kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন বনাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

মোহাম্মদ নূরুজ্জামান

১৮ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন বনাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ১৯৯২’ মোতাবেক বাংলাদেশে ১৯৯২ সাল থেকে বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। তৎপরবর্তীতে আইনটি ১৯৯৮ সালে কিছুটা সংশোধন করা হয়, যা ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ১৯৯২ অ্যান্ড ইটস অ্যামেন্ডমেন্ট ১৯৯৮’ নামে পরিচিত। আইনটি সর্বশেষ সমন্বিত আকারে গেজেটভুক্ত হয় ২০১০ সালের ১৮ জুলাই, ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ২০১০’ নামে।

অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমে বেসরকারি কিছু ইনস্টিটিউট ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন (সিবিএইচই) শুরু করে। তারা সে সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন গ্রহণের চেষ্টা করছিল; কিন্তু তখন এসংক্রান্ত কোনো আইন ছিল না, এমনকি সমস্যাটি সমাধানের জন্য মন্ত্রণালয়ে কোনো ডেস্ক পর্যন্ত ছিল না বা এর উপযোগিতাও তৈরি হয়নি। এসব ইনস্টিটিউটের উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উদ্যোগে ইউজিসি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কয়েক বছরব্যাপী দফায় দফায় বৈঠক, সংলাপ, সেমিনার ও অন্যান্য উদ্যোগের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিবিএইচইর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয় এবং ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ২০১০’ আইনটিতে অনুমোদন নিয়ে সিবিএইচই পরিচালনার বিধানটি সংযুক্ত করা হয়। এই আইনের ৩৯ (২) বিধান অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিল একটি প্রবিধান প্রণয়ন করে ও ইউজিসি সিবিএইচই পরিচালনায় আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিভুক্তি গ্রহণের আবেদনের আহবান  জানিয়ে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিকে নোটিশ প্রকাশ করে। যত দূর জানা যায়, তখন থেকে এখন অবধি সাকল্যে ১৪টি আবেদন জমা পড়েছে। একই প্রবিধান অনুযায়ী ইউজিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মহোদয়ের নেতৃত্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল সিবিএইচই প্রভাইডারদের সাতটি বৈদেশিক ক্যাম্পাস (ছয়টি যুক্তরাজ্যে ও একটি অস্ট্রেলিয়া) পরিদর্শন করেন। এরই মধ্যে একটি স্টাডি সেন্টারকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যাদের সিবিএইচই পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। যারা সিবিএইচই পরিচালনায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ, তাদের আবেদন এখনো ঝুলে রয়েছে। অথচ সব আইন ও প্রবিধান মেনে এবং সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই তারা আবেদন করেছে। তাদের অনুমোদন পাওয়ার সব যোগ্যতা ও অধিকার রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা সিবিএইচই ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টারের অনুমোদনসংক্রান্তদের যৌক্তিক মতামত তুলে ধরেছে, যা ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ২০১০’-এর সঙ্গেও খুবই সংগতিপূর্ণ।

এমন পরিস্থিতিতে সমাধান কী? এর সমাধান খুঁজতে হলে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা আলোকপাত করা যাক।

দৃশ্যপট : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাত্রা শুরুর পর থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে প্রায় তিন দশক অতিক্রম করেছে। এখন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটির অস্তিত্ব একপ্রকার দৃশ্যমান বাস্তবতা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবশ্যই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকল্প নয়, বরং তারা স্বীয় শক্তি নিয়েই দাঁড়িয়ে গেছে। শুরুর দিকে শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেন। তবে সেই দৃশ্য এখন কিছুটা হলেও পাল্টে গেছে। এখন বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার গুণগত মানে এতটাই উতরে গেছে যে শিক্ষার্থীরা কোনো বিকল্প না খুঁজে সরাসরি সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছেন। যেসব শিক্ষার্থী দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যেতেন তাঁদেরই বেশির ভাগ এখন দেশেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমেছে।

কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে অসাধারণ কাজ করছে। অথচ একসময় গবেষণা না করার জন্য এদের অভিযুক্ত করা হতো। ক্রমবর্ধমান শিক্ষার্থী, শিক্ষার্থীদের চাকরিপ্রাপ্তি, শিক্ষাবৃত্তি, সহশিক্ষা কার্যক্রম ইত্যাদি ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্জন খুবই প্রশংসনীয়। কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে পিএইচডি প্রগ্রাম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পিএইচডি কিংবা গবেষণা ডিগ্রি পরিচালনা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক মান অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।

অন্যদিকে কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে না পেরে নানা সমস্যা মোকাবেলা করছে এবং শিক্ষার গুণগত মান অর্জন করতে পারছে না। তারা ভবন ভাড়া, বেতন, গবেষণা তহবিল, স্থায়ী ক্যাম্পাস উন্নয়ন ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করতে ভীষণ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এ ছাড়া অন্য প্রচুর বাধা আছে (যেমন—নতুন প্রগ্রাম অনুমোদন নেওয়া, ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি)। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু সরকারি অনুদান নেই, সেহেতু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও তাদের টিউশন ফির ওপরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাসটেইনেবিলিটি নির্ভর করে।

