সম্প্রতি দেশের বিদ্যুৎ সংকটকালে আলোচনায় এসেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে। সে জায়গায় অনেকটা পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। দেশের বর্তমানে চার কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ৫১টি পরিবার রয়েছে। তার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে মাত্র ৫৯ হাজার ৬৪৫টি পরিবার। শতাংশের হারে ১.৪৫ শতাংশ। দেশের চার কোটি ২৯ হাজার ৯১১টি পরিবার জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সুবিধা নিয়ে থাকে। তবে দেশে বিদ্যুত্হীন পরিবার রয়েছে তিন লাখ সাত হাজার ৫৭৫টি। সম্প্রতি ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রতিবেদন ২০২২’-এর প্রাথমিক ফলাফলে উঠে এসেছে এসব তথ্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশকে এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে। কারণ জ্বালানির বিশ্ব বাজারে অস্থিরতা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরশক্তি থেকে কিভাবে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। সরকার এরই মধ্যে নবায়নয়োগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগে তেমন কোনো সুফল আসেনি। নতুন করে সরকার নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে চার হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছে। মূলত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর জন্যই মূলত এই উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। এই উৎপাদনের অর্ধেক অর্থাৎ দুই হাজার ২৭৭ মেগাওয়াট আসবে সৌরশক্তি থেকে। পানি ও বায়ু ব্যবহার করে উৎপাদন হবে যথাক্রমে এক হাজার ও ৫৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ২০২১ সালে শেষ হওয়া ‘জলবায়ু পরিবর্তন শীর্ষ সম্মেলন কপ-২৬’-এ এই পরিকল্পনা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ যদি এনডিসিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে, তাহলে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে পৌঁছাবে। জনশুমারি ও গৃহগণনার ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, দেশের চার কোটি ২৯ হাজার ৯১১টি পরিবার জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সুবিধা নিয়ে থাকে। শতাংশের হারে তা ৯৭.৬১ শতাংশ। আর জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎ সুবিধা পেয়ে থাকে ৭৭ হাজার ৯১৯টি পরিবার। তিন লাখ সাত হাজার ৫৭৫টি পরিবারে নেই বিদ্যুৎ সুবিধা, যা ০.৭৫ শতাংশ। দেশের বিদ্যুত্সংকট দূরীকরণ ও সংকট সমাধানের জন্য বর্তমানে কী করণীয় এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষঞ্জ ম. তামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার এখন যেসব বিদ্যুেকন্দ্র চালাচ্ছে তা প্রধানত জ্বালানিনির্ভর। সেই জায়গা থেকে আমাদের বের হতে হবে। ধীরে ধীরে নাবয়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে। সরকার এরই মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সেই পদক্ষেপগুলো আরো জোরদার করে কাজ করতে হবে। বেশ কিছু জায়গায় সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, তবে তার আওতা আরে বাড়াতে হবে।’ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জাতীয়ভাবে বিদ্যুেসবা থেকে বঞ্চিত ০.৭৫ শতাংশ পরিবার। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুেসবা পেয়ে আসছে ৯৭.৬১ শতাংশ পরিবার। বিভাগওয়ারি সব থেকে বেশি বিদ্যুত্হীন পরিবার রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এই বিভাগে বিদ্যুতের সেবা থেকে বঞ্চিত ১.২৩ শতাংশ পরিবার। এই বিভাগের ৯৩.৯৭ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ পেয়ে থাকে জাতীয় গ্রিড থেকে। ৫.০৬ শতাংশ পরিবার সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ পায় ০.৩৪ শতাংশ পরিবার। এর পরেই বেশি বিদ্যুত্হীন পরিবার রয়েছে সিলেটে। শতাংশের হারে তা ১.২১ শতাংশ। এই বিভাগের ৯৭.৭৫ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ পেয়ে থাকে জাতীয় গ্রিড থেকে। ০.৭১ শতাংশ পরিবার সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ পায় ০.৩২ শতাংশ পরিবার। সিলেটের পরই রংপুরের অবস্থান। এই বিভাগে বিদ্যুত্হীন পরিবার রয়েছে ১.২০ শতাংশ। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ পায় ৯৭.৭৩ শতাংশ পরিবার। সৌর বিদ্যুৎ থেকে পায় ০.৮৮ শতাংশ পরিবার। এবং অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ পায় ০.২০ শতাংশ পরিবার। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশে চলমান বিদ্যুত্সংকট সমাধানের পাশাপাশি সরকারের উচিত বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহের দিকে যাওয়া। এ ছাড়া গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য কূপ খনন ও বিদ্যুতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে, যাতে করে দীর্ঘমেয়াদে সংকট দূর করা যায়।’