শিশু মানবসমাজের সবচেয়ে কোমল, নিষ্পাপ ও নিরাপত্তাহীন সদস্য। একটি শিশুর শৈশব নিরাপদ, আনন্দময় ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার কথা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমান সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, বলাৎকার, নির্যাতন কিংবা হত্যার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। কিছু ঘটনা জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়, কিন্তু অসংখ্য ঘটনা নীরবে চাপা পড়ে যায়। আড়ালে থাকা সেসব ঘটনা হয়তো আরো বেশি ভয়াবহ।
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত রামিসা হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন শিশু নির্যাতনের ঘটনা আমাদের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। একটি শিশুর ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। কারণ একটি শিশু আত্মরক্ষার সক্ষমতা রাখে না, সে তার ওপর সংঘটিত অপরাধের প্রকৃতি বুঝতে পারে না এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার শক্তিও রাখে না। ফলে শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন হলো ক্ষমতার নির্মম অপব্যবহার, যা সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, শিশু নির্যাতনকারী সব সময় সমাজের প্রান্তিক বা অপরিচিত মানুষ নয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত। বাইরে থেকে তাদের স্বাভাবিক, ভদ্র এবং ধার্মিক মনে হলেও আড়ালে তারা এমন সব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, যা কল্পনা করাও কঠিন। বহু মামলায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের ওপর নির্যাতন চলেছে, কিন্তু ভয়, লজ্জায় এবং সামাজিক চাপে বিষয়টি প্রকাশ পায়নি।
চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতায় এমন বহু মামলার তদন্ত হয়েছে, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা তত্ত্বাবধায়ক কোমলমতি শিশুদের ওপর অমানবিক যৌন নির্যাতন চালিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতনের ফলে শিশুদের শরীরে গুরুতর আঘাত সৃষ্টি হয়েছে। তারা শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে দিনের পর দিন নীরবে কষ্ট সহ্য করেছে। ভয়, লজ্জা ও হুমকির কারণে তারা কাউকে কিছু বলতে পারেনি। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে বা অভিভাবকরা বিষয়টি টের পেলে সত্য প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—কেন একজন মানুষ একটি অসহায় শিশুর ওপর এমন বর্বর নির্যাতন চালায়? আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞান এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বহু গবেষণা করেছে। গবেষণায় দেখা যায়, শিশু যৌন নির্যাতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। কিছু মানুষের মধ্যে শিশুদের প্রতি বিকৃত যৌন আকর্ষণ তৈরি হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এটি শুধু যৌন আকর্ষণের বিষয় নয়, বরং ক্ষমতা প্রদর্শন, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, সহিংসতা এবং আত্মসংযমের অভাবেরও বহিঃপ্রকাশ। কিছু অপরাধী শিশুর অসহায়ত্বকে ব্যবহার করে নিজের বিকৃত মানসিক তৃপ্তি অর্জন করে।
তবে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব ধরনের শিশু যৌন নির্যাতনকে শুধু মানসিক রোগ বলে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। কারণ বেশির ভাগ অপরাধী জানে যে সে অপরাধ করছে। সে জানে তার কাজ অনৈতিক, অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য। তার পরও সে অপরাধ করে। অর্থাৎ এখানে শুধু মানসিক সমস্যা নয়; নৈতিক অবক্ষয়, অপরাধপ্রবণতা, জবাবদিহির অভাব এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাও কাজ করে।
বিশ্বজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষতি তৈরি হয়। অনেক শিশু ভয়, উদ্বেগ, দুঃস্বপ্ন, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। তারা মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে না। অনেকের মধ্যে আত্মঘাতী চিন্তাও দেখা দেয়। কেউ কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও সেই মানসিক আঘাত থেকে পুরোপুরি বের হতে পারে না।
বিশেষ করে ছেলেশিশুদের ওপর সংঘটিত যৌন নির্যাতন নিয়ে সমাজে এক ধরনের নীরবতা বিদ্যমান। অনেক পরিবার বিষয়টি প্রকাশ করতে চায় না। সামাজিক লজ্জা ও ভুল ধারণার কারণে ছেলেদের নির্যাতনের ঘটনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আড়ালে থেকে যায়। ফলে ভুক্তভোগী শিশু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও মানসিক পুনর্বাসন থেকে বঞ্চিত হয়।
