সুনামগঞ্জ জেলার সোমেশ্বরী নদীর তীরে সবচেয়ে উপেক্ষিত, অবহেলিত, অনুন্নত ও দুর্গম এক জনপদের নাম মধ্যনগর। ২২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মধ্যনগর থানার লোকসংখ্যা প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার ৭২০ জন। এই থানার প্রশাসনিক উপজেলা ধর্মপাশা। এর সদর দপ্তর উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। উপজেলা সদর থেকে উত্তর সীমানার দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার, মধ্যনগরের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম ও হাওরবেষ্টিত বিধায় জরুরি মুহূর্তে বা যথাসময়ে সরকারের প্রশাসনিক সুবিধা বা সেবা গ্রহণ করা জনগণের পক্ষে সম্ভব হয় না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর মধ্যনগর বর্তমান থানা কমপ্লেক্সে স্থাপিত হয় Anti Dacoit Police Camp (ADPC) । জনগণের সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশা লাঘব ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের নিমিত্তে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭৪ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় চারটি ইউনিয়ন (মধ্যনগর, চামরদানী, বংশীকুণ্ডা দক্ষিণ, বংশীকুণ্ডা উত্তর) নিয়ে মধ্যনগর থানা গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সুকেশ রঞ্জন সরকার মধ্যনগর উপজেলা বাস্তবায়ন আন্দোলন শুরু করেন। তাঁরই বলিষ্ঠ নেতৃত্বের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত (নিকার) ৮৬তম বৈঠকে মধ্যনগর থানা এলাকার উপর্যুক্ত চারটি ইউনিয়ন নিয়ে মধ্যনগর উপজেলা স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে ৮৮তম সভায় সিদ্ধান্তটি বাতিল করে দেয়। এ রকম জনবিরোধী সিদ্ধান্তে মধ্যনগরবাসী বিস্মিত ও ব্যথিত। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম হাওর, তৃতীয় রামসার এলাকা টাঙ্গুয়ার হাওর মধ্যনগর থানায় অবস্থিত। অসংখ্য ভ্রমণপিপাসু দেশি-বিদেশি পর্যটক প্রতিবছর হাওরের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে আসেন। এ অঞ্চলে পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা করা গেলে পর্যটকরা আরো বেশি আকৃষ্ট হবেন ও সরকারের প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টাকা রাজস্ব আয় হবে। যত দূর জানা যায়, সুনামগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাঁচবার এসেছিলেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ১৯৫৬ সালে সুনামগঞ্জে প্রথম এসে শিল্প-বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন ও গ্রাম অনুদান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু বর্তমান স্টেডিয়ামে বিশাল জনসমুদ্রে অগ্নিঝরা বক্তব্য দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘সুনামগঞ্জবাসীর কোনো অভিযোগ বা দাবি থাকলে বা কোনো সমস্যা হলে শুধু দুই পয়সার একটা পোস্টকার্ডে সবিস্তারে লিখে শেখ মুজিবের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। আমি তাত্ক্ষণিকভাবে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনি একবার শাল্লা উপজেলার বিশাল জনসভায় বলেছিলেন, ‘গোপালগঞ্জের উন্নয়ন হলে সুনামগঞ্জের উন্নয়ন হবে।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আপনার বাবার প্রতিশ্রুতি ও আপনার প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে রক্ষা করুন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সুযোগ্য নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত যুগান্তকারী পদক্ষেপ, ইতিবাচক ও কল্যাণমুখী সেবা পশ্চাৎপদ গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর মাধ্যমে তাদের জীবনমান ও আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নয়নের নিমিত্তে মধ্যনগরকে অবিলম্বে উপজেলা বাস্তবায়ন করার অনুরোধ করছি। জনগণের কথায় ঈশ্বরের বাক্যের প্রতিফলন হয়। পৃথিবীর প্রতিটি মহৎ কাজের সঙ্গে ঈশ্বরের পবিত্র স্পর্শ আছে। আপনার আছে বাংলাদেশের মানুষের সেবা করার এক মহৎ হৃদয়। যার বিশালতা আমাদের মধ্যনগরের টাঙ্গুয়ার হাওরের ঢেউয়ের মতোই উদার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি মধ্যনগরবাসীর কাছে বিশাল সূর্যের মতো। আমরা মধ্যনগরবাসী আপনার দিকে অধীর আগ্রহে চেয়ে আছি। আপনি মধ্যনগর উপজেলা বাস্তবায়ন করে হাওরের জলবন্দি মানুষের অসীম সংগ্রামী জীবনের কষ্টের অবসান ঘটাবেন। আপনার সময়োচিত জনস্বার্থের অনুকূলে বৈদগ্ধপূর্ণ মধ্যনগর উপজেলা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দিলে এর নান্দনিক সম্প্রসারণে আপনার মতো বহুদর্শী, প্রাজ্ঞ ও সফল রাষ্ট্রনায়কের কথা মধ্যনগরবাসী সারা জীবন কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে।ু লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক