kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সময়ের প্রতিধ্বনি

মানবতা ও সামাজিক মূল্যবোধ চীনের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশ

মোস্তফা কামাল

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মানবতা ও সামাজিক মূল্যবোধ চীনের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশ

চীনে ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জার নিষিদ্ধ। অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে চীন কী করে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারল? সত্যিই চিন্তার বিষয়। প্রায় দেড় শ কোটি মানুষের দেশ চীন। সেখানে মানুষের চাপও অনেক বেশি। সেই চাপ সামাল দিল কী করে! আর ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জার নেই বলে কি চীনের কোনো কিছু আটকে আছে? তা তো নেই!

চীন সরকার অনেক চিন্তাভাবনা করেছে বিষয়টি নিয়ে। তারপর তারা নিজেরাই তৈরি করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উইচ্যাট। অতি প্রয়োজনীয় যোগাযোগের একটি মাধ্যম। অনেক জরুরি কাজও ইউচ্যাট দিয়ে সম্পন্ন করা যায়।

চীনে আমার কাছে সবচেয়ে যে বিষয়টি ভালো লেগেছে সেটা হচ্ছে, মানবতা ও সামাজিক মূল্যবোধ। সবচেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এই দুটি বিষয়কে। ধর্মের চেয়েও বড় করে দেখা হয় মানবতাকে। সেখানে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে। কেউ যদি ধর্মে বিশ্বাস না-ও করে, সেখানে রাষ্ট্র তার ওপর কোনো খবরদারি করে না। আবার কেউ ধর্মে বিশ্বাস করলে তাকে বাধাও দেয় না।

চীন সরকারের কথা হচ্ছে, ধর্মে বিশ্বাস হচ্ছে যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ধর্ম আর রাজনীতি পুরোপুরি আলাদা ব্যাপার। একটির সঙ্গে আরেকটি মেলানো যাবে না। আবার ধর্মকর্ম করতে গিয়ে অন্য মানুষের বিরক্তির কারণ হওয়াও যাবে না। এটা হচ্ছে চীনের নীতি। আইনের মাধ্যমে এই নীতিকে তারা সংরক্ষণ করেছে।

চীন সফরে গিয়ে সরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়াও উরুমচি, আকসু ও কাশগর শহরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জেনেছি, চীনে ৫০ শতাংশ মানুষই কোনো ধর্ম বিশ্বাস করে না। তবে তারা মানবতায় বিশ্বাসী। তাদের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায় মানবতা। বাকিদের মধ্যে ১৮ শতাংশের কিছু বেশি বৌদ্ধ, ১০ শতাংশ মুসলমান এবং অন্যান্য ধর্মে বিশ্বাসী। সেখানে ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের কাছেও কিন্তু মানবতা ও সামাজিক মূল্যবোধ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।

চীনের সাধারণ মানুষও বলছে, মানুষের মধ্যে মানবতা ও সামাজিক মূল্যবোধের অভাব ঘটলেই সমাজে পচন ধরে। সামাজিক বন্ধন হালকা হয়ে যায়। রাষ্ট্র হয় ক্ষতিগ্রস্ত। তাই রাষ্ট্রও মানবতা ও সামাজিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধু মানবতা আর সামাজিক মূল্যবোধ দিয়ে বিশাল চীনকে অসাধারণ এক শৃঙ্খলে আবদ্ধ রেখেছে। এক সুতায় চীনকে গেঁথে রেখেছে। এটা ভাবতেও বিস্ময় লাগে।

আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে চীনের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। চীন কী উপায়ে সামাজিক বন্ধনকে অটুট রেখেছে, তা জানা-বোঝা দরকার। চীনের সমাজ বিশ্লেষকদের পরামর্শও কাজে লাগানো যেতে পারে। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন না থাকলে রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়। রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে হলেও সরকারকে বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে।

সমাজ বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব। এটি কতটুকু সত্য জানি না। তবে চীনের উন্নয়ন দর্শনে গ্রামকে শহরে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয় দুই দশক আগে। চীনের শিনচিয়ানে সরেজমিনে কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। সেখানে দেখেছি, গ্রামবাসীর জন্য আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। বসবাসের জন্য আধুনিক ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ তো আছেই। তা ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজারব্যবস্থা সবই উন্নতমানের।

প্রতিটি জেলা ধরে ধরে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে এসেছে চীন। পরিকল্পিতভাবে কাজগুলো করা হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রতিটি জেলার ঐতিহ্যকে ঠিক রেখে সেই জেলার সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো হচ্ছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে। প্রতিটি জেলায় আছে উন্নতমানের লাইব্রেরি, আধুনিক প্রযুক্তির জাদুঘর ও দর্শনীয় স্থান। ঐতিহ্যগুলোকেও বিশেষভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

আমরা কয়েক বছর ধরে আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে শুনছি, গ্রাম হবে শহর। কিন্তু কবে হবে, তার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। এখানেও প্রতিটি জেলা ধরে কাজ হতে পারে। সামগ্রিক উন্নয়নই যদি মানুষের মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তাহলে তো কথাই নেই। তবে ফেসবুকের ব্যবহার নিয়ে আরেকটু চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।

