চীনা জাতি দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং চীনা সভ্যতা অত্যন্ত গৌরবময়। মানুষের সামগ্রিক বিকাশ চীনা শৈলীর আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীনা শৈলীর আধুনিকায়নের তত্ত্ব ও অনুশীলন মানব উন্নয়নের ধারণাকে আরো বিস্তৃত করেছে এবং ক্রমাগত তা চীনা শৈলীর আধুনিকায়নের সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় বাস্তবে রূপ দিয়ে চলেছে। এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া। মানুষ যখন বস্তুজগতের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক জগৎ ও সামগ্রিক বিকাশের প্রতিও তাদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। এই ধারণাটিকে আরো স্পষ্ট করে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে চীনা আধুনিকায়ন হলো এমন একটি আধুনিকায়ন, যা বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সভ্যতার রূপকে একীভূত করে। এটি এমন একটি আধুনিকায়ন, যা সামগ্রিক বস্তুগত সমৃদ্ধি ও ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশকে একসূত্রে গেঁথে তোলে।
চীনা ধাঁচের আধুনিকায়ন হলো বিশাল জনসংখ্যার একটি পরিপূর্ণ আধুনিকায়ন, যেখানে সব মানুষ সচ্ছল, বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সভ্যতা একই গতিতে এগিয়ে চলে, মানুষ ও প্রকৃতি সহাবস্থান করে এবং শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথ অনুসরণ করা হয়।
আধুনিকায়নের পথে চীনের যাত্রা কার্যকর নেতৃত্ব, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং অগ্রগতির প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতির প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিস্তৃত ইতিহাস, বিশাল ভূখণ্ড এবং বিপুল জনসংখ্যার দেশ চীন গত কয়েক দশকে প্রচলিত উন্নয়নের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ঐতিহাসিক জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক উদ্ভাবনকে একীভূত করে চীন এমন একটি অনন্য পথ তৈরি করেছে, যা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই মডেল কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে এবং চীনকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি ও টেকসই উন্নয়নের আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শিল্প বিপ্লব ও ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণে চিহ্নিত পশ্চিমা উন্নয়নের পথের বিপরীতে চীনের পদ্ধতি তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সমাজতান্ত্রিক নীতি ও বৈশ্বিকায়নের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সম্পৃক্ততার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। এই সামগ্রিক ও বহুমাত্রিক পদ্ধতি অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত দিককে অন্তর্ভুক্ত করে, যা বৈশ্বিক পরিসরে একে স্বতন্ত্র করে তোলে।
এই বিশিষ্ট পথের একটি উল্লেখযোগ্য ফলাফল হলো সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি, যার মাধ্যমে চীন পরিকল্পিত অর্থনীতি থেকে সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই পরিবর্তন শক্তিশালী উৎপাদন খাতের বিকাশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রসার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব করেছে। এর ফলে বর্তমানে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে এবং বৈশ্বিক শিল্প শৃঙ্খলে একটি অপরিহার্য অবস্থান অর্জন করেছে। বহির্মুখী কৌশলের আরো প্রমাণ হিসেবে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ এর রুট বরাবর অবস্থিত দেশগুলোর মধ্যে সমষ্টিগত উন্নয়ন ও পারস্পরিক সমৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ তৈরি করছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি চীন সামাজিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। ব্যাপক দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে, যা মানব ইতিহাসে দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে একটি অসাধারণ মাইলফলক। একই সঙ্গে জনগণের জীবনমান ও সার্বিক কল্যাণ বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত, যা চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তিমত্তার ওপর জোর দেয়। এই ব্যবস্থা দক্ষতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে সক্ষম, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে পারে এবং উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো উন্নয়ন ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে পারে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সহায়তা করার পাশাপাশি চীন তার উত্কৃষ্ট ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ও প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেয় এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক অর্জনগুলো আত্মস্থ করে সাংস্কৃতিক উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে। সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস জোরদার করা, জাতির সাংস্কৃতিক নরম শক্তি বৃদ্ধি করা এবং আধুনিকায়নের জন্য শক্তিশালী আধ্যাত্মিক প্রেরণা জোগানো—এগুলো চীনের সাংস্কৃতিক নীতির মূল লক্ষ্য।
পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্নে চীন ‘স্বচ্ছ পানি ও সবুজ পাহাড় অমূল্য সম্পদ’—এই ধারণাটি সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছে। দেশটি সক্রিয়ভাবে সবুজ উন্নয়নের প্রচার করছে, পরিবেশগত শাসন ও সুরক্ষায় প্রচেষ্টা জোরদার করছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে একটি ইতিবাচক মিথস্ক্রিয়া স্থাপনের চেষ্টা করছে।
মানুষের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ অর্জনের জন্য একটি সুদৃঢ় বস্তুগত ভিত্তি অপরিহার্য। শক্ত বস্তুগত ভিত্তির নিশ্চয়তা ছাড়া সর্বাঙ্গীণ মানব উন্নয়ন নিছক একটি অর্থহীন স্লোগান মাত্র। মানুষের সামগ্রিক বিকাশের জন্য শুধু বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক সভ্যতার যৌথ উন্নয়নই নয়, এই দুটির সমন্বিত বিকাশও প্রয়োজন। শুধু এই দুটি সত্তার যৌথ প্রচার ও সমন্বিত বিকাশের মাধ্যমেই মানুষের সামগ্রিক বিকাশের পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব।
চীনের পদ্ধতি আধুনিকায়নের একটি স্বতন্ত্র পথ প্রদর্শন করে এবং গ্লোবাল সাউথের যেসব দেশ নিজস্ব উন্নয়নের মডেল খুঁজছে, তাদের জন্য একটি প্রাসঙ্গিক রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে।
লেখক : মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম, পিএইচডি, চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওভারসিজ এডুকেশনের (স্কুল অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস) সিনিয়র লেকচারার ও গবেষক এবং বাংলাদেশের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বেল্ট অ্যান্ড রোড রিসার্চ সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো
মোহাম্মদ শাকিল ভূইয়া, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক এবং চীনের শানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক



গত ১৮ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা শুরু করার লক্ষ্যে যে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছে, এর দফাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যুক্তরাষ্ট্র যে লক্ষ্য নিয়ে এই যুদ্ধ শুরু করেছিল, এর কোনোটিই তারা অর্জন করতে পারেনি। উপরন্তু এত বছর ধরে একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরান যেন পরম মুক্তির স্বাদ পেয়েছে! এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অন্তর্বর্তী সময়ের (৬০ দিন) জন্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে ইরান এখন অবাধে যুক্তরাষ্ট্রসহ সবার সঙ্গেই বাণিজ্য করার অধিকার ভোগ করবে। ইরানের পুনর্গঠনের জন্য শর্ত সাপেক্ষে ৩০ হাজার কোটি ডলার সহায়তার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো দায়িত্ব নেবে। উল্লেখ্য, এই অর্থের সংস্থান হবে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে, যাঁরা ইরানে তাঁদের ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন। এ ক্ষেত্রে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু বিনিয়োগকারী এরই মধ্যে আগ্রহ প্রদর্শন করেছেন বলে জানা গেছে। ইরান গ্যাস ও তেলের মজুদের দিক দিয়ে বিশ্বের মধ্যে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এত দিন ধরে নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকলেও তেল উৎপাদনে তারা তৃতীয় বৃহত্তম অবস্থান ধরে রেখেছে। তাদের উৎপাদিত তেলের শতকরা ৯০ ভাগের ক্রেতা হচ্ছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে থেকেও ইরান কৌশলে তেল বাণিজ্যের মাধ্যমে এত দিন ধরে তাদের অর্থনীতিকে ধরে রেখেছিল। এখন এই নিষেধাজ্ঞার আপাত অবসান এবং পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগ কার্যত দীর্ঘ মেয়াদে ইরানকে তার অর্থনৈতিক স্বার্থের নিশ্চয়তা দিতে পারে।
