কেউ নিখুঁত একটা পাস বাড়িয়ে দেবে না, নিজের বলে ওঠা ক্যাচ নেওয়ারও কেউ নেই, ময়দানে তুমি একা, যা করার করতে হবে নিজেকেই। সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সবই নিজের। ফুটবল-ক্রিকেটের মতো দলীয় খেলার আকর্ষণের জগতেও বাড়তি গরিমা নিয়ে টিকে আছে একক নৈপুণ্যের খেলাগুলো। বাংলাদেশে যখন ফুটবল রমরমা, তখনো নিয়াজ মোর্শেদের গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়াটা মাতিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। এরপর গুটিকয় গ্র্যান্ড মাস্টার পেয়েছে বাংলাদেশ, এঁদেরই একজন রিফাত বিন সাত্তার। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে পরিচিতি দেওয়া দাবাড়ুদের জীবনের নিশ্চয়তা মেলেনি দাবার বোর্ডে। রিফাত নিজে তাই বেছে নিয়েছেন চাকরি জীবন, শুধু নেশার টানেই বসে পড়েন দাবা বোর্ডের সামনে। পেশাদারিত্বের অভাবেই দাবা সেভাবে বিকশিত হয়নি বলে মনে করেন তিনি। কালের কণ্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার নোমান মোহাম্মদের কাছে দাবার প্রতি ব্যক্তিগত ভালোবাসা আর সামগ্রিক হতাশার কথা বলেছেন গ্র্যান্ড মাস্টার রিফাত বিন সাত্তার। প্রশ্ন : আপনি তো এখন পুরোদস্তুর চাকরিজীবী। দাবায় আর আগের মতো সময় দিতে পারেন না। নিশ্চয়ই আক্ষেপ আছে? রিফাত বিন সাত্তার : আক্ষেপ নেই। কারণ আমি বরাবরই ভেবেছি যে দাবা নিয়ে সব সময় থাকব না। পড়াশোনাটা তাই মনোযোগ দিয়ে করেছি। এখন চাকরি করছি আর সেটি উপভোগও করছি খুব। সে কারণে দাবা থেকে একটু দূরে সরে যাওয়ায় কোনো আক্ষেপ নেই। এখানে আরেকটা কথা একটু বলি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করার পর চার বছর আমি শুধু দাবা নিয়ে ছিলাম। তখন কিন্তু খেলাটিতে খুব ভালো করতে পারিনি। এরপর চাকরি শুরু করলাম, আর চাকরি করতে করতেই গ্র্যান্ডমাস্টারের তিনটি নর্ম করি। আর গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়াই যেহেতু চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল, সেটি পূরণ হওয়ার পর খেলাটি থেকে একটু দূরে সরে যেতে আমার কষ্ট লাগেনি। প্রশ্ন : দাবায় কি তাহলে গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়াই সব? রিফাত : নির্ভর করে বিষয়টা কিভাবে দেখছেন। আমার ক্ষেত্রে গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়াই ছিল চূড়ান্ত লক্ষ্য। অনেকের ক্ষেত্রে সেটি না-ও হতে পারে। গ্র্যান্ড মাস্টারদের ভেতরেও কিন্তু শ্রেণিবিভাজন থাকে। দুই হাজার ৬০০-র ওপরে রেটিং থাকলে তিনি ভালো গ্র্যান্ড মাস্টার বলে বিবেচিত। পেশাদার দাবাড়ুদের উচিত, দুই হাজার ৭০০ না হলেও দুই হাজার ৬০০ রেটিংয়ের লক্ষ্য নিয়ে খেলা। আর আমি বরাবর দাবা খেলেছি মনের আনন্দে, সেটি করতে করতেই গ্র্যান্ড মাস্টার হয়ে যাই। এরপর নিজের পরিবার বা সমাজের প্রতিও তো দায়বদ্ধতা থাকে। আমি তাই এনজিওর চাকরিটা মনোযোগ দিয়ে করেছি। প্রশ্ন : পেশাদার দারাড়ুদের কথা বলছিলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটি কতটা সম্ভব? রিফাত : আমি ছাড়া বাকি চার গ্র্যান্ড মাস্টারই কিন্তু তাই। তাঁরা শুধু দাবা নিয়ে পড়ে আছেন। নিয়াজ ভাই, জিয়া, রাকিব, রাজীব। তবু বাস্তবতা বিবেচনায় বলব, পেশাদার দাবাড়ু হওয়ার মতো পরিবেশ বাংলাদেশে নেই। দাবা খেলে কারো কিন্তু পেট ভরে না। এখান থেকে অর্থ প্রাপ্তির দুটো উপায় আছে। কোনো একটা ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে আর টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে জিতে। টুর্নামেন্ট খেলতে আবার তো বিদেশ যাওয়া লাগে। সেই বিমান ভাড়া, ওখানে থাকা-খাওয়ার খরচ কে দেবে? আসলে বেশ জটিল পরিস্থিতি। আমার দাবা থেকে চাকরির দিকে ঝুঁকে যাওয়ায় এটি হয়তো একমাত্র কারণ না, তবে একটি কারণ তো বটেই। আর প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, স্পন্সর, টুর্নামেন্ট খেলা- কোনো কিছুর নিশ্চয়তাই বাংলাদেশে নেই। ভারতে আছে। আর আছে বলেই ওদের দেশে এখন ৩২-৩৫ জন গ্র্যান্ড মাস্টার। তাঁদের মধ্যে অনেকে, যেটি বললাম, ভালো মানের গ্র্যান্ড মাস্টার। ও দেশের দাবাড়ুরা ইউরোপে গিয়ে তিন-চার মাস পড়ে থাকেন। অসংখ্য টুর্নামেন্ট খেলেন। আরো গ্র্যান্ড মাস্টার তাই ভারত থেকে বেরোবে। অথচ নিয়াজ ভাই যখন গ্র্যান্ড মাস্টার হয়েছেন, তখন ভারত কেন, এই অঞ্চলেই কোনো গ্র্যান্ড মাস্টার ছিলেন না। এ কারণেই আমাদের বাকি চার গ্র্যান্ড মাস্টার ও এর পরের পর্যায়ের আরো অনেক দাবাড়ু যে কেবল দাবা নিয়ে পড়ে আছেন- হ্যাটস অফ টু দেম। প্রশ্ন : আপনি দাবার পাশাপাশি পড়াশোনাও করেছেন সিরিয়াসলি। আগের দুই গ্র্যান্ড মাস্টার নিয়াজ মোরশেদ ও জিয়াউর রহমানও তাই। অথচ পরের দুই গ্র্যান্ড মাস্টার এনামুল হোসেন রাজীব ও আবদুল্লাহ আল রাকিব পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে পুরোদস্তুর দাবাড়ু। আজ থেকে ১০-১৫ বছর পর কি এ জন্য তাঁরা অনুশোচনা করবেন বলে মনে করেন? রিফাত : দেখুন, এটি পুরোপুরি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তাঁরা এই পথটাই বেছে নিয়েছেন। আমি অন্যদের কথা জানি না, তবে রাজীব-রাকিবের কথা বলতে পারি। হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তাঁরা উচ্চশিক্ষিত নন, কিন্তু এই দুজনের শিক্ষার কমতি নেই। তাঁরা প্রচুর বই পড়েন, যেকোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারেন। আমি তো বলব, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেকের চেয়েও তাঁরা বেশি শিক্ষিত। তবে হ্যাঁ, আমি বলব, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেউ দাবা নিয়ে পড়ে থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা প্রয়োজন আছে। আর শীর্ষস্থানীয় দাবাড়ুরা অমনটা হলে নিচের দিকের দাবাড়ুরা ভালো একটা বার্তা পাবে। প্রশ্ন : শুরুতেই অনেক ভারী ভারী কথা হয়ে গেল। আসুন আমরা এবার কিছু আনন্দের জায়গা ঘুরে আসি। দাবার প্রেমে পড়েছিলেন কিভাবে? রিফাত : যেভাবে হয় আর কি, বাসায় বাবা-চাচাদের খেলতে দেখতে দেখতে। বেশির ভাগ শিশুর হয়তো ফুটবল পছন্দ, আমার কাছে কিন্তু সেটি একঘেয়ে লেগেছে। গোল একটি বল, তাতে কোনো বৈচিত্র্য নেই, সৌন্দর্য নেই। অন্যদিকে দাবায় কী সুন্দর সাদা-কালো খোপ কাটা ঘর! প্রতিটি ঘুঁটির নকশা-ডিজাইন কত বৈচিত্র্যপূর্ণ। তাদের ব্যবহারও নানাবিধ। কোনোটি শুধু কোনাকুনি যায়, কোনোটি আড়াই ঘর, কোনোটি আবার সব দিকেই যেতে পারে। আর ঘুঁটিগুলোর মধ্যে আমার শিশুমন দারুণ সৃজনশীলতাও আবিষ্কার করে। ঘোড়া, হাতি, মন্ত্রী, রাজা, সৈন্য- এক এক রকম ছাঁচের ঘুঁটি দিয়ে একেকটি বোঝানো হচ্ছে। দাবার প্রেমে পড়তে আমার তাই সময় লাগেনি। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। ক্লাস টু পর্যন্ত আমি ভিকারুন্নিসায় পড়েছি, তখন এটি কো-এডুকেশন স্কুল ছিল। ক্লাস টুর ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার সময় বাবার কাছে আবদার ধরেছিলাম, পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে পারলে আমাকে দাবার বোর্ড কিনে দিতে হবে। আর মায়ের কাছে দাবি ছিল এক কেজি রসমালাই। তো পরীক্ষায় ফার্স্ট হলাম, আমার দুটো আবদার মেটানো হলো। ওইটুকুন আমি রসমালাই আর কটি খেতে পারি, কিন্তু দাবা নিয়ে পড়ে থাকতাম সারাক্ষণ। প্রশ্ন : বন্ধুদের সঙ্গেও? রিফাত : না। মানে সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে না। ওদের সঙ্গে মেলামেশা শুরুর আগেই তো দাবার জগতে ঢুকে গেলাম। প্রতিযোগিতামূলক দাবা শুরু করতে সময় লাগেনি। বুয়েটে তখন মুফতি স্মৃতি দাবা বলে প্রতিবছর একটি টুর্নামেন্ট হতো। ১৯৮১ সালে সেই টুর্নামেন্টে খেলি। আমার মামা ছিলেন ডাক্তার। তাঁর কিছু বন্ধু ছিলেন বুয়েটের। তাঁরা নিয়মিত আমাদের বাসায় আসতেন। আমার দাবায় আগ্রহ দেখে তাঁরাই বাবাকে বললেন, রিফাতকে নিয়ে আসেন। উদ্বোধনী দিনে নিয়াজ ভাই একসঙ্গে ২০ জনের সঙ্গে খেলছিলেন। তিনি তখন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। মামার বন্ধুরা আমাকে মঞ্চে উঠিয়ে দিলেন ২০ জনের একজন হিসেবে। বাকি ১৯ জন বুয়েটের ছাত্র, আর আমি সাত বছরের বাচ্চা। দাবা বোর্ড পর্যন্ত তখন পৌঁছতে পারি না বলে চেয়ারের ওপর আলাদা তক্তা দেওয়া হলো, আগেকার দিনের সেলুনের মতো। তো খেলার একটা জায়গায় গিয়ে নিয়াজ ভাই প্রস্তাব দিলেন, ড্র নেবে? আমি