১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ১৯৫৫ সালে আবার আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে নিপীড়িত মানুষের জন্য মুসলিম বাদ দিয়ে আমজনতার দল আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। সাতচল্লিশের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির পর অনেক উথালপাথাল গেছে, বাঙালি জাতির ওপর অনেক আঘাত এসেছে। প্রথমেই আঘাত আসে ভাষার ওপর। ভাষা আন্দোলন সফলতা পায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এরপর ১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। সেখানে মুসলিম লীগ মুছে যায়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভবিষ্যদ্বাণীমতো তারা শুধু ৯টি আসন পায়। তার পরের ইতিহাস আরো করুণ। এত বিপুল সাড়া-জাগানো নির্বাচনের প্রতি পাকিস্তান তেমন কোনো সম্মান দেখায়নি। তাদের গোঁয়ার্তুমিতে সরকার বেশিদিন টিকতে পারেনি। সকালে-বিকেলে সরকার পরিবর্তন হয়। এভাবেই চলতে থাকে। হুজুর মওলানা ভাসানী-শামসুল হকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ গঠিত হয় প্রধানত টাঙ্গাইল দক্ষিণ উপনির্বাচনে শামসুল হকের বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে। খুব সম্ভবত মওলানা ভাসানী ব্রিটিশ ভারতে একবারই নির্বাচন করেছিলেন দক্ষিণ টাঙ্গাইল আসনে। তিনি পরিষদে এক দিনের জন্য বসতে পেরেছিলেন কি না, জানি না। তবে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মাইঠানের শামসুল হক এক দিনও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে অংশ নিতে পারেননি, যার ফলে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ গঠনের তিন বছর পরও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলায় আসতে পারেননি। সম্মেলনের দিন যদিও তিনি কলকাতা থেকে এসেছিলেন। তবে তাঁকে তখনকার পূর্ববঙ্গে নামতে দেওয়া হয়নি। নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে আবার ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর বলে তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়।
টাঙ্গাইল দক্ষিণ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ছিল অভিনব। সেখানে মূল প্রার্থী ছিলেন মুসলিম লীগের মাইঠানের বিদ্রোহী গ্রুপের অন্যতম নেতা শামসুল হক। অন্যদিকে মুসলিম লীগের প্রার্থী করটিয়ার প্রতাপশালী জমিদার কে কে পন্নী (খুররম খান পন্নী) ও আবু খান। আবু খান ওই সময়ে একজন বেশ নামকরা রাজনীতিবিদ ছিলেন। মনোনয়নপত্র জমা হলে খুররম খান পন্নীর সমর্থকরা আবু খানের বাড়ি যায়। তাঁকে পন্নী সাহেবের অনুরোধে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বলে। তিনি বলেন, ‘কেন প্রত্যাহার করব? পন্নী সাহেব টাকা দিবেন। তোমরা কত টাকা দিবা?’ পরে ঠিক হয় তারা ছয় হাজার টাকা দেবে। তিনি রাজি হন। কয়েকটি স্কুলের নাম বলে তাদের সেখানে পাঠিয়ে দিয়ে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ এনে তাঁকে দিতে বলেন। পন্নী সাহেবের সমর্থকরা তাঁর কথামতো কাজ করে স্কুলে স্কুলে জমা দেওয়া টাকার রসিদ এনে দেয়। তখন আলাদা প্রচারণা না করে একসঙ্গে একই মঞ্চ থেকে প্রচার করা হতো। সে রকম একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় নাটিয়াপাড়ায়। লোক আর কত হবে, তিন-চার হাজার। পন্নীর লোকদের কয়েকজন বক্তৃতা করেছেন, শামসুল হকের সমপরিমাণ সমর্থক বক্তৃতা করেছেন। এবার এলো কে কে পন্নীর সমর্থকদের পালা। এবার উঠলেন স্বনামধন্য আবু খান। কিন্তু কে কে পন্নী আবু
