kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

মনের কোণে হীরে-মুক্তো

হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি সেক্টর রয়েছে প্রশাসনের সুনিয়ন্ত্রণে

ড. সা’দত হুসাইন

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি সেক্টর রয়েছে প্রশাসনের সুনিয়ন্ত্রণে

সংসদীয় গণতন্ত্রে যে দল সরকার গঠন করে, দেশের সামগ্রিক বিষয়ের দায়-দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায়। সামগ্রিক বলতে এখানে সব বিষয় এবং ‘সব কিছুকে’ বোঝানো হয়েছে। এ কথা ঠিক যে সব কিছুর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকে না। থাকার কথাও নয়, থাকা উচিতও হবে না। তবে সরকারের প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান নির্বাহী তাঁর মন্ত্রিসভা গঠন করে দেশের সব বিষয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় বণ্টন করে দেন। সব বিষয়ের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও প্রতিটি বিষয়ের জন্য একটি ‘রেফারেন্স’ ‘মন্ত্রণালয়’ থাকে। অর্থাৎ প্রতিটি বিষয়ে দেখাশোনার জন্য একটি এবং শুধু একটি মন্ত্রণালয় খুঁজে পাওয়া যাবে। একজন মন্ত্রী এর দায়িত্বে থাকবেন। যদি কোনো ব্যতিক্রমী বিষয়ে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় পাওয়া না যায়, তবে সে বিষয়ের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর ওপর বর্তায়। কিন্তু কোনো বিষয় সরকারের অধিক্ষেত্রের বাইরে থাকতে পারবে না। আদর্শ কার্যবণ্টন (Allocation of business)অনুসারে একই বিষয় দুই মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত হবে না। হলে কার্যবণ্টন আদেশ দ্রুত সংশোধন করে নিতে হবে।

দেশের কিছু সেক্টরে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে। যেমন জননিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, রাজস্ব আদায়, বাজেট প্রণয়ন, পররাষ্ট্রনীতি, ভর্তুকি প্রদান, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টন ইত্যাদি। আবার অনেক বিষয়ে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কিছু বিষয় দেশের জনগণ সম্পূর্ণরূপে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখার পক্ষপাতী। সরকারের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণও তারা ভয়ংকরভাবে অপছন্দ করে। যেমন মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন, মুক্তবাজারের লেন-দেন, কর পরিশোধের পর ব্যক্তির কাছে রক্ষিত নিজ সম্পদের ব্যবহার, বৈধ উপায়ে বাজার থেকে কেনা সামগ্রীর ভোগ-উপভোগ। যেসব বিষয়ে সাধারণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই এবং কোনোভাবে সরকারের হস্তক্ষেপ করার কথা নয়, সেসব ক্ষেত্রে যদি এমন কিছু ঘটে, যেখানে জনস্বার্থে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকারের দায়-দায়িত্ব এসে যায়, তখন সরকার নির্লিপ্ত, নির্বিকার থাকতে পারে না। বাধ্য হয়ে সরকারকে কিছু দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়, সক্রিয় হতে হয়। যেমন—পারিবারিক সন্ত্রাস, পারিবারিক পর্যায়ে খুনখারাবির ক্ষেত্রে সরকারকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।

ক্রেতা-বিক্রেতার অবাধ দর-কষাকষির মাধ্যমে বাজারের লেন-দেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। এখানে সরকারের হস্তক্ষেপ অনাকাঙ্ক্ষিত। প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহের মাধ্যমে বাজার ভরে উঠবে। ক্রেতারা অর্থকড়ি সঙ্গে নিয়ে বাজারে ভিড় জমাবে। দর-কষাকষি চলবে। তার মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নির্ধারিত হবে। বাজারে পণ্যসামগ্রীর বেচা-কেনা এগিয়ে যাবে। সরকার এসে এ প্রক্রিয়ায় খবরদারি করুক, এটি ক্রেতা-বিক্রেতা কারো কাম্য নয়। বাস্তবে বাজারপ্রক্রিয়া এত নিখুঁত ও নির্বিঘ্ন হয় না। নানা উপসর্গ এসে প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহের ধারাকে ব্যাহত করে। বাজারব্যবস্থায় বিকৃতি এনে স্বার্থান্বেষী মহল ভোক্তাসাধারণের অসুবিধা সৃষ্টি করে। তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন হয়তো দেখা যায়, নিত্যব্যবহার্য পণ্যের সরবরাহ কমে যাচ্ছে, বাজারে পণ্যের দুষ্প্রাপ্যত্য সৃষ্টি হয়েছে। জনস্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে। জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। সমাজে অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা দেখা দিচ্ছে। এ সময় সরকার নিশ্চল, নির্বিকার থাকতে পারে না। কর্মবণ্টন অনুসারে পণ্যমূল্য যৌক্তিক সীমার মধ্যে রাখা যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, তাদের সক্রিয় হতে হয়। তারা প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ জোরদার করার অজুহাতে বাজার তদারকিতে নেমে পড়ে। কখনো কখনো এর সুফল পাওয়া যায়। আবার দেখা যায়, বাজার তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সরকারের সক্রিয় ভূমিকায় ফলোদয় হয় না; বরং উল্টা ফল হয়। সরবরাহ আরো কমে গিয়ে পণ্যমূল্য আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে।

