kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

স্নায়ুর লড়াইয়ে জয়ী হয়েছে ক্রিকেট

ইকরামউজ্জমান

১৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্নায়ুর লড়াইয়ে জয়ী হয়েছে ক্রিকেট

বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফাইনালে এবারই প্রথম উত্তেজনা, শ্বাসরুদ্ধকর এবং রোমাঞ্চ ছড়ানো ম্যাচ। ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের নির্ধারিত ৫০ ওভারের খেলায় প্রথমে (২৪১ রান) টাই। এরপর সুপার ওভারে আবারও টাই হওয়ায় টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী বাউন্ডারিতে এগিয়ে থাকায় লর্ডসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব এবারই প্রথম অধিকার করল ৪০ বছর পর। বিশ্বকাপ এসেছে ইংল্যান্ডের ঘরে। লর্ডস থেকে শিরোপা জয় পঞ্চমবারের চেষ্টায়। এর আগে ১৯৭৯ সালে লর্ডসে ফাইনালে ইংল্যান্ড হেরেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে। সেদিন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ছিলেন মাইক বিয়ালি।

দ্বাদশ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সত্যি, তবে নিউজিল্যান্ডও হতে পারত! দুই বীরের লড়াই, কেউ তো কাউকে হারাতে পারেনি। জয় হয়েছে ক্রিকেটের। মাঠ ভরা রঙিন ক্রিকেটে একেবারে অন্তিম পর্যায়ে ভাগ্য ইংল্যান্ডের অভিনেতাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এটিই ‘ম্যান প্রপোজেস গড ডিসপোজেস’। লর্ডসের প্যাভিলিয়নে একদিকে যুদ্ধ জয়ের কোলাহল, আরেক দিকে স্তব্ধতা। খেলার মধ্যে অনিশ্চয়তা। ফাইনালে দেখলাম পুরো খেলায় অনিশ্চয়তা। এমনিতেই ক্রিকেট স্নায়ুর চাপের রাজা। সুপার ওভারে তো দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল! এটি কি ক্রিকেটের নিষ্ঠুরতা, না মজা করা!

রানের মতো গান নেই। মানুষ ভাবে এক রকম, ক্রিকেটের চিন্তা তো অন্য রকম। লর্ডসের উইকেটে তো ২৪০ থেকে ২৫০ রানই যথেষ্ট! ‘লো স্কোরিং ম্যাচ’-এর মধ্যে এত উত্তেজনা আর নাটক। উভয় দলের পেসাররাই তাঁদের কাজ করে দিয়েছেন। বিশ্বকাপের ফাইনাল আর কখনো তো এই রূপে সামনে আসেনি। যাঁরা রান করার তাঁরাই করেছেন। ইংল্যান্ডের একটি বড় পার্টনারশিপে মনে হয়েছিল খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারলেও পারতে পারে। সেটিও শেষ পর্যন্ত হয়নি। ক্রিকেট নাটকে উত্তেজনা ক্রমেই বেড়েছে। ক্রিকেটের এ আরেক তৃপ্তি! আরেক রহস্যময় সৌন্দর্য। উভয় দলের প্রথম ‘পাওয়ার প্লের’ পর বোঝার উপায় ছিল না খেলার সমাপ্তিতে কী ঘটতে যাচ্ছে। উভয় দলের খেলোয়াড়রা কখনো হাল ছাড়েননি। তাঁরা স্নায়ুর চাপ যতটুকু সম্ভব সামলে লড়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত জিতেছে ক্রিকেটের গৌরবময় অনিশ্চয়তা।

বিশ্বকাপের শুরু থেকে পরিবর্তনের সপক্ষে বড় রায় ছিল। সেই পরিবর্তন এসেছে ২৩ বছর পর—নতুন একটি দেশের শিরোপা অধিকারের মাধ্যমে। ক্রিকেট নির্দিষ্ট হিসাবের খাতা থেকে বেরিয়ে এসেছে। এটি ক্রিকেটের স্বার্থে অনেক বড় স্বস্তি। বিশ্বের প্রায় ৫০ দেশের ক্রিকেটচর্চার অধিকারীরা এতে অবশ্যই অনুপ্রাণিত হবে।