বললাম, হ্যাঁ। সবাই তো অবাক, নিয়াজ মোরশেদ এই বাচ্চা ছেলেকে ড্র অফার করছেন! জিজ্ঞেস করলেন এমনটা করার কারণ। নিয়াজ ভাই বললেন, 'আমি ওর জন্য একটি ফাঁদ পেতেছিলাম। তাতে পা না দিয়ে ও ফাঁদ কেটে বেরিয়ে গেছে। সে কারণে ড্র করে ওকে অনুপ্রাণিত করলাম। এই ছেলেটি দাবায় থাকলে ভালো করবে।' প্রশ্ন : নিয়াজ মোরশেদও ছোটবেলায় এমন একজনের সঙ্গে প্রথম খেলে নজর কেড়েছিলেন। প্রেসক্লাবে এক রুশ গ্র্যান্ড মাস্টার এমনিভাবেই ১৫-২০ জনের বিপক্ষে খেলছিলেন। আপনার ক্ষেত্রে নিয়াজ মোরশেদ হয়ে গেলেন রুশ গ্র্যান্ড মাস্টার আর আপনি ছোট্ট নিয়াজ মোরশেদ... রিফাত : হ্যাঁ, লুডিকভের সঙ্গে খেলেছিলেন নিয়াজ ভাই। এভাবেই হয় আসলে। ভবিষ্যতে এমন কোনো গ্র্যান্ড মাস্টার হয়তো বাংলাদেশ পাবে, যে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলবে, ছোটবেলায় রিফাত ভাইয়ের সঙ্গে খেলেছিলাম। এভাবেই হয়। প্রশ্ন : ওই মুফতি স্মৃতি দাবার পরই কি খেলাটিতে একেবারে নিয়মিত হয়ে গেলেন? রিফাত : বলতে পারেন। মুফতি স্মৃতিতে দেশের সব নামকরা দাবাড়ু খেলতেন। ফেডারেশনের কর্মকর্তারাও সেখানে যেতেন। তাঁরাই আমার খেলা দেখে বাবাকে বললেন, আমাকে ফেডারেশনে নিয়ে যেতে। রামপুরা, সিদ্ধেশ্বরী, যাত্রাবাড়ী- বাসা যেখানেই ছিল, বাবা ফেডারেশনে ঠিক নিয়ে যেতেন। ধারাবাহিকভাবে খেললাম বাটা স্কুল দাবা, কিশোর দাবা, সাব জুনিয়র দাবা, জাতীয় দাবা। পুরোপুরি দাবার জগতের একজন হয়ে গেলাম। প্রশ্ন : শুরুতেই বলেছিলেন যে গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়াই ছিল আপনার চূড়ান্ত লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন কবে? রিফাত : মুফতি স্মৃতি দাবায় আমি খেলেছি সাত বছর বয়সে। তখন গ্র্যান্ড মাস্টার কী জানতামই না। পরে একটু একটু করে বুঝতে শুরু করলাম। তবে ব্যাপারটি যে আসলে কত বড়, সেটি প্রথম বুঝলাম নিয়াজ ভাই গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়ার পর। ১৩ বছরের আমি দেখলাম, নিয়াজ ভাইকে টিভিতে দেখা যায়, পেপারে তাঁর ছবি আসে, যেখানেই যান ভক্তরা অটোগ্রাফ চায়। তখন মনে হলো, দাবাড়ু হলে এমন দাবাড়ুই হতে হবে। গ্র্যান্ড মাস্টার না হলে আমার চলবে না। প্রশ্ন : পড়ালেখাও তো সমান তালে চলছিল? রিফাত : চলছিল। কোনো সমস্যা হয়নি। ক্লাস থ্রিতে উঠে আমি চলে এলাম সেন্ট যোশেফ স্কুলে। সেখানে ব্রাদার ডমিনিক, ব্রাদার রালফ আমাকে খুব সাহায্য করেছেন। নটর ডেম কলেজ কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানথ্রপলোজিতে ভর্তি হওয়ার পরও আমার দাবায় কোনো সমস্যা হয়নি। আসলে স্কুল-কলেজে অন্য ছেলেমেয়েদের মতো আমার তেমন কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়নি। আমার সব বন্ধু ছিল দাবার জগতের। খেলাটির