আমরা এক দশকের বেশি সময় ধরেই ফেসবুক-জ্বরে আক্রান্ত। মাদকের চেয়েও ভয়ংকর এক নেশা ফেসবুকে বুঁদ হয়ে আছে পুরো দেশ। ঘুণ পোকার মতো ভেতরে ভেতরে সমাজটাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত নীতি-নৈতিকতার স্খলন ঘটছে। মহামারির মতো দেখা দিয়েছে সামাজিক অবক্ষয়। মানবিকতার স্থলে নিষ্ঠুরতা পাকাপোক্তভাবে আসন গেড়ে বসছে।

দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই অঘটন ঘটছে। এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা দেখে আমাদের সমাজ বিশ্লেষকরাও বিস্ময়ে বিমূঢ়। তাঁরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, কেন এসব ঘটছে? আসলে কোথায় যাচ্ছে দেশ! কী করলে এর প্রতিকার হবে?

দিন দিনই খারাপের দিকে যাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা মা-বাবাকে মানে না। তাঁদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, অবহেলা করে। বয়োবৃদ্ধ মা-বাবাকে সন্তানরা দেখভাল করে না বলেই অনেকে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। অনেকে দিন কাটাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে। যদিও আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য হচ্ছে, মা-বাবা ও শিক্ষকদের পা ছুঁয়ে সালাম করা। অথচ বর্তমান জামানা যেন পাল্টে যাওয়া একটা যুগ। ছাত্ররা শিক্ষককে মানে না। ছোটরা বড়দের অমান্য করে। অসহায়ের প্রতি কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ায় না। সর্বত্র অমানবিকতা আর সামাজিক অবক্ষয়। নারী-শিশুকে যৌন নিপীড়নের ঘটনা তো বেড়েই চলছে। মানুষের বোধবুদ্ধি, বিচার-বিবেচনাও লোপ পেয়েছে বলে মনে হয়। একটা ফুলের মতো পবিত্র ছোট্ট শিশুও এখন আর এই সমাজে নিরাপদ নয়।

অথচ একসময় আমাদের দেশেই মানবতা ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হতো। কেউ বিপদে পড়লে তাকে সহায়তা করার মনোভাবও খুব বেশি পরিমাণে দেখা যেত। শিক্ষকরা সমাজে সবচেয়ে বেশি সম্মানীয় ছিলেন। বড়দের প্রতি ছোটদের সম্মান, আবার ছোটদের প্রতি বড়দের স্নেহ ছিল সহজাত প্রবৃত্তি। কেউ বেয়াদবি করলে তাকে শাস্তি পেতে হতো। এখন আর কোনো শিক্ষক ছাত্রকে শাস্তি দিতে পারেন না। তাহলে শিক্ষককেই ছাত্রের হাতে মার খেতে হয়।

ফেসবুক-বন্ধুর নামে অসম সম্পর্ক, পরকীয়া, মিথ্যা প্রলোভনে মেয়েদের যৌন হয়রানি যেন নিত্যদিনের ঘটনা। ফেসবুকের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সংসারজীবনে। অনেক সুখের সংসার ভেঙে তছনছ হয়েছে ফেসবুকের কারণে। আর এতে বেড়েছে সামাজিক অস্থিরতা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অস্থিরতার কারণও ফেসবুক।

এখন তো দেখছি, ব্যক্তিজীবনের যাবতীয় বিষয় ফেসবুকে চলে আসছে। অফিসের কলিগদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন, ব্যক্তিগত রেষারেষি, ভাই-বোন কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়ার রেষও ফেসবুকে। মানুষের চরিত্র হনন থেকে শুরু করে কাউকে গালাগাল দেওয়ার জন্যও মানুষ ফেসবুকের ওপর ভর করছে। কারো মন খারাপ হলে ফেসবুকে লিখে দিচ্ছে। তাতেই যেন তার মন ভালো হয়ে যায়!

সাম্প্রতিককালে ফেসবুকে নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে। মানুষের চরিত্র হননের সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে ফেসবুক। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য এ যেন এক মোক্ষম অস্ত্র। অনেকেই এখন এই অস্ত্র ব্যবহার করছে। কারো সঙ্গে মতের অমিল হলেই চরিত্র হনন!

আমি বলছি না যে ফেসবুক বন্ধ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ফেসবুক আসার আগেও সমস্যা ছিল। তবে এখন তা ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটেছে। এর রাশ টানা আরো আগেই খুব দরকার ছিল। এখনো সময় আছে। সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়টি মানুষের চেতনায় ঢোকাতে হবে। দেশের সর্বত্র সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করতে হবে। কেউ অপরাধ করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়—তা মানুষকে বোঝাতে হবে। ক্ষমতাবানরাও যাতে অপরাধ করলে শাস্তি পায়, তার উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। দেশের সিনিয়র নাগরিকদের মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষকসমাজকে তার যোগ্য মর্যাদা দিতে হবে। মোট কথা, মানুষে মানুষে, পরিবারে পরিবারে, সমাজে সমাজে সম্পর্কের যে সুতাটা রয়েছে, তাকে শক্ত করে বাঁধতে হবে। অন্যথায় বিপদে পড়তে হবে। আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে এখনই আমাদের কাজটা করতে হবে।  

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা