kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

মহাপৃথিবী

এক ফাতমাতার কাহিনি

ফাতমাতা, জামিলাতু বা আলিমেমি যেতে চান ইউরোপে। ভালো আয়-রোজগারের আশায়। পেছনে ফেলে যান মা, খালা, ভাই-বোন বা সন্তানদের। তবে বেশিজন পৌঁছতে পারেন না গন্তব্যে। অথচ পথে পথে ঘটতে থাকে নানা ঘটনা। ফাতমাতার গল্প বলা হচ্ছে এখানে

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এক ফাতমাতার কাহিনি

পশ্চিম আফ্রিকা থেকে বহু মানুষ সাহারা মরুভূমি আর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সফল হয় খুব কমসংখ্যক মানুষ। যারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে, বাড়িতে তাদের জন্য অপেক্ষা করে কঠিন বাস্তবতা। অনেক পরিবার তাদের ফিরিয়ে নিতে দ্বিধা করে। অনেক সময় তাদের ত্যাজ্যও ঘোষণা করা হয়। আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধুবান্ধবরা তাদের সঙ্গে আগের মতো মিশতে চায় না। তাদের চোখে তারা ব্যর্থ মানুষ। ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার খরচ জোগাতে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ ধারদেনা করে ও জমিজমা বিক্রি করে তাঁরা তখন একেবারেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

এ রকমই এক নারী ফাতমাতা। নিজের গল্প বলার সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সাহারা মরুভূমি পার হওয়ার সময় এক তুয়ারেগ যাযাবরের খপ্পরে পড়েছিলেন তিনি। ছয় মাস তাঁকে তার স্ত্রী হিসেবে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল।

জামিলাতু

তার নাম ছিল আহমেদ। সে ছিল খুবই শয়তান ধরনের লোক। সে বলত, আমি নাকি তার দাসী। কারণ আমি কৃষ্ণাঙ্গ। আমরা নাকি নরক থেকে এসেছি। তিনি জানান, আহমেদ তাকে বলত, একজন দাসীর সঙ্গে তার প্রভু যা ইচ্ছা তা করতে পারে। শুধু সে নয়, চাইলে তার বন্ধুরাও পারে। সে তাদের বলত, বাড়িতে যা আছে চাইলে তুমি তারও স্বাদ নিতে পারো। তারা প্রতিদিন আমার ওপর নির্যাতন চালাত। ২৮ বছর বয়সী ফাতমাতা থাকতেন সিয়েরা লিওনের রাজধানী ফ্রিটাউনে, যখন তাঁর জীবনের দুর্বিষহ এই অভিজ্ঞতার গল্প শুরু। তিনি চেয়েছিলেন ইউরোপে পাড়ি জমাতে। আহমেদের হাত থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এর পরেই পড়ে যান কয়েকজন দালালের খপ্পরে, যারা তাঁকে আলজেরিয়ায় তাদের নিজেদের কারাগারে আটকে রেখেছিল। একপর্যায়ে তিনি ইউরোপে নতুন জীবনের স্বপ্ন পরিত্যাগ করেন। ফিরে যেতে চান ফ্রিটাউনে—যেখান থেকে তিনি এই যাত্রা শুরু করেছিলেন। অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করে এ রকম একটি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন বা আইওএমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ফাতমাতা। দেশে ফিরে যেতে তাঁর যে খরচের প্রয়োজন, তা চেয়ে সংস্থাটির কাছে আবেদন করেন তিনি। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি মালি থেকে বাসে করে ফ্রিটাউনে ফিরে গেছেন, প্রায় দুই বছর বাড়ির বাইরে থাকার পর। কিন্তু বাড়িতে তাঁর জন্য কেউ-ই অপেক্ষা করছিল না। কেউ তাঁকে স্বাগতও জানায়নি; বরং সবাই তাঁকে ফিরে যেতে দেখে অনেকটা বিরক্তই হয়েছে। ফাতমাতা এত দিন তাঁর মাকে দেখেননি, দেখা হয়নি পেছনে ফেলে যাওয়া মেয়ের সঙ্গেও, যার বয়স এখন আট বছর। ‘বাড়িতে ফিরে আসব বলে আমি খুব খুশি ছিলাম; কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমার ফেরা উচিত ছিল না।’ বললেন ফাতমাতা। নিজের বাড়িতে ফিরে তিনি প্রথমে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। কিন্তু তার আচরণ দেখে ভয় পেয়ে গেলেন।

সে আমাকে বলল, ‘তোমার ফিরে আসা উচিত হয়নি। তুমি যেখানে গিয়েছিলে সেখানেই তোমার মরে যাওয়ার দরকার ছিল। কারণ তুমি তো বাড়িতে কিছু নিয়ে আসতে পারোনি।’

ফাতমাতা বলেন, ‘এর পরে তাঁর আর মায়ের সঙ্গে দেখা করার সাহস হয়নি।’

ইউরোপে যাওয়ার জন্য দালালদের যে অর্থ দিতে হয়েছিল, সেটা জোগাতে তিনি তাঁর এক খালার কাছ থেকে কাপড়ের ব্যবসা করার নামে দুই হাজার ৬০০ ডলার চুরি করেছিলেন।

আমি শুধু ভেবেছিলাম, কিভাবে আমি কিছু অর্থ জোগাড় করতে পারি—যা দিয়ে আমি ইউরোপে যেতে পারব। আমি ভাবতাম, যদি ইউরোপে যেতে পারি, তাহলে আমি এর তিন গুণ অর্থ ফেরত দিতে পারব। তখন আমি আরো ভালোভাবে আমার মা ও খালার দেখাশোনা করতে পারব।

ওই চুরির পর খালার সঙ্গে তাঁর ও তাঁর মায়ের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। খালা মনে করেন যে এ সব কিছুর পেছনে ছিলেন ফাতমাতার মা।

ফাতমাতার মা বলেন, এসব নিয়ে আমার মনে খুব কষ্ট ছিল। খুবই কষ্ট। এ কারণে আমার মেয়েকে যদি কখনো জেলে যেতে হয়, কষ্টে আমি মরেই যাব।

সিয়েরা লিওনে ফাতমাতার মতো প্রায় তিন হাজার মানুষ গত দুই বছরে ইউরোপে পাড়ি জমাতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে এসেছে। দেখা গেছে, আগে এই পরিবারগুলো তাদের একজনকে ইউরোপে পাঠাতে অর্থ সংগ্রহ করত। কিন্তু এখন আর কোনো পরিবার সেটা করতে চায় না। কারণ তারা দেখেছে, এভাবে দেশ ছাড়তে গিয়ে তাদের অনেককে জেলে যেতে হয়েছে, কিংবা নৌকা ডুবে সমুদ্রেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। সে কারণে অনেকে তাদের ইউরোপে যাওয়ার ইচ্ছা বা পরিকল্পনা গোপন রাখে। অর্থ ধার না করে তারা তখন নিজেদের জমি বিক্রি করে দেয়। অথবা বাড়ি থেকে অর্থ চুরি করে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

     সূত্র : বিবিসি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা