• ই-পেপার

বাণিজ্যিকীকরণের হাওয়ায় নীতি-নৈতিকতা হারিয়েছে শিক্ষা

  • মাহবুব উল্লাহ

ভারতে ব্রিটিশ শাসন ও অসচেতন ক্ষমতা দখলের ইতিহাস

সৈকত ইসলাম

ভারতে ব্রিটিশ শাসন ও অসচেতন ক্ষমতা দখলের ইতিহাস

১৭০০ সালের গোড়ার দিকে ভারত ছিল বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। তখনকার হিসাব অনুযায়ী, ভারত বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশে অবদান রাখত এবং এর বড় অংশই ছিল কৃষি ও হস্তশিল্প নির্ভর। কিন্তু এর ঠিক ১০০ বছরের মধ্যেই এই সমৃদ্ধ দেশটি ব্রিটিশ শাসনের অধীন হয়ে পড়ে। এটি কি  ব্রিটিশ সরকারের কোনো সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার ফল ছিল,  নাকি  এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল এক জটিল রাজনৈতিক অবস্থা, স্থানীয় শাসকদের দ্বন্দ্ব, নাকি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ?

ভারতের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক সময় স্থানীয় রাজারা বাইরের শক্তিকে দেশে এনে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করার চেষ্টা করেছেন। বাবরের দিল্লি দখল তারই একটি উদাহরণ, যেখানে ইব্রাহিম লোদীর বিরুদ্ধে তাঁর শত্রুরা তাঁকে আমন্ত্রণ জানায়। পরে মোগলদের দুর্বলতার সময়েও এই ধরনের ঘটনা ঘটে। যেমন১৭৩৯ সালে ইরানের নাদির শাহ দিল্লি আক্রমণ করেন, আর সেই আক্রমণে মোগল দরবারের কিছু কর্মকর্তার গোপন ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই প্রবণতা অর্থাৎ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য বাইরের শক্তিকে ব্যবহার করার রেওয়াজ পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়ে ওঠে।

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি প্রথমে আসে বাণিজ্য করার জন্য। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুনাফা করা, শাসন করা নয়। লন্ডনের পরিচালকরা চেয়েছিলেন, কম্পানি যেন কোনো রাজনৈতিক ঝামেলায় না জড়ায়। তাঁরা নির্দেশ দিয়েছিলেন মোগল বা অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে সংঘর্ষ না করতে এবং যুদ্ধ খরচ কমাতে। কিন্তু বাস্তবে ভারতে যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা চলছিল, তা কম্পানির কর্মচারীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। এই বিশৃঙ্খলার বড় কারণ ছিল আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা। তখন বিভিন্ন প্রদেশে স্বাধীন রাজারা নিজেদের মতো শাসন চালাতে শুরু করেন। ফলে একটি কেন্দ্রীয় শক্তির অভাব দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় রাজারা নিজেদের ক্ষমতা রক্ষার জন্য বাইরের সাহায্য নিতে দ্বিধা করেননি।

অন্যদিকে বাংলার বণিক শ্রেণি এবং জমিদারদের মধ্যে অনেকেই চেয়েছিলেন এমন একটি শাসনকাঠামো, যেখানে ব্যবসার নিরাপত্তা থাকবে এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, যা এই ছোট ছোট রাজ্যের দুর্বল শাসকদের দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না। বিশেষত বাংলায় মুর্শিদকুলীর শাসনের পর তৈরি রাজনৈতিক অস্থিরতায় যখন স্থানীয় বণিক শ্রেণির স্বার্থ হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল, তখন তা তাদের  ইংরেজ কম্পানির সহায়তায় সিরাজকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিল। সিরাজউদ্দৌলার শাসনে যখন তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ হুমকির মুখে পড়ে, তখন তারা কম্পানির স্থানীয় কর্মকর্তাদের সহায়তায় সিরাজকে সরাতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীর বিজয় এই সহযোগিতারই ফল। অথচ যদি রবার্ট ক্লাইভ এই যুদ্ধে পরাজিত হতেন, তাহলে কম্পানিকে ভারত ছেড়ে পালাতে হতো এবং এই মাটিতে তাদের আর কোনো ভবিষ্যৎ থাকত না। লন্ডনের পরিচালকরাও এমন সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং এই ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের ঘোরতর বিরোধিতা করেছিলেন। এই সময় ইংরেজ কম্পানির কর্মচারীরা শুধু কম্পানির জন্য কাজ করছিলেন না, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবেও লাভবান হওয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন। অনেকেই মনে করতেন, শুধু কম্পানির বেতনে চলা সম্ভব নয়। তাই তাঁরা স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতা দখলে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। রবার্ট ক্লাইভের মতো কিছু কর্মকর্তা শুধু চাকরি না করে নিজস্ব রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সামরিক কৌশলে প্রচুর ধন-সম্পদ অর্জন করেন। তাঁদের অনেকেই সরাসরি কম্পানির নির্দেশ অমান্য করে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন।