খানকে টাকা দিয়েছেন, বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে—এ নিয়ে জনমনে ভীষণ বিরূপ প্রতিক্রিয়া। আবু খানের নাম ঘোষণা করলে সবার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। যারা একসময় সম্মান করত, শ্রদ্ধা করত, তারাও বিরূপ সমালোচনা করতে থাকে। আবু খান নিষ্ঠাবান সাহসী মানুষ। তিনি দাঁড়ালে গুঞ্জন আরো বেড়ে যায়। একসময় তিনি চিৎকার করে ওঠেন, ‘এই মিয়ারা থামেন। আমি শুধু শুধু বসে পড়ি নাই। কে কে পন্নী আমাকে ছয় হাজার টাকা দিছে। সেই টাকার ভারে বইসা পড়ছি। আপনাদেরও যদি পন্নী ছয় হাজার করে টাকা দেয়, তাহলে টাকার ভারে বইসা পইড়েন। তা না হলে ভোটটা মহাসংগ্রামী গরিব শামসুল হককেই দিয়েন।’ আবু খানের বক্তৃতার প্রভাব পড়েছিল অসম্ভব ধরনের। ভোটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনসহ দুই ডজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আসার পরও কে কে পন্নীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। তারপর তাঁকে কেন্দ্র করেই আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৪৩ আসনে জয়ী হয়েছিল। মুসলিম লীগ জয়ী হয়েছিল ৯টিতে, বাদবাকি সব কটিতে ফ্রন্ট। জন্মের পর থেকেই আওয়ামী মুসলিম লীগ দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসেন। এসেই তিনি দেশে মার্শাল ল জারি করেন, ভোটাধিকার কেড়ে নেন। পাকিস্তানিরা ভোট দিতে জানে না বলে ১৯৬২ সালের ২৮ এপ্রিল বনিয়াদি গণতন্ত্র বা বেসিক ডেমোক্রেসির নির্বাচন দেন। পূর্ব পাকিস্তানে ৪০ হাজার এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সব কটি প্রভিন্স মিলে ৪০ হাজার। অথচ আমরা পূর্ব পাকিস্তানিরা ছিলাম শতকরা ৫৬ জন, ওরা ছিল ৪৪ জন। ১০ শতাংশ কম। তার পরও সাম্যতা। বেসিক ডেমোক্রেসি নির্বাচন হয় ২৮ এপ্রিল। বর্ষীয়ান নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক আল্লাহর কাছে রাতদিন ফরিয়াদ করছিলেন, জারজার হয়ে কাঁদছিলেন—‘হে আল্লাহ দয়াময় প্রভু, আমরা যে পাকিস্তান তৈরি করেছি, সেই পাকিস্তানের আমিও ভোটার না। আল্লাহ তুমি এই নির্বাচনের আগে আমাকে উঠিয়ে নেও।’ আল্লাহ হয়তো তাঁর কথা শুনেছিলেন। মহান আল্লাহ ২৭ এপ্রিল তুলে নিয়েছিলেন। এরপর ছাত্র আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা কমিশন, ৭ জুন ছয় দফা, উনসত্তরের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ১১ দফার গণ-আন্দোলন, সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচন; যেখানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৬৭ আসন। হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের আওয়ামী লীগ আর নেত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে অনেক পার্থক্য। রাজনীতি হচ্ছে মানবসেবা। রাজনীতি লুটপাট ও শক্তি দেখানো নয়। আজকাল কেউ কেউ মনে করছেন, আওয়ামী লীগ আর কোনো দিন ফিরবে না। এটি পাকিস্তানিরাও ভেবেছিল। একাত্তরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা ভেবেছিল বাঙালি আর দাঁড়াতে পারবে না, কিন্তু দাঁড়িয়েছিল। যাঁরা বউয়ের কানের দুল, নাকের ফুল বিক্রি করে আওয়ামী লীগ নেতাদের খাইয়েছেন, সভা-সমাবেশে জোগান দিয়েছে, তাঁদের কথা বলছি না। বলছি হাইব্রিড সুবিধাবাদী নেতাদের কথা। তাঁদের জন্য বোন শেখ হাসিনাকে সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে অনুরোধ জানাচ্ছি। ক্ষমা চাওয়ায় কোনো দোষ নেই। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে ১৯৭৭ সালে সীমান্তে ছিলাম। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছি। দিনে একবার, দুই দিনে একবার খেয়েছি। তবু মনে কোনো আঘাত পাইনি। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতন হলে মোরারজি দেশাইয়ের জনতা পার্টির সরকারের কাছে আমি প্রধান শত্রুতে পরিণত হই। কারণ ইন্দিরা গান্ধী আমাকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন। তাই মোরারজি দেশাই সরকারের আমি হয়েছিলাম প্রধান শত্রু। ১৯৭৯ সালে বিহারে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। গাড়িতে করে তিনি যেতে পারেননি, হাতির পিঠে চড়ে গিয়েছিলেন। সেখানে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল। ইন্দিরাজি বলেছিলেন, ‘ভাইয়ো, আয়োর বহেনো গলতি হো গিয়া, মাফি মাংতা হু, মাফ করদো।’ এই মাফ চাওয়ার পর তিন মাসও লাগেনি সারা দেশ ইন্দিরাময় হয়ে গিয়েছিল। তাই ভেবে দেখতে বলছি। আজ ২৩ জুন নিরাপত্তা বাহিনী নাকি খুবই সতর্ক, আওয়ামী লীগ কিছু করতে পারে। মানুষ যা চায়, তা করলে আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই লাভবান হবে। কিন্তু জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গায়ের জোর দেখালে, অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড করলে ভালোর চেয়ে খারাপ হবে বেশি। তাই বলব, ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী গত ১৯ জুন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ২০০৩ সালে তাঁকে একুশে পদক দেওয়া হয়েছিল। একজন সত্যিকারের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাহিত্যিক, কবি, সর্বোপরি একজন ভালো মানুষকে আমরা হারালাম। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদীর কতটা মূল্যায়ন হয়েছে? তাহলে বলতেই হবে আমাদের দেশে গুণীজনের অনেক সময় সঠিক মূল্যায়ন হয় না, কবি আল মুজাহিদীরও তেমন হয়নি। ১৯৪৩ সালে পয়লা জানুয়ারি টাঙ্গাইলে তাঁর জন্ম। তিনি আমাদের আত্মীয়। তাঁর সঙ্গে আমার কবে কোথায় কিভাবে প্রথম পরিচয় হয়েছে বলতে পারব না। তবে বাষট্টির শিক্ষা কমিশন আন্দোলনের সময় করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে টাঙ্গাইল শহরে আসা মিছিলে শরিক হয়েছিলাম। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী হাই স্কুল, বিবেকানন্দ হাই স্কুল ও বিন্দুবাসিনী গার্লস স্কুলের মেয়েরা শরিক হয়েছিল। সেই মিছিলের একজন হিসেবে আমিও স্লোগান ধরেছি, স্লোগান দিয়েছি। সেখানে আরো নেতাদের মধ্যে ফজলুল করীম মিঠু, লতিফ সিদ্দিকী, ফজলুর রহমান খান ফারুক, আল মুজাহিদী, আতিকুর রহমান সালু, বুলবুল খান মাহবুব, এম এ রেজাসহ আরো অনেকে ছিলেন। মজার ব্যাপার, সেই শিক্ষা কমিশন বাতিলের মিছিলে পাকিস্তান জিন্দাবাদের সঙ্গে নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার স্লোগান হয়েছে। সেখানে আমিও স্লোগান দিয়েছি নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার। কেন দিয়েছি জানি না।
বাষট্টি থেকে চৌষট্টির মাঝামাঝিতে টাঙ্গাইলের রওশন সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনেও উপস্থিত হয়েছিলাম। তখন ছাত্রলীগের সভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণি অন্যান্য নেতাকে নিয়ে সেই সম্মেলনে গিয়েছিলেন। আমি তাঁর আগে অত উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা শুনিনি। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের বক্তৃতা ছিল অসাধারণ, ঘরের টিন খুলে পড়তে চাইত। শেখ ফজলুল হক মণির বক্তৃতা অত ক্ষুরধার ছিল না, কিন্তু তাঁর যুক্তি ছিল অসাধারণ। টাঙ্গাইলের সেই সফল সম্মেলনে টাঙ্গাইল মহকুমা ছাত্রলীগকে জেলার মর্যাদা দেওয়া হয় এবং কবি আল মুজাহিদীর লেখা ‘ছাত্রলীগ জিন্দাবাদ ছাত্রলীগ জিন্দাবাদ’ কবিতাকে ছাত্রলীগ সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং যা পরে বছরের পর বছর গাওয়া হয়েছে, রেকর্ড করে বাজানো হয়েছে। সেই সম্মেলনে শওকত তালুকদারকে সভাপতি এবং লতিফ সিদ্দিকীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। আল মুজাহিদী শুধু একজন কবিই ছিলেন না, তিনি একজন আদর্শবান রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তিনি বাংলা ছাত্রলীগ করেছিলেন। তারপর ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর সঙ্গে রাজনৈতিক দল করেন। সর্বত্রই চেষ্টা করেছেন দেশের জন্য কিছু করতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরম দয়ালু আল্লাহ আমার ওপর দয়া করেছিলেন। ৩ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানি হানাদাররা টাঙ্গাইলে ঢোকার পথে সাটিয়াচরায় আমরা হানাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। ঢাকা থেকে অতটা পথ কোনো বাধা না পাওয়ায় তারা নিশ্চিন্তেই ছিল। কিন্তু ধল্যা-সাটিয়াচরার মাঝামাঝি আচমকা আমরা আক্রমণ করলে ওদের ২৫ থেকে ৩০টি গাড়ি রাস্তার নিচে পড়ে যায়। এতে শতেকখানি হানাদার আহত-নিহত হয়। ওদের মেশিনগান, রকেট লঞ্চার, ১২০ মিলি কামান বৃষ্টির মতো গোলাগুলি ছুড়তে থাকে। এতে আমাদের জমারত আলী দেওয়ানসহ ১৩-১৪ জন যোদ্ধা শহীদ হন।
