• ই-পেপার

একান্ত সাক্ষাৎকারে সিজেডএম-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া

মুনাফার পাশাপাশি সমাজের প্রতিও দায় আছে ব্যবসায়ীদের

কৃষি সাপ্লাই চেইন, প্রযুক্তি ও গ্রামীণ অর্থনীতি : বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফ্রেশি ফার্ম

কৃষি সাপ্লাই চেইন, প্রযুক্তি ও গ্রামীণ অর্থনীতি : বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

কৃষিপণ্যের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহব্যবস্থা কোনো এক দিনে গড়ে ওঠা কাঠামো নয়। কয়েক শ বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভুল ও সংশোধনের মধ্য দিয়েই এই ব্যবস্থা আজকের রূপ পেয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালেই স্কষ্ট হয়, যখনই এই সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে, তখনই সমাজ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু উৎপাদনের সঙ্গে নয়, বরং উৎপাদিত পণ্য সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছানোর সক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

কৃষি সাপ্লাই চেইন, প্রযুক্তি ও গ্রামীণ অর্থনীতি : বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনাইতিহাসের শিক্ষা : সাপ্লাই চেইন বিপর্যয় ও    দুর্ভিক্ষ : বাংলা অঞ্চলের বড় তিনটি দুর্ভিক্ষ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর মূল কারণ শুধু খাদ্যের অভাব ছিল না; বরং সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতা ও পরিবহন কাঠামোর ভেঙে পড়াই ছিল প্রধান নিয়ামক। ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর-এ খরা অবশ্যই একটি কারণ ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ ছিল তৎকালীন বাফার স্টক বা আপৎকালীন খাদ্য মজুদের অনুপস্থিতি এবং দুর্বল বণ্টনব্যবস্থা। খাদ্যশস্য গ্রাম থেকে অভাবগ্রস্ত মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছতে পারেনি।

১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তর ছিল সাপ্লাই চেইন ধ্বংসের এক নির্মম উদাহরণ। নদীমাতৃক বাংলায় নৌকা ছিল পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ শাসকরা বোট ডিনায়াল পলিসি গ্রহণ করে হাজার হাজার নৌকা ধ্বংস বা বাজেয়াপ্ত করে। এর ফলে উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে খাদ্য পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং কৃত্রিম সংকট ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষেও আমরা দেখি, স্বাধীন দেশে খাদ্য উৎপাদন একেবারে শূন্য ছিল না, কিন্তু বণ্টনব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং তথ্যের অভাব সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় খাদ্য পৌঁছতে দেয়নি। এই তিনটি ঘটনাই আমাদের একটি বিষয় স্কষ্ট করে শেখায়, সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়লে উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও মানুষ অনাহারে মরতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট : প্রযুক্তি কেন অপরিহার্য ইতিহাসের এই শিক্ষা থেকেই বোঝা যায়, শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; সেই উৎপাদনের পথটিও নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। অতীতের ট্রায়াল অ্যান্ড এরর-এর ঝুঁকি কমানোর একমাত্র কার্যকর উপায় হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। আজকের দিনে রিয়াল-টাইম ডেটা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ডেটা অ্যানালিটিকসের মাধ্যমে মুহূর্তেই জানা সম্ভব, কোন জেলায় চালের মজুদ কত, কোথায় আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এই তথ্য থাকলে ১৯৭৪-এর মতো বণ্টন বিপর্যয় অনেকাংশেই এড়ানো যেত।

ডিজিটাল লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম, যেমনট্রাক বা কার্গো ভাড়ার অ্যাপ পরিবহন সংকটের ঝুঁকি কমাতে পারে। কৃষক সরাসরি পরিবহন নিশ্চিত করতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্যও হ্রাস পায়। একইভাবে আইওটিভিত্তিক কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা পচনশীল পণ্যের অপচয় কমিয়ে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়াতে পারে।

ই-কমার্স ও গ্রামীণ বাজার : তত্ত্ব আর বাস্তবতার ফারাক : ই-কমার্স নিয়ে যত আলোচনা হয়, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক ভিন্ন। বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো প্রায় পুরোপুরি শত বছরের পুরনো হাট-বাজার ও আড়ত কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ই-কমার্সের অংশগ্রহণ এখানে নগণ্য।

আস্থার সংকট ও নিয়ন্ত্রণহীনতা : আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক ক্ষেত্রে ভেজাল পণ্যের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। চটকদার ছবি ও বিজ্ঞাপনের আড়ালে নিম্নমানের পণ্য বিক্রি হওয়ায় ভোক্তাদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এই সংকট আরো ঘনীভূত করেছে। মাঠ পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি না থাকায় অনলাইন বাজার অনেক সময় প্রতারণার ফাঁদে পরিণত হচ্ছে।

কৃষকের ন্যায্যমূল্য :ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ধারণা তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। রিয়াল-টাইম ডেটা থাকলে পরিকল্পিত চাষাবাদ, সাপ্লাই-ডিমান্ডের ভারসাম্য এবং কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবে এর পথে সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তি নয়, বরং স্বার্থের সংঘাত। ডিজিটাল স্বচ্ছতা মানেই মজুদদারি ও সিন্ডিকেটের তথ্য প্রকাশ্যে আসা, যা বর্তমান সুবিধাভোগীরা কোনোভাবেই চাইবে না। রেলওয়ে বা বিমান খাতের অভিজ্ঞতা দেখায়, কিভাবে ডিজিটাল উদ্যোগ ভেতর থেকেই বাধাগ্রস্ত হয়।

স্থানীয় উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ অবকাঠামোর গুরুত্ব : স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি হলে কর্মসংস্থান বাড়ে, অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। কিন্তু বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় বাধা হলো অর্থায়নের অভাব, দুর্বল ভিসি ইকোসিস্টেম এবং ব্যাংকঋণের জটিল কাঠামো। করোনা মহামারি প্রমাণ করেছে, গ্রামীণ অর্থনীতিই ছিল দেশের সবচেয়ে বড় শক অ্যাবজরবার। কোরবানির ঈদের সময় শহর থেকে গ্রামে অর্থপ্রবাহ একটি প্রাকৃতিক সম্কদ পুনর্বণ্টনের উদাহরণ। গ্রামে লজিস্টিকস, বিদ্যুৎ, স্টোরেজ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে শহরের তুলনায় বেশি রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। কাঁচামালের উৎসর কাছাকাছি শিল্প স্থাপন করলে পরিবহন খরচ ও অপচয় কমে। পাশাপাশি রিভার্স মাইগ্রেশন শহরের ওপর চাপ কমাতে পারে।

গ্রামীণ অর্থনীতি বাংলাদেশের একটি ঘুমন্ত দৈত্য। প্রযুক্তি একে জাগাতে পারে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন অবকাঠামো, স্বচ্ছতা, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এসব ছাড়া প্রযুক্তি শুধু একটি আকর্ষণীয় শব্দই থেকে যাবে। সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন চাইলে আমাদের দৃষ্টি শহর থেকে সরিয়ে গ্রামের দিকে ফেরাতেই হবে; কারণ সেখানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত।

সরকারি পর্যায়ে মেন্টরশিপ ও দক্ষতার সংকট : প্রাইভেট সেক্টরে উদ্যোক্তা উন্নয়নে মেন্টরশিপ ও দক্ষ জনবলের কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও সরকারি পর্যায়ে চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। এখানে উদ্যোক্তাদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো যোগ্য মেন্টর বা অভিভাবকের চরম অভাব রয়েছে। ফলে তরুণ উদ্যোক্তারা সরকারি সহায়তা কাঠামো থেকে কার্যকর সহযোগিতা পাচ্ছেন না। বিসিএস ও আমলাতান্ত্রিক মানসিকতাযাঁরা নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছেন, বিশেষ করে বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা, তাঁদের অনেকেরই আধুনিক ব্যবসা বা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম সম্কর্কে সুস্কষ্ট ধারণা নেই। তাঁদের চিন্তাধারা এখনো অনেকাংশে প্রাচীন ও অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আবদ্ধ, যা উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষ মানবসম্কদের অভাবসরকারি কাঠামোর ভেতরে এমন দক্ষ মানবসম্কদের অভাব প্রকট, যাঁরা একজন তরুণ উদ্যোক্তার ভাষা বুঝবেন, তার সমস্যাগুলো অনুধাবন করবেন এবং বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিতে পারবেন। এই ঘাটতি উদ্যোক্তা উন্নয়নের গতি আরো ধীর করে দিচ্ছে।

এসএমই ও ব্যাংকঋণের কঠিন বাস্তবতা : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। ঋণপ্রাপ্তির জটিলতাআমাদের ব্যাংকিং কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে একজন ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক উদ্যোক্তার পক্ষে ব্যাংকঋণ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কঠোর শর্ত, অতিরিক্ত কাগজপত্র এবং জামানতের বেড়াজালে পড়ে ব্যাংকগুলো মূলত বড় উদ্যোক্তাদেরই ঋণ দেয়। ফলে ছোট উদ্যোক্তারা অর্থায়নের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে।

সম্ভাবনা ও করণীয়স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, এটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যত দিন না উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তাদের মানসিকতায় আধুনিক ও বাস্তবমুখী পরিবর্তন আসছে এবং ব্যাংকঋণের কাঠামো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাবান্ধব হচ্ছে, তত দিন এই বিপুল সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। এই জটগুলো খুলতে পারলেই কেবল স্থানীয় অর্থনীতিতে সত্যিকারের গতি আসবে।

 

কৃষক-ভোক্তার ন্যায্য অধিকারের বাস্তব চ্যালেঞ্জ

এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, সভাপতি, কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং সাবেক সচিব

কৃষক-ভোক্তার ন্যায্য অধিকারের বাস্তব চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থার সংকট আজ আর কারো অজানা নয়। পেঁয়াজ থেকে ভোজ্যতেল, চাল থেকে চিনি, প্রতিবছরই আমরা কোনো না কোনোভাবে বাজার অস্থিরতার পুনরাবৃত্তি দেখি। এই সংকটকে আমরা প্রায়ই সিন্ডিকেট নামে অভিহিত করি। কিন্তু প্রকৃত চিত্রটি আরো জটিল এবং অনেক বেশি কাঠামোগত। সিন্ডিকেট কখনোই শুধু চোখে দেখা কয়েকজন ব্যবসায়ীর সমন্বয়ে তৈরি হয় না; বরং এটি গঠিত হয় উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বিস্তৃত সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকা বহু অদৃশ্য হাতে। বাজারের এই অস্বচ্ছতা, অকার্যকারিতা ও স্বার্থান্বেষী উপস্থিতিই সংকট দীর্ঘস্থায়ী করে। সিন্ডিকেট ভাঙা এবং আধুনিক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলাএই দুটি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

উৎপাদক-ভোক্তা ব্যবধান : বাংলাদেশের কৃষিপণ্য উৎপাদন কৃষকদের হাতেই, কিন্তু বাজারে সেই পণ্যের প্রকৃত মূল্য পায় নানা মধ্যস্বত্বভোগী। কৃষকের মাঠ থেকে শহরের বাজার পর্যন্ত একটি পণ্য পৌঁছতে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তার প্রতিটি ধাপেই যুক্ত হয় নতুন নতুন খরচ, নতুন নতুন ব্যক্তি। ফলে যে কৃষক তিন মাস পরিশ্রম করেন, তিনিই সবচেয়ে কম দামে বিক্রি করেন, আর যে ব্যবসায়ী বা মধ্যস্বত্বভোগী মাঝপথে পণ্যটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা রাখেন, তিনিই সবচেয়ে বেশি লাভ পান। এটি শুধু বাজারব্যবস্থার ত্রুটি নয়; এটি সামাজিক অন্যায়।

কৃষক-ভোক্তার ন্যায্য অধিকারের বাস্তব চ্যালেঞ্জবাংলাদেশে কৃষকের হাতে থাকে প্রায় ৩০ শতাংশ, আর ৭০ শতাংশ মূল্য বিভিন্ন স্তরে হারিয়ে যায় অনিয়ন্ত্রিত পরিবহনব্যবস্থা, হাতবদল, চাঁদাবাজি, অনিয়ম ও অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া কোনো ধরনের বাজারস্থিরতা সম্ভব নয়।

সমবায়ভিত্তিক বাজারব্যবস্থার অভাব : বিশ্বের বহু দেশে কৃষক সমবায় বা সমন্বিত বাজারব্যবস্থা বাজার স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা এমন কাঠামো তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি। বাজার মনিটরিং, নেটওয়ার্কিং ও ডিজিটাল তথ্যভিত্তিক ট্র্যাকিং আজও যথেষ্ট উন্নত নয়। এই ঘাটতি পূরণ না হলে কৃষক-ভোক্তা ব্যবধান আরো বাড়বে, আর সিন্ডিকেট আরো শক্তিশালী হবে।

উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি : কৃষকের উৎপাদন ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়া বাজারের আরেক বড় ধাক্কা। সরকারি ভর্তুকির সারই যখন ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়, তখন কৃষকের ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের উচ্চ সুদের লেনদেন, কৃষিঋণে অনিয়ম, বীজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্নসব মিলিয়ে কৃষির মৌলিক কাঠামোই অসুস্থ। ভারতে পেঁয়াজ ১২ রুপিতে বিক্রি হওয়ার পেছনে উৎপাদনব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও ভর্তুকিব্যবস্থার দক্ষতা কাজ করেছে। বাংলাদেশে এটি এখনো অনেকটাই প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল।

আমদানিনির্ভর পণ্য এবং বৃহৎ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ : চিনি, তেল, গমআমদানিনির্ভর এই পণ্যের বাজারে কয়েকটি বড় করপোরেট গ্রুপই প্রায় সম্কূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। তাদের মূল্য নির্ধারণেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। সরকারের সঙ্গে অতিমুনাফা নিয়ে দর-কষাকষি করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আমদানি মূল্য, রিফাইনিং খরচ, ডলার রেট, পাইকারি-খুচরা লাভএসবের ওপর স্বচ্ছ ও ডিজিটাল মনিটরিং চালু করা অত্যন্ত জরুরি।

সরকারি মনিটরিং ও নীতি নির্ধারণ, সময়মতো সিদ্ধান্তের প্রয়োজন : সরকার প্রায়ই বাজারের সমস্যাগুলো মোকাবেলা করে পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায়, পূর্বপ্রস্তুতিতে নয়। ডিউটি-ট্যাক্সও সময়মতো সমন্বয় করা দরকার। যেমনখেজুরের ক্ষেত্রে রমজানের সাত দিন আগে ডিউটি কমানো হয়েছিল, তা কোনো ফল দেয়নি। সময়মতো সরকার সিদ্ধান্ত নিলে বাজার স্থিতিশীল হয়। পেঁয়াজেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকেই কিছু আইপি দিলে আজকের সংকট হতো না। কিন্তু আমদানির সিদ্ধান্ত এলো অনেক পরে। তারা বলেছিল কৃষকের হাতে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আছে, কিন্তু বাস্তবে শীতের দিকে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিবছরই পাঁচ থেকে ছয় লাখ টন আমদানি করতে হয়। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া না হয়, তাহলে বাজারে ক্ষতি আগেই হয়ে যায়, যার বোঝা ভোক্তার ওপরই পড়ে।

ব্যবসায়ীদের অস্বাভাবিক লাভের প্রবণতা: বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের লাভের আকাঙ্ক্ষা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। কৃষক তিন মাস ধরে ঘাম ঝরিয়ে ফসল উৎপাদন করে, আর মধ্যস্বত্বভোগী এক রাতেই তার চেয়ে বেশি লাভ করে নেয়। কৃষকের ঘামে উৎপাদিত পণ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের রাতারাতি অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন এক অদ্ভুত অন্যায়। এটা সম্কূর্ণ অনৈতিক। নীতিনৈতিকতার যে অবক্ষয় হয়েছে, সেটাই এখন বড় বাধা। এই সংস্কৃতির অবসান না হলে বাজার কখনো স্থিতিশীল হবে না। বর্তমান বাজার সংস্কৃতি একটি বৃহত্তর সামাজিক নৈতিকতার সংকটের প্রতিফলন। চক্ষুলজ্জাহীন মুনাফার প্রবণতা, ভোক্তা ঠকানো এবং পণ্যের জোগান নিয়ন্ত্রণ করে অতিরিক্ত লাভ আদায়এসব আচরণ ধীরে ধীরে একটি নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই অবস্থার পরিবর্তন কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অসম্ভব।

বাজারকে ন্যায্য ও স্বচ্ছ করার নতুন অঙ্গীকার ক্যাবের : সরকারি দায়িত্ব শেষে ক্যাবের সভাপতি হিসেবে আমি কাজ শুরু করেছি। এটি আমার জন্য নতুন দায়িত্ব। আমি অবসর গ্রহণের পরপরই গত ৮ সেপ্টেম্বর এই দায়িত্ব নেওয়ার ১০ দিনের মাথায় গণমাধ্যমের সামনে ১৬ দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংগঠনকে দেশব্যাপী শক্তিশালী করা : জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কমিটি সক্রিয়করণের লক্ষ্যে এরই মধ্যে আটটি বিভাগে সরাসরি ভিজিট করা হয়েছে। সেক্টরভিত্তিক কার্যক্রম: নিরাপদ খাদ্য, শিশুশ্রম নিরোধ ও ভোক্তা অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি। গবেষণাভিত্তিক কাজ ও প্রমাণভিত্তিক নীতি : রিসার্চ গ্রুপ গঠন, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা ও বাজার বিশ্লেষণের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ। খাতভিত্তিক টিম গঠন : প্রতিটি খাতে বিশেষজ্ঞ মতামত কাজে লাগানোর লক্ষ্যে খাতভিত্তিক টিম গঠন করা হবে। ভোক্তাকণ্ঠ ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারণা : ভোক্তা অধিকার বিষয়াদি সম্কর্কে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ক্যাবের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ভোক্তা কণ্ঠর মাধ্যমে নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করা। একাডেমিক ও কর্মী সম্কৃক্তকরণ : সচেতন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মকে ভোক্তা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা।

এক বছর শেষে এর অগ্রগতি সরাসরি প্রকাশ করা হবে, ভোক্তা অধিকার রক্ষায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়েছি। এটাই ক্যাবের স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি।

বাজার সংস্কার আর বিলম্বের সুযোগ নেই : বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা এবং ভোক্তার জীবনযাত্রা আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সিন্ডিকেট ভাঙা, মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য কমানো, উৎপাদনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সমন্বিত সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলাই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ। এই সংস্কার এখনই শুরু না হলে ভবিষ্যৎ আরো কঠিন হবে। আমাদের লক্ষ্য একটাইএকটি ন্যায্য, স্বচ্ছ, আধুনিক ও সিন্ডিকেটমুক্ত বাজারব্যবস্থা গড়া, যেখানে কৃষক মর্যাদা পাবে, ভোক্তা ন্যায্যমূল্য পাবে এবং ব্যবসা হবে নীতি ও সততার ভিত্তিতে।

অনুলিখন : সজীব আহমেদ

বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বাড়লে গতিশীল হবে অর্থনীতি

একান্ত সাক্ষাৎকারে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মুনিরুজ্জামান

বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বাড়লে গতিশীল হবে অর্থনীতি

চ্যালেঞ্জিং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর বৈশ্বিক লজিস্টিক জটিলতাকে পাশ কাটিয়ে ২০২৫ সালে সাফল্যের নতুন ইতিহাস গড়েছে দেশের অর্থনীতির হূিপণ্ড চট্টগ্রাম বন্দর। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৩৪ লাখ টিইইউএসের মাইলফলক স্কর্শ করার পাশাপাশি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্জন করেছে কাঙ্ক্ষিত জিরো ওয়েটিং টাইম। শুধু প্রবৃদ্ধিই নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মানদণ্ডে জিরো অবজারভেশন লাভ এবং বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগাপ্রকল্পের অগ্রগতি চট্টগ্রাম বন্দরকে পরিণত করেছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক হাবে। বন্দরের এই রূপান্তর, রাজস্ব আয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক মুহাম্মদ আবু তৈয়বকে বিস্তারিত জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মুনিরুজ্জামান

 

কালের কণ্ঠ : ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর ইতিহাসের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই সাফল্যের নেপথ্যের গল্পটি যদি বলেন?

এস এম মুনিরুজ্জামান : ২০২৫ সাল চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য ছিল একটি রূপান্তরের বছর। বিভিন্ন লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সত্ত্বেও আমরা সব সূচকে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। এই সময়ে আমরা ৩৪ লাখ টিইইউএসের (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একক কনটেইনার) বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছি, যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মূলত আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, ইয়ার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রমই এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

 

কালের কণ্ঠ : পরিসংখ্যানের বিচারে এই প্রবৃদ্ধি ঠিক কতটা উল্লেখযোগ্য?

এস এম মুনিরুজ্জামান : যদি শতাংশের হিসাবে বলি, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪.০৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১১.৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০.৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মোট কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ টনের বেশি। এ ছাড়া বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ১৩.২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আমাদের সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে।

 

কালের কণ্ঠ : বন্দরে আসার পর জাহাজগুলোকে আগে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। বর্তমানে এই ওয়েটিং টাইম বা অপেক্ষমাণ সময়ের অবস্থা কী?

এস এম মুনিরুজ্জামান : এটি আমাদের জন্য একটি বড় গর্বের জায়গা। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে আমরা জিরো ওয়েটিং টাইম অর্জন করেছি। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে জাহাজগুলো বন্দরে আসা মাত্রই (অ্যারাউন্ড টাইম) বার্থিং পেয়েছে। বর্তমানে গড় টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম কমে ২.৫৩ দিনে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে আমদানিকারকরা দ্রুত পণ্য খালাস করতে পারছেন, যা পরোক্ষভাবে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম কমাতে সাহায্য করবে।

বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বাড়লে গতিশীল হবে অর্থনীতি

কালের কণ্ঠ : বন্দরের আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল সেবা নিয়ে আপনাদের নতুন উদ্যোগগুলো কী কী?

এস এম মুনিরুজ্জামান : আমরা একটি পেপারলেস বা কাগজবিহীন বন্দর বিনির্মাণের দিকে এগোচ্ছি। এখন টস (টিওএস) সিস্টেমের মাধ্যমে অনলাইন ই-গেট পাস ব্যবস্থাপনা চালু হয়েছে, যা ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে। এর ফলে বন্দর এলাকায় যানজট কমেছে। এ ছাড়া গত ২৩ ডিসেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ছয় হাজার ৭৬১টি গেট পাস ইস্যু করার রেকর্ড হয়েছে। এখন ব্যবহারকারীরা মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের মাধ্যমে যেকোনো জায়গা থেকে অপারেশনাল বিল পরিশোধ করতে পারছেন।

 

কালের কণ্ঠ : জাতীয় অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক অবদান সম্কর্কে কিছু বলুন।

এস এম মুনিরুজ্জামান : চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে বন্দরের রাজস্ব আয় হয়েছে ৫৪৬০.১৮ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ৭.৫৫ শতাংশ বেশি। আমরা সরকারি কোষাগারে ১৮০৪.৪৭ কোটি টাকা প্রদান করেছি। গত পাঁচ বছরে জাতীয় কোষাগারে আমাদের মোট অবদানের পরিমাণ ১২৩৪৯.৫০ কোটি টাকা।

 

কালের কণ্ঠ : নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক কোনো স্বীকৃতি কি আপনারা পেয়েছেন?

এস এম মুনিরুজ্জামান : হ্যাঁ, সম্ক্রতি ইউএস কোস্ট গার্ডের ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট সিকিউরিটি (টিপিএস) দল আমাদের বন্দর পরিদর্শন করেছে। তাদের রিপোর্টে আমাদের কোনো বিচ্যুতি ধরা পড়েনি, অর্থাৎ আমরা সম্মানজনক জিরো অবজারভেশন পেয়েছি, যা আমাদের ইতিহাসের এক গৌরবময় অর্জন।

 

কালের কণ্ঠ : মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বে টার্মিনাল প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি কী?

