kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

হস্তক্ষেপের অভ্যন্তরে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



হস্তক্ষেপের অভ্যন্তরে

মানুষের কাজের কী কোনো শেষ আছে? বেশির ভাগ কাজই করতে হয় হাত দিয়ে, মাথার কাজও হাতের সাহায্যেই নিষ্পন্ন হয় শেষ পর্যন্ত। অভিনয়ের বেলায়ও দেখা যায় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা মুখে যখন কথা বলেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে, তখন হাত নিয়ে কী করবেন তা নিয়ে ছোটখাটো একটা অস্বস্তিতে পড়েন। গত বছরের ঘটনা, চাঁদপুর এলাকার একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছেলেদের হাত ও পিঠের দ্বারা তৈরি ‘পদ্মা সেতু’র ওপর দিয়ে মহাসমারোহে জুতা পায়ে যে হেঁটে গেলেন, তাঁকেও দেখা গেছে দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন সানন্দে। হাতের অসংখ্য রকমের ব্যবহার। হাতাহাতি থেকে হাতজোড় করা পর্যন্ত সর্বত্র হাতের হস্তক্ষেপ। সৃষ্টিতে হাত, ধ্বংসেও হাত।

পা ধরে মাফ চাইতে গেলেও হাত লাগবে। নিউ ইয়র্ক প্রবাসী এক মেহনতি বাংলাদেশি ওই কাজটি করতে গিয়ে বেশ একটা বিপদে পড়েছিল। তার তাড়া ছিল। দ্রুত ছুটে পাতালরেলের গাড়িতে উঠার তাগিদে বেষ্টনী পার হওয়ার ঘোরাপথে না গিয়ে লাফ দিয়ে পার হতে গিয়ে বেচারা ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। পুলিশ তাকে নিয়ে গেছে আদালতে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ একটি নয়, দুটি। প্রথমটি বেষ্টনী ডিঙানোর; দ্বিতীয়টি পুলিশকে পা ধরে টান দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করার। দোভাষীর সাহায্যে আদালতকে সে বোঝাবার চেষ্টা করেছে যে তার তাড়া ছিল, তাই কেউ দেখছে না দেখে বেষ্টনীর বাধাটা ওভাবে অতিক্রম করার প্রয়াস নিয়েছে; এর জন্য সে ক্ষমা প্রার্থী। আর পুলিশকে প্রহার করা? প্রশ্নই উঠে না! সে সামান্য লোক, পুলিশ সাহেব ছয় ফুট লম্বা, তার সঙ্গে সে টক্কর দিতে যাবে এ-ও কী সম্ভব? সে যা করেছিল তা হলো, পা জড়িয়ে ধরে আর কখনো অমনটা করবে না বলে মাফ চাওয়ার চেষ্টা। আদালত তাকে কী শাস্তি দিয়েছেন জানা যায় না, প্রথম অপরাধটির জন্য জরিমানা করে এবং দ্বিতীয়টিকে অপরাধ বলে না ধরে অব্যাহতি দিয়েছেন এমনটাই আশা করা যায়।

কিন্তু ঢাকা শহরের বাসিন্দা সেই তরুণী বধূটি তো অব্যাহতি পায়নি। জানত যে তার শাস্তি হবে। কারণ তার অপরাধ ভয়াবহ; আইন বলি, নৈতিকতার বোধ বলি, মানবিক বিবেচনা বলি কোনো দিক দিয়েই তার কাজের কোনো ক্ষমা নেই। মেয়েটি জানত না তার জন্য বিকল্প কী ছিল। জিজ্ঞেস করলে কেউ দেখাতে পারত না ভিন্ন কোনো পথ। আর জিজ্ঞেস যে করবে এমন তো কেউ ছিলও না তার আশপাশে। নিরুপায় মেয়েটি ভেবেছে সে পালাবে এবং পালাবার একটি মাত্র পথই সে খোলা দেখতে পেয়েছে তার সামনে। পথটি অত্যন্ত ভয়ংকর, কিন্তু বেঁচে থাকাটা নিশ্চয়ই হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার চেয়েও ভয়ংকর। অবিশ্বাস্য একটি কাজ করেছে সে। বছর তিনেক আগে সব দৈনিক পত্রিকায়, সব ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এসেছে তার খবর। তার ছিল একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। একজনের বয়স পাঁচ, অন্যজনের তিন। ওই দুই সন্তানের একটিকে সে নিজ হাতে বঁটি দিয়ে জবাই করেছে, অন্যটিকে মেরেছে গলা টিপে। তারপর? তারপর যা করা সম্ভব ছিল সেটিই করেছে, টিনের চালের কড়িতে নিজেকে ঝুলিয়ে দিয়ে অবসান ঘটিয়েছে জীবনের সমুদয় যন্ত্রণার।