মোট কথা, সমাজজীবনের যেসব বিষয়ে সরকার নিশ্চল, নিশ্চুপ অবস্থায় দর্শকের সারিতে বসে থাকার কথা, পরিবেশ-পরিস্থিতির বিবেচনায় সেসব বিষয়ে সরকারকে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। দেশের মানুষ মনে করে, সব বিষয় যাতে ঠিকমতো চলে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। যেকোনো সেক্টরে সামান্য কিছু বিগড়ে গেলে সরকারকেই তা শোধরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার যদি বলে যে বিষয়টি বেসরকারি খাতের আওতাভুক্ত বিধায় এ ব্যাপারে সরকারের কিছু করণীয় নেই। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে নেওয়া হবে সরকারের চরম ব্যর্থতা হিসেবে। মানুষ মনে করে, দেশের কোনো বিষয় সরকারের আওতাবহির্ভূত নয়। যখন দৈব-দুর্বিপাকে বা মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যা-সংকটের কারণে জনগণের ভোগান্তি বাড়ে, তখন সরকারকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। বিষয়টি সরকারের আওতাবহির্ভূত—এমন যুক্তি জনগণ মানবে না।

প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অধিক্ষেত্র মিলে সরকারের কর্তৃত্বাধীন বিষয়গুলোর বিস্তার বিশাল হলেও সব বিষয়ের ওপর নজর রাখা বা এতদ্সম্পৃক্ত সমুদয় কার্যকলাপ তদারকি করা সরকারের পক্ষে সম্ভবপর হয় না। কর্তৃত্ব আরোপের জন্য সরকার কদাচ আনুষ্ঠানিকভাবে অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুত করে কাজ সম্পন্ন করে। বেশির ভাগ সময়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্যরা নিজেদের মনে থাকা অগ্রাধিকার তালিকা অনুসরণ করে। এসব তালিকায় সব বিষয়, অনুবিষয় থাকে না। তাই দেখা যায়, কোনো কোনো বিষয়-অনুবিষয়ের ওপর সরকারি নজরদারি ও তত্ত্বাবধান শূন্যের কোঠায় এসে গেছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা জরুরি অবস্থার সৃষ্টি হলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর কিংবা সংস্থা বিষয়টির প্রতি বিন্দুমাত্র দৃষ্টিপাত করেনি। কর্তৃপক্ষের অলক্ষে এ সেক্টরের লোকজন নিজেদের ইচ্ছামতো কাজকর্ম চালিয়ে গেছে। ফলে বর্ণিত সেক্টরে-উপসেক্টরে নানাবিধ অপরাধ-অপকর্ম ঘটছে। নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। বিরাজমান পরিস্থিতি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। বাধ্য হয়ে সরকারকে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঘুরে-ফিরে দাঁড়ায় যে সরকারের দৃষ্টির বাইরে থাকা বিষয়াবলি বা সেক্টরও পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে সরকারের কর্তৃত্বাধীনে চলে আসে।

অনেক সময় দেখা যায়, কয়েকটি সেক্টরে সরকারের বাইরে একটি বেসরকারি গোষ্ঠী অতিমাত্রায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তাদের কেউ কেউ আবার সরকারের উচ্চমহল থেকে আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়। সেই সুবাদে তারা নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি করে বসে, যে সিন্ডিকেট অপ্রতিরোধ্যভাবে সেই সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। বাজার সিন্ডিকেটের লোকরা পণ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে, বাজারে দুষ্প্রাপ্যতা সৃষ্টি করে। এককথায় বাজারব্যবস্থাকে কবজা করে ফেলে। অর্থনীতির পরিভাষায় বলা যায়— market powerদখল বরে নিজেদের ইচ্ছামতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে।

