ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবস্থিত প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ এক শ বছর পূর্ণ করেছে। ১৫ জুলাই ১৯২৬ তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট গাস্তোঁ দুমের্গ এবং মরক্কোর তৎকালীন সুলতান মাওলায়ে ইউসুফ যৌথভাবে এর উদ্বোধন করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত মুসলিম সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। সে সময় এক লাখের বেশি মুসলিম সেনা নিহত হয়েছিল।
স্পেনীয়-মুরিশ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মসজিদটির অন্যতম আকর্ষণ ৩৩ মিটার উঁচু মিনার। এতে আছে আরব-আন্দালুসীয় প্রাসাদের আদলে নির্মিত মনোরম প্রাঙ্গণ ও অভ্যন্তরীণ বাগান। এর বারান্দা ও প্রবেশপথগুলো ১৯২২ সালে মরক্কোর দক্ষ কারুশিল্পীদের হাতে খোদাই করা নান্দনিক টাইলস দ্বারা অলংকৃত। মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি জনপ্রিয় চা-কক্ষ এবং ঐতিহ্যবাহী হাম্মামও রয়েছে। ফ্রান্সে ইসলামী স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত এই মসজিদকে ১৯৮৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।
তবে ঐতিহাসিক এই মসজিদের সঙ্গে আরো কিছু ইতিহাস জড়িয়ে আছে। যেমন—ঔপনিবেশিক যুগে ফ্রান্সে বসবাসরত মুসলিমদের ওপর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান দখলদার বাহিনীর নিপীড়নের শিকার ইহুদিদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
প্যারিস গ্র্যান্ড মসজিদ বর্তমানে রাজধানী প্যারিসের ব্যস্ত লাতিন কোয়ার্টার এলাকায় অবস্থিত। শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে মসজিদে একাধিক বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজনে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিরা সমসাময়িক ফ্রান্সে মুসলিম হিসেবে জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা নিয়েও নিজেদের ভাবনা তুলে ধরছেন।
প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদের রেক্টর (প্রধান) শেমস-এদ্দিন হাফিজের মতে, এই মসজিদ আন্ত ধর্মীয় সংলাপ এবং ফ্রান্সের বহুত্ববাদী পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে ক্রমবর্ধমান বিভাজনমূলক রাজনৈতিক প্রচারণার কারণে দেশে ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
শুক্রবার শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ নামাজে অংশ নিতে প্যারিস ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ মসজিদে আসেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া মুসলিম যেমন ছিলেন, তেমনি কয়েক দশক আগে আলজেরিয়া, সেনেগালসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসে বসতি গড়া মানুষও। উপস্থিত অনেকের পারিবারিক শিকড় ফ্রান্সের সাবেক ঔপনিবেশিক ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।
হাফিজ বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সকে রক্ষা করতে গিয়ে ভার্দ্যাঁসহ বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেওয়া মুসলিম সৈন্যদের আত্মত্যাগ স্মরণ করতেই ফরাসি কর্তৃপক্ষ এই মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। এসব সৈন্যের বেশির ভাগই আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশগুলো থেকে এসেছিলেন। মসজিদটি উদ্বোধনের সময় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট গাস্তোঁ বলেছিলেন, ফ্রান্সের বৈচিত্র্যই তার জাতীয় ঐক্যকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমার বিশ্বাস ১৯২৬ সাল থেকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রাজনৈতিক বার্তাটি বদলায়নি। সমস্যাটা মানুষের মনোভাবের মধ্যে। আজও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ঘটনা ঘটছে। ইসলামকে প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা হয়, আর মুসলিম বা ইসলাম নিয়ে কথা বললেই অনেক সময় শত্রুতা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।’
বর্তমানে ইসলাম ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যা এই দেশেই বসবাস করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটির মুসলিমরা এখনো সমাজে পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করছেন এবং বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। অন্যদিকে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ফ্রান্সে রাজনৈতিক প্রচারণা জোরদার হচ্ছে।
সূত্র : এবিসি নিউজ
ও ফ্রেন্স টুয়েন্টিফোরডটকম