• ই-পেপার

‘অগ্রণী রেমিট’ অ্যাপ সেবা আরো দেশে চালু করা হবে

  • রেমিট্যান্স সংগ্রহের দিক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে অগ্রণী ব্যাংক। প্রবাসীদের আকর্ষণে রেমিট্যান্স সেবার পরিধি আরো বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটি। এসব বিষয়ে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন অগ্রণী ব্যাংকের এমডি এবং সিইও মো. আনোয়ারুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. জয়নাল আবেদীন

রেমিট্যান্সে যুক্তরাষ্ট্রের ১% কর ২০২৬ সাল থেকে

বাণিজ্য ডেস্ক
রেমিট্যান্সে যুক্তরাষ্ট্রের ১% কর ২০২৬ সাল থেকে

বাণিজ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের পর এবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ১ শতাংশ কর আরোপ করছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস ও সিনেটে অনুমোদিত ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট-এর ক্ষমতাবলে এ কর আরোপ করা হবে। যদিও শুরুতে ৫ শতাংশ কর আরোপ করার কথা থাকলেও পরে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন হয় ১ শতাংশ। এ আইন কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশিসহ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানো ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে বৈধপথে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট অনুযায়ী, যেসব মানি ট্রান্সফার যেমন ক্যাশ, মানি অর্ডার বা ক্যাশিয়ারস চেক সেন্ড করা হয় বিদেশে, সে ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ফেডারেল রেমিট্যান্স কর আরোপ করা হবে। এই ১ শতাংশ রেমিট্যান্স কর কার্যকর হবে ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে।

কর কোথায় প্রযোজ্য নয় : ব্যাংক থেকে ডিজিটাল ট্রান্সফার বা যুক্তরাষ্ট্র ইস্যুকৃত ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে পাঠানো টাকাএসব ক্ষেত্রে কর আরোপ করা হবে না।

কর কে সংগ্রহ করবে : এই কর সংগ্রহ করবেন মানি ট্রান্সফার সার্ভিস প্রোভাইডার এবং তা পরবর্তী সময়ে আইআরএস এ জমা দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস ও সিনেটে প্রথমে ৫ শতাংশ করের প্রস্তাব এলেও চূড়ান্ত আইন অনুযায়ী সেটা ১ শতাংশে ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হয়েছে।

 

দেশের রেমিট্যান্সে শীর্ষে সৌদি আরব

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের রেমিট্যান্সে শীর্ষে সৌদি আরব

২০২৪-২৫ অর্থবছরে নতুন এক মাইলফলকে পৌঁছেছে দেশের প্রবাসী আয়। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই বৈদেশিক আয় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সপ্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, এই রেকর্ড রেমিট্যান্স আয়ের সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে সৌদি আরব।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু সৌদি আরব থেকেই বাংলাদেশে এসেছে প্রায় সাত থেকে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স, যা মোট বৈদেশিক আয়ের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ, যদিও বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। গৃহকর্ম, নির্মাণ, কৃষি, পরিষেবা, রেস্টুরেন্ট, ট্রান্সপোর্টসহ বিভিন্ন খাতে এই বিপুলসংখ্যক কর্মী নিযুক্ত রয়েছেন।

এই রেমিট্যান্সপ্রবাহে সৌদি আরবের নেতৃত্ব দেওয়ার পেছনে রয়েছে কয়েকটি প্রধান কারণ। প্রথমত, কর্মীর বিপুল সংখ্যা; দ্বিতীয়ত, এই কর্মীদের একটি বড় অংশ নিয়মিত বেতনভুক্ত এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈধভাবে টাকা পাঠানো। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে বিমান যোগাযোগ সহজ এবং দেশটির ব্যাংকিং অবকাঠামো শক্তিশালী হওয়ায় অর্থ পাঠানোও সহজ। ফলে হুন্ডির চেয়ে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা সেখানে বেশি দেখা যায়।

তা ছাড়া সৌদি আরব ইসলামের পবিত্র স্থান হওয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে সেখানে কাজ করার প্রতি অতিরিক্ত একটি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুপ্রেরণা রয়েছে। এতে তাঁরা দীর্ঘ মেয়াদে অবস্থান করে নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠান।