আমরা যখন সাটিয়াচরা-নাটিয়াপাড়া থেকে টাঙ্গাইলের দিকে ফিরে যাই, তার আগেই আমাদের অনেক নেতা চলে গিয়েছিলেন। টাঙ্গাইল পুলিশ কোথের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। কিন্তু টাঙ্গাইল পুলিশ কোথে ফিরে দেখি একজন পুলিশ গার্ডের চেহারা বদলে গেছে। সে তালা খুলতে দেবে না। যুদ্ধে পরাজয়ের খবর তখনো টাঙ্গাইলে এসে পৌঁছেনি। তার পরও এই অবস্থা। থানায় পাকিস্তান পতাকা উঠে গেছে। পুলিশ কোথে পাহারাদার বদলে গেছে। কে একজন পুলিশ কোথের পাহারাদারের হাত থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে এক ধাক্কায় পুলিশ কোথের বারান্দার সামনে ফেলে দেয়। তালা খুলে অস্ত্র গাড়িতে তোলা হয়। এই সময় আমাদের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মুজাহিদী ৫-৬টি রিভলবারের মধ্য থেকে একটি তুলে নেন। একসময় মনে হয়েছিল, রিভলবারটি তাঁর হাত থেকে নিয়ে নিই। কিন্তু আল মুজাহিদীর মতো একজন নেতার হাত থেকে রিভলবারটি নেওয়া যুক্তিসংগত মনে হয়নি। তাই আর নিইনি। যুদ্ধ শেষে যেদিন আল মুজাহিদী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়, সেদিন প্রথমেই তিনি বলেছিলেন, ‘কাদের, তুমি আজ কত বড় হয়েছ। ছোট্ট বাচ্চা রেখে গেলাম, আর তুমি আমাদের সবাইকে পিছে ফেলে শৌর্যে-বীর্যে, দেশপ্রেমে কত দূর এগিয়ে গেছ। আমার মনে হয়েছিল তুমি রিভলবারটি রেখে দেবে। কিন্তু তোমার পারিবারিক কৃষ্টি-সভ্যতার কথা চিন্তা করে ভেবেছিলাম—না, তুমি রিভলবার রেখে দেবে না। দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আর আমার অস্ত্রের প্রয়োজন কী? তুমি এটি রেখে দাও। তোমার কাছেই নিরাপদ থাকবে।’ না, সেদিনও তাঁর রিভলবার আমি রাখিনি। বলেছিলাম, ‘ওটা আপনার কাছেই রাখুন। নিরাপত্তার দায়ভার আমার ওপর থাক।’ বড় ভালো মানুষ ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী। আমি তাঁর থেকে তিন-সাড়ে তিন বছরের ছোট। আমাকে ভীষণ বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসতেন। যখনই কোনো কথা বলেছি, সেটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন, সম্মান করেছেন। দয়াময় আল্লাহ আমাকে তাঁর বায়তুল মোকাররমের জানাজায় শরিক হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এ জন্য দয়ালু আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। যখন ভালো মানুষের বড় বেশি দরকার, তখনই চলে গেলেন। আমি তাঁর উত্তরার বাড়িতে বহুবার গেছি। তাঁর ছেলেমেয়ের শুকনা মুখ দেখে নিজেকে সামাল দিতে পারিনি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, হে দয়াময় আল্লাহ দয়া করুন, বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদীর সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে বেহেশতবাসী করুন। তাঁর আত্মীয়-স্বজন, সন্তান-সন্ততি, নিকটজনদের আপনার পবিত্র আরশের ছায়াতলে রাখুন এবং তাদের এই শোক সইবার শক্তি দিন। আমিন।
লেখক : রাজনীতিক





দীর্ঘ ক্রীড়াঙ্গনের জীবনে খেলোয়াড়, কোচ, সংগঠক হিসেবে আবদুস সাদেকের বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের বিকাশে, ক্লাবের ক্রীড়াচর্চা, হকি ও ফুটবলে অসামান্য অবদান নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। তিনি নিজেই তাঁর তুলনা। একজন মানুষ ক্রীড়াঙ্গনকে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কিভাবে উপভোগ করতে পারেন খুব কাছে থেকে না দেখলে, না জানলে এটি লিখে বোঝানো মুশকিল। রেকর্ড বইয়ের সব নিছক পরিসংখ্যান থেকে মানুষ আবদুস সাদেক ছিলেন অনেক বড়। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আবদুস সাদেক ছিলেন ক্রীড়াঙ্গনে সুস্থ জীবনবোধ, ন্যায়নীতি ও আদর্শের প্রতীক। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনেক উঁচু একটি স্তম্ভ! দেশের ক্রীড়াঙ্গনের গৌরব। এই মানুষটি সারা জীবন ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ভেবেছেন। ভেবেছেন ক্রীড়াচর্চার বিষয়টি।