শ্রীপুর উপজেলার বাঘের বাজার থেকে আরো প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে যেতে হয়। জায়গাটা বন জঙ্গলে ঘেরা। যত দূর চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। মাঝেমধ্যে পাখির কিচিরমিচিরও কানে আসে। এর মাঝেই দূর থেকে চোখে পড়বে সুউচ্চ ‘গম্বুজ’। রূপালি গম্বুজটি সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে। যত কাছে যাবেন দেখবেন গাছপালা ভেদ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি ভবন। ষড়ভুজ আকৃতির। চারতলা। নিচতলায় কয়েকটি আবাসিক কক্ষ। পাশেই ওয়ার্কশপ। ওপরের তলাগুলো গ্রন্থাগার, মানমন্দির দপ্তর, থাকার জায়গাসহ নানা আয়োজন। আর চারতলার ওপরে ভবনের ছাদে একটা গম্বুজাকৃতির ঘর। এটাই আসলে মানমন্দির। ওপরে ২৩ ফুট ব্যাসের গোলাকৃতির আচ্ছাদন। যেটা মোটরের সাহায্যে সুবিধামতো ঘোরানো যায়। এই ঘরেই বসানো হয়েছে টেলিস্কোপ। ১৪ ইঞ্চির মিড ক্যাসিগ্রেইন টেলিস্কোপটির সাহায্যে এখন রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ে মানমন্দিরের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে জন্য আছে একটা লকিং স্টেশন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের থিমে আঙিনা ও পুরো ভবনের নকশা করা। ঘুড়ি ওড়ানোর জায়গাও আছে। ভবনের সামনে আছে অ্যাস্ট্রো উঠান। মোট ১০টি টেলিস্কোপ আছে। সবচেয়ে ছোটটির দৈর্ঘ্য চার ইঞ্চি, বড়টি ১৪ ইঞ্চির। এগুলোর মধ্যে সোলার টেলিস্কোপ আছে দুটি। যেগুলো দিয়ে দিনের বেলায় সূর্য দেখা যায়। ১০০ ইঞ্চি ব্যাসের রিফ্লেক্টর টেলিস্কোপও বসবে সামনে। ৮০ বিঘা জমির ওপর এই মানমন্দির। নির্মাণ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মৃধা বেনু। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। এমন দুটি সোলার টেলিস্কোপ আছে মানমন্দিরে। বহুদিনের স্বপ্ন শাহজাহান মৃধা বেনুর বাবার ছিল কাঠের ব্যবসা। থাকতেন চট্টগ্রামের দোহাজারীতে। শৈশবে বেনু প্রায়ই দলবেঁধে পাহাড়ে চলে যেতেন। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে উঠে যেতেন ছোট ছোট পাহাড়ের চূড়ায়। ভালো লাগত আকাশ দেখতে। যৌবনে ঢাকায় চলে এলেন। যুক্ত হলেন বিজ্ঞান ক্লাবের সঙ্গে। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞান ক্লাব ‘অনুসন্ধিত্সু চক্র’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তিনি। বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। জ্যোতির্বিদ্যা খুব টানত তাঁকে। অসীম রহস্যের মহাকাশ নিয়ে কৌতূহলের অন্ত ছিল না। ১৯৯০ সালে আগারগাঁওয়ে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের ছাদে দেশের প্রথম মানমন্দির স্থাপনেও মুখ্য ভূমিকা ছিল তাঁর। অন্ধকার রাতে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন। দেশব্যাপী হ্যালির ধূমকেতুও পর্যবেক্ষণ করার আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু সেখানে আকাশ দেখার জন্য পর্যাপ্ত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না। কাজের সূত্রে একসময় আমেরিকা গিয়েছিলেন বেনু। সেখানে ঘুরে ঘুরে অনেক মানমন্দির দেখেছেন। এসব দেখতে গিয়ে মনের মধ্যে সব সময় একটা আক্ষেপ কাজ করতো—‘ইস, আমাদেরও যদি এমন একটা মানমন্দির থাকত!’ সেই আক্ষেপ ঘোচাতেই বছরচারেক আগে সিদ্ধেশ্বরীর বাড়ির ছাদে টেলিস্কোপ বসিয়েছেন। সব সময় চাইতেন, দেশে এমন একটি গবেষণাকেন্দ্র হবে যেখানে এ দেশের ছেলেমেয়েরা মহাকাশ নিয়ে গবেষণার সুযোগ পাবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ এলো করোনাকালে। ২০১৯ সালে নিজের স্বপ্নের মানমন্দির নির্মাণে হাত দিলেন। তবে কাজটা এত সহজ ছিল না। একদিকে অর্থের জোগান, অন্যদিকে জুতসই জায়গা নির্বাচন। পরে শ্রীপুরের বাঘের বাজারসংলগ্ন জায়গাটা মনে ধরল। বেনুর ভাষ্যে, ‘জায়গাটা আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য আদর্শ। ধুলাবালি ও আলোর দূষণমুক্ত। চারপাশে উঁচু ভবনও নেই।’ কিন্তু সেখানে যোগাযোগব্যবস্থা খুবই খারাপ। সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হয়েছে উপকরণ পরিবহনের ক্ষেত্রে। পরে গাজীপুরে কয়েক শতাংশ জায়গা বিক্রি করে বাঘের বাজারের পর থেকে মানমন্দির ভবন পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটারের মতো রাস্তা বানিয়ে নিয়েছেন নিজের টাকায়। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই মন্দির নির্মাণ করতে সময় লেগেছে প্রায় আড়াই বছর। এখন এটি জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণায় আগ্রহীদের জন্য প্রস্তুত। অনুসন্ধিত্সু চক্র এবং বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রো ফাউন্ডেশন যৌথভাবে নতুন এই মানমন্দিরটি পরিচালনা করবে বলে জানালেন বেনু। ইতোমধ্যে মানমন্দির পরিদর্শন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মোরেনো ভ্যালি কলেজের অধ্যাপক, নাসার সাবেক গবেষক ও জ্যোতির্বিদ অধ্যাপক ড. দীপেন ভট্টাচার্য, অক্সফোর্ড সেন্টার ফর অ্যানিমেল এথিকসসের ফেলো ড. রেইনার এবার্ট ও মহাকাশ গবেষক ড. মাকসুদা আফরোজ। এ সময় দীপেন ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘ব্যক্তি উদ্যোগে এত বড় কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়।’ মিড ক্যাসিগ্রেইন টেলিস্কোপ এখানে কী কী থাকবে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষকদের অংশগ্রহণে সামনে এটি পূর্ণাঙ্গ মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র হয়ে উঠবে বলে আশা শাহজাহান মৃধা বেনুর। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এর আঙিনায় যে অ্যাস্ট্রো উঠান আছে সেখানে সাধারণের জন্য আটটি টেলিস্কোপ বসানোর পরিকল্পনা আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি আর্চারি, মাউন্টেনিয়ারিং, উড্ডয়নবিদ্যার নানা কিছু শেখানো হবে এখানে। গবেষকদের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, গ্রন্থাগার ছাড়াও ঘুড়ি, হট এয়ার বেলুন, প্যারা সেল গ্লাডারসহ নানা কিছু থাকবে। অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফির জন্যও থাকবে নানা সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষার্থীদের জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানা খুঁটিনাটি বিষয় হাতে-কলমে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কিছু শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে দুদিন আকাশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে। তাঁদের প্রতিবেদন পরে আন্তর্জাতিক ফোরামে যাবে।