২০২৪-২৫ অর্থবছরে নতুন এক মাইলফলকে পৌঁছেছে দেশের প্রবাসী আয়। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই বৈদেশিক আয় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সপ্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, এই রেকর্ড রেমিট্যান্স আয়ের সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে সৌদি আরব।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু সৌদি আরব থেকেই বাংলাদেশে এসেছে প্রায় সাত থেকে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স, যা মোট বৈদেশিক আয়ের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ, যদিও বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। গৃহকর্ম, নির্মাণ, কৃষি, পরিষেবা, রেস্টুরেন্ট, ট্রান্সপোর্টসহ বিভিন্ন খাতে এই বিপুলসংখ্যক কর্মী নিযুক্ত রয়েছেন।
এই রেমিট্যান্সপ্রবাহে সৌদি আরবের নেতৃত্ব দেওয়ার পেছনে রয়েছে কয়েকটি প্রধান কারণ। প্রথমত, কর্মীর বিপুল সংখ্যা; দ্বিতীয়ত, এই কর্মীদের একটি বড় অংশ নিয়মিত বেতনভুক্ত এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈধভাবে টাকা পাঠানো। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে বিমান যোগাযোগ সহজ এবং দেশটির ব্যাংকিং অবকাঠামো শক্তিশালী হওয়ায় অর্থ পাঠানোও সহজ। ফলে হুন্ডির চেয়ে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা সেখানে বেশি দেখা যায়।
তা ছাড়া সৌদি আরব ইসলামের পবিত্র স্থান হওয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে সেখানে কাজ করার প্রতি অতিরিক্ত একটি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুপ্রেরণা রয়েছে। এতে তাঁরা দীর্ঘ মেয়াদে অবস্থান করে নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠান।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরব সরকারের মধ্যে শ্রমবাজার বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ও চুক্তির কারণে কয়েক বছর ধরে রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া অনেকটাই স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল হয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড, বিএমইটি ও দূতাবাসের সমন্বয়ে পরিচালিত এসব উদ্যোগ প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করেছে।
চলতি বছরের জুন মাসে দেশে এসেছে ২৮২ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৪ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে)। শুধু সৌদি আরব থেকেই এসেছে ৪৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা মাসটির রেমিট্যান্স উৎসর তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য (৩৬ কোটি ২০ লাখ), মালয়েশিয়া (৩৫ কোটি ৮৮ লাখ), আরব আমিরাত (৩২ কোটি ৩৯ লাখ), যুক্তরাষ্ট্র (২৩ কোটি ৮১ লাখ)। এরপর আছে ওমান, ইতালি, কুয়েত, কাতার ও সিঙ্গাপুর। এপ্রিলে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৭৫ কোটি ১৯ লাখ ডলার। সেই মাসেও সৌদি প্রবাসীরা ৪৯ কোটি ১৪ লাখ ডলার পাঠিয়ে শীর্ষে ছিলেন। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল আরব আমিরাত (৩৭ কোটি ২১ লাখ)। এরপর ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, কুয়েত, ইতালি, ওমান, সিঙ্গাপুর ও কাতার। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী বিদেশে পাঠানো হলে এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি ভারতের মতো কর্মী বাজার ধরতে পারলে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক আয় অর্জনও অসম্ভব নয়। কারণ ভারতের প্রবাসীরা একই ধরনের কাজে বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ আয় করেন, শুধু দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের কারণে।
সার্বিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরব, বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য রেমিট্যান্সখনি। এই সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার করতে পারলে রেমিট্যান্স হতে পারে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।