১৯৬৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদখ্যাত বায়তুল মোকাররমে প্রথম নামাজ আদায় হয়। আব্দুর রহমান কাশগরি (১৯১২-১৯৭১ খ্রি.) বায়তুল মোকাররমের প্রথম খতিব (প্রায় এক বছর) ছিলেন।
উপমহাদেশের খ্যাতিমান আলেম, নিপীড়িত উইঘুর মজলুম-মুহাজির, ভাষা-ব্যাকরণবিদ, কবি, লেখক, সংগ্রাহক আব্দুর রহমান কাশগরি ১৯১২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গণচীনের উত্তর-পশ্চিমের জনপদ, তথা পূর্ব-তুর্কিস্তানের কাশগরে (বর্তমান শিনজিয়াং, চীন) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন এলাকার সম্ভ্রান্ত শাসক। চীনা কমিউনিজমের অত্যাচারে বন্দি হন তাঁর পিতা, ভাইবোন। জব্দ হয় তাদের খামারবাড়ি, জমিজমা সর্বস্ব। বন্দি হয় কাশগরির স্বপ্ন-ভবিষ্যৎও!
তাঁর মা তখন দারুণভাবে ভেঙে পড়লে, মামার পরামর্শে বেঁচে থাকার তাগিদে কাশগরিকে ভারতে পাঠানো হয়। তাঁর ইচ্ছা হচ্ছিল মাকে সঙ্গে নেওয়ার। না, মা রইলেন কাশগরেই—স্বামী-সন্তান ও স্বদেশের মায়ায়।
শুরু হয় দুঃখের সাগর সাঁতরে টিকে থাকার সংগ্রাম! কাশগরের রাজনৈতিক অন্ধকারের সঙ্গে যুক্ত হলো প্রকৃতি, সেদিনের আকাশে চাঁদ ছিল না, আধো আলো-আঁধারির মধ্যেই ১৪-১৫ বছর বয়সী আব্দুর রহমান রওনা হলেন ভারতের উদ্দেশে। অনেকটা পথ হেঁটে পেছন ফিরে দেখেন, দূর পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন মা। পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হওয়ার পূর্বমুহূর্তে কানে বেজে ওঠে মমতাময়ীর বুকফাটা আর্তনাদ, ‘আব্দুর রহমান...’!!
বাস্তুচ্যুত কাশগরি লখনৌয়ের নদওয়াতুল উলামা এতিমখানায় আশ্রয় পান। সেখানে তিনি হাদিস, তাফসির, আরবি ভাষা-সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর বিদ্যার্জন করেন। ১৯২২ সালে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে আরবি ভাষা-সাহিত্যের অধ্যাপক হন। তিনি দারুন নদওয়াতুল উলামা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত শিক্ষা-গবেষণায় নিয়োজিত থেকে ১৯৩১ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে সর্বোচ্চ শ্রেণি ‘ফাজিল-ই-আদাব’ ডিগ্রি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি অর্জন করেন।
আল্লামা কাশগরির উচ্চশিক্ষা সমাপ্তির পর পরই লখনৌ সফরে আসেন শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। তাঁর সঙ্গে কাশগরির হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁর অনুুরোধে ১৯৩৮ সালে তিনি কলকাতা মাদরাসা-ই-আলিয়ায় যোগদান করেন। আল্লামা কাশগরি পরবর্তী সময়ে মাদরাসা-ই-আলিয়ায় উসুলে ফিকহের অধ্যাপক পদে মনোনীত হন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতার মাদরাসা-ই-আলিয়া অধুনা পূর্ব পাকিস্তান/ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ১৯৪৮ সালে স্থানান্তরিত হয়। আল্লামা কাশগরি চলে আসেন ঢাকায়। তিনি মাদরাসার লাইব্রেরি এবং অন্যান্য মূল্যবান সম্পদের ‘মুহাফিজ’ বা সংরক্ষক ও হোস্টেল সুপারের দায়িত্বে নিযুক্ত হলেন। ১৯৫৬ সালে আল্লামা কাশগরি সহকারী হেড মাওলানা এবং ১৯৬৯ সালে হেড মাওলানার পদোন্নতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন শিক্ষকমণ্ডলীর শিক্ষকতুল্য। এ জন্যই তাঁকে ‘উস্তাজুল আসাতিজা’ বলা হতো।
আব্দুর রহমান কাশগরি স্বভাবকবি, লেখক হিসেবে খ্যাতিমান। তাঁর রচিত আরবি ‘আয-যাহারাত’ (১৯৩৫, লখনৌ) কাব্যগ্রন্থে দেশাত্মবোধ এবং প্যান-ইসলামিজম প্রতিফলিত হয়েছে। ‘আল-হাদিকা’ নামক তাঁর আরবি গদ্য-পদ্য সংকলনটি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক মনোনীত হয়। তিনি ‘আল-মুফিদ’ (২ খণ্ড, ১৯৬১) নামে ত্রিভাষিক (আরবি-উর্দু-বাংলা) উচ্চমানের অভিধান সংকলন করেন। অভিধানটি মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়।
আল্লামা কাশগরির উল্লেখযোগ্য রচনাবলির মধ্যে আছে ‘আল ইবরাত’, ‘আশ শাযারাত’, ‘মুহিককুন নাকদ্’, ‘আল মাহবাব ফিল মুযাককার ওয়াল মুয়াল্লাম’ ইত্যাদি। তাঁর অপ্রকাশিত রচনাবলির মধ্যে ‘শে’র ইবি্ন মুকবিল’, ‘ইযালাতুল খাফা আল খিলাফাতিল খুলাফা’, ‘ফারহাঙ্গে কাশগরি’ উল্লেখযোগ্য।
অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী আল্লামা কাশগরি ছিলেন নিরীহ-নিরহংকারী। ছিলেন আচার-ব্যবহার, চালচলনে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর। শুধু আলোকিত মানুষ গড়েননি তিনি। শিক্ষার আলোর সন্ধানই দেননি, বরং মানবসেবা, আত্মপ্রেম, পরিবেশ-প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং সৃষ্টির সেবার মাধ্যমে জাগতিক জীবন পরিচালনার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বিড়াল পুষতেন। নতুন বই কেনা তাঁর শখ ছিল।
বায়তুল মোকাররমের প্রথম খতিব, ভাগ্যবিড়ম্বিত জ্ঞানতাপস আব্দুর রহমান কাশগরি বেছে নিয়েছিলেন চিরকুমারত্বের স্বাধীনতা। জ্ঞানের পত্ররস প্রেয়সীর গোলাপি গালের চেয়েও তাঁর কাছে ছিল মধুময়। আমৃত্যু যখনই আনমনা হতেন; কানে বাজত যেন ‘আব্দুর রহমান’...!! ডেকে যাচ্ছেন তাঁর আম্মাজান। মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকায় তিনি আমৃত্যু অধ্যাপনারত ছিলেন। চিরদুঃখী মানুষটির আপনজন বলে কেউ ছিল না। মাদরাসার আবাসিক ছাত্রদের তিনি সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। তাঁর আপনজন ছিল ছাত্ররাই। তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা জানিয়ে মাদরাসা-ই-আলিয়ার একটি হলের নামকরণ করা হয় আল্লামা কাশগরি (রহ.) হল।
আব্দুর রহমান কাশগরি ৩ এপ্রিল ১৯৭১ ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। অনন্তনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন আজিমপুর নতুন গোরস্তানে। কাশগরি (রহ)-এর বর্ণাঢ্য জীবন ও সংগ্রাম অনাগত প্রজন্মের কাছে অনুপম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুক। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ
কাপাসিয়া, গাজীপুর।