সব উদ্দেশ্য ও মহৎ আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সর্বোচ্চ হলো আল্লাহ তাআলার তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা—আসমান ও জমিনের রবকে একক হিসেবে স্বীকার করা, তাঁর একত্বে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, শুধু তাঁর সামনে বিনম্র হওয়া, তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা, আশা ও ভয় নিয়ে তাঁরই ইবাদত করা, রুকু-সিজদার মাধ্যমে একমাত্র তাঁরই আনুগত্য করা, সমস্ত ইবাদতকে তাঁর জন্যই একনিষ্ঠ করা এবং ছোট-বড়, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকা। এটাই সেই মহান উদ্দেশ্য, যার জন্য আল্লাহ জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমারই ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি।’
(সুরা : আয-যারিয়াত, আয়াত : ৫৬)
এই তাওহিদের দাওয়াত দেওয়ার জন্যই আল্লাহ তাঁর সম্মানিত রাসুলদের প্রেরণ করেছেন এবং মহান কিতাবসমূহ নাজিল করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন রাসুল প্রেরণ করেছি এই নির্দেশ দিয়ে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুতকে বর্জন করো। অতঃপর তাদের মধ্যে কাউকে আল্লাহ হিদায়াত দিয়েছেন, আর কারো ওপর পথভ্রষ্টতা অবধারিত হয়েছে। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো, মিথ্যাবাদীদের পরিণাম কেমন হয়েছে।’
(সুরা : আন-নাহল, আয়াত : ৩৬)
তাওহিদই প্রকৃত জীবনের উৎস
তাওহিদের মাধ্যমে বান্দা এমন এক সত্যিকারের জীবন লাভ করে, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি, সম্মান ও অফুরন্ত নিয়ামতে পরিপূর্ণ। পক্ষান্তরে তাওহিদহীন জীবন পশুর জীবনের মতো। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি কি মনে করেন, তাদের বেশির ভাগ শোনে অথবা বুঝে? তারা তো পশুর মতোই; বরং তারা আরো বেশি পথভ্রষ্ট।’ (সুরা : আল-ফুরকান, আয়াত : ৪৪)
যার অন্তরে তাওহিদ নেই, সে পৃথিবীতে চলাফেরা করলেও প্রকৃত অর্থে মৃত। আর যে তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই প্রকৃত জীবিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত ছিল, অতঃপর আমি তাকে জীবন দান করেছি এবং তাকে এমন এক আলো দিয়েছি, যার সাহায্যে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করে—সে কি তার মতো হতে পারে, যে অন্ধকারে নিমজ্জিত এবং তা থেকে বের হতে পারে না?’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ১২২)
অর্থাৎ আল্লাহ তাকে ঈমান ও তাওহিদের মাধ্যমে জীবিত করেছেন।
তাওহিদ সুখ, প্রশান্তি ও হৃদয়ের স্থিরতার উৎস
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানদার অবস্থায় সৎকর্ম করবে—সে পুরুষ হোক বা নারী—আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র ও সুখময় জীবন দান করব এবং তাদের উত্তম কর্মের সর্বোত্তম প্রতিদান দেব।’
(সুরা : আন-নাহল, আয়াত : ৯৭)
তাওহিদের মাধ্যমে হৃদয় থেকে কুসংস্কার, দুশ্চিন্তা, শয়তানের কুমন্ত্রণা ও অশুভ চিন্তা দূর হয়ে যায়। হৃদয় লাভ করে প্রশান্তি, স্বস্তি ও স্থিরতা। তাই আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন, ‘বলুন, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের কাছে, মানুষের অধিপতির কাছে, মানুষের উপাস্যের কাছে...।’ (সুরা : আন-নাস, আয়াত : ১-৩)
এটি তাওহিদের ঘোষণা।
তাওহিদ মানুষকে অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে
তাওহিদের মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছায় বান্দা জাদুকর, ভণ্ড ও অশুভ মানুষের ষড়যন্ত্র থেকে নিরাপদ থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ঈমানদারদের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞকে ভালোবাসেন না।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৮)
তাওহিদ দুনিয়া ও আখিরাতের সব কল্যাণের চাবিকাঠি
তাওহিদের মাধ্যমে মানুষ সব ধরনের কল্যাণ, দুনিয়ার শান্তি এবং আখিরাতের সফলতা লাভ করে। আল্লাহ তাঁর অকাট্য বিধানে নির্ধারণ করেছেন যে প্রকৃত সুখ ও নিয়ামত শুধু ঈমান ও তাওহিদের অধিকারীদের জন্য—পৃথিবীতে, কবরের জীবনে এবং আখিরাতে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই সৎকর্মশীলরা নিয়ামতের মধ্যে থাকবে।’
(সুরা : আল-ইনফিতার, আয়াত : ১৩)
কাজেই তাওহিদই ইসলামের মূল ভিত্তি, সব ইবাদতের প্রাণ এবং মানুষের মুক্তি, নিরাপত্তা, শান্তি ও সফলতার একমাত্র পথ। যে ব্যক্তি আল্লাহকে এককভাবে মানে, তাঁরই ইবাদত করে এবং শিরকের সব রূপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে, সে দুনিয়ায় প্রশান্তি ও সম্মান লাভ করে এবং আখিরাতে জান্নাতের চিরস্থায়ী নিয়ামতের অধিকারী হয়। তাই প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো নিজের তাওহিদকে বিশুদ্ধ রাখা, ঈমানকে নিয়মিত নবায়ন করা এবং নিজের পরিবার ও সমাজে তাওহিদের শিক্ষা ও চর্চা প্রতিষ্ঠা করা।