ছিল তাঁর বিচরণ। তবে হকি ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। হকিতে প্রথম বড় ক্লাব আজাদ স্পোর্টিং। সাদেক ভাই ও তাঁর বন্ধুরা মিলে মধ্যষাটের দশকের আগে কম্বাইন্ড স্পোর্টিং নামে একটি দল গঠন করেছিলেনএই দলটি ঢাকার হকি লীগে অনেক বছর শিরোপা জিতেছে।

সাদেক ভাইয়ের যে বিষয়টি উল্লেখ করার মতো, সেটি হলো হকি ও ফুটবলে ক্লাবের হয়ে কৃতিত্ব প্রদর্শন ছাড়াও কোচ হিসেবেও ক্লাবকে শিরোপা জয়ের স্বাদ দিয়েছেন একাধিকবার। চুটিয়ে হকি খেলেছেন পাকিস্তানের পক্ষে আন্তর্জাতিক হকি। খেলেছেন আন্তর্জাতিক যুব হকি। স্বাধীন বাংলাদেশে আবাহনী ক্লাবের প্রথম ফুটবল এবং হকি অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে ভারতের নয়াদিল্লিতে প্রথমবার দল খেলতে গেছে। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম এশিয়ান গেমসে অংশ নেয়সেই দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন আবদুস সাদেক। সংগঠক হিসেবে প্রথমবার ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮২ সালে এশিয়ান কাপ হকিতে (পাকিস্তান) এবং ১৯৮৬ সালে সিউলে দশম এশিয়ান গেমসে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ ছিলেন। একসময় বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

ফুটবল খেলেছেন প্রিয় দল আবাহনী ছাড়াও ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ও দিলকুশা স্পোর্টিংয়ে। তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তিনি নীতির প্রশ্নে কখনো আপস করেননি।

১৯৬৭ সালে পেয়েছেন ব্লু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সেরা ফুটবলার এবং ১৯৭৭ সালে বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার।

আমরা আবদুস সাদেক ভাইয়ের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে তিনি সব সময় অমর হয়ে থাকবেন।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া