মৃত্যুর আগে নিজ হাতে সে একটি চিরকুট লিখে রেখে গেছে। সম্বোধন করেছে প্রথমে স্বামীকে, পরে নিজের মাকে। উত্তরবঙ্গের গ্রাম থেকে এসেছিল মেয়েটি, ছিল অল্পশিক্ষিত, তার লেখার ভাষায় এই উভয় সত্যেরই ছাপ রয়েছে। আর যা আছে তা হলো তার মর্মবেদনা। শান্ত, প্রায় জমাট বাঁধা এবং সে জন্য দুঃসহ রকমের মর্মস্পর্শী ওই চিঠি। স্বামী ও মাকে উদ্দেশ করে লিখেছে সে : ‘ছেলে-মেয়ে নিয়ে গেলাম। সবাই ভালো থেকো।’ তারপর বিশেষভাবে মাকে সম্বোধন করে লিখেছে, ‘মা, আমি দুই হাতে ওদের খাইয়েছি, তেল দিছি, আজ আমি সেই হাত দিয়ে মারলাম। আমাকে তোমরা মাফ করে দিয়ো। আমার কপালে এ ছিল। ওরা দুজন নিষ্পাপ।’

সন্তান দুটিকে হত্যা করার ঠিক পরে এবং নিজেকে হত্যা করার ঠিক আগে ঠাণ্ডা মাথায় সে এই চিঠিটি লিখেছে। এমন ঘটনার কথা গল্প-উপন্যাসে পেলেও পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানীতে, উন্নতি যেখানে হৈহৈ রৈরৈ করছে সেখানে এমন ঘটনা অবিশ্বাস্য ঠেকতে পারে। ঠেকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটা তো ঘটেছে; জীবন যে কখনো কখনো কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে, তাত্ত্বিক সেই সত্যটা বাস্তব বলে প্রমাণিত হয়ে গেছে। আমাদের সমাজে লেখক আছেন বিস্তর; কিন্তু কারো পক্ষে কী সম্ভব হবে এমনতর ঘটনার পেছনে যে ইতিহাস থাকে, কার্যকর থাকে যে অসহ্য যন্ত্রণা তাকে সামনে নিয়ে আসা? না, নেই। আমাদের মধ্যে কোনো দস্তয়েভস্কি নেই, তলস্তয় নেই, থাকলে এই যন্ত্রণার খবরের উপস্থাপনা আমাদের বিচলিত করত এবং এই দেশে সামাজিক বিপ্লব ত্বরান্বিত হতো।

তবু যা হোক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন ছিল, নইলে অতটুকুও জানতে পারতাম না, যতটুকু জেনেছি। সাংবাদিকরা চিরকুটটি উদ্ধার করেছেন। আমরা পড়লাম। মেয়েটি তার স্বামীর বিরুদ্ধে ওজস্বী কোনো অভিযোগ যে রেখে গেছে তা নয়। ছোট্ট করে শুধু লিখেছে, ‘শামীম, তোমার একটা ভুলের জন্য এত বড় ঘটনা। তুমি ভেবেছ আমি শুধু শুনব।’ সাংবাদিকরা একটু খোঁজাখুঁজিও করেছেন এবং এই মতো খবর পেয়েছেন যে স্বামীটি দ্বিবিধ আসক্তির প্রকোপে পড়েছিল, মাদকের ও পরনারীর। মেয়েটি ওসব কথা লিখে রেখে যায়নি। তার সময় কোথায়? দুটি সন্তান লাশ হয়ে সামনে পড়ে আছে, তার নিজের জন্য মৃত্যু অপেক্ষা করছে, ঘাড়ের ওপর হাত রেখে। অতিদ্রুত সম্পন্ন করতে হয়েছে লেখার কাজ। তবে ওই যে লিখেছে সে, ‘তুমি ভেবছ আমি শুধু শুনব’, তাতে আমরা আরো কিছু কথা শুনতে পাই বৈকি; সাংবাদিকরা যার খোঁজ দিয়েছেন। সেদিন সকালে শামীম অর্থাৎ ওই স্বামীটি অশ্লীল ভাষায় মেয়েটিকে গালাগাল করেছিল। আমরা অনুমান করতে পারি যে এ কাজ শুধু সেদিনই নয়, নিত্যদিনই সে করত। তবে সেদিন বোধ করি খানিকটা অধিক পরিমাণেই করা হয়েছিল। করার কারণও ছিল। সেদিন সকালে স্ত্রী তার স্বামীকে নাশতা খাবার জন্য বাসি ভাত সামনে ধরেছিল। বোঝাই যাচ্ছে এর চেয়ে ভালো কিছু ঘরে ছিল না। স্বামী রাগ করেছে, মুখে যা আসে বলেছে, স্ত্রীকে সন্তানসহ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছে। সব কিছু বলা শেষে নিজে ঘর ছেড়ে সে চলে গেছে। ঘরই আসলে, বাড়ি নয়; এক কামরার একটি আবাস তাদের, টিনের। বস্তি এলাকায়। স্বামীর জন্য অবশ্য যাওয়ার জায়গা ছিল। সে একটি সেলুনে কাজ করত, পত্রিকা লিখেছে কাজটি নরসুন্দরের। তা-ই হওয়ার কথা, সেলুনে একজন কর্মচারীর জন্য ওটিই তো সর্বোচ্চ পদ। তবে সেদিন সে সেলুনের কাজে যায়নি। গিয়েছিল অন্যত্র। গিয়েছিল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে; সেদিন সেখানে বিশাল এক সরকারি আয়োজন ছিল। সেদিনকার রোজগার জনসভায় যোগদানের বিনিময়ে তার হাতে এসে থাকবে। অন্য প্রাপ্তি তো ছিলই। সে প্রাপ্তিটা হচ্ছে অত বড় একটি রাজনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। ওই রকমের সংযোগ সাহস দেয়, প্রসারতা জোগায়, ক্ষমতার স্বাদ এনে দেয়। ওই জনসভায়ই ছিল সে, মেয়েটি যখন একের পর এক ওই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানোতে নিযুক্ত হয়।

কিন্তু মেয়েটি যাবে কোথায়? স্বামী তাকে ঘর ছেড়ে চলে যেতে বলেছে। বিশাল এই শহরে তার জন্য তো কোনো জায়গা নেই, ঠিকানা নেই কোনো। সঙ্গে তার দুটি সন্তান। দুটি নয়, আসলে তিনটিই—কেননা সংবাদে প্রকাশ সে অন্তঃসত্ত্বা ছিল, ওই খবরটি তার নিজের অজানা থাকার কথা নয়। না, যাওয়ার কোনো জায়গা খুঁজে পায়নি তরুণী বধূটি। তাই সেখানেই গেছে চলে, অসহায় মানুষ যেখানে যেতে বাধ্য হয়, পালিয়ে। একা যায়নি, ছেলে-মেয়ে দুটিকে ফেলে রেখে চলে যায়নি, সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। লিখেছে সে : ছেলে-মেয়ে নিয়ে গেলাম। লিখেছে : ‘ওরা দুজন নিষ্পাপ।’ নিজে সে নিষ্পাপ এমনটা কিন্তু বলেনি। তবে লিখেছে, ‘আমার কপালে ছিল।’ ওই কপালই যে তার পাপ, মর্মে মর্মে জানত সে। ওই জ্ঞানের পরিণতিই এই হত্যাকাণ্ড।

তা কপালটা তো তার ললাটে লেখা ছিল না, ছিল অভিশপ্ত একটি সমাজের দরিদ্র অবস্থা ও অবস্থানে তার জন্মগ্রহণে। জন্ম তাকে নিক্ষেপ করেছিল এক অন্ধকূপে। জীবিত অবস্থায় সেখান থেকে নিজেকে সে উদ্ধার করবে কী করে? একাকী? সাধ্য কী? পারেনি, না পেরে হত্যা করেছে নিজেকে এবং প্রাণপ্রিয় সন্তান দুটিকে।  নিজ হস্তে। যেন তার চরম ও চূড়ান্ত মুক্তি। আর কেউ-ই তো পারবে না তাকে জ্বালাতন করতে। তবে মেয়েটির ভেতর প্রতিবাদের একটি সুরও ছিল। চিঠিতে সে লিখেছে, ‘তুমি ভেবেছ আমি শুধু শুনব।’ নীরবে শুধু শুনতেই হবে, শুনেই যাবে, কিছু বলবে না, এমন অবস্থা মেনে নিতে চায়নি সে, নিজের কথা শোনাতেও চেয়েছে।

তার ওই সুরটি একটি স্বর হতে পারত, প্রচণ্ড একটি আওয়াজ হয়ে উঠতে পারত, পরিণত হতে পারত অন্ধকূপ ভেঙে ফেলার উদ্যোগ, যদি অনেকে থাকত তার সঙ্গে, একত্র হতো সবাই—যেমনটা হয়েছিল আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে; কিন্তু অন্ধকূপবাসীরা তো মুক্ত হয়নি। ওই মেয়েটি একা নয়, তার মতো অসংখ্য মানুষ আজ কূপবন্দি, ওপরের উন্নতি তাদের জন্য অন্য কিছু বয়ে আনেনি, ভেতরের বন্ধনকে আরো শক্ত করা ভিন্ন। তারই একটি প্রমাণ সে রেখে গেল। হাঁড়ির ওই একটি ভাত বাকি সব ভাতের খবর দিচ্ছে, অত্যন্ত বিশ্বস্ত উপায়ে। তার একাকী প্রতিবাদ কত দূরই বা যেতে পারে, মৃত্যুর বাইরে?

সবার জন্য মেয়েটি শুভ কামনা রেখে গেছে। লিখেছে, ‘সবাই ভালো থেকো।’ মৃত্যু যখন অপেক্ষা করছে, হাত রেখেছে ঘাড়ের ওপরে, তখন ওই রকমের একটা শুভ কামনা সহজ ব্যাপার নয়। তা কেউ কেউ ভালো থাকবে বৈকি, তবে তাদের সংখ্যা সুপ্রচুর নয়। বেশির ভাগই সুখে থাকবে না, শান্তিও পাবে না। তারা শুধু কাঁদবেই। তরুণী বধূটির আপনজন যারা ঘটনাটির ব্যাপারে তারা যেকোনো মামলা-মোকদ্দমা করবে, অন্তত অভিযোগ আনবে আত্মহত্যায় উসকানিদানের এমনটাও আশা করা যায় না। মেয়েটি গরিব ঘরের সন্তান। তার আপনজনরা থাকে উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকায়; তাদের সামর্থ্য নেই খরচপাতি জোগানোর। তা ছাড়া মামলা করে কী-ই বা পাবে তারা? মেয়েকে তো ফেরত পাবে না। মাঝখান থেকে বিপদ-আপদ বাড়বে, অবস্থা আরো খারাপ হবে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা