চট্টগ্রামের বিভাগীয় ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের যৌথ জরিপে নগরে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু বিস্তারের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। জরিপকৃত প্রতি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি মিলেছে। এর মধ্যে আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
চট্টগ্রামে গত মাসের তুলনায় চলতি মাসের গত ২৪ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী দ্বিগুণের বেশি। শুধু তাই নয়, এটি গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ (মাসভিত্তিক)। চলতি মাসের শুরু থেকে ডেঙ্গু বাড়তে শুরু করে।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলো—উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা। ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বরাবর চারটি সুপারিশ করেছে চার সদস্যের জরিপ দল।
ওই জরিপ প্রতিবেদন গতকাল বুধবার বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কাছে দেওয়া হয়। এখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিবেদনটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হবে বলে বিভাগীয় পরিচালক ও চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। এডিস মশার উপস্থিতির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার লার্ভার মধ্যে এডিস (অ্যাডিস) ইজিপটাই (এজিপ্টি) ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এবং সেকেন্ডারি ভেক্টর এডিস এলবোপিকটাস ২০ থেকে ৩০ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে।
এ ব্যাপারে জরিপ দলে থাকা চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত জেলা কীটতত্ত্ববিদ মঈন উদ্দীন গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, চলতি মাসে বাড়লেও গত বছরের তুলনায় চট্টগ্রামে এখনো ডেঙ্গু আক্রান্ত কম। তবে জরিপকালে লার্ভার আধিক্য বেশি পাওয়া গেছে। এডিস ইজিপ্টাই ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লার্ভা পাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। জরিপ প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা যাবে।
জানা যায়, চলতি মাসের গত জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত নগরের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ১৮টি ওয়ার্ডে এই জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। জরিপ দলে প্রধান করা হয়েছিল চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজল হক শাহ।
কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘যেসব ওয়ার্ডকে আমরা ডেঙ্গুর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে নির্ধারণ করেছি, সেখানে এডিস মশার লার্ভা অনেক বেশি ছিল। জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা চারটি সুপারিশ করেছি।’
এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—এডিস মশার বংশবিস্তার নির্মূল করা, কোনো পাত্রে বা আঙিনায় তিন দিনের বেশি জমে থাকা পানি অপসারণ, নিজ নিজ বাসস্থান ও কর্মস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। এ ছাড়া প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তার উদ্যোগে নগরবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সব ধরনের প্লাস্টিক কনটেইনার নির্মূলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ, সুউচ্চ অট্টালিকার আন্ডারগ্রাউন্ড ও নির্মীয়মাণ ভবনে এডিস মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি, লার্ভিসাইডিং এবং এডালটিসাইডিং সময়োপযোগী প্রয়োগ, সূর্যোদয়ের পর পর এবং সূর্যাস্তের আগে এডালটিসাইডিং পরিচালনা, মশক নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন বর্ষা মৌসুম। এই সময় ডেঙ্গু বাড়তে পারে। ভারি বৃষ্টিপাত হলে লার্ভা থাকে না। আমরা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে গঠন করা জরিপ দলের প্রতিবেদন আজ (গতকাল) পাওয়ার পর এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণে চসিক মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে লিখেছি। আমরা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন প্রদক্ষেপ নিয়েছি।’
একই বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চট্টগ্রামে এপ্রিল মাস থেকে ডেঙ্গু রোগী বাড়ার দিকে। মে মাসের তুলনায় আবার চলতি মাসে আক্রান্ত বেশি। সাধারণত বর্ষা মৌসুমের আগে-পরে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশি হয়। তবে এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতি। জরিপে যেসব ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুিঁকপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেসব ওয়ার্ডে ডেঙ্গু নির্মূলে প্রদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে গতকাল চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ডেঙ্গু প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলতি বছরের গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত মোট রোগী ২৫৩ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন, মার্চে ২০ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মে মাসে ৩৭ জন ও চলতি জুনে গতকাল পর্যন্ত ৭৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে একজন পুরুষ রোগী মারা গেছেন। মোট আক্রান্তের মধ্যে নগরে ১৫৭ জন ও জেলার ১৫ উপজেলায় ৯৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে পুরুষ ১৩৩ জন, নারী ৭১ জন ও শিশু ৪৯ জন। বর্তমানে ২১ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগী ছিল চার হাজার ৮৬৪ জন। এর মধ্যে ২৭ জনের মৃত্যু হয়।

