কৃষিপণ্যের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহব্যবস্থা কোনো এক দিনে গড়ে ওঠা কাঠামো নয়। কয়েক শ বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভুল ও সংশোধনের মধ্য দিয়েই এই ব্যবস্থা আজকের রূপ পেয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালেই স্কষ্ট হয়, যখনই এই সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে, তখনই সমাজ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু উৎপাদনের সঙ্গে নয়, বরং উৎপাদিত পণ্য সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছানোর সক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
ইতিহাসের শিক্ষা : সাপ্লাই চেইন বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষ : বাংলা অঞ্চলের বড় তিনটি দুর্ভিক্ষ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর মূল কারণ শুধু খাদ্যের অভাব ছিল না; বরং সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতা ও পরিবহন কাঠামোর ভেঙে পড়াই ছিল প্রধান নিয়ামক। ১৭৭০ সালের ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’-এ খরা অবশ্যই একটি কারণ ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ ছিল তৎকালীন বাফার স্টক বা আপৎকালীন খাদ্য মজুদের অনুপস্থিতি এবং দুর্বল বণ্টনব্যবস্থা। খাদ্যশস্য গ্রাম থেকে অভাবগ্রস্ত মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছতে পারেনি।
১৯৪৩ সালের ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ ছিল সাপ্লাই চেইন ধ্বংসের এক নির্মম উদাহরণ। নদীমাতৃক বাংলায় নৌকা ছিল পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ শাসকরা ‘বোট ডিনায়াল পলিসি’ গ্রহণ করে হাজার হাজার নৌকা ধ্বংস বা বাজেয়াপ্ত করে। এর ফলে উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে খাদ্য পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং কৃত্রিম সংকট ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষেও আমরা দেখি, স্বাধীন দেশে খাদ্য উৎপাদন একেবারে শূন্য ছিল না, কিন্তু বণ্টনব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং তথ্যের অভাব সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় খাদ্য পৌঁছতে দেয়নি। এই তিনটি ঘটনাই আমাদের একটি বিষয় স্কষ্ট করে শেখায়, সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়লে উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও মানুষ অনাহারে মরতে পারে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট : প্রযুক্তি কেন অপরিহার্য ইতিহাসের এই শিক্ষা থেকেই বোঝা যায়, শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; সেই উৎপাদনের পথটিও নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। অতীতের ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’-এর ঝুঁকি কমানোর একমাত্র কার্যকর উপায় হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। আজকের দিনে রিয়াল-টাইম ডেটা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ডেটা অ্যানালিটিকসের মাধ্যমে মুহূর্তেই জানা সম্ভব, কোন জেলায় চালের মজুদ কত, কোথায় আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এই তথ্য থাকলে ১৯৭৪-এর মতো বণ্টন বিপর্যয় অনেকাংশেই এড়ানো যেত।
ডিজিটাল লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম, যেমন—ট্রাক বা কার্গো ভাড়ার অ্যাপ পরিবহন সংকটের ঝুঁকি কমাতে পারে। কৃষক সরাসরি পরিবহন নিশ্চিত করতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্যও হ্রাস পায়। একইভাবে আইওটিভিত্তিক কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা পচনশীল পণ্যের অপচয় কমিয়ে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়াতে পারে।
ই-কমার্স ও গ্রামীণ বাজার : তত্ত্ব আর বাস্তবতার ফারাক : ই-কমার্স নিয়ে যত আলোচনা হয়, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক ভিন্ন। বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো প্রায় পুরোপুরি শত বছরের পুরনো হাট-বাজার ও আড়ত কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ই-কমার্সের অংশগ্রহণ এখানে নগণ্য।
আস্থার সংকট ও নিয়ন্ত্রণহীনতা : আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক ক্ষেত্রে ভেজাল পণ্যের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। চটকদার ছবি ও বিজ্ঞাপনের আড়ালে নিম্নমানের পণ্য বিক্রি হওয়ায় ভোক্তাদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এই সংকট আরো ঘনীভূত করেছে। মাঠ পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি না থাকায় অনলাইন বাজার অনেক সময় প্রতারণার ফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য :ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ধারণা তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। রিয়াল-টাইম ডেটা থাকলে পরিকল্পিত চাষাবাদ, সাপ্লাই-ডিমান্ডের ভারসাম্য এবং কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবে এর পথে সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তি নয়, বরং স্বার্থের সংঘাত। ডিজিটাল স্বচ্ছতা মানেই মজুদদারি ও সিন্ডিকেটের তথ্য প্রকাশ্যে আসা, যা বর্তমান সুবিধাভোগীরা কোনোভাবেই চাইবে না। রেলওয়ে বা বিমান খাতের অভিজ্ঞতা দেখায়, কিভাবে ডিজিটাল উদ্যোগ ভেতর থেকেই বাধাগ্রস্ত হয়।
স্থানীয় উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ অবকাঠামোর গুরুত্ব : স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি হলে কর্মসংস্থান বাড়ে, অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। কিন্তু বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় বাধা হলো অর্থায়নের অভাব, দুর্বল ভিসি ইকোসিস্টেম এবং ব্যাংকঋণের জটিল কাঠামো। করোনা মহামারি প্রমাণ করেছে, গ্রামীণ অর্থনীতিই ছিল দেশের সবচেয়ে বড় ‘শক অ্যাবজরবার’। কোরবানির ঈদের সময় শহর থেকে গ্রামে অর্থপ্রবাহ একটি প্রাকৃতিক সম্কদ পুনর্বণ্টনের উদাহরণ। গ্রামে লজিস্টিকস, বিদ্যুৎ, স্টোরেজ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে শহরের তুলনায় বেশি রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। কাঁচামালের উৎসর কাছাকাছি শিল্প স্থাপন করলে পরিবহন খরচ ও অপচয় কমে। পাশাপাশি রিভার্স মাইগ্রেশন শহরের ওপর চাপ কমাতে পারে।
গ্রামীণ অর্থনীতি বাংলাদেশের একটি ঘুমন্ত দৈত্য। প্রযুক্তি একে জাগাতে পারে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন অবকাঠামো, স্বচ্ছতা, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এসব ছাড়া প্রযুক্তি শুধু একটি আকর্ষণীয় শব্দই থেকে যাবে। সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন চাইলে আমাদের দৃষ্টি শহর থেকে সরিয়ে গ্রামের দিকে ফেরাতেই হবে; কারণ সেখানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত।
সরকারি পর্যায়ে মেন্টরশিপ ও দক্ষতার সংকট : প্রাইভেট সেক্টরে উদ্যোক্তা উন্নয়নে মেন্টরশিপ ও দক্ষ জনবলের কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও সরকারি পর্যায়ে চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। এখানে উদ্যোক্তাদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো যোগ্য মেন্টর বা অভিভাবকের চরম অভাব রয়েছে। ফলে তরুণ উদ্যোক্তারা সরকারি সহায়তা কাঠামো থেকে কার্যকর সহযোগিতা পাচ্ছেন না। বিসিএস ও আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা—যাঁরা নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছেন, বিশেষ করে বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা, তাঁদের অনেকেরই আধুনিক ব্যবসা বা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম সম্কর্কে সুস্কষ্ট ধারণা নেই। তাঁদের চিন্তাধারা এখনো অনেকাংশে প্রাচীন ও অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আবদ্ধ, যা উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষ মানবসম্কদের অভাব—সরকারি কাঠামোর ভেতরে এমন দক্ষ মানবসম্কদের অভাব প্রকট, যাঁরা একজন তরুণ উদ্যোক্তার ভাষা বুঝবেন, তার সমস্যাগুলো অনুধাবন করবেন এবং বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিতে পারবেন। এই ঘাটতি উদ্যোক্তা উন্নয়নের গতি আরো ধীর করে দিচ্ছে।
এসএমই ও ব্যাংকঋণের কঠিন বাস্তবতা : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা—আমাদের ব্যাংকিং কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে একজন ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক উদ্যোক্তার পক্ষে ব্যাংকঋণ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কঠোর শর্ত, অতিরিক্ত কাগজপত্র এবং জামানতের বেড়াজালে পড়ে ব্যাংকগুলো মূলত বড় উদ্যোক্তাদেরই ঋণ দেয়। ফলে ছোট উদ্যোক্তারা অর্থায়নের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে।
সম্ভাবনা ও করণীয়—স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, এটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যত দিন না উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তাদের মানসিকতায় আধুনিক ও বাস্তবমুখী পরিবর্তন আসছে এবং ব্যাংকঋণের কাঠামো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাবান্ধব হচ্ছে, তত দিন এই বিপুল সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। এই জটগুলো খুলতে পারলেই কেবল স্থানীয় অর্থনীতিতে সত্যিকারের গতি আসবে।





বাংলাদেশে কৃষকের হাতে থাকে প্রায় ৩০ শতাংশ, আর ৭০ শতাংশ মূল্য বিভিন্ন স্তরে হারিয়ে যায় অনিয়ন্ত্রিত পরিবহনব্যবস্থা, হাতবদল, চাঁদাবাজি, অনিয়ম ও অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া কোনো ধরনের বাজারস্থিরতা সম্ভব নয়।