এস এম মুনিরুজ্জামান : মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পটি আমাদের অন্যতম ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প, যা আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে কাজ করবে। সেখানে ড্রেজিংয়ের প্রস্তুতি চলছে। অন্যদিকে বে টার্মিনাল হবে দেশের প্রথম গ্রিন পোর্ট। এই প্রকল্পের মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের জন্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে এবং শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হবে।

 

কালের কণ্ঠ : বন্দর ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি অংশীদারি বা পিপিপি মডেল নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

এস এম মুনিরুজ্জামান : আমরা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি জোরদার করছি। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এবং পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনায় সুইজারল্যান্ডের মেডলগের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সই হয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইয়ার্ড এবং যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন নিয়ে বিশেষ কী কাজ হয়েছে?

এস এম মুনিরুজ্জামান : ক্রমবর্ধমান কন্টেইনারের চাপ সামলাতে ২০২৫ সালে আমরা ৭০ হাজার বর্গমিটার নতুন ইয়ার্ড নির্মাণ করেছি। এ ছাড়া অপারেশনাল গতি বাড়াতে রাজস্ব বাজেটের আওতায় ৩৫টি নতুন ইকুইপমেন্ট এবং নিজস্ব অর্থায়নে আরো ৮১টি ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফোর হাই স্ট্র্যাডেল ক্যারিয়ার, মোবাইল ক্রেন এবং লগ হ্যান্ডলারের মতো ভারী ও আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে, যা আমাদের হ্যান্ডলিং সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে গেছে।

 

কালের কণ্ঠ : ডিজিটাল বন্দর হিসেবে আপনারা ই-গেট পাস ব্যবস্থার কথা বলছিলেন। এতে ব্যবহারকারীরা কতটা উপকৃত হচ্ছে?

এস এম মুনিরুজ্জামান : এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। এখন ব্যবহারকারীরা সপ্তাহে সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা যেকোনো স্থান থেকে অনলাইনে গেট পাস সংগ্রহ ও ফি পরিশোধ করতে পারছেন। এতে যেমন জালিয়াতির সুযোগ কমেছে, তেমনি স্বচ্ছতা বেড়েছে। আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে প্রতি মাসে গড়ে ৬০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার গেট এন্ট্রি সম্কন্ন হচ্ছে, যা আমাদের ডিজিটাল অগ্রগতির প্রমাণ।

 

কালের কণ্ঠ : চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড পরিচালিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের পারফরম্যান্স কেমন?

এস এম মুনিরুজ্জামান : সেখানেও আমরা দারুণ সাফল্য পেয়েছি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই (জুলাই-ডিসেম্বর) ছয় লাখ ৯৮ হাজার ৬৬৮ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১০.১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। বিশেষ করে অক্টোবর মাসে ২০.১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : বন্দরের বিভিন্ন চার্জ (যেমনইয়ার্ড রেন্ট, ডক লেবার চার্জ) বাড়ানোর বিষয়ে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সিপিএর অবস্থান কী?

এস এম মুনিরুজ্জামান : চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর; এবং বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল গেটওয়ে চট্টগ্রাম বন্দর। পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবা প্রদানের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে নতুন নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করতে হচ্ছে। বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, যন্ত্রপাতি ক্রয়, জ্বালানি ব্যয়, সাপোর্ট ভেসেল ক্রয়, চলাচল ও মেরামত ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের মূল উৎস সেবা মাশুল বা ট্যারিফ। চট্টগ্রাম বন্দর দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে, অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের প্রণীত ট্যারিফের আওতায় বন্দর সেবা প্রদান করা হচ্ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বন্দরসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সময়োপযোগী ট্যারিফ হালনাগাদের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে স্কেনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান M/S, IDOM Consulting, Engineering & Architecture, Bilbao, Spain কে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক মূল্যস্ফীতি, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা বিবেচনা করে দীর্ঘ ৪০ বছর পরে যথাবিহিত প্রক্রিয়া অবলম্বন ও বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলাপের পর চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ সরকার কর্তৃক পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্ধিত ট্যারিফে প্রতি কেজি পণ্যে ভোক্তা পর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফের প্রভাব মাত্র ১২ পয়সা এবং প্রতি ১০০ টাকার পণ্যের মূল্যে ১৫ পয়সা। নতুন ট্যারিফ কাঠামোর মাধ্যমে অর্জিত রাজস্ব উন্নত অবকাঠামো, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম এবং বে টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল সম্ক্রসারণে ব্যবহৃত হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উন্নত সেবার মান নিশ্চিত হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আসবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসায়ীদের খরচ কমাবে। নতুন ট্যারিফ কাঠামো দেশের ব্যবসায়ীসমাজকে কোনো ধরনের অযাচিত চাপের মধ্যে ফেলবে না। বর্তমান ট্যারিফ যৌক্তিক ও ন্যূনতম পরিসরে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই পরিবর্তন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে দেশের আমদানি-রপ্তানিকারকরা সাশ্রয়ী কাঠামোর মধ্যেই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।

পৃথিবীর প্রতিটি আন্তর্জাতিক বন্দরের প্রাতিষ্ঠানিক ট্যারিফ পলিসি রয়েছে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিচালন ব্যয় বাজার ব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতা বিবেচনায় ট্যারিফ রিভিউ করা হয়। এরই মধ্যে চবক বোর্ড বাস্তবমুখী ট্যারিফ পলিসি প্রণয়নের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বাজারব্যবস্থা এবং প্রতিযোগিতা বিবেচনায় ট্যারিফ পলিসি নির্ধারণ করা হবে এবং সেই পলিসি মোতাবেক ভবিষ্যতে চবকের ট্যারিফ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হবে।

ট্যারিফ বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটররা নির্মীয়মাণ বে টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী ডিপ সি টার্মিনালে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতাও বৃদ্ধি পাবে।

 

বাজারের প্রতিটি খাদ্য নিরাপদ করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

ড. মোহাম্মদ মোস্তফা, সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

বাজারের প্রতিটি খাদ্য নিরাপদ করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের জীবন ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি মৌলিক অধিকার। খাদ্য হিসাবে প্রতিনিয়ত আমরা যা গ্রহণ করি, তা যদি অনিরাপদ হয়, তাহলে তার মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মসবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই বাংলাদেশ সরকার জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সকলের জন্য নিরাপদ খাদ্য রূপকল্প সামনে রেখে ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রণয়ন করে এবং ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) যাত্রা শুরু করে।

 

প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নতুন একটি রেগুলেটরি অথরিটির জন্য প্রথম ও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিজ্ঞানসম্মত শক্ত আইনগত কাঠামো তৈরি করা। কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের জন্য সুস্কষ্ট আইন, বিধি ও প্রবিধান অপরিহার্য। সে কারণেই ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের বড় অংশ জুড়ে ছিল আইন ও বিধিমালা প্রণয়নের কাজ। এই সময়টিকে অনেকেই প্রস্তুতির সময় হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এটি ছিল ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের মজবুত ভিত্তি স্থাপনের পর্ব। কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ সম্কন্ন করার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করে।

বাজারের প্রতিটি খাদ্য নিরাপদ করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

জনবল কাঠামো

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী মোট জনবল ছিল ৩৭১ জন। কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালে ঊর্ধ্বতন পদে প্রেষণে ও সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত মোট ১২৩ জন কর্মকর্তা, ১১৮ জন কর্মচারী এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১২৩ জন কাজ শুরু করেন। তবে বর্তমানে প্রায় ২৯টি পদ শূন্য রয়েছে। বাস্তবতা হলো, দেশব্যাপী খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিবীক্ষণ এবং নিরাপদ খাদ্যের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কার্যাবলির সমন্বয় সাধনের মতো বিশাল নেটওয়ার্কের তুলনায় এই জনবল খুবই সীমিত। প্রতিটি জেলায় একজন মাত্র কর্মকর্তা ও দুজন কর্মচারী দিয়ে পুরো জেলার খাদ্য নিরাপত্তা কার্যক্রম তদারক করতে হচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

 

কার্যক্রমের বিস্তৃত ক্ষেত্র

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাজ শুধু মোবাইল কোর্ট বা জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম বহুমাত্রিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক। এর মধ্যে রয়েছে রেগুলেটরি কার্যক্রম, নজরদারি ও মনিটরিং, আইন প্রয়োগ, শিখন ও প্রশিক্ষণ, সচেতনতা ও প্রচার, খাদ্য মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ, সহযোগিতা ও যোগাযোগ, খাদ্যঝুঁকি বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।

খাদ্য নিরাপত্তা একটি সমন্বিত বিষয়। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন ও বিক্রয়ের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। এই কাজ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কৃষি সম্ক্রসারণ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্কদ অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা অধিকারসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্ব্বয়ের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে।

 

আইন ও বিধিমালায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে তিনটি বিধিমালা এবং খাদ্যপণ্যের স্ট্যান্ডার্ড হারমোনাইজেশনের লক্ষ্যে ১২টি প্রবিধানমালা প্রণয়ন করেছে। এসব প্রবিধানে খাদ্যে অনুমোদিত খাদ্য সংযোজন দ্রব্যের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা, খাদ্যে রাসায়নিক দূষক ও বায়োলজিক্যাল দূষণ, খাদ্য স্কর্শক, খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বছরে দুটি প্রবিধাননিরাপদ খাদ্য (স্বাস্থ্য সহায়ক খাদ্য বা সম্কূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত খাদ্য, চিকিৎসাজনিত কারণে বিশেষ পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত খাদ্য, প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক খাদ্য) প্রবিধানমালা-২০২৫ ও নিরাপদ খাদ্য প্রবিধানমালা-২০২৫ প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে, যা ছয় মাসের মধ্যে কার্যকর হবে। ফলে দেশে পুষ্টিহীনতা মোকাবেলায় ও বিভ্রান্তিকর খাদ্য বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া আরো আটটি খসড়া প্রবিধিমালা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় নোটিফাই করা হয়েছে।

 

খাদ্য নমুনা পরীক্ষা ও ল্যাব কার্যক্রম

বর্তমানে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কোনো ল্যাব না থাকলেও সারা দেশে ৪৭টি ডেজিগনেটেড ল্যাবের মাধ্যমে খাদ্য পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খাদ্যের নিরাপত্তায় ঝুঁকিভিত্তিক ৮১ ধরনের খাদ্য থেকে এক হাজার ৭১৩টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএফএসএ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আটটি বিভাগীয় কার্যালয়ের আটটি মোবাইল ল্যাবের মাধ্যমে ৩৩টি প্যারামিটারে ৯ হাজার ৪২১টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এ ছাড়া ৬৪টি জেলায় স্থাপিত মিনিল্যাবের মধ্যে ৫৪টি সক্রিয় ল্যাবের মাধ্যমে ছয় হাজার ৫৭৫টি নমুনা পরীক্ষা সম্কন্ন করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে নজরদারিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।

 

পরিদর্শন, গ্রেডিং ও রপ্তানি কার্যক্রম

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়মিত খাদ্য স্থাপনা ও বাজার পরিদর্শন করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৯৬৯টি খাদ্য স্থাপনা এবং ২৬টি কোল্ড স্টোরেজ পরিদর্শন করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে গ্রেডিং পদ্ধতি অনুসরণ করে কর্তৃপক্ষের হোটেল-রেস্তোরাঁয় স্টিকার প্রদান এবং নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট এক হাজার ৯৯টি খাদ্য স্থাপনাকে বিভিন্ন গ্রেড (এ প্লাস, এ, বি) প্রদান করা হয়েছে, যা ভোক্তার জন্য একটি স্বচ্ছতা তৈরি করছে। রপ্তানি খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা রক্ষার্থে এবং বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনলাইন পদ্ধতিতে সার্টিফিকেট সিস্টেম চালু করা হয়েছে। গত অর্থবছরে ৬৭টি প্রতিষ্ঠানকে এই সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে, যা রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

 

আইন প্রয়োগ ও বিশেষ অভিযান

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিভিন্ন খাদ্য স্থাপনায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খাদ্য স্থাপনায় অসংগতি প্রাপ্তি সাপেক্ষে ১৫০টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১৫৩টি মামলা দায়ের এবং এক কোটি চার লাখ টাকা অর্থদণ্ড আদায় করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩৬টি বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে ৩৯৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৮২টি চলমান এবং ১১১টি নিষ্কত্তি হয়েছে। এ ছাড়া রমজান মাসসহ বিভিন্ন উৎসবকালে বিশেষ অভিযান ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শুধু গত রমজান মাসেই তিন হাজার ৩৩২টি খাদ্য স্থাপনা মনিটরিং করা হয়, যার মধ্যে ঢাকায়ই ৯৬০টি প্রতিষ্ঠান।

 

শাস্তির পাশাপাশি সচেতনতা

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে, শুধু শাস্তি দিয়ে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই সর্বসাধারণের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা সম্কর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিএফএসএ বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন (টিভিসি), লিফলেট, পোস্টার, খাদ্য ব্যবসায়ী ও খাদ্যকর্মী প্রশিক্ষণ, গৃহিণীদের উঠান বৈঠক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিদ্যালয়ে সেমিনার, জনসংযোগ বিজ্ঞপ্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের আওতায় বছরব্যাপী নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক ২৭টি অডিও বা ভিডিও টিভিসি প্রস্তুতপূর্বক ৯টি টেলিভিশন বিজ্ঞাপন (৪০৯মিনিট) প্রচার করা হয়। ফেসবুকে ৩০টি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২২ লাখ ৮০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া ২৮০টি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে ১১ হাজার ৭৪০ খাদ্য ব্যবসায়ী ও মসজিদের ইমাম, ৫০৮টি কর্মসূচির মাধ্যমে ৫০ হাজার ৮০০ জন শিক্ষার্থীকে এবং ২১৬টি উঠান বৈঠকের সাধ্যমে ছয় হাজার ৪৮০ জন গৃহিণীকে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা

বর্তমানে বাজেট ও জনবল সীমাবদ্ধতাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবু ভবিষ্যতের জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রয়োজনীয় সংশোধন, খাদ্য স্থাপনার বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্সিং বিধিমালা ও একটি জাতীয় খাদ্য স্থাপনা ডেটাবেইস তৈরি করা। বাংলাদেশের বাজারে থাকা প্রতিটি খাদ্য যেন নিরাপদ হয়, সেটিই বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের একমাত্র লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তোলা।

অনুলিখন : সজীব আহমেদ

মুনাফার পাশাপাশি সমাজের প্রতিও দায় আছে ব্যবসায়ীদের | কালের কণ্ঠ