একটি মজা হচ্ছে, এখানে অসমবয়সীদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। আমি আর জিয়া যেমন সমসাময়িক। আমাদের নিজেদের ভেতর যেমন বন্ধুত্ব আছে, তেমনি আমরা আবার চপল ভাই, তাহমিদ ভাই, প্রিন্স ভাই, লিন্টু ভাই, ইউনুস ভাইদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি। তাঁদের কাছ থেকে শিখেছি অনেক কিছু। প্রশ্ন : তাই বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও বন্ধুত্ব হয়নি! রিফাত : তা হয়েছে। আমি তো বিয়েই করেছি আমার ক্লাসমেট আইরিনকে। হ্যাঁ, বন্ধুত্ব বলতে আমরা সাধারণ অর্থে যেটি বুঝি, সেটি আমার হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েই। আইরিন, অনু, বাবু, শিবলি, মুস্তাফিজ, পরাগ- এমন অনেকের কথাই বলা যায়। কিছু দিন আগে আমাদের এক বন্ধু মৌলির বিয়ে হলো, সবাই মিলে গিয়ে হৈচৈ করে বিয়ে খেলে এলাম। প্রশ্ন : পড়ালেখাটা ঠিকঠাক ছিল দেখে মা-বাবার দিক থেকে দাবা খেলা নিয়ে কোনো চাপে আপনাকে পড়তে হয়নি, তাই না? রিফাত : ঠিক তাই। তার পরও এই দাবা আর পড়াশোনা কিন্তু একটা সময় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। ঘটনাটি বলি। আমি ইন্টার পাস করলাম ১৯৯২ সালে। ওই বছরের শেষের দিক থেকেই তো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়। সবাই কোমর বেঁধে তখন পড়ালেখা করছে, আর আমি মেতে আছি দাবায়। মায়ের খুব ইচ্ছা ছিল বুয়েটে পড়াবেন। কোচিং সেন্টারেও ভর্তি করিয়েছিলেন। আমি সেখানে ক্লাস না করে চলে গেছি ফেডারেশনে। আমার সঙ্গে আরেকটি ছেলেও ছিল এই ফাঁকি মারার দলে। তৈয়বুর রহমান, এখন ফিদে মাস্টার। ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে একটি জিএম টুর্নামেন্ট হয় ঢাকায়, ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স টুর্নামেন্ট। সেখানে এমন হয়েছে যে আমি ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে এসেও খেলেছি। টুর্নামেন্টে আমি চতুর্থ হই, বাংলাদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো। সেখানে ক্যারিয়ারে প্রথম কোনো গ্র্যান্ডমাস্টারের বিপক্ষে জিতি, ব্রিটিশ গ্র্যান্ড মাস্টার ড্যানিয়েল কিংয়ের বিপক্ষে জয়টি তখন আমার জন্য বিরাট ব্যাপার। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যানথ্রপলোজিতে ভর্তি হই। কিন্তু আমার আগ্রহ ছিল আইবিএ। জুন-জুলাই মাসের দিকে আইবিএ-র বিবিএ পরীক্ষা। আমি তখন দাবা একটু স্থগিত রেখে শুরু করলাম পড়ালেখা। এর মধ্যে হলো কী, এশিয়া জোনাল দাবার সূচি পড়ে গেল ঠিক আমার আইবিএ-র পরীক্ষার সময়। আমি এর আগের তিনবারের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। এখন কি সেখানে যাব, নাকি পরীক্ষা দেব? অনেক চিন্তাভাবনা, আলাপ-আলোচনা শেষে দাবা বেছে