আমাদের সমাজে একটি বড় সমস্যা হলো শিশুদের কথা গুরুত্ব দিয়ে না শোনা। অনেক সময় শিশু কোনো অভিযোগ করলে তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাকে বলা হয়, ‘এসব কথা বোলো না’, ‘ভুল দেখেছ’, ‘ভুল বুঝেছ’ অথবা ‘চুপ থাকো’। এই মনোভাব অপরাধীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে। শিশুদের বিশ্বাস করা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া শিশু সুরক্ষার প্রথম ধাপ।
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শিশুদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অনেক অপরাধী শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। ধীরে ধীরে তারা শিশুর বিশ্বাস অর্জন করে এবং পরে শোষণের ফাঁদে ফেলে। তাই শিশু সুরক্ষার আলোচনায় ডিজিটাল নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশু যেন নির্ভয়ে তার অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে তার শরীর তার নিজের। কোন স্পর্শ নিরাপদ এবং কোন স্পর্শ অনিরাপদ, তা বয়স উপযোগী ভাষায় বোঝাতে হবে। কোনো ব্যক্তি তাকে অস্বস্তিকরভাবে স্পর্শ করলে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বস্ত বড়দের জানাতে হবে—এই শিক্ষা দিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও শিশু সুরক্ষা বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা, অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। একইভাবে আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এতিমখানা, হোস্টেল এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ, ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত বিচার অপরিহার্য। বিচার বিলম্বিত হলে ভুক্তভোগী পরিবার হতাশ হয় এবং সমাজে ভুল বার্তা যায়।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় নির্ধারিত হয় সেই সমাজ তার শিশুদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারে তার ওপর। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিশুদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর কান্না শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়, সেটি পুরো সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন ভবিষ্যতের একজন নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যায়। একটি স্বপ্ন ভেঙে যায়। তাই শিশু সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আজ সময় এসেছে শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করার। কোনো অজুহাত, কোনো সামাজিক মর্যাদা, কোনো ধর্মীয় পরিচয় কিংবা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব যেন অপরাধীর রক্ষাকবচ না হতে পারে। শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা মানবিক দায়িত্ব, নৈতিক কর্তব্য এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো শিশু ভয়ে কুঁকড়ে থাকবে না; যেখানে কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে নীরবে কাঁদবে না; যেখানে প্রতিটি শিশু নিরাপদে বেড়ে উঠবে, শিক্ষা গ্রহণ করবে, স্বপ্ন দেখবে এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে জীবন গড়ে তুলবে। কারণ শিশুদের রক্ষা করা মানেই ভবিষ্যেক রক্ষা করা। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্য সমাজ নির্মাণ করা।
লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা




বিশ্বকাপ মানে একটি পৃথিবী। একটি বল। অগণিত মানুষের প্রত্যাশা। মানুষের স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের মহাকাব্য। আনন্দ ও বেদনার সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী। খেলার মধ্যে মানুষ দেশকে খোঁজে। দেশের পরিচিতি জানে। ফুটবল খেলাটি তো বিশ্বের ৪০০ কোটিরও বেশি মানুষের হৃদয়ে অবস্থান করে, তা বিশ্বকাপ চার বছর পর পর না এলে বোঝা যায় না। বিশ্বকাপ তো ফুটবলের গৌরব মঞ্চ। সারা বছর দুনিয়াজুড়ে যে ক্লাব ফুটবল চলে এর সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের আবেগ ও আবেদনের কোনো মিল নেই। বিশ্বকাপ ফুটবলের ভূমিকা বহুবিধ। ফুটবল তার মোহজালের মাধ্যমে খেলাটিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে চলেছে। এবার তো তিন দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যৌথভাবে বিশ্বকাপের রঙিন উৎসব। ২১১টি দেশ থেকে ৪৮টি দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি এখন সবার সামনে। 
আগামী সেপ্টেম্বর থেকে প্রত্যাশিত সেই নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারপ্রধান তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, আগের মতো দলের প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনের সহায়তায় এই নির্বাচনে জয়ী হওয়া যাবে না। নির্বাচন কমিশনও আসন্ন এই নির্বাচনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে বলে আশাবাদী; যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু নির্বাচন হচ্ছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সেই পুরনো এবং প্রায় অকার্যকর কাঠামো বহাল রেখেই।