kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

জাগো সত্য সুন্দরের আবাহনে

কালিদাস ভক্ত

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জাগো সত্য সুন্দরের আবাহনে

দেবী দুর্গা যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে, দশ হাতের ৯টিতেই নিলেন অস্ত্র, এক হাতে নিলেন পদ্ম। এই যুদ্ধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সুন্দরের আবাহন। বৈষম্য-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা

 

নান্দনিক স্বপ্ন শুভ্রতার প্রতীক হয়ে শরৎকালে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এবার দুটি অমাবস্যা হওয়ায় আশ্বিন মলমাস বলে পূজা হচ্ছে কার্তিক মাসে। আমাদের প্রাণের দেবী মহামায়া এই মহাতিথিতে মর্তে অবতরণ করে করুণার আঁখি উন্মিলন করেছেন। তিনি সর্বশক্তিমান মাতৃরূপী দুর্গা। পৃথিবীতে যখন খুব খারাপ অবস্থা বিরাজ করে, অশুভ শক্তির কাছে শুভ শক্তি পরাস্ত, সমাজে বিরাজ করে চরম বিশৃঙ্খলা তখন দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের জন্য সব অশান্তি দূরীভূত করে দেবী মহামায়া শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

দেবী দুর্গার আবাহনের মধ্য দিয়ে ধরামাঝে নারীশক্তি জাগরিত হওয়ার বীজ বপিত হয়। দুর্গার রূপেই নারীকে কল্পনা করা হয়। তাঁর পূজার মাধ্যমে নারীর ভূমিকাকে আরো বড় করে দেখানো হয়েছে। দেবী দুর্গা সৃষ্টির প্রতীক, সমৃদ্ধির প্রতীক, সুরক্ষার প্রতীক। নারীও মাতৃরূপে সৃষ্টির প্রতীক, সন্তান জন্ম দিয়ে সন্তানের মুখে আহার তুলে দিয়ে, সন্তানকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন। মহামহিমাময় নারী জগত্সংসারে ভালোবাসা দিয়ে, প্রেরণা দিয়ে, শক্তি দিয়ে বিজয়ী করে পরিত্রাণ করছে। এই মাতৃসম নারীই চরম বঞ্চনার শিকার হচ্ছে।

ভারতবর্ষে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে শক্তির পূজা চলে আসছে। তবে বঙ্গদেশে এর প্রসার ও প্রচার সর্বাধিকভাবে পরিলক্ষিত হয়। গবেষকদের মতে, সম্রাট আকবরের সময়ে ষোড়শ শতকের শেষের দিকে বর্তমান রূপের শারদীয় দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়। বেদে দেবী দুর্গার উল্লেখ আছে। রামায়ণে রামচন্দ্র ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে দুর্গা দেবীর পূজার আয়োজন করেছিলেন এবং মহাভারতের ভীষ্ম পর্বে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধারম্ভের পূর্বে জয়ের জন্য দুর্গাপূজার উপদেশ দিয়েছিলেন। সর্বপ্রথমে বসন্তকালে বাসন্তী দুর্গাপূজা হতো। রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য বসন্তকালে দুর্গাপূজা করেছিলেন। তাঁদের পূজা করার পেছনের কাহিনি হলো—রাজা সুরথ রাজ্য হারিয়ে বনে বনে ঘুরছিলেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি এলেন মেধা নামে এক মহর্ষির আশ্রমে। অন্যদিকে সমাধি নামে এক বৈশ্য স্ত্রী ও সন্তানদের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। তিনিও ঘুরতে ঘুরতে আসেন মেধা মুনির আশ্রমে। আশ্রমে এসেও হারানো রাজ্যের জন্য রাজা সুরথের মনে মায়া কাজ করেছিল। আবার সমাধি বৈশ্যও তাঁর স্ত্রী-পুত্রদের ভুলতে পারছিলেন না। কেন এই অন্তরের আকর্ষণ! রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের দেখা হলো। দুজন দুজনের কাছে মনের কথা ব্যক্ত করলেন। তারপর গেলেন মহর্ষি মেধার কাছে। গিয়ে জানালেন নিজেদের অন্তরের কথা। মহর্ষি মেধা বললেন যে এর নাম মায়া। আর এ মায়া হচ্ছে মহামায়ার প্রভাব। তবে মহামায়া সন্তুষ্ট হলে তিনি কৃপা করেন এবং মুক্তি দান করেন। মহর্ষি মেধা মহামায়ার মহাত্ম্য রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের কাছে বর্ণনা করলে দেবীর কৃপায় তাঁদের জাগতিক ও মানসিক অশান্তি দূরীভূত হয়। মহামায়া দুর্গারূপে দুর্ধর্ষ অসুররাজ মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। অসুরদের অত্যাচার থেকে দেবগণ মুক্ত হলেন, ফিরে পেলেন তাঁদের প্রিয় স্বর্গ রাজ্য।

দেবী দুর্গা যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে, দশ হাতের ৯টিতেই নিলেন অস্ত্র, এক হাতে নিলেন পদ্ম। এই যুদ্ধে ধার্মিককে তিনি পদ্ম ফুলের আবেশে রক্ষা করেন এবং অধার্মিককে বিনাশ করেন। এই যুদ্ধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সুন্দরের আবাহন। বৈষম্য-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা। অসত্যের বিরুদ্ধে সত্য ও শান্তির প্রকাশ। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িকতার মেলবন্ধন। দেবী দুর্গা আমাদের শক্তি ও সাহস দান করেন, তাই তিনি অভয়া। তিনি দুর্গতি ও দুঃখ-কষ্ট থেকে পরিত্রাণ করেন, তাই দুর্গতিনাশিনী। তিনি শুভবার্তা নিয়ে হাজির হন, তাই শুভফলপ্রদায়িনী। যেকোনো অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবিধানের ক্ষেত্রে দুর্গা আমাদের প্রেরণা এবং নবচেতনার উৎস। আজকের এই দিনে হে! মাতা জাগো সত্য সুন্দরের আবাহনে।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা