দেশে প্রবাস আয়ের নতুন রেকর্ড এক ঐতিহাসিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে এক বছরের হিসাবে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এটি আগে কখনো হয়নি। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে রেমিট্যান্সের এ পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে এবং রেমিট্যান্স আরো বাড়াতে হলে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী বিদেশে পাঠানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দক্ষ কর্মীরা উচ্চ বেতনের চাকরিতে নিয়োজিত হতে পারেন, যার ফলে তাঁরা দেশেও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যেসব কর্মী বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন, তাঁদের দক্ষ করে তোলা গেলে দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহে বিপুল পরিবর্তন আসতে পারে। এমনকি রেমিট্যান্স ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। শুধু হুন্ডি বন্ধ করতেই যে ৫০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করা সম্ভব, সেই ধারণা অনেক আগে থেকেই উঠে আসছে সংশ্লিষ্ট মহলে। তার সঙ্গে যদি দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টি যুক্ত করা যায়, তাহলে এ খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরো বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো দক্ষতা ও পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর্মীরা এখনো অনেকটা পিছিয়ে রয়েছেন প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে ভারত ও পাকিস্তানের কর্মীরা একই ধরনের কাজের জন্য বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ বা তারও বেশি বেতন পাচ্ছেন। মূল কারণ হলো তাদের বেশির ভাগই প্রশিক্ষিত, ইংরেজি ভাষায় দক্ষ এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার আওতায় প্রেরিত।
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় নির্বাহ, মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে এই আয় প্রধান ভূমিকা রাখে। গত অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো আয় বৈদেশিক ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবাহকেও ছাপিয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই সময় দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার। প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও বিদেশগামীদের পূর্বপ্রস্তুতির জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত কর্মসূচি চালু করলে পরবর্তী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারবে। সদ্যোবিদায়ি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়ের প্রবাহ নতুন রেকর্ড গড়েছে। গত অর্থবছরে (জুলাই ২০২৪-জুন ২০২৫) দেশে মোট ৩০ হাজার ৩২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) তুলনায় ২৬.৮ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরে দেশে এসেছিল ২৩ হাজার ৯১২ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু জুন মাসেই (১ থেকে ৩০ জুন) দেশে এসেছে দুই হাজার ৮১৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যেখানে গত বছরের একই সময়ে (জুন ২০২৪) এসেছিল দুই হাজার ৫৩৯ মিলিয়ন ডলার। ফলে মাসওয়ারি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হুন্ডি রোধে সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রাখা, ব্যাংকিং চ্যানেলে সহজ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি—কয়েকটি কারণেই রেমিট্যান্সপ্রবাহে এই উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে।
গত ৩০ জুন এক দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১১৩ মিলিয়ন ডলার, যা মাসের শেষ দিনে উল্লেখযোগ্য একটি প্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ‘নেট ইন্টারন্যাশনাল রিজার্ভ’ (এনআইআর) সংক্রান্ত শর্ত পূরণে রেমিট্যান্সপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে এনআইআরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও এই রেমিট্যান্স সহায়ক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঊর্ধ্বমুখী রেমিট্যান্সপ্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি ডলারের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে এবং আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হবে।
তবে রেমিট্যান্সপ্রবাহে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে দক্ষ ও আধাদক্ষ কর্মী পাঠানো বাড়াতে হবে এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের (সিএসপিএস) নির্বাহী পরিচালক ড. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর মাত্র আট মাসে যদি সাত বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বাড়তে পারে, তাহলে দেশে আস্থাবান সরকার থাকলে ও অভিজ্ঞ লোক পাঠাতে পারলে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই বার্ষিক রেমিট্যান্স ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট রিজিমে দেশের সামষ্টিক রিজার্ভ ২০২০ সালে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর তা পাচার হয়ে গেছে। গত এক বছরে দেশের অর্থনীতি খাদের কিনারা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। তবে এই সরকারের প্রতি প্রবাসী ভাই-বোনদের আস্থা বেড়েছে। তাই তাঁরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি আশীর্বাদ। প্রণোদনা দিয়ে হোক বা লাউঞ্জ সুবিধা দিয়ে হোক, যেভাবেই হোক না কেন প্রবাসীদের সম্মান করতে হবে।