• ই-পেপার

প্রশ্ন-উত্তর

  • সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৯৩

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

...তাদের লক্ষণ তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার প্রভাবে প্রস্ফুটিত থাকবে; তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপ এবং ইনজিলেও তাদের বর্ণনা

এরূপই। তাদের দৃষ্টান্ত একটি চারাগাছ, যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়, অতঃপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয়। পরে কাণ্ডের ওপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে, যা চাষির জন্য আনন্দদায়ক।... (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ২৯)

আয়াতে সাহাবায়ে কেরাম (রহ.)-এর অনন্য মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১. হাসান বসরি (রহ.) বলেন, আয়াতে মুখমণ্ডলে সিজদার প্রভাব দ্বারা কিয়ামতের দিন মুমিনের চেহারায় যে ঔজ্জ্বল্য সৃষ্টি হবে তা উদ্দেশ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই জ্যোতির মাধ্যমে তাঁর উম্মতকে চিনতে পারবেন।

২. সাহাবায়ে কেরাম ও মুমিনদের এসব বৈশিষ্ট্য পূর্ববর্তী আসমানি কিতাব তাওরাত ও ইনজিলেও বর্ণিত হয়েছে।

৩. আয়াতে উপমার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দ্বিনি দাওয়াতের কৌশল ও ধারাক্রম তুলে ধরা হয়েছে। তা হলো ধীরে ধীরে হলেও সুদৃঢ়ভাবে অগ্রসর হওয়া।

৪. শরিয়তের দৃষ্টিতে সাহাবিদের সমালোচনা করা নিষিদ্ধ। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো একজন সাহাবির ব্যাপারে অন্তরে বিদ্বেষ পোষণ করে এই (২৯ নম্বর) আয়াতে তার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি রয়েছে।

৫. ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো একজন সাহাবির দোষ ধরল বা সমালোচনা করল, সে আল্লাহর দাবি প্রত্যাখ্যান করল এবং মুসলমানদের শরিয়তকে বাতিল গণ্য করল। (তাফসিরে কুরতুবি : ১৯/৩৪২)

 

নবীজি যে চার বিষয় থেকে আশ্রয় চাইতেন

নবীজি যে চার বিষয় থেকে আশ্রয় চাইতেন

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন কলবিন লা ইয়াখশাউ ওয়া দুআ-ইন লা ইয়ুসমাউ ওয়া মিন নাফসিন লা তাশবাউ ওয়া মিন ইলমিন লা ইয়ানফাউ আউজুবিকা মিন হা-উলাইল আরবাই।

অর্থ : হে আল্লাহ! তোমার কাছে আমি আশ্রয় প্রার্থনা করি এমন মন হতে, যা (তোমার ভয়ে) ভীত হয় না, এমন দোয়া হতে, যা শোনা হয় না (প্রত্যাখ্যান করা হয়), এমন আত্মা হতে, যা পরিতৃপ্ত হয় না এবং এমন জ্ঞান হতে, যা কাজে আসে না। তোমার নিকট আমি এ চার জিনিস থেকে আশ্রয় চাই।

সূত্র : রাসুল (সা.) সর্বদা এই চারটি বিষয়ে মহান আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলতেন, হে আল্লাহ! তোমার কাছে আমি আশ্রয় প্রার্থনা করি এমন মন হতে, যা (তোমার ভয়ে) ভীত হয় না, এমন দোয়া হতে, যা শোনা হয় না (প্রত্যাখ্যান করা হয়), এমন আত্মা হতে, যা পরিতৃপ্ত হয় না এবং এমন জ্ঞান হতে, যা কাজে আসে না। তোমার নিকট আমি এ চার জিনিস হতে আশ্রয় চাই। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৮২)

জিজ্ঞাসা

কিছু বিষয়ে অন্য মাজহাবের মতানুসারে আমল করা যাবে?

আমার নাম জামিলুল ইসলাম। পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক। আমি হানাফি মাজহাবের অনুসারী। কিন্তু কিছু কিছু বিষয়ে অন্য মাজহাবের মতামত ভালো লাগে। আমি কি কিছু কিছু বিষয়ে অন্য মাজহাবের মতানুসারে আমল করতে পারব?

মুফতি আবদুল্লাহ নুর
কিছু বিষয়ে অন্য মাজহাবের মতানুসারে আমল করা যাবে?

প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, চার মাজহাবের কোনো একটি মাজহাবের অনুসারী হয়ে বিশেষ মাসআলায় অন্য মাজহাবের অনুসরণ করা জায়েজ। তবে জায়েজ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) হিলায়ে নাজায়েজা নামক গ্রন্থে লেখেন, কঠিন প্রয়োজনে অন্য মাজহাবের ওপর আমল করা জায়েজ। শর্ত হলো তাতে প্রবৃত্তির অনুসরণ ও তালফিক (প্রত্যেক মাজহাবের সহজ বিধানগুলো বেছে বেছে আমল করা) থাকবে না।  এবং তা নিজ মাজহাবের ইমামদের ইজমাবিরোধী হবে না।

মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ ইউসুফ বানুরি (রহ.) বলেন, এ বিষয়ে তালফিক থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। এর উদ্দেশ্য সহজে অনুসন্ধান করাও হতে পারবে না।

(ফাতাওয়ায়ে বাইয়িনাত : ১/২৮)

মুফতি রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.) এ বিষয়ক এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, সব মাজহাবই সত্য। প্রয়োজনের সময় শাফেয়ি মাজহাবের ওপর আমল করা কোনো দোষের বিষয় নয়। কিন্তু প্রবৃত্তির অনুসরণ ও প্রবৃত্তির লালসার কারণে তা হতে পারবে না। যদি তা অপারগতা ও শরিয়তের দলিলের ভিত্তিতে হয় কোনো সমস্যা নেই। (ফাতাওয়ায়ে রশিদিয়া, পৃষ্ঠা-৯৩)

মোটকথা, যদি গুরুতর প্রয়োজন দেখা দেয় এবং নিজ মাজহাব অনুসারে আমল করলে মারাত্মক ক্ষতি ও কষ্টের আশঙ্কা হয়, তবে অন্য মাজহাব অনুসারে আমল করা যাবে। নিছক প্রবৃত্তির অনুসরণ ও সুযোগ গ্রহণের জন্য তা হতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, অন্য মাজহাবের ওপর আমল করার জন্য নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ হলো কি না যাচাই করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই নিজে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ মুফতির সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। তিনি যদি সবকিছু শুনে অন্য মাজহাব অনুসারে আমল করার অনুমতি দেন তবে তা করবে, নতুবা ছেড়ে দেবে।

আল্লাহ সব বিষয়ে সবচেয়ে ভালো জানেন।

দ্বিনের সপক্ষে দলিল-প্রমাণ জানা আবশ্যক

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
দ্বিনের সপক্ষে দলিল-প্রমাণ জানা আবশ্যক

মহান আল্লাহ পৃথিবীতে বিশেষ কিছু লক্ষ্য অর্জন ও উদ্দেশ্য পূরণে নবী-রাসুুুলদের পাঠিয়েছেন, যার অন্যতম দ্বিন ও শরিয়তের পক্ষে দলিল প্রতিষ্ঠা করা এবং বিপক্ষের দলিলগুলো খণ্ডন করা। আল্লামা জামালুদ্দিন গজনভি (রহ.) বলেন, রাসুল প্রেরণের একটি উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বিধানের পক্ষে দলিল প্রতিষ্ঠা করা এবং বিপক্ষের দলিল খণ্ডন করা, আল্লাহর অঙ্গীকারকৃত জান্নাত ও জাহান্নাম প্রমাণ করা। কেননা তাঁরা যদি প্রেরিত না হতেন, তবে অবিশ্বাসীরা ঈমান প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে অজুহাত খুঁজে পেত। মহান আল্লাহ বলেন, সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসুল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসুল আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে।

(সুরা : নিসা, আয়াত : ১৬৫; উসুলুদ্দিন, পৃষ্ঠা-১২০)

মোল্লা আলী কারি (রহ.) বলেন, নিশ্চয়ই যখন আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য জান্নাত এবং অবাধ্যদের জন্য জাহান্নাম সৃষ্টি করেন, তখন আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছাড়া মানুষের পক্ষে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও করণীয় কাজগুলো সম্পর্কে জানা সম্ভব ছিল না। তখনো মাটির সৃষ্টি মানুষ ও মহান আল্লাহর মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল না। আল্লাহর প্রজ্ঞার দাবি ছিল তিনি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী মানুষ প্রেরণ করবেন। যেন তাঁরা পথগুলোর ভালো-মন্দ প্রমাণ করতে পারেন। (দাউয়ুল মাআলি, পৃষ্ঠা-৭০)

শায়খ আবদুল্লাহ বিন বাজ (রহ.) বলেন, নবী-রাসুলদের প্রেরণের উদ্দেশ্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করা এবং অজুহাত দূর করা। যেন মানুষ বলতে না পারে, আমাদের কাছে কোনো সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী প্রেরিত হননি। আল্লাহ তাঁর রাসুলদের প্রেরণ করেছেন দলিল প্রতিষ্ঠা করতে, অজুহাত দূর করতে, মানুষকে সুপথ দেখাতে, সত্য প্রকাশ করতে, মানুষকে মুক্তির পথ দেখাতে, ধ্বংসের কারণ সম্পর্কে সতর্ক করতে। তাঁরা শ্রেষ্ঠ, সর্বোত্তম ও কল্যাণকামী মানুষ।

(মাজমুউ ফাতাওয়া : ৩/১০৬)

মুগিরা (রা.) থেকে বর্ণিত, সাআদ ইবনু ওবাদা (রা.) বললেন, আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোনো পুরুষকে যদি দেখি, তাকে সরাসরি তরবারি দিয়ে হত্যা করব। এ কথা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা কি সাআদের আত্মমর্যাদা দেখে বিস্মিত হচ্ছ? আল্লাহর শপথ! আমি তার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। আর আল্লাহ আমার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। আল্লাহ আত্মমর্যাদাবোধের কারণে প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা হারাম করেছেন। অক্ষমতা প্রকাশকে আল্লাহর চেয়ে অধিক পছন্দ করেন এমন কেউ নেই। আর এ জন্য তিনি ভীতি প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতাদের পাঠিয়েছেন। আত্মপ্রশংসা আল্লাহর চেয়ে অধিক কারো কাছে প্রিয় নয়। তাই তিনি জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৪১৬)

ইমাম নববী (রহ.) হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, হাদিসে অক্ষমতা প্রকাশ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মানুষকে অক্ষম করে দেওয়া এবং অজুহাতের সুযোগ না দেওয়া। (শরহু মুসলিম : ১০/১৩২)

অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর দরবারে তাওবা করা, অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসা এবং অক্ষমতা পেশ করা পছন্দ করেন। এ জন্য তিনি নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন, যেন মানুষ আল্লাহর পরিচয় জানতে পারে এবং তাঁর অভিমুখী হয়। আর তারা অজুহাত পেশ না করে। নবী-রাসুল প্রেরণ করার পরও তিনি তাওবা করা পছন্দ করেন বলে মানুষকে ক্ষমা করে দেবেন।