দৃশ্যপট : বেসরকারি সিবিএইচই প্রভাইডার্স

১৯৮৯ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইন বিষয়ে দূরশিক্ষণ ডিপ্লোমা প্রগ্রাম এবং ১৯৯০ সালে যুক্তরাজ্যেও এনসিসি এডুকেশনের অধীনে ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইন ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইটি) প্রগ্রাম চালু হয়। এরপর বেশ কিছু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের বেশ কিছু বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইন, আইটি ও ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে অনার্স প্রগ্রাম চালু করেন। প্রতিবছর কয়েক হাজার গ্র্যাজুয়েট এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সফলতার সঙ্গে পাস করে বের হচ্ছেন এবং তাঁরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। দূরশিক্ষণের মাধ্যমে গ্র্যাজুয়েট হওয়া এসব শিক্ষার্থীর সাফল্য উল্লেখযোগ্য। বেশির ভাগ গ্র্যাজুয়েট ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট সনদ অর্জন করেছেন। এসব ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাংলাদেশে চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণ করে ব্রিটিশ কাউন্সিল। সিবিএইচই পরিচালনা করে এমন সব প্রতিষ্ঠান অনেকবার ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং আবেদন জানিয়েছে, কিন্তু কোনো অনুমোদন মেলেনি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, সম্ভাবনাময় সিবিএইচই সেক্টর নিয়ে কাজ করার মতো কোনো ডেস্ক পর্যন্ত নেই।

যাই হোক, নানা বৈঠক, সংলাপ, সেমিনার ইত্যাদির পর শেষমেশ ইউজিসি ও মন্ত্রণালয় বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ২০১০’ প্রণয়ন করে এবং এই আইনের আলোকে ২০১৪ সালে একটি প্রবিধান তৈরি করে, যার ৪(৩)-ঝ ধারা অনুসারে বিদ্যমান সিবিএইচই প্রভাইডারদের অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয় রয়েছে।

অন্যদিকে করোনা মহামারির কারণে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বৈশ্বিক পরিসরে অনলাইন শিক্ষা এক নতুন বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি চলতে থাকবে এবং করোনার পরও আমাদের নতুন স্বাভাবিকতা হিসেবে অনলাইনকে মেনে নিতে হবে। আমরা মনে করছি না যে অনলাইন শিক্ষা ক্লাসরুম শিক্ষার বিকল্প হয়ে উঠবে। তবে দুই মাধ্যমের সংমিশ্রণে একটি ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’ বা ‘হাইব্রিড মডেল’ চালু থাকবে। ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশনের (সিবিএইচই) সঙ্গে এ ধরনের শিক্ষার মিল রয়েছে। আমরা এখনই যদি এই নতুন স্বাভাবিকতাকে আত্মস্থ করতে না পারি, তবে বিশ্বায়নের এই যুগে জাতি হিসেবে নিঃসন্দেহে পিছিয়ে পড়ব।

সিবিএইচই এবং এর ইউনেসকো সংজ্ঞা

 ইউনেসকোর সংজ্ঞা অনুযায়ী ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশন হচ্ছে এমন এক ধরনের শিক্ষা, যেখানে ছাত্র, শিক্ষক, প্রগ্রাম, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি জাতীয় সীমা অতিক্রম করে থাকে। ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশনকে পাবলিক, প্রাইভেট এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। মুখোমুখি শিক্ষার সম্প্রসারণ হিসেবে (বিদেশে ভ্রমণকারী শিক্ষার্থী এবং বিদেশি ক্যাম্পাসে পড়া শিক্ষার্থী) দূরশিক্ষণকে (বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে) গ্রহণ করা যেতে পারে।

ইউনেসকোর সনদ স্বাক্ষরিত সদস্যভুক্ত দেশ হিসেবে এবং সিবিএইচইর পক্ষে যেহেতু উচ্চ আদালতের রায় রয়েছে, সেহেতু ক্রস বর্ডার হায়ার এডুকেশনের অনুমোদন দেওয়া থেকে পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি) বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ এবং সিবিএইচই প্রবিধান পরস্পর সাংঘর্ষিক, সেটাও অগ্রহণযোগ্য নয়।

প্রস্তাবিত সমাধান

‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ২০১০’ আইনটির শিরোনামই সাধারণত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে নির্দেশ করে। অথচ সিবিএইচই বিদেশি প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দেশের ছোটখাটো ইনস্টিটিউটগুলোর সম্পৃক্ততা নির্দেশ করে, যাদের ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ২০১০’-এর অনেক কিছুই মানার বাধ্যবাধকতা নেই। তদুপরি আইন ও প্রবিধানের সঙ্গেও কিছু দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি এরই মধ্যে স্পষ্ট করেছে।

এহেন পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (আগ্রহী) অধীনে সিবিএইচই ইনস্টিটিউট অনুমোদন প্রদানই হতে পারে এই সমাস্যার যৌক্তিক সমাধান। এ জন্য সিবিএইচই প্রবিধানের সামান্য সংশোধন করতে হবে। এ ব্যবস্থায় বিদ্যমান সিবিএইচই প্রভাইডার্স বা নতুন সিবিএইচই উদ্যোক্তারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সিবিএইচই ইনস্টিটিউট স্থাপন ও পরিচালনা করবেন। এসব ইনস্টিটিউট ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ২০১০’ পরিপূর্ণ আইন ও বিধি মেনে চলবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সামনে সিবিএইচই ছাড়াও ভিন্ন কিছু বাতায়ন (যেমন—জয়েন্ট ডিগ্রি, ভেলিডেটেড ডিগ্রি, ফ্র্যাঞ্চাইজ প্রগ্রাম, এক্সচেঞ্জ প্রগ্রাম) উন্মুক্ত হবে। এই বিধি ও প্রবিধি অনুযায়ী বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন বিদেশে নিজেদের শাখা ক্যাম্পাসও খুলতে পারবে, সে ব্যবস্থা রাখা বাঞ্ছনীয় মনে করি।

লেখক : গ্রুপ সিইও, ড্যাফোডিল ফ্যামিলি