ক্রিকেটের রায়ে নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে আবার রানার্স-আপ হলো। গত বিশ্বকাপে (২০১৫) অকল্যান্ডে আর এডলেইডে নিউজিল্যান্ড আর বাংলাদেশের কাছে পরাজিত দলের গত চার বছরে ওয়ানডে ক্রিকেটে অসাধারণ উন্নতি। এ ক্ষেত্রে খেলার ধরনটাই পাল্টে দিয়ে র‌্যাংকিংয়ে সবার ওপরে উঠে শেষ পর্যন্ত প্রথম শিরোপার মুখ দেখেছে তারা। ফাইনালে উভয় দলের সম্মিলিত প্রয়াসের জয়টাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এই দুটি দল গ্রুপ পর্যায়ে কিভাবে হারার পর লড়াই করে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে এসেছে, এটি কারো অজানা নয়। তবে যেটি শিক্ষণীয়, সেটি হলো আত্মবিশ্বাস, ক্রিকেটে মাইন্ডসেট, মাথা ঠাণ্ডা রেখে খেলা, যার যা দায়িত্ব গেম প্ল্যান অনুুযায়ী সেটির বাস্তবায়ন এবং নিজেদের সেরাটা দিতে হবে। জয় হয়েছে উভয় দলের সব খেলোয়াড়ের নিষ্ঠার। ইংল্যান্ডের ব্যাটিংয়ে গভীরতা বেশি ছিল, তাদের বোলিংয়ে অনেক বেশি ‘অপশন’ ছিল, নিউজিল্যান্ডের পেসারদের আক্রমণাত্মক মাপা লেন্থের বোলিং, ব্যাটিং শক্তিটা তিন-চারজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এসব বিশ্লেষণ এখন মূল্যহীন। খেলায় জয়টাই আসল। সবাই জয়ের সান্নিধ্য চান। কিভাবে জয়, এটি একটি সময় গৌণ হয়ে পড়ে। আফসোস আর অনুশোচনাও স্মিত হয়ে যায়। আবার আশা ও স্বপ্নের পেছনে দৌড়ানো। অবশ্যই এর জন্য সময় হাতে নিয়ে যথাযথ প্রস্তুতি। ২০২৩ সালে বিশ্বকাপ ভারতে। উপমহাদেশে বিশ্বকাপ সম্পূর্ণ ভিন্ন কন্ডিশনে। উপমহাদেশ থেকে তো অস্ট্রেলিয়া চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, রানার্স-আপ হয়েছে ইংল্যান্ড। এশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে এই অঞ্চলের দেশগুলোর অনেক বেশি সুযোগ আছে ভালো পারফরম করার। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর জন্য প্রতিটি দেশের ক্রিকেটে যথাযথভাবে কাজ করতে হবে। ক্রিকেট উন্নতিতে ‘ডেডিকেশনের’ কোনো বিকল্প নেই! ইংল্যান্ড তার প্রমাণ।

ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হয়েছেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন। ধীরস্থির আত্মপ্রত্যয়ী এই সেনাপতি টিম গেমে সব সময় বিশ্বাস করেছেন। নিজে পারফরম করলেও সব সময় দলীয় পারফরম্যান্সকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফাইনাল শেষে মিডিয়াকে বলেছেন, ‘আমরা সাধ্য অনুযায়ী মাঠে চেষ্টা করেছি। যোগ্য দল হিসেবে ইংল্যান্ড জিতেছে। জয় হয়েছে ক্রিকেটের।’  আর কোনো খেলায় কি আছে এই ধরনের শিষ্টাচার আর মহত্ত্বতা!

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য