ভারতের কিছু শহর তখন ধীরে ধীরে কম্পানির নিয়ন্ত্রণে আসছিল। কলকাতা, মাদ্রাজ, বোম্বে ছিল এর মধ্যে প্রধান। এই শহরগুলোতে কম্পানি ব্যবসা পরিচালনার জন্য আইন-আদালত, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং শৃঙ্খলার কাঠামো গড়ে তোলে। ফলে ভারতের অন্যান্য শহর; যেমনদিল্লি, আগ্রা, মুলতান থেকে অনেক ব্যবসায়ী এই নতুন শহরগুলোতে চলে আসতে শুরু করেন। কারণ তাঁরা এখানে নিজেদের পুঁজি বেশি নিরাপদ মনে করতেন। ধীরে ধীরে এই শহরগুলো শুধু ব্যবসার কেন্দ্রই নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রেও পরিণত হয়।

এই অনিচ্ছাকৃত ক্ষমতা দখলের পেছনে যে রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করেছে, তা অনেক গভীর। কম্পানির স্থানীয় কর্মচারীরা যেমন ব্যক্তিগত লাভের জন্য ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলেন, তেমনি স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও নিরাপত্তা এবং আইনি কাঠামোর কারণে কম্পানির শহরগুলোতে পুঁজি স্থানান্তর করতে রাজি হয়েছিলেন। এতে এক ধরনের পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করে। এই প্রক্রিয়ায় এক নতুন ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ইংরেজ কম্পানি ও স্থানীয় ধনী শ্রেণির মধ্যে, যাকে পরবর্তী সময়ে অনেক ইতিহাসবিদ অ্যাংলো-বানিয়া অর্ডার বলেছেন। এখানে কম্পানি একদিকে শাসনকাঠামো সরবরাহ করে, আর অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অর্থ ও প্রভাব দিয়ে সেই কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেন। এই সম্পর্কের মধ্যেই তৈরি হয় এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, যার ফলে ইংরেজরা আরো বেশি ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

এই সমীকরণে আমরা দেখতে পাই, কিভাবে একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থা ধীরে ধীরে একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়। এটি শুধু বাহ্যিক সামরিক বিজয়ের ফল নয়, বরং অভ্যন্তরীণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলাফল। এমনকি কম্পানির পরিচালকরাও এই পরিবর্তনের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। এই পুরো প্রক্রিয়াকে অনেক ইতিহাসবিদ ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। কার্ল মার্ক্স এই ঘটনাকে সৃষ্টিশীল ধ্বংস বলেছেন। তাঁর মতে, ব্রিটিশরা যেমন ভারতের প্রথাগত সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামো ধ্বংস করেছে, তেমনি কিছু নতুন কাঠামোও তৈরি করেছে; যেমনরেল, ডাকব্যবস্থা বা আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো। যদিও এগুলো স্থানীয় লোকজনের জন্য সর্বদা উপকারী ছিল না, তবু এগুলো এক নতুন বাস্তবতার সূচনা করে।

অন্যদিকে সাব-অলটার্ন স্কুলের ইতিহাসবিদরা বলতে চেয়েছেন, এই শাসনকাঠামো শুধু ইংরেজ আগ্রাসনের ফল নয়। বরং তাঁরা বলছেন, স্থানীয় অভিজাত শ্রেণি; যেমনজমিদার বা ব্যবসায়ীরা ব্রিটিশদের সঙ্গে মিলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, এই ধরনের ইতিহাসে শুধু বড় রাজা-বাদশাহ নন, সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ ও মতামতও গুরুত্বপূর্ণ।

ইংরেজদের ভারত শাসনের শুরুটা আসলে ছিল অনেকটা অসচেতন সাম্রাজ্যবাদ। অর্থাৎ তারা শুরুতে শাসনের উদ্দেশ্যে আসেনি, কিন্তু ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্থানীয় সহযোগিতা এবং কম্পানির কর্মচারীদের লোভ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা মিলিয়ে এক নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে। বাস্তবে ভারতবর্ষে কম্পানির সাম্রাজ্যিক উত্থান ছিল এক জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।

এই ইতিহাস আমাদের শেখায় যে কোনো শাসনের পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক আগ্রাসনের কারণে হয় না। এর পেছনে থাকে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, স্থানীয় শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানীদের ভূমিকা। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস তাই শুধু সামরিক জয়ের কাহিনি নয়, এটি একটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা শাসনকাঠামোর গল্প, যা শুরু হয়েছিল ব্যবসার নামে এবং শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক পূর্ণাঙ্গ সাম্রাজ্যিক শাসনে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

ইতিহাসের জন্ম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তম

ইতিহাসের জন্ম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ১৯৫৫ সালে আবার আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে নিপীড়িত মানুষের জন্য মুসলিম বাদ দিয়ে আমজনতার দল আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। সাতচল্লিশের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির পর অনেক উথালপাথাল গেছে, বাঙালি জাতির ওপর অনেক আঘাত এসেছে। প্রথমেই আঘাত আসে ভাষার ওপর। ভাষা আন্দোলন সফলতা পায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এরপর ১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। সেখানে মুসলিম লীগ মুছে যায়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভবিষ্যদ্বাণীমতো তারা শুধু ৯টি আসন পায়। তার পরের ইতিহাস আরো করুণ। এত বিপুল সাড়া-জাগানো নির্বাচনের প্রতি পাকিস্তান তেমন কোনো সম্মান দেখায়নি। তাদের গোঁয়ার্তুমিতে সরকার বেশিদিন টিকতে পারেনি। সকালে-বিকেলে সরকার পরিবর্তন হয়। এভাবেই চলতে থাকে। হুজুর মওলানা ভাসানী-শামসুল হকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ গঠিত হয় প্রধানত টাঙ্গাইল দক্ষিণ উপনির্বাচনে শামসুল হকের বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে। খুব সম্ভবত মওলানা ভাসানী ব্রিটিশ ভারতে একবারই নির্বাচন করেছিলেন দক্ষিণ টাঙ্গাইল আসনে। তিনি পরিষদে এক দিনের জন্য বসতে পেরেছিলেন কি না, জানি না। তবে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মাইঠানের শামসুল হক এক দিনও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে অংশ নিতে পারেননি, যার ফলে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ গঠনের তিন বছর পরও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলায় আসতে পারেননি। সম্মেলনের দিন যদিও তিনি কলকাতা থেকে এসেছিলেন। তবে তাঁকে তখনকার পূর্ববঙ্গে নামতে দেওয়া হয়নি। নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে আবার ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর বলে তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়।

