মহান আল্লাহ তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের মাধ্যমে পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে তুলেছেন। সেই নিয়ামতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো গাছ। এর মাধ্যমে মানুষের অক্সিজেন, খাদ্য, আসবাব, পশুপাখির আশ্রয়, পরিবেশের ভারসাম্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অসংখ্য প্রাণের জীবনধারণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই ইসলাম গাছকে শুধু একটি উদ্ভিদ হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর এক মহা নিয়ামত এবং মানবকল্যাণের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছে। নিম্নে গাছ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে আসা কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো—
রিজিকের অন্যতম উৎস : গাছের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁর বিভিন্ন মাখলুকের রিজিকের ব্যবস্থা করেন। যার মধ্যে মানুষ, পশুপাখি, পোকা-মাকড় সবই অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তিনিই সৃষ্টি করেছেন এমন বাগানসমূহ, যার কিছু মাচায় তোলা হয় আর কিছু তোলা হয় না এবং খেজুরগাছ ও শস্য, যার স্বাদ বিভিন্ন রকম, জয়তুন ও আনার যার কিছু দেখতে একরকম, আর কিছু ভিন্ন রকম। তোমরা তার ফল থেকে আহার করো, যখন তা ফলদান করে এবং ফল কাটার দিনেই তার হক দিয়ে দাও। আর অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’
(সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪১)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর তাতে আমি উৎপন্ন করি শস্য, আঙুর ও শাক-সবজি, জয়তুন ও খেজুর বন, ঘনবৃক্ষ শোভিত বাগ-বাগিচা, আর ফল ও তৃণগুল্ম। তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুগুলোর জীবনোপকরণস্বরূপ।’
(সুরা : আবাসা, আয়াত : ২৭-৩২)
এ আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, গাছ শুধু মানুষের নয়; পশুপাখির রিজিকেরও অন্যতম উৎস।
মানুষের ব্যাবহারিক কল্যাণের মাধ্যম : মহান আল্লাহ গাছের মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের ব্যাবহারিক কল্যাণের ব্যবস্থা করেন। যেমন— নুহ (আ.) নৌকা তৈরি করেছিলেন বলে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি তাকে (নুহকে) কাঠ ও পেরেক নির্মিত নৌযানে আরোহণ করালাম।’
(সুরা : কামার, আয়াত : ১৩)
একইভাবে জ্বালানিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস কাঠ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যিনি সবুজ বৃক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আগুন তৈরি করেছেন। ফলে তা থেকে তোমরা আগুন জ্বালাও।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৮০)
এ আয়াতগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গাছের বহুমুখী উপকারিতার প্রতি ইঙ্গিত দেয়। বর্তমান যুগে আমাদের ব্যবহৃত বহু জিনিস এমন আছে, যার উৎস মূলত গাছ।
ছায়া দেয় : গাছের শীতল ছায়ায় ক্লান্ত মানুষ স্বস্তি পায়। শরীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রফুল্লতায়ও গাছ বিশেষ ভূমিকা রাখে। মহান আল্লাহ যখন ইউনুস (আ.)-কে মাছের পেট থেকে নাজাত দিয়েছিলেন, তখন তাঁকে ছায়া দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিক একটি ছায়াদার গাছ উদ্গত করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর আমি তাকে তৃণলতাহীন প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম এবং সে ছিল অসুস্থ। অতঃপর আমি তার ওপর লাউ-কুমড়া জাতীয় লতাপাতাযুক্ত একটা গাছ বের করে দিলাম।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১৪৫-১৪৬)
পরিবেশ রক্ষায় উপকারী : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা জমিনে ফাসাদ কোরো না তার সংশোধনের পর এবং তাঁকে ডাকো ভয় ও আশা নিয়ে। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।’
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৬)
কোনো কোনো তাফসিরবিদের মতে, এই আয়াত পরিবেশ ধ্বংস, বন উজাড়, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহারসহ সব ধরনের ফাসাদ (বিপর্যয়) থেকে বিরত থাকারও একটি মৌলিক নীতি প্রদান করে।
গাছ লাগালে সদকার সওয়াব : গাছ যেহেতু বহুভাবে মানুষের জীবন ও কল্যাণের সঙ্গে জড়িত, তাই সহিহ নিয়তে তা রোপণ করা ও পরিচর্চা করারও বিশেষ সওয়াব রয়েছে। গাছ লাগানোর প্রতি উৎসাহ দিতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যেকোনো মুসলিম ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায় আর তা হতে পাখি কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায়, তবে তা তার পক্ষ হতে সদকা বলে গণ্য হবে।’
(বুখারি, হাদিস : ২৩২০)
এমনকি অন্য হাদিসে তিনি কিয়ামতের পূর্বক্ষণেও যদি কেউ গাছ লাগানোর সুযোগ পায়, তাহলেও যেন সে গাছটি রোপণ করে এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন।
(মুসনাদে আহমাদ)
অতএব আমাদের সবার উচিত পরিবেশের বন্ধু এই সম্পদ বৃদ্ধি, রক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে যত্নবান হওয়া।