‘ছেলের আবদার মিটাইতেই বাইকটা কিনে দিছিলাম, সেই আবদারই আজ আমার একমাত্র ছেলেকে চিরতরে কেড়ে নিল।’—একজন অসহায় বাবার এই আর্তনাদ বাংলাদেশের বেশির ভাগ পত্রিকায় গত ৩০ মে ২০২৬ প্রকাশিত হওয়া কলেজছাত্র আফতাব শাহরিয়ার মাহিরের মৃত্যুর পর উচ্চারিত হয়েছিল। ঈশ্বরগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাহির মাত্র চার মাস আগে তার বাবার কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল পেয়েছিল। বন্ধুদের মতো তারও একটি মোটরসাইকেল চাই। বাবা আপত্তি করেছিলেন, বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সন্তানের জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছিল। চার মাস পর সেই মোটরসাইকেলই হয়ে উঠেছিল তার জীবনের শেষযাত্রার বাহন।
মাহিরের মৃত্যুসহ এমন মৃত্যু নিছক একটি সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ নয়, এটি সমকালীন বাংলাদেশের এক গভীর সামাজিক সংকটের প্রতীক। এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে তরুণদের কাছে মোটরসাইকেল শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, বরং পরিচয়, স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মপ্রদর্শনের একটি উপকরণে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা গত এক দশকে অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে। সহজ কিস্তি সুবিধা, তুলনামূলক কম দাম এবং দ্রুত চলাচলের সুবিধার কারণে মোটরসাইকেল এখন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিগত যানবাহনগুলোর একটি। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্ঘটনা, অক্ষমতা এবং মৃত্যুর সংখ্যা। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের একটি বড় অংশ মোটরসাইকেল আরোহী। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে এক বছরে ছয় হাজার ৯২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ২৯৪ জন নিহত এবং ১২ হাজার ১৯ জন আহত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, নিহতদের মধ্যে দুই হাজার ৬০৯ জনই মোটরসাইকেল আরোহী, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৬ শতাংশ। আরো তাৎপর্যপূর্ণ হলো, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ, যা অন্য যেকোনো যানবাহনের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে মোটরসাইকেলচালকদের ঝুঁকি অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীদের তুলনায় অনেক বেশি।
এই বাস্তবতা আমি ব্যক্তিগতভাবেও প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করি। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় বসবাস করি। হরহামেশাই সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই সড়কে মোটরসাইকেল নিয়ে তরুণদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা চলে। কখনো দুটি, কখনো তিন বা চারটি মোটরসাইকেল পাশাপাশি ছুটতে দেখা যায়। অনেক সময় বিকট শব্দ শুনেই বোঝা যায় যে তারা গতি বাড়িয়ে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এই দৃশ্য শুধু বিরক্তিকর নয়, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
প্রশ্ন হলো, কেন তরুণদের মধ্যে এই বেপরোয়া মোটরসাইকেল সংস্কৃতি গড়ে উঠছে? এর একটি বড় কারণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোটরসাইকেল ঘিরে অসংখ্য ভিডিও, রিলস এবং কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে, যেখানে গতি ও ঝুঁকিকে অনেক সময় বীরত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তব জীবনের ঝুঁকি সেখানে অনুপস্থিত থাকে। তরুণরা দেখতে পায় প্রশংসা, জনপ্রিয়তা ও উত্তেজনা, কিন্তু দেখতে পায় না হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার কিংবা শোকাহত পরিবারের কান্না। দ্বিতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলকে পুরুষত্ব, আধুনিকতা কিংবা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কারো মোটরসাইকেল থাকলে অন্যদের মধ্যেও সেটি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। মাহিরের ঘটনাও সেই সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগ ও নিরাপত্তা সংস্কৃতির ঘাটতি রয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া চালানো, হেলমেট ব্যবহার না করা, অতিরিক্ত গতি কিংবা ট্রাফিক আইন অমান্য করা—এসব আচরণ অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের মৃত্যু ঘটায় না; এটি একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং অনেক সময় একটি সমাজের সম্ভাবনাকেও ধ্বংস করে দেয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, মোটরসাইকেল চালনার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তরুণদের বুঝতে হবে যে দক্ষ চালক হওয়া মানে দ্রুত চালানো নয়, বরং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দায়িত্বশীল বার্তা প্রচার করতে হবে। বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্টকে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপনের পরিবর্তে নিরাপদ চালনাকে সামাজিক মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। চতুর্থত, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, অভিভাবকদেরও কঠিন কিন্তু দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা মানে সব আবদার পূরণ করা নয়। অনেক সময় ‘না’ বলতে পারাও ভালোবাসারই অংশ। মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার আগে সন্তানের প্রশিক্ষণ, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপদ চালনার মানসিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
কলেজ শিক্ষার্থী মাহির আর ফিরে আসবে না, কিন্তু তার মৃত্যুর ঘটনা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকতে পারে। আমরা যদি এই বার্তাটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হই, তাহলে হয়তো আগামীকাল আরেকজন মাহির, আরেকটি পরিবার এবং আরেকটি স্বপ্ন একইভাবে হারিয়ে যাবে। গতি মানুষের জীবনকে সহজ করে, কিন্তু বেপরোয়া গতি জীবন কেড়ে নেয়। তাই মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রাখার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে, বেপরোয়া বাইক চালিয়ে কয়েক মিনিট আগে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে নিরাপদে ধীরস্থিরভাবে জীবিত পৌঁছানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



আশার বাণী হলো, তথ্য-প্রযুক্তি খাতে তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার চায় তরুণরা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির নেতৃত্ব দেবে। প্রস্তাবিত বাজেটে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সরাসরি বরাদ্দ এবং স্টার্টআপ তহবিল মিলিয়ে দেশের পাঁচ কোটি তরুণ বা যুবকের ভাগে মাথাপিছু বরাদ্দ পড়ে প্রায় ৬৫৭ টাকা। তবে শিক্ষা, কারিগরি ও আইটি খাতের মতো যুব সম্পৃক্ত পরোক্ষ খাতগুলোর হিসাব যুক্ত করলে এই মাথাপিছু বরাদ্দের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৮ হাজার টাকা। পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও যুব উন্নয়ন মিলিয়ে মোট এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। (কালের কণ্ঠ, ১৩ জুন ২০২৬)
বিশ্বকাপ মানে একটি পৃথিবী। একটি বল। অগণিত মানুষের প্রত্যাশা। মানুষের স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের মহাকাব্য। আনন্দ ও বেদনার সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী। খেলার মধ্যে মানুষ দেশকে খোঁজে। দেশের পরিচিতি জানে। ফুটবল খেলাটি তো বিশ্বের ৪০০ কোটিরও বেশি মানুষের হৃদয়ে অবস্থান করে, তা বিশ্বকাপ চার বছর পর পর না এলে বোঝা যায় না। বিশ্বকাপ তো ফুটবলের গৌরব মঞ্চ। সারা বছর দুনিয়াজুড়ে যে ক্লাব ফুটবল চলে এর সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের আবেগ ও আবেদনের কোনো মিল নেই। বিশ্বকাপ ফুটবলের ভূমিকা বহুবিধ। ফুটবল তার মোহজালের মাধ্যমে খেলাটিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে চলেছে। এবার তো তিন দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যৌথভাবে বিশ্বকাপের রঙিন উৎসব। ২১১টি দেশ থেকে ৪৮টি দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি এখন সবার সামনে। 
আগামী সেপ্টেম্বর থেকে প্রত্যাশিত সেই নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারপ্রধান তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, আগের মতো দলের প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনের সহায়তায় এই নির্বাচনে জয়ী হওয়া যাবে না। নির্বাচন কমিশনও আসন্ন এই নির্বাচনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে বলে আশাবাদী; যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু নির্বাচন হচ্ছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সেই পুরনো এবং প্রায় অকার্যকর কাঠামো বহাল রেখেই।