টাঙ্গাইল দক্ষিণ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ছিল অভিনব। সেখানে মূল প্রার্থী ছিলেন মুসলিম লীগের মাইঠানের বিদ্রোহী গ্রুপের অন্যতম নেতা শামসুল হক। অন্যদিকে মুসলিম লীগের প্রার্থী করটিয়ার প্রতাপশালী জমিদার কে কে পন্নী (খুররম খান পন্নী) ও আবু খান। আবু খান ওই সময়ে একজন বেশ নামকরা রাজনীতিবিদ ছিলেন। মনোনয়নপত্র জমা হলে খুররম খান পন্নীর সমর্থকরা আবু খানের বাড়ি যায়। তাঁকে পন্নী সাহেবের অনুরোধে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বলে। তিনি বলেন, কেন প্রত্যাহার করব? পন্নী সাহেব টাকা দিবেন। তোমরা কত টাকা দিবা? পরে ঠিক হয় তারা ছয় হাজার টাকা দেবে। তিনি রাজি হন। কয়েকটি স্কুলের নাম বলে তাদের সেখানে পাঠিয়ে দিয়ে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ এনে তাঁকে দিতে বলেন। পন্নী সাহেবের সমর্থকরা তাঁর কথামতো কাজ করে স্কুলে স্কুলে জমা দেওয়া টাকার রসিদ এনে দেয়। তখন আলাদা প্রচারণা না করে একসঙ্গে একই মঞ্চ থেকে প্রচার করা হতো। সে রকম একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় নাটিয়াপাড়ায়। লোক আর কত হবে, তিন-চার হাজার। পন্নীর লোকদের কয়েকজন বক্তৃতা করেছেন, শামসুল হকের সমপরিমাণ সমর্থক বক্তৃতা করেছেন। এবার এলো কে কে পন্নীর সমর্থকদের পালা। এবার উঠলেন স্বনামধন্য আবু খান। কিন্তু কে কে পন্নী আবু ইতিহাসের জন্ম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদীখানকে টাকা দিয়েছেন, বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছেএ নিয়ে জনমনে ভীষণ বিরূপ প্রতিক্রিয়া। আবু খানের নাম ঘোষণা করলে সবার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। যারা একসময় সম্মান করত, শ্রদ্ধা করত, তারাও বিরূপ সমালোচনা করতে থাকে। আবু খান নিষ্ঠাবান সাহসী মানুষ। তিনি দাঁড়ালে গুঞ্জন আরো বেড়ে যায়। একসময় তিনি চিৎকার করে ওঠেন, এই মিয়ারা থামেন। আমি শুধু শুধু বসে পড়ি নাই। কে কে পন্নী আমাকে ছয় হাজার টাকা দিছে। সেই টাকার ভারে বইসা পড়ছি। আপনাদেরও যদি পন্নী ছয় হাজার করে টাকা দেয়, তাহলে টাকার ভারে বইসা পইড়েন। তা না হলে ভোটটা মহাসংগ্রামী গরিব শামসুল হককেই দিয়েন। আবু খানের বক্তৃতার প্রভাব পড়েছিল অসম্ভব ধরনের। ভোটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনসহ দুই ডজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আসার পরও কে কে পন্নীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। তারপর তাঁকে কেন্দ্র করেই আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৪৩ আসনে জয়ী হয়েছিল। মুসলিম লীগ জয়ী হয়েছিল ৯টিতে, বাদবাকি সব কটিতে ফ্রন্ট। জন্মের পর থেকেই আওয়ামী মুসলিম লীগ দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসেন। এসেই তিনি দেশে মার্শাল ল জারি করেন, ভোটাধিকার কেড়ে নেন। পাকিস্তানিরা ভোট দিতে জানে না বলে ১৯৬২ সালের ২৮ এপ্রিল বনিয়াদি গণতন্ত্র বা বেসিক ডেমোক্রেসির নির্বাচন দেন। পূর্ব পাকিস্তানে ৪০ হাজার এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সব কটি প্রভিন্স মিলে ৪০ হাজার। অথচ আমরা পূর্ব পাকিস্তানিরা ছিলাম শতকরা ৫৬ জন, ওরা ছিল ৪৪ জন। ১০ শতাংশ কম। তার পরও সাম্যতা। বেসিক ডেমোক্রেসি নির্বাচন হয় ২৮ এপ্রিল। বর্ষীয়ান নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক আল্লাহর কাছে রাতদিন ফরিয়াদ করছিলেন, জারজার হয়ে কাঁদছিলেন—‘হে আল্লাহ দয়াময় প্রভু, আমরা যে পাকিস্তান তৈরি করেছি, সেই পাকিস্তানের আমিও ভোটার না। আল্লাহ তুমি এই নির্বাচনের আগে আমাকে উঠিয়ে নেও। আল্লাহ হয়তো তাঁর কথা শুনেছিলেন। মহান আল্লাহ ২৭ এপ্রিল তুলে নিয়েছিলেন। এরপর ছাত্র আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা কমিশন, ৭ জুন ছয় দফা, উনসত্তরের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ১১ দফার গণ-আন্দোলন, সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচন; যেখানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৬৭ আসন। হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের আওয়ামী লীগ আর নেত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে অনেক পার্থক্য। রাজনীতি হচ্ছে মানবসেবা। রাজনীতি লুটপাট ও শক্তি দেখানো নয়। আজকাল কেউ কেউ মনে করছেন, আওয়ামী লীগ আর কোনো দিন ফিরবে না। এটি পাকিস্তানিরাও ভেবেছিল। একাত্তরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা ভেবেছিল বাঙালি আর দাঁড়াতে পারবে না, কিন্তু দাঁড়িয়েছিল। যাঁরা বউয়ের কানের দুল, নাকের ফুল বিক্রি করে আওয়ামী লীগ নেতাদের খাইয়েছেন, সভা-সমাবেশে জোগান দিয়েছে, তাঁদের কথা বলছি না। বলছি হাইব্রিড সুবিধাবাদী নেতাদের কথা। তাঁদের জন্য বোন শেখ হাসিনাকে সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে অনুরোধ জানাচ্ছি। ক্ষমা চাওয়ায় কোনো দোষ নেই। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে ১৯৭৭ সালে সীমান্তে ছিলাম। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছি। দিনে একবার, দুই দিনে একবার খেয়েছি। তবু মনে কোনো আঘাত পাইনি। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতন হলে মোরারজি দেশাইয়ের জনতা পার্টির সরকারের কাছে আমি প্রধান শত্রুতে পরিণত হই। কারণ ইন্দিরা গান্ধী আমাকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন। তাই  মোরারজি দেশাই সরকারের আমি হয়েছিলাম প্রধান শত্রু। ১৯৭৯ সালে বিহারে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। গাড়িতে করে তিনি যেতে পারেননি, হাতির পিঠে চড়ে গিয়েছিলেন। সেখানে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল। ইন্দিরাজি বলেছিলেন, ভাইয়ো, আয়োর বহেনো গলতি হো গিয়া, মাফি মাংতা হু, মাফ করদো। এই মাফ চাওয়ার পর তিন মাসও লাগেনি সারা দেশ ইন্দিরাময় হয়ে গিয়েছিল। তাই ভেবে দেখতে বলছি। আজ ২৩ জুন নিরাপত্তা বাহিনী নাকি খুবই সতর্ক, আওয়ামী লীগ কিছু করতে পারে। মানুষ যা চায়, তা করলে আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই লাভবান হবে। কিন্তু জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গায়ের জোর দেখালে, অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড করলে ভালোর চেয়ে খারাপ হবে বেশি। তাই বলব, ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।

বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী গত ১৯ জুন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ২০০৩ সালে তাঁকে একুশে পদক দেওয়া হয়েছিল। একজন সত্যিকারের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাহিত্যিক, কবি, সর্বোপরি একজন ভালো মানুষকে আমরা হারালাম। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদীর কতটা মূল্যায়ন হয়েছে? তাহলে বলতেই হবে আমাদের দেশে গুণীজনের অনেক সময় সঠিক মূল্যায়ন হয় না, কবি আল মুজাহিদীরও তেমন হয়নি। ১৯৪৩ সালে পয়লা জানুয়ারি টাঙ্গাইলে তাঁর জন্ম। তিনি আমাদের আত্মীয়। তাঁর সঙ্গে আমার কবে কোথায় কিভাবে প্রথম পরিচয় হয়েছে বলতে পারব না। তবে বাষট্টির শিক্ষা কমিশন আন্দোলনের সময় করটিয়া সাদত কলেজ থেকে টাঙ্গাইল শহরে আসা মিছিলে শরিক হয়েছিলাম। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী হাই স্কুল, বিবেকানন্দ হাই স্কুল ও বিন্দুবাসিনী গার্লস স্কুলের মেয়েরা শরিক হয়েছিল। সেই মিছিলের একজন হিসেবে আমিও স্লোগান ধরেছি, স্লোগান দিয়েছি। সেখানে আরো নেতাদের মধ্যে ফজলুল করীম মিঠু, লতিফ সিদ্দিকী, ফজলুর রহমান খান ফারুক, আল মুজাহিদী, আতিকুর রহমান সালু, বুলবুল খান মাহবুব, এম এ রেজাসহ আরো অনেকে ছিলেন। মজার ব্যাপার, সেই শিক্ষা কমিশন বাতিলের মিছিলে পাকিস্তান জিন্দাবাদের সঙ্গে নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার স্লোগান হয়েছে। সেখানে আমিও স্লোগান দিয়েছি নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার। কেন দিয়েছি জানি না।

বাষট্টি থেকে চৌষট্টির মাঝামাঝিতে টাঙ্গাইলের রওশন সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনেও উপস্থিত হয়েছিলাম। তখন ছাত্রলীগের সভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণি অন্যান্য নেতাকে নিয়ে সেই সম্মেলনে গিয়েছিলেন। আমি তাঁর আগে অত উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা শুনিনি। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের বক্তৃতা ছিল অসাধারণ, ঘরের টিন খুলে পড়তে চাইত। শেখ ফজলুল হক মণির বক্তৃতা অত ক্ষুরধার ছিল না, কিন্তু তাঁর যুক্তি ছিল অসাধারণ। টাঙ্গাইলের সেই সফল সম্মেলনে টাঙ্গাইল মহকুমা ছাত্রলীগকে জেলার মর্যাদা দেওয়া হয় এবং কবি আল মুজাহিদীর লেখা ছাত্রলীগ জিন্দাবাদ ছাত্রলীগ জিন্দাবাদ কবিতাকে ছাত্রলীগ সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং যা পরে বছরের পর বছর গাওয়া হয়েছে, রেকর্ড করে বাজানো হয়েছে। সেই সম্মেলনে শওকত তালুকদারকে সভাপতি এবং লতিফ সিদ্দিকীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। আল মুজাহিদী শুধু একজন কবিই ছিলেন না, তিনি একজন আদর্শবান রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তিনি বাংলা ছাত্রলীগ করেছিলেন। তারপর ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর সঙ্গে রাজনৈতিক দল করেন। সর্বত্রই চেষ্টা করেছেন দেশের জন্য কিছু করতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরম দয়ালু আল্লাহ আমার ওপর দয়া করেছিলেন। ৩ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানি হানাদাররা টাঙ্গাইলে ঢোকার পথে সাটিয়াচরায় আমরা হানাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। ঢাকা থেকে অতটা পথ কোনো বাধা না পাওয়ায় তারা নিশ্চিন্তেই ছিল। কিন্তু ধল্যা-সাটিয়াচরার মাঝামাঝি আচমকা আমরা আক্রমণ করলে ওদের ২৫ থেকে ৩০টি গাড়ি রাস্তার নিচে পড়ে যায়। এতে শতেকখানি হানাদার আহত-নিহত হয়। ওদের মেশিনগান, রকেট লঞ্চার, ১২০ মিলি কামান বৃষ্টির মতো গোলাগুলি ছুড়তে থাকে। এতে আমাদের জমারত আলী দেওয়ানসহ ১৩-১৪ জন যোদ্ধা শহীদ হন।

আমরা যখন সাটিয়াচরা-নাটিয়াপাড়া থেকে টাঙ্গাইলের দিকে ফিরে যাই, তার আগেই আমাদের অনেক নেতা চলে গিয়েছিলেন। টাঙ্গাইল পুলিশ কোথের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। কিন্তু টাঙ্গাইল পুলিশ কোথে ফিরে দেখি একজন পুলিশ গার্ডের চেহারা বদলে গেছে। সে তালা খুলতে দেবে না। যুদ্ধে পরাজয়ের খবর তখনো টাঙ্গাইলে এসে পৌঁছেনি। তার পরও এই অবস্থা। থানায় পাকিস্তান পতাকা উঠে গেছে। পুলিশ কোথে পাহারাদার বদলে গেছে। কে একজন পুলিশ কোথের পাহারাদারের হাত থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে এক ধাক্কায় পুলিশ কোথের বারান্দার সামনে ফেলে দেয়। তালা খুলে অস্ত্র গাড়িতে তোলা হয়। এই সময় আমাদের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মুজাহিদী ৫-৬টি রিভলবারের মধ্য থেকে একটি তুলে নেন। একসময় মনে হয়েছিল, রিভলবারটি তাঁর হাত থেকে নিয়ে নিই। কিন্তু আল মুজাহিদীর মতো একজন নেতার হাত থেকে রিভলবারটি নেওয়া যুক্তিসংগত মনে হয়নি। তাই আর নিইনি। যুদ্ধ শেষে যেদিন আল মুজাহিদী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়, সেদিন প্রথমেই তিনি বলেছিলেন, কাদের, তুমি আজ কত বড় হয়েছ। ছোট্ট বাচ্চা রেখে গেলাম, আর তুমি আমাদের সবাইকে পিছে ফেলে শৌর্যে-বীর্যে, দেশপ্রেমে কত দূর এগিয়ে গেছ। আমার মনে হয়েছিল তুমি রিভলবারটি রেখে দেবে। কিন্তু তোমার পারিবারিক কৃষ্টি-সভ্যতার কথা চিন্তা করে ভেবেছিলামনা, তুমি রিভলবার রেখে দেবে না। দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আর আমার অস্ত্রের প্রয়োজন কী? তুমি এটি রেখে দাও। তোমার কাছেই নিরাপদ থাকবে। না, সেদিনও তাঁর রিভলবার আমি রাখিনি। বলেছিলাম, ওটা আপনার কাছেই রাখুন। নিরাপত্তার দায়ভার আমার ওপর থাক। বড় ভালো মানুষ ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদী। আমি তাঁর থেকে তিন-সাড়ে তিন বছরের ছোট। আমাকে ভীষণ বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসতেন। যখনই কোনো কথা বলেছি, সেটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন, সম্মান করেছেন। দয়াময় আল্লাহ আমাকে তাঁর বায়তুল মোকাররমের জানাজায় শরিক হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। এ জন্য দয়ালু আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। যখন ভালো মানুষের বড় বেশি দরকার, তখনই চলে গেলেন। আমি তাঁর উত্তরার বাড়িতে বহুবার গেছি। তাঁর ছেলেমেয়ের শুকনা মুখ দেখে নিজেকে সামাল দিতে পারিনি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, হে দয়াময় আল্লাহ দয়া করুন, বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মুজাহিদীর সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে বেহেশতবাসী করুন। তাঁর আত্মীয়-স্বজন, সন্তান-সন্ততি, নিকটজনদের আপনার পবিত্র আরশের ছায়াতলে রাখুন এবং তাদের এই শোক সইবার শক্তি দিন। আমিন।

লেখক : রাজনীতিক

বহুমুখী ফসল : টেকসই কৃষির নতুন দিগন্ত

ড. মুহাম্মাদ আব্দুল হামিদ মিয়া

বহুমুখী ফসল : টেকসই কৃষির নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা বহুমুখী সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের সম্মিলিত একটি ক্ষেত্র, যেখানে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের সঠিক ব্যবহারের বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জমির সীমাবদ্ধতা, পানির সংকট, লবণাক্ততা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যমান কৃষিপদ্ধতি থেকে প্রত্যাশিত ফলন অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। অথচ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত কিছু চাষাবাদ পদ্ধতি এবং গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা গেলে একই জমি থেকে অধিক উৎপাদন, অতিরিক্ত আয় এবং পতিত জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে ফসলবিন্যাস, মিশ্রচাষ, বিনা চাষে আবাদ এবং স্থানীয় উদ্ভাবনী কৌশলের সমন্বিত প্রয়োগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পাশাপাশি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, সম্প্রসারণ সংস্থা এবং কৃষকদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাবও অনেক সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই কৃষির টেকসই উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এসব সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের অনেক এলাকায় এখনো আমন ধান কাটার পর জমি চাষ করে সরিষা আবাদ করা হয় এবং সরিষা সংগ্রহের পর পুনরায় জমি কর্দমাক্ত করে বোরো ধানের চারা রোপণ করা হয়। এতে আউশ বা পরবর্তী আমন মৌসুমের আগে দুটি ফসল পাওয়া গেলেও বোরো ধানের ফলনের যে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হয়, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নজরের বাইরে থেকে যায়। মূলত প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবই এই সমস্যার প্রধান কারণ। পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার চলনবিল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই পদ্ধতি প্রচলিত। প্রথম পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে বোরো ধানের চারার বয়স ৫০ দিনের বেশি হলে প্রতি হেক্টরে প্রতিদিন প্রায় ৬০ কেজি করে ফলন কমে। সেই হিসাবে পুরো এলাকায় মোট উৎপাদনের ক্ষতির পরিমাণ সহজেই অনুমান করা যায়।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্তপ্রবণ জেলাগুলোতে বিনা চাষে গম, মুগ ও সরিষা উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন। অস্ট্রেলিয়ার এসিআইএআরের অর্থায়নে এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার তত্ত্বাবধানে ড. নিয়োগীর নেতৃত্বে বাগেরহাট জেলায় সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, আমন ধানের জমিতে রিলে পদ্ধতিতে বিনা চাষে সরিষা আবাদ লাভজনক।

এই গবেষণায় আরো দেখা গেছে, জমিতে ফসল থাকলে গাছের ছায়ার কারণে মাটির পানি বাষ্পীভবনের হার কমে। ফলে অনাবাদি জমির তুলনায় মাটির লবণাক্ততা প্রায় ৪ ডিএস/মিটার পর্যন্ত কম থাকে। লবণাক্ত জমিতে বিনা চাষে ফসল উৎপাদনের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এর অর্থ হলো, রবি মৌসুমে ধান ছাড়া অন্যান্য দানাদার ফসল ও বিশেষ করে পত্রবহুল সবজি বিনা চাষেই উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বোরো ধান আবাদ প্রসঙ্গে আরো দেখা যায়, বোরো ধান কাটার পর অনেক জমি রোপা আমনের জন্য দীর্ঘ সময় পতিত থাকে। কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে রোপা আউশ চাষ হলেও তা খুবই কম। এই অবস্থায় আগাম বোরো ধান চাষ করে তা কাটার পর আগের মতো বৃষ্টিনির্ভর আউশ ও আমন একসঙ্গে বোনা যেতে পারে। এতে আউশ আগে পরিপক্ব হবে এবং তা কেটে নেওয়ার পর আমনগাছ রেখে দেওয়া যাবে, যা পরে পূর্ণাঙ্গ ফসলে পরিণত হবে। ফলে জমি পতিত থাকবে না। উফশী ধান প্রবর্তনের আগে এই পদ্ধতিই প্রচলিত ছিল। ভবিষ্যতে সেচনির্ভর বোরো চাষ ব্যাহত হলে এই পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, অর্থাৎ বোরো মৌসুমে বিকল্প ফসল চাষের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আখ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হলেও এটি সাধারণত এককভাবে চাষ করা হয়। যদিও আখের সঙ্গে সাথি ফসল চাষের প্রযুক্তি অনেক আগেই উদ্ভাবিত হয়েছে, তবু দীর্ঘ সময় জমি দখল করে রাখার কারণে এবং ধানের মতো প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদিত না হওয়ায় কৃষকরা একক আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে আখের আবাদ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ সুগারক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউট আখের জমিতে বোরো ও আউশ ধানকে সাথি ফসল হিসেবে চাষের একটি কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এতে আখের ফলন কমেনি, বরং একই জমি থেকে ধান উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়েছে। সাধারণত আখের জমিতে সেচ দেওয়া হয় না, কিন্তু বোরো ধানের জন্য এডব্লিউডি পদ্ধতিতে সেচ দেওয়ায় আখের ফলনও স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এই প্রযুক্তি আখ চাষিদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

একইভাবে তুঁতগাছের জমিতে অন্য ফসল চাষের সম্ভাবনা নিয়েও আগে তেমন ধারণা ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ সেরিকালচার রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, তুঁতগাছের সারির দূরত্ব সমন্বয় করে ফাঁকা জায়গায় পেঁয়াজ, রসুন, আলু, ডাল, তৈলবীজ, মিষ্টিকুমড়া ও অন্যান্য সবজি চাষ করে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশে কৃষি গবেষণার একটি প্রচলিত ধারা হলো, নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের আগে ফসল কর্তন ও পর্যালোচনা সভায় বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে বাস্তবে সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তাদের পক্ষে পুরো সময় উপস্থিত থাকা সম্ভব হয় না। ফলে গবেষণার ফলাফল মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বা অঙ্গীকার অনেক সময়ই পাওয়া যায় না। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় ও ধারাবাহিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষণার শুরু থেকেই প্রতিটি ধাপে তৈলবীজ, ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খামার ও সংস্থাগুলোকে, বিশেষ করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে তাঁরা প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করবেন এবং মাঠ পর্যায়ে তা প্রয়োগে আগ্রহী হবেন।

সব শেষে বলা যায়, বাংলাদেশের কৃষিতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে তা উন্নত প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে রূপান্তর করা অপরিহার্য। একই জমিতে বহুমুখী ফসল উৎপাদন, বিনা চাষে আবাদ, মিশ্রচাষ ও সাথি ফসলের সমন্বিত প্রয়োগ শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, বরং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার, খরচ হ্রাস এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পাশাপাশি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এবং কৃষকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও জ্ঞান বিনিময় নিশ্চিত করা না গেলে এসব সম্ভাবনাময় প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব নয়। তাই মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সময়োপযোগী প্রযুক্তি বিস্তার এবং স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণই হতে পারে কৃষির টেকসই অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। এর মাধ্যমে পতিত জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ কৃষিকে আরো সহনশীল ও লাভজনক করে তোলা সম্ভব।

লেখক : ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস

সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

বুড়িগঙ্গার কান্না, সুমিদার হাসি : দুই নদীর দুই বাস্তবতা

মো. রায়হান

বুড়িগঙ্গার কান্না, সুমিদার হাসি : দুই নদীর দুই বাস্তবতা

সূর্য ওঠার আগেই জাপানের টোকিওর অনেক ফুটপাত এলাকার লোকজন ঝাড়ু দেয় স্বেচ্ছায়, বিনা পারিশ্রমিকে। বাড়ির বর্জ্য নির্দিষ্ট রঙের ব্যাগে আলাদা করে রাখা এখানে সামাজিক শিষ্টাচারের অংশ। নদীতে ময়লা ফেলা তো দূরের কথা, রাস্তায় থুতু ফেলাটাও এখানে চরম লজ্জার। জাপানে অধ্যয়নরত একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে এই দৃশ্যগুলো প্রতিদিন আমাকে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়, আমাদের দেশে কেন এটি সম্ভব হচ্ছে না?