বাংলাদেশ ও সৌদি আরব সরকারের মধ্যে শ্রমবাজার বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ও চুক্তির কারণে কয়েক বছর ধরে রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া অনেকটাই স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল হয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড, বিএমইটি ও দূতাবাসের সমন্বয়ে পরিচালিত এসব উদ্যোগ প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করেছে।

চলতি বছরের জুন মাসে দেশে এসেছে ২৮২ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৪ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে)। শুধু সৌদি আরব থেকেই এসেছে ৪৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা মাসটির রেমিট্যান্স উৎসর তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য (৩৬ কোটি ২০ লাখ), মালয়েশিয়া (৩৫ কোটি ৮৮ লাখ), আরব আমিরাত (৩২ কোটি ৩৯ লাখ), যুক্তরাষ্ট্র (২৩ কোটি ৮১ লাখ)। এরপর আছে ওমান, ইতালি, কুয়েত, কাতার ও সিঙ্গাপুর। এপ্রিলে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৭৫ কোটি ১৯ লাখ ডলার। সেই মাসেও সৌদি প্রবাসীরা ৪৯ কোটি ১৪ লাখ ডলার পাঠিয়ে শীর্ষে ছিলেন। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল আরব আমিরাত (৩৭ কোটি ২১ লাখ)। এরপর ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, কুয়েত, ইতালি, ওমান, সিঙ্গাপুর ও কাতার। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী বিদেশে পাঠানো হলে এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি ভারতের মতো কর্মী বাজার ধরতে পারলে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক আয় অর্জনও অসম্ভব নয়। কারণ ভারতের প্রবাসীরা একই ধরনের কাজে বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ আয় করেন, শুধু দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের কারণে।

সার্বিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরব, বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য রেমিট্যান্সখনি। এই সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার করতে পারলে রেমিট্যান্স হতে পারে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।

 

রেমিট্যান্স পাঠানোর সহজ ইকোসিস্টেম করেছে বিকাশ

দেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ, দ্রুত, নিরাপদ ও কাগজপত্রের ঝামেলামুক্ত করেছে মোবাইল আর্থিক সেবা। ফলে প্রবাসীদের কাছে এ সেবা দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব বিষয়ে কথা বলেন বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদ

রেমিট্যান্স পাঠানোর সহজ ইকোসিস্টেম করেছে বিকাশ
আলী আহম্মেদ, চিফ কমার্শিয়াল অফিসার, বিকাশ

রেমিট্যান্স পাঠানো কতটা সহজ করতে পেরেছে মোবাইল আর্থিক সেবা?

প্রথাগত পদ্ধতিতে কিছুটা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রেমিট্যান্স পাঠাতে হয়। এখন প্রবাসীরা চাইলে এমএফএসের মাধ্যমে যেকোনো মুহূর্তে, দ্রুত ও সহজে দেশে থাকা তাদের প্রিয়জনদেন কাছে টাকা পাঠাতে পারছেন। প্রেরক যেমন খুব সহজে টাকা পাঠাতে পারছেন, তেমনি প্রাপককে কোথাও যেতে হচ্ছে না, লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না, সরাসরি হাতে থাকা মোবাইল অ্যাকাউন্টেই টাকাটা পৌঁছে যাচ্ছে। এমএফএসের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর আরেকটি বড় সুবিধা হলো জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক টাকা পাঠানো। দেশে থাকা পরিবার-পরিজনের যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে বিদেশে বসে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ তাদের বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে পারছেন প্রবাসীরা। এমনকি ছুটির দিনেও তাঁরা টাকা নিতে পারছেন এবং টাকা মোবাইল অ্যাকাউন্টে আসার পরপরই তাদের প্রয়োজনমতো খরচও করতে পারছেন। ফলে প্রবাসী ও তাদের প্রিয়জন-উভয়ের জন্যই এটি অত্যন্ত কার্যকর সেবা হয়ে উঠেছে।

 

বিকাশের মাধ্যমে কত দেশ থেকে রেমিট্যান্স আসছে?

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ১৪০টিরও বেশি দেশ থেকে শতাধিক আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার অপারেটরের (এমটিও) মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন প্রবাসীরা, যা দেশের ২৫টি শীর্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংকে নিষ্পত্তির (সেটলমেন্ট) মাধ্যমে নিমেষেই পৌঁছে যাচ্ছে প্রিয়জনের বিকাশ অ্যাকাউন্টে। এ পর্যন্ত দেশে থাকা প্রিয়জনের ৪০ লাখেরও বেশি বিকাশ অ্যাকাউন্টে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স সবচেয়ে সহজে তাঁর প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দিতে ধারাবাহিকভাবে নানা সুবিধা যুক্ত করে চলেছে বিকাশ।

বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনতে বিশেষ করে হুন্ডি প্রতিরোধে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো কী ভূমিকা রাখছে এবং প্রবাসীদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা কেমন?

অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের রেমিট্যান্স মোকাবেলা অর্থনীতির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। প্রবাসীরা অনেক সময় কাগুজে প্রক্রিয়া এড়াতে কিংবা সময়ের অভাবে অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি বেছে নেয়।  তাদের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানোর সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর ইকো সিস্টেম তৈরি করেছে বিকাশ। লাস্ট মাইল সলিউশন প্রোভাইডার হিসেবে বিকাশে পাঠানো রেমিট্যান্স হাতে পৌঁছে যাওয়ায় প্রবাসীর পরিবার-প্রিয়জনদের জীবনমান বাড়ছে। সহজে এই রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ অবৈধ পথে অর্থ পাঠানোকে নিরুৎসাহ করছে। সংক্ষেপে, স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা ও দ্রুততার কারণে প্রবাসীদের মাঝে এমএফএস সেবা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। শুধু তা-ই নয়, বিদেশ থেকে দ্রুত রেমিট্যান্স পাঠাতে পারা এবং তা হাঁটা দূরত্বে বাড়ির পাশের এজেন্ট পয়েন্ট থেকে তুলতে পারায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বিকাশের রেমিট্যান্স সেবা।

বিকাশে রেমিট্যান্স পাঠালে দেশে থাকা স্বজনদের কী সুবিধা হয়? তাদের দৈনন্দিন লেনদেনে কি পরিবর্তন আসছে?

একটা গল্প বলি, কোনো এক ঝড়ের রাতে গ্রামের এক সন্তানসম্ভাবনা নারীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেই রাতে জরুরি অপারেশনের জন্য তাৎক্ষণিক বিকাশে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে টাকা পাঠান তাঁর প্রবাসী স্বামী। এ রকম অসংখ্য গল্প বলা যাবে। শত প্রয়োজনে বিকাশ এখন সব পরিবারের সঙ্গী। এখন প্রবাসীর স্বজনরা বিকাশে আসা রেমিট্যান্সের টাকা দিয়ে বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকেই মোবাইল রিচার্জ, সেভিংস, কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, এনজিওর কিস্তি দেওয়া, স্কুল-কলেজের ফি পরিশোধসহ প্রয়োজনমতো টাকা উত্তোলন করাসহ অসংখ্য কাজে ব্যবহার করতে পারছেন। এটি শুধু আর্থিক সুরক্ষা নয়, দৈনন্দিন জীবনেও স্বাচ্ছন্দ্য এনেছে। নগদ টাকার ঝামেলা কমেছে এবং নারী সদস্যরাও সরাসরি টাকা ব্যবহার করতে পারছেন, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়াতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরো কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঠিক দিকনির্দেশনা, ব্যাংকের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বিতরণ সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ডিজিটাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অবৈধ দেনদেন প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি করতে হবে। একই সঙ্গে, প্রবাসীরা যাতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহী হয়, সে জন্য সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা আরো জোরদার করতে হবে।

প্রবাস আয়

দক্ষ কর্মী পাঠালে ১০০ বিলিয়ন ডলার সম্ভব

নিজস্ব প্রতিবেদক
দক্ষ কর্মী পাঠালে ১০০ বিলিয়ন ডলার সম্ভব
পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা থাকলে প্রবাসীরা বর্তমানে দ্বিগুণ আয় করতে পারেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশে প্রবাস আয়ের নতুন রেকর্ড এক ঐতিহাসিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে এক বছরের হিসাবে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এটি আগে কখনো হয়নি। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে রেমিট্যান্সের এ পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে এবং রেমিট্যান্স আরো বাড়াতে হলে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী বিদেশে পাঠানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দক্ষ কর্মীরা উচ্চ বেতনের চাকরিতে নিয়োজিত হতে পারেন, যার ফলে তাঁরা দেশেও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যেসব কর্মী বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যাচ্ছেন, তাঁদের দক্ষ করে তোলা গেলে দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহে বিপুল পরিবর্তন আসতে পারে। এমনকি রেমিট্যান্স ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। শুধু হুন্ডি বন্ধ করতেই যে ৫০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করা সম্ভব, সেই ধারণা অনেক আগে থেকেই উঠে আসছে সংশ্লিষ্ট মহলে। তার সঙ্গে যদি দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টি যুক্ত করা যায়, তাহলে এ খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরো বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো দক্ষতা ও পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর্মীরা এখনো অনেকটা পিছিয়ে রয়েছেন প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে ভারত ও পাকিস্তানের কর্মীরা একই ধরনের কাজের জন্য বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ বা তারও বেশি বেতন পাচ্ছেন। মূল কারণ হলো তাদের বেশির ভাগই প্রশিক্ষিত, ইংরেজি ভাষায় দক্ষ এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার আওতায় প্রেরিত।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় নির্বাহ, মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে এই আয় প্রধান ভূমিকা রাখে। গত অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো আয় বৈদেশিক ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবাহকেও ছাপিয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই সময় দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার। প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও বিদেশগামীদের পূর্বপ্রস্তুতির জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত কর্মসূচি চালু করলে পরবর্তী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারবে। সদ্যোবিদায়ি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়ের প্রবাহ নতুন রেকর্ড গড়েছে। গত অর্থবছরে (জুলাই ২০২৪-জুন ২০২৫) দেশে মোট ৩০ হাজার ৩২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) তুলনায় ২৬.৮ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরে দেশে এসেছিল ২৩ হাজার ৯১২ মিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু জুন মাসেই (১ থেকে ৩০ জুন) দেশে এসেছে দুই হাজার ৮১৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যেখানে গত বছরের একই সময়ে (জুন ২০২৪) এসেছিল দুই হাজার ৫৩৯ মিলিয়ন ডলার। ফলে মাসওয়ারি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হুন্ডি রোধে সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রাখা, ব্যাংকিং চ্যানেলে সহজ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকয়েকটি কারণেই রেমিট্যান্সপ্রবাহে এই উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে।

গত ৩০ জুন এক দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১১৩ মিলিয়ন ডলার, যা মাসের শেষ দিনে উল্লেখযোগ্য একটি প্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নেট ইন্টারন্যাশনাল রিজার্ভ (এনআইআর) সংক্রান্ত শর্ত পূরণে রেমিট্যান্সপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে এনআইআরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও এই রেমিট্যান্স সহায়ক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঊর্ধ্বমুখী রেমিট্যান্সপ্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি ডলারের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে এবং আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হবে।

তবে রেমিট্যান্সপ্রবাহে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে দক্ষ ও আধাদক্ষ কর্মী পাঠানো বাড়াতে হবে এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের (সিএসপিএস) নির্বাহী পরিচালক ড. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর মাত্র আট মাসে যদি সাত বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বাড়তে পারে, তাহলে দেশে আস্থাবান সরকার থাকলে ও অভিজ্ঞ লোক পাঠাতে পারলে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই বার্ষিক রেমিট্যান্স ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট রিজিমে দেশের সামষ্টিক রিজার্ভ ২০২০ সালে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর তা পাচার হয়ে গেছে। গত এক বছরে দেশের অর্থনীতি খাদের কিনারা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। তবে এই সরকারের প্রতি প্রবাসী ভাই-বোনদের আস্থা বেড়েছে। তাই তাঁরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি আশীর্বাদ। প্রণোদনা দিয়ে হোক বা লাউঞ্জ সুবিধা দিয়ে হোক, যেভাবেই হোক না কেন প্রবাসীদের সম্মান করতে হবে।

 

‘অগ্রণী রেমিট’ অ্যাপ সেবা আরো দেশে চালু করা হবে | কালের কণ্ঠ