দেশে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সেক্টরের ক্রিয়াশীল এজেন্টগুলোর (Agent)কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব্ব। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার শীর্ষ পদধারী নির্বাহীদের আদেশ-নির্দেশ মেনে সেক্টরে কর্মরত ব্যক্তিরা বা এজেন্টগুলো তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে—এটাই নিয়ম। দেশের মানুষও তেমনটাই প্রত্যাশা করে। সময়বিশেষে দেখা যায়, শাসক দলের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে সেক্টরে কর্মরত বেসরকারি ব্যক্তিরা এমন ক্ষমতাধরচক্রে রূপান্তরিত হয়েছে যে তারা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে উল্টো নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিকে বলা যেতে পারে Contra Control Mechanism । সেক্টরের লোকজন তথা ক্ষমতাধর চক্র তাদের আধিপত্য খাটিয়ে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকে বলে দিচ্ছে তাদের কী করতে হবে। সেক্টরের নিয়ম-কানুন, গতিবিধি কী হবে। অবস্থার বিপাকে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। তারা সেক্টরে কর্মরত ক্ষমতাধর বেসরকারি গোষ্ঠীর কথায় উঠতে-বসতে শুরু করেছে।

এমন গোষ্ঠী রয়েছে, যারা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টির আড়ালে নিজেদের কর্মকাণ্ড অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, এসব কর্মকাণ্ড বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অনৈতিক বা অবৈধ হয়ে থাকে। নির্বাহী কর্তৃপক্ষের যেসব কর্মকর্তা সেক্টরের কর্মকাণ্ড মনিটরিং ও তদারকি করার কথা, সেখানে অনৈতিক লেন-দেনের মাধ্যমে তাদের বশ করে অবৈধ কাজের হোতারা এগিয়ে যায়। নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। তাদের আয়-সম্পদের পাহাড় এত বিশাল আকার ধারণ করে যে শাসক দলের অত্যুচ্চ পর্যায়ের নেতাদের এর সামান্য অংশ দিয়ে খুশি রাখা সম্ভব হয়। তাঁরা কোনোরূপ উচ্চবাচ্য করেন না। ফলে দেখা যায়, বাস্তবে সেক্টরের কর্মকাণ্ডের ওপর রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ তিরোহিত হয়েছে। কতিপয় অর্থগৃধ্নু খলনায়ক তাদের বে-আইনি কর্মকাণ্ড অপ্রতিরোধ্য গতিতে চালিয়ে যাচ্ছে।

আসলে দেশের হাজার হাজার কর্মকাণ্ডে এত কোটি কোটি লোক ব্যাপৃত রয়েছে যে একক ব্যক্তি কিংবা নীতিনির্ধারণী ফোরামের সীমিতসংখ্যক নেতার পক্ষে এই বিশাল কর্মকাণ্ডের মনিটরিং এবং তত্ত্বাবধান করা সম্ভবপর নয়। শত শত প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য অধীনস্থ উপপ্রতিষ্ঠান ও অধস্তনগোষ্ঠীর ওপর এ কাজের দায়িত্বভার ছেড়ে দিতে হয়। তাদের ওপর সুনিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য যে মানসিক সচেতনতা এবং ব্যবস্থাপনা-দক্ষতা থাকা প্রয়োজন, শীর্ষস্তরের নেতারা এবং প্রশাসকদের সে দক্ষতা সব সময় থাকে না। বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষমতা কাঠামোর দুর্বলতা ও ফাঁক গলিয়ে বিস্তৃত অধিক্ষেত্রের কোনো কোনো অংশে কতিপয় ব্যক্তি বা চক্র তাদের নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এ অংশে বাস্তবিক পক্ষে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সেক্টরের এ অংশটুকু প্রায়ই দুর্বৃত্তায়িত হয়ে পড়ে।

সরকার তার নিজস্ব অগ্রাধিকার অনুযায়ী বিভিন্ন সেক্টর তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হচ্ছে, ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ়করণ। ভোটে হেরে গিয়ে বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হারানোর মানে হচ্ছে, ব্যক্তি পর্যায়ে এবং দলগতভাবে দুঃখ-দুর্দশা, যন্ত্রণা-বঞ্চনা এবং বিপত্তির সম্মুখীন হওয়া। ক্ষমতাচ্যুত ব্যক্তি ও দলের ওপর কী নির্মমভাবে স্টিমরোলার চালানো হয়, নির্যাতিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে তার বর্ণনা শুনলে যেকোনো সজ্জন ব্যক্তি আঁতকে উঠবেন। দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরদিন থেকে শাসক দল তার অগ্রাধিকারভুক্ত এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে। ‘এজেন্ডার’ প্রথম কাজ হলো, প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে কিভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা যায় তার সুনিশ্চিত ব্যবস্থা করা। এ ব্যাপারে যাতে কোনো অবহেলা, উদাসীনতা, অদক্ষতা বা ব্যর্থতা না ঘটে, সেদিকে নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্যরা সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। এ কাজে তাঁরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কোর্ট-কাছারি, বিভিন্ন এজেন্সি, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং শাস্তি প্রদানে সক্ষম এমন কিছু স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থাকে ব্যবহার করেন। এ জন্য দেখা যায়, প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত সেক্টরের ওপর সব সরকারের আমলে শাসক দলের পূর্ণ কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ লক্ষণীয়ভাবে বহাল থাকে। স্বাভাবিক সময়ে এ ক্ষেত্রে বড় একটা গাফিলতি বা ব্যর্থতা ঘটে না। বড় রকমের অদক্ষতা, ব্যর্থতা ও অবহেলার ক্ষেত্রে শাসক দলের ক্ষমতায় টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে।