বিশ্বে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের গ্রাউন্ডসওয়েল প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা আমাদের কৃষি জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করে দিতে পারে। তাপপ্রবাহ, অসময়ের বন্যা, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং ঘূর্ণিঝড়ের ক্রমবর্ধমান তীব্রতা এখন আর কোনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি আজকের রূঢ় বাস্তবতা। অথচ এই সংকট মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

জাপান ১৯৯৭ সালে কিয়েটো প্রটোকলের সূতিকাগার হয়েছিল। কারণ দেশটি পরিবেশ সংকটকে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে জাপান সরকার গ্রিন ট্রান্সফরমেশন পলিসির মাধ্যমে হাইড্রোজেন জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ করছে।

তবে জাপানের সাফল্যের মূল রহস্য সরকারের চেয়েও বেশি নাগরিকের মানসিকতায়। মোত্তাইনাই অর্থাৎ অপচয় না করার দর্শন, যা জাপানি সংস্কৃতির শিরায় মিশে আছে। টোকিওর সুমিদা নদী একসময় মারাত্মক দূষিত ছিল। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে নীতিগত দৃঢ়তা ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে আজ তা স্বচ্ছ ও প্রাণময়।

বিপরীতে, ঢাকার বায়ুমান সূচক বিশ্বের মধ্যে প্রায়ই শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় থাকে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালুসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলো আজ প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ হলেও তা এখনো আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের (ইআইএ) চেয়ে অর্থনৈতিক মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নাগরিক সচেতনতার অভাবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিগুলোও মুখ থুবড়ে পড়ছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে। বাজেটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রায় দুই হাজার ২৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ।

এ ছাড়া বাজেটে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক গাড়ির (ইভি) ওপর করভার কমানো হয়েছে। ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভি আমদানিতে মোট শুল্ক ৯৩ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব অত্যন্ত সময়োপযোগী। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়কর ছাড় এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবটি প্রশংসনীয়।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং অন্যান্য গবেষণা সংস্থার মতে, আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বরাদ্দের প্রায় ৭৯ শতাংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি বা কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের দখলে, যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করা। কিন্তু আইইইএফের হিসাব অনুযায়ী, এই লক্ষ্য পূরণে বার্ষিক যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, বর্তমান বাজেটে তার প্রতিফলন সামান্যই।

জাপানি মডেল থেকে শিক্ষা : ১. শিক্ষা ও আচরণগত পরিবর্তন : জাপানে যেমন শৈশব থেকে পরিবেশসচেতনতা শেখানো হয়, বাংলাদেশেও প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বর্জ্য পৃথককরণ এবং প্রকৃতি রক্ষার ব্যাবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা দরকার।

২. জ্বালানিনীতির আমূল পরিবর্তন : জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি কমিয়ে সেই অর্থ সরাসরি সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের ওপর থেকে সব ধরনের অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা জরুরি।

৩. আইনের কঠোর প্রয়োগ ও কার্বন ট্যাক্স : শুধু বাজেট বরাদ্দ দিলেই হবে না, নদী-খাল দখলকারী এবং দূষণকারী ব্যক্তি-শিল্পের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে। জাপানের মতো বাংলাদেশেও পলিউটার পেজ নীতি কার্যকর করে দূষণকারীদের ওপর উচ্চহারে জরিমানা করতে হবে।

৪. জলবায়ু বাজেটের স্বচ্ছতা : প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার জলবায়ু সংবেদনশীল বরাদ্দের কথা বলা হলেও সেই অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, তার সঠিক ট্যাগিং ও জনসমক্ষে নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করা প্রয়োজন।

৫. নগর পরিকল্পনায় পরিবেশকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে খাল, জলাশয়, উন্মুক্ত স্থান এবং সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার বাধ্যতামূলক অংশ করতে হবে।

টোকিওর সুমিদা নদীর পারে বসে যখন স্বচ্ছ জলে চেরি ফুলের প্রতিচ্ছবি দেখি, তখন বুড়িগঙ্গার কথা মনে পড়ে। যে নদী কয়েক শতক ধরে ঢাকার প্রাণ ছিল, আজ তা মৃতপ্রায়। দুটি দেশ, দুটি বাস্তবতা। পার্থক্যটা শুধু সম্পদের নয়, বরং শৃঙ্খলা, মানসিকতা ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের।

জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জন্য অস্তিত্বের লড়াই। জাপান তার পরিবেশ ঠিক করতে কয়েক দশক সময় পেয়েছে; আমাদের হাতে সেই বিলাসিতার সময় নেই। আমাদের বদ্বীপকে বাঁচাতে হলে আজই আমাদের জাপানিজ ডিসিপ্লিন আর বাংলাদেশি দেশপ্রেমের সমন্বয় ঘটাতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন স্নাতকোত্তর স্কুল

সুজুকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

বাণিজ্যিকীকরণের হাওয়ায় নীতি-নৈতিকতা হারিয়েছে শিক্ষা | কালের কণ্ঠ