নেওয়ারই সিদ্ধান্ত হলো। প্রশ্ন : নিঃসন্দেহে অনেক বড় সিদ্ধান্ত... রিফাত : হ্যাঁ। আসলে এই টুর্নামেন্টটি ছিল বড় এক সুযোগ। এখানে ৬৬ শতাংশ স্কোর করলে সরাসরি আইএম হওয়া যায়, নইলে তিনটি নর্ম করতে হয়। সে কারণে আইবিএ-র আশা ছেড়ে দিয়ে ওই সুযোগটা নিতে চাই। আর তাতে সফলও হই। ইরানের ওই জোনাল দাবায় একটা সময় পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে ছিলাম। শেষ রাউন্ডের আগেও চারজনের একজন হিসেবে শীর্ষে। তাতে আবার আরেকটি বড় সিদ্ধান্তের ব্যাপার হয়ে যায়। আমার তখন সাড়ে ছয় পয়েন্ট। শেষ রাউন্ডে ড্র করলে সরাসরি আইএম হয়ে যাচ্ছি। আবার জয়ের জন্য খেললে থাকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ, তাতে বিশ্বকাপে খেলার দরজাটা খুলে যায়। কিন্তু তাতে হেরে গেলে আইএম আর হওয়া যাবে না। কেউ তখন আমাকে ঠিকভাবে গাইড করতে পারেনি। ড্রর জন্য খেলে ড্র করে আমি আইএম হই, হারাই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ। পরে অবশ্য অনেকে বলেছে যে জেতার জন্যই খেলা উচিত ছিল। কেননা প্রতিভা যখন ছিল দুই দিন আগে-পরে আমি আইএম হতামই। প্রশ্ন : এই ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার হওয়ার পর গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়ার স্বপ্নটা নিশ্চয়ই জোরালো হয়েছে আরো। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য তো আপনাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়... রিফাত : ১৩ বছর। ২০০৬ সালে আমার গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়ার ঘোষণা আসে। প্রশ্ন : সমসাময়িক জিয়াউর রহমান আপনার অনেক আগে গ্র্যান্ড মাস্টার হয়ে যান। তাঁর অর্জন কি আপনাকে তাঁতিয়ে তুলেছিল? রিফাত : হ্যাঁ, আমার তখন মনে হয়েছিল, জিয়া পারলে আমি পারব না কেন। এর ঠিক আগে আগে একটা বিবর্ণ সময় গেছে। ১৯৯৭ সালে আমি মাস্টার্স করি। বিয়ে করলাম ১৯৯৮ সালে। মাস্টার্স পাস করার পর চার বছর শুধু দাবা নিয়ে ছিলাম, কোনো চাকরি করিনি। আমার স্ত্রী আইরিন ওই সময় সংসার চালিয়েছে। ও যেহেতু চাকরি করত, আমাকে সংসার চালানোর কথা ভাবতে হয়নি। শুধু তাই নয়, ওর খরচে অনেকবার বিদেশে গিয়ে টুর্নামেন্টও খেলেছি। কিন্তু শুধু দাবা নিয়ে থাকলেও আমি দাবায় খুব একটা এগোতে পারছিলাম না। এর মধ্যে আবার জিয়া গ্র্যান্ড মাস্টার হয়ে গেল ২০০১ সালে বোধহয়। আমিও চাকরি করছিলাম। আর চাকরি নেওয়ার আট মাসের মধ্যেই জিএমের প্রথম নর্ম হয়ে যায়। ২০০২ সালে প্রথম, ২০০৩ সালে দ্বিতীয় আর ২০০৫ সালে তৃতীয় নর্ম। তিনটিই ঢাকায়। আমার গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে ২০০৬ সালে। মনে আছে, সেটি ছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালের দিন। টিভিতে তখন সব প্রোগ্রাম এই কেন্দ্রিক। কিন্তু তৃতীয় গ্র্যান্ড মাস্টার যে পেল বাংলাদেশ, সেটিও বড় খবর। এনটিভি থেকে আমাকে তাই ডাকা হলো। প্রতি দিন যেখানে ফুটবলারদের ডাকা হতো, সেখানে ফাইনালের দিনই কি না একজন দাবাড়ু! প্রশ্ন : আপনার ক্যারিয়ার গ্রাফে বেশ মজার একটি বিষয় লক্ষণীয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ালেখার চাপে ছিলেন, তখন দাবাতে ছিলেন উজ্জ্বল। মাস্টার্স করার পর চার বছর শুধু খেলা নিয়ে পড়ে রইলেন এবং ভালো করলেন না। আবার যখন চাকরিতে ঢুকলেন, উজ্জ্বলতা ফিরতে শুরু করল দাবায়... রিফাত : আমার ধরনটা হয়তো এমন। দাবা আমার আবেগ-ভালোবাসার জায়গা, পেশা না। এ ব্যাপারটা আমার নিজের কাছে সব সময় পরিষ্কার ছিল। যখন অন্য কোনো পেশায় যাইনি, তখন সে কারণেই হয়তো ভালো করিনি। আসলে খেলাধুলার প্রতি জীবনদর্শনটা এমনই হওয়া উচিত। আবেগের একটা জায়গা থেকে যদি সব সময় 'কী পাব, কী পাব' চিন্তা থাকে, তাহলে সেই বিশুদ্ধ আবেগটা আর থাকে না। আমি শুধু দাবার কথা বলছি না। ধরুন, এখন যদি কোনো ছেলে স্বপ্ন দেখে আমি ক্রিকেটার হলে আমার নামধাম হবে, অনেক অর্থ উপার্জন করব- সেটি তো ঠিক নয়। প্রশ্ন : কেন ঠিক না, একটু যদি বুঝিয়ে বলেন? আজ যদি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের এক কিশোর ক্রিকেট দিয়ে জীবন বদলে ফেলার স্বপ্ন দেখে, তাতে দোষটা কোথায়? রিফাত : দোষ নেই। দোষটা হবে তখনই, যখন সে ভাববে, ক্রিকেট দিয়ে যেটি বললেন অর্থ কামাবে, বাড়ি-গাড়ি করবে- এমনটা ভাববে। খেলাটাকে ভালোবাসতে হবে একেবারে হৃদয় দিয়ে। এরপর ধারাবাহিকতায় অর্থ-যশ-খ্যাতি আসবে। শচীন টেন্ডুলকারের সব সাক্ষাৎকারে আমি শুনেছি, ক্রিকেট ভালোবাসার কথা। রেকর্ড-অর্থ- এসব এমনিতেই হয়েছে। এখন ওসবের পেছনেই যদি কেউ ছোটে, তাহলে বিশুদ্ধ আবেগের জায়গাটি একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। আমি আমার ক্ষেত্রে অন্তত সেটি হতে দিইনি। প্রশ্ন : ২০০৬ সালে গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়ার পরই কি দাবার আগ্রহে ভাটা পড়ল? রিফাত : ঠিক আগ্রহে ভাটা বলব না, তবে এক ধরনের আয়েশি ভাব তো এসেছিলই। সঙ্গে আরেকটি ব্যাপার ছিল। ২০০১ থেকে আমি পুরোপুরি চাকরি করা শুরু করি। তত দিনে দায়িত্ব অনেক বেড়েছে। আর আমি তো বারবারই বলছি যে আমি ক্যারিয়ারের পথটি ঠিক করে নিয়েছিলাম। যে কারণে অফিসের কাজে বেশি সময় দিতে গিয়ে দাবায় সময় কমিয়ে দিতে হলো। আরডিআরএস, সেভ দি চিলড্রেন, ইউনিসেফ, প্লান হয়ে এখন আমি কাজ করছি অ্যাকশন এইডে। প্রশ্ন : বাকি চার গ্র্যান্ড মাস্টারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন? রিফাত : সম্পর্কের তো নানা মাত্রা থাকে। তবে মোটা দাগে সম্পর্ক ভালো। আমি আগেই বলেছি যে দাবায় অনেক সিনিয়রের সঙ্গে আমার বন্ধুর মতো সম্পর্ক, তাঁদের সঙ্গে আমি ছোট থেকে বড় হয়েছি। তবে ওই সিনিয়রদের মধ্যে নিয়াজ ভাই নেই। তাঁকে পেয়েছি ছাড়াছাড়া ভাবে। জিয়ার সঙ্গে একই সময় বেড়ে উঠেছি। আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক, একই স্কুলে পড়েছি কিছু দিন, আমার দেখাদেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যানথ্রপলোজিতে ও ভর্তি হয়। এত কিছুর পরও আমরা কিন্তু দাবা বোর্ডের প্রতিদ্বন্দ্বীও। রাকিব-রাজীবের সঙ্গে সম্পর্ক আবার অন্য রকম। যদিও তারা আমার বেশ জুনিয়র, কিন্তু আড্ডায় তাদের সঙ্গে আমি বেশ স্বচ্ছন্দ। যেটি নিয়াজ ভাইয়ের সঙ্গে তো না-ই, জিয়ার সঙ্গেও না। প্রশ্ন : গ্র্যান্ড মাস্টাররা তো দাবা ফেডারেশনের নির্বাচন নিয়ে দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন, পরে আবার একও হয়েছেন... রিফাত : সেখানে আমাদের জিএমদের সম্পর্কের নতুন এক মাত্রা তৈরি হয়েছিল। অযোগ্য-অথর্ব মোকাদ্দেসের নেতৃত্বে একটি অ্যাডহক কমিটি করা হয়েছিল। আমি, রাকিব, রাজীব এর বিপক্ষে জোরালো প্রতিবাদ করেছিলাম। অথচ এমন বাজে, অযোগ্য এক কমিটিকে সমর্থন করেছিলেন নিয়াজ ভাই, জিয়া, রানী আন্টি (রানী হামিদ)। তখন আমাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। দুই-তিন বছর পর নিয়াজ ভাই কিন্তু মিডিয়ায় বলেছিলেন যে 'আমাদের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, এই কমিটিকে সমর্থন করা উচিত হয়নি।' কিন্তু তত দিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে যায়। সে ক্ষতির জের এখনো দাবা টানছে। প্রশ্ন : পরে তো আপনারা এক হয়েও নির্বাচন করেছিলেন! রিফাত : হ্যাঁ, নিয়াজ ভাই নিজে একটা প্যানেল দিতে চাইলেন। আমরা বললাম যে আপনার সাধারণ সম্পাদক হওয়া ঠিক হবে না। সহসভাপতি হতে পারেন, তাতে পরামর্শের জায়গা থাকবে, খুব বেশি কাজ করতে হবে না। নিয়াজ ভাই রাজি হলেন। খন্দকার কায়েস হাসানকে সেক্রেটারি করে প্যানেল দিই আমরা। কিন্তু নির্বাচনের নানা নোংরামিতে শেষ পর্যন্ত আর জিততে পারিনি। তার পরও নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা পাঁচ গ্র্যান্ড মাস্টার একসঙ্গে অলিম্পিয়াডে গেছি। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরা ফল করে এসেছি। প্রশ্ন : দাবা নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত খুব বড় স্বপ্ন আর নেই। কিন্তু সামগ্রিক অর্থে বাংলাদেশের দাবা কি আর বড় স্বপ্ন দেখতে পারে? রিফাত : আমার মনে হয় না। দাবার ভবিষ্যৎ আসলে খুবই অন্ধকার। নতুন খেলোয়াড় আর তৈরি হচ্ছে না। আর দাবা ফেডারেশনে গত ছয়-সাত বছরে অযোগ্য সব লোক ঢুকে গেছে। তারা দাবার অন্ধকার দূর করবে- এই বিশ্বাস আমার নেই।