ক্ষমতাসম্পৃক্ত অগ্রাধিকারে সর্বাত্মক মনোযোগ দিতে গিয়ে সরকার অন্যান্য সেক্টরের অতি প্রয়োজনীয় বিষয়ে আবশ্যকীয় নজর দিতে পারে না। ফলে বেসরকারি সিন্ডিকেটগুলো এসব সেক্টরের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে নিজেদের ইচ্ছামতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে। তারা জনমানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে তৎপর হয়। জনগণ দুর্বিষহ যন্ত্রণার শিকার হয়। যেমন হয়েছে পেঁয়াজের বাজারে। সরকার শত চেষ্টা করেও এ বাজারে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সিন্ডিকেটবাজরা সরকারি অনুশাসনের তোয়াক্কা করছে না। ভোক্তার ভোগান্তি বাড়িয়ে তারা নিজেদের পকেট ভারী করছে।

রাজনীতির মাঠে অবিসংবাদিত প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে প্রতিপক্ষকে মাঠছাড়া করার তাড়নায় শাসক দল (সরকার) অনেক সময় একদর্শী মানসিকতায় (monomania)আক্রান্ত হয়। সুশাসনের হাজারো ফ্রন্টের প্রতি তারা উদাসীন হয়ে পড়ে। ফলে অন্ততপক্ষে কয়েকটি সেক্টর আঙুলের ফাঁক গলিয়ে কর্তৃপক্ষের নাগালের বাইরে চলে যায়। সেখানে অনাচার, অত্যাচার, বে-আইনি অনৈতিক কাজ এত বিস্তার লাভ করে যে কর্তৃপক্ষ অবশেষে নির্বিকার থাকাই আরামদায়ক মনে করে। অনিয়ম ও অনৈতিক কাজে সরকার অনেকটা বাধ্য হয়ে সায় দিতে থাকে। চলে দুর্বৃত্তায়নের মহোৎসব। চরম অপকর্মদৃষ্টে একসময় কর্তৃপক্ষ (সরকার) অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তখন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে চাইলেও তারা পদে পদে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়, কখনো কখনো কর্তৃপক্ষ অসহায় হয়ে পিছু হটে। নিজেদের সৃষ্ট দুর্বৃত্তরাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

সরকার একটি জটিল বুননের বিশাল সত্তা। এর মধ্যে রয়েছে হাজারো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং বিপুলসংখ্যক জীবিত কোষ। মস্তিষ্ক থেকে সঠিক সংকেত পাঠিয়ে এদের কর্মকাণ্ড এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সন্তোষজনকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সংকেত সারা শরীরে না পৌঁছলে অথবা ভুল সংকেত সঞ্চারিত হলে শরীরে যেমন রোগ-ব্যাধি দেখা দেয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশবিশেষও তেমনি বিকল, অকার্যকর হয়ে পড়ে। কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও কোষের ওপর সরকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এই ব্যাধি ক্যান্সারের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের সুনিয়ন্ত্রণাধীন সেক্টরের সংখ্যা কমে যায়। সরকার ক্ষমতায় থাকে ঠিকই; কিন্তু কার্যকর থাকে না।

‘স্বাধীনতা রক্ষার জন্য দেশের মানুষকে নিরন্তর সতর্ক থাকতে হবে।’ মহামনীষীর এই আপ্তবাক্যকে সম্প্রসারিত করে বলা যায়, ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণ অটুট রাখতে হলে একদর্শিতা (monomania) পরিহার করে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব অংশের প্রতি সরকারকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। ব্যতিক্রমী কিছু ঘটা মাত্র নমনীয়তাকে দূরে সরিয়ে শুদ্ধ আচরণের মাধ্যমে যথাযথ প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। শুদ্ধাচারের মূল স্তম্ভ হলো বৈষম্যহীন ব্যবহার ও ন্যায়াচার। সেটিকে মূলমন্ত্র হিসেবে ধরে নিয়ে দৃঢ়তা এবং ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনার কালোত্তীর্ণ হাতিয়ারগুলো প্রয়োগ করলে বেয়াড়া সেক্টরগুলো ধীরে ধীরে সুনিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা