• ই-পেপার

অপরাধপ্রবণতা কমাতে নবীজি (সা.)-এর পাঁচ নীতি

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৮২

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও

সতর্ককারীরূপে। যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো, রাসুলকে শক্তি জোগাও এবং তাঁকে সম্মান করো; সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো।

(সুরা : ফাতহ, আয়াত : ৮-৯)

আয়াতদ্বয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাঁর সম্মান রক্ষার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১. প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মত সম্পর্কে এই মর্মে সাক্ষ্য দেবেন যে তিনি তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও তাঁর উম্মতের ব্যাপারে এই সাক্ষ্য দেবেন।

২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাহায্য করা, তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাঁর সম্মান রক্ষা করা মুমিনের অপরিহার্য দায়িত্ব।

৩. তাসবিহ পাঠ তথা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করা আল্লাহর সঙ্গে খাস। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো তাসবিহ পাঠ করা বৈধ নয়।

৪. আয়াত দ্বারা সকাল ও সন্ধ্যায় আল্লাহর জিকির করার গুরুত্ব প্রমাণিত হয়।

৫. প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, দরুদ শরিফ ইবাদত ও দোয়া কবুলে সহায়ক। আর আয়াত দ্বারাও তা পরোক্ষভাবে প্রমাণিত হয়। কেননা আয়াতে রাসুল (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও আল্লাহর তাসবিহ পাঠের আদেশ একত্রে এসেছে। (মাআরেফুল কোরআন : ৮/৫৬)

প্রশ্ন-উত্তর

সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

প্রশ্ন-উত্তর

মুক্তাদির সানা-তাসবিহের আওয়াজ কতটুকু হবে?

প্রশ্ন : জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের সময় ইমামের পেছনে সানা, তাশাহুদ ইত্যাদি যা কিছু পড়তে হয় তা কতটুকু আওয়াজে পড়তে হয়? কিছু মুসল্লি আছে, জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়ার সময় সানা, তাশাহুদ ইত্যাদি যা কিছু পড়তে হয়, সেগুলো এত উচ্চৈঃস্বরে পড়ে, যা কাতারের ডানে পাঁচ-সাতজন এবং বাঁয়ে পাঁচ-সাতজনের কানে আওয়াজ পৌঁছে। এ ধরনের মুসল্লিদের নামাজ শুদ্ধ হবে কি?

জয়নাল আবেদিন, নারায়ণগঞ্জ

উত্তর : নামাজে তাকবির, তাসবিহ, সানা, তাশাহুদ ইত্যাদি নিজ কানে শোনার মতো আওয়াজে পড়া সুন্নত। ভুলবশত কিংবা অজ্ঞতার কারণে আওয়াজ পাঁচ-সাতজন শোনার মতো উচ্চৈঃস্বরে হয়ে গেলেও নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৪৭৫-৪৭৬, বায়হাকি : ২/১৪৬)

হাদিসের আলো

নেক আমলই পরকালের সঙ্গী

নেক আমলই পরকালের সঙ্গী

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিনটি জিনিস মৃত ব্যক্তির সঙ্গে যায় : তার আত্মীয়-স্বজন, তার সম্পদ ও তার আমল। অতঃপর দুটি জিনিস ফিরে আসে এবং একটি জিনিস থেকে যায়। তার আত্মীয়-স্বজন ও তার সম্পদ ফিরে আসে এবং তার আমল (তার সঙ্গে) থেকে যায়। (বুখারি, হাদিস : ৬৫১৪)

শিক্ষা

উল্লিখিত হাদিস থেকে কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হলো

১. পার্থিব জীবন, বস্তু ও সম্পর্ক সবই ক্ষণস্থায়ী। ব্যক্তি এর সবকিছু ছেড়ে চলে যায়।

২. পরকালই স্থায়ী এবং পরকালের উপার্জন তথা নেক আমলই ব্যক্তির চিরসঙ্গী।

৩. সন্তান যদি নেককার হয় এবং সম্পদ যদি আল্লাহর পথে ব্যয় করা হয়, তবে তা পরকালে মানুষের উপকারে আসবে; নতুবা তা কোনো উপকারে আসবে না।

৪. অসৎ উপায়ে উপার্জিত সম্পদ ইহকালে ও পরকালে মানুষের বিপদের কারণ হবে।

৫. সেই ব্যক্তিই বুদ্ধিমান যে পার্থিব জীবনে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করে। আর বোকা সেই ব্যক্তি যে পার্থিব জীবনকেই একমাত্র জীবন জ্ঞান করে পরকাল থেকে বিমুখ থাকে। (মাউসুয়াতুল হাদিসিয়্যা)

বন্যা ও বর্ষায় করণীয় আমল

ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
বন্যা ও বর্ষায় করণীয় আমল

বন্যা বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা প্রতিবছর মানুষের জীবনযাত্রা, সম্পদ ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বন্যার কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যাভাব, রোগব্যাধির বিস্তার এবং পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি দেখা দেয়। ইসলাম ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি মানুষের কল্যাণ, দুর্যোগ মোকাবেলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে। মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও হাদিসে বিপদগ্রস্ত মানুষের সহযোগিতা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং বৃক্ষরোপণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা : বন্যার সময় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে। তাই এ সময়ে বিশুদ্ধ পানি বিতরণ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ এবং নিরাপদ পানির উৎস নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। মহানবী (সা.) মদিনায় এসে মানুষের সুপেয় পানির সংকট দেখে রুমা কূপটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। যেমনটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরত করে মদিনায় আগমন করার পর দেখলেন যে সেখানে সুপেয় পানি পান করার ব্যবস্থা নেই। এক ইহুদির রুমা নামক একটি কূপ থাকলেও যার পানি অনেক চড়া মূল্যে বিক্রি করা হয়। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) কূপটি ব্যক্তিমালিকানা থেকে সরিয়ে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা করলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন কে রুমা নামক কূপটি কিনে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে? এবং এর বিনিময়ে জান্নাতে আরো উত্তম পুরস্কার লাভ করবে? এ কথা শুনে উসমান (রা.) এই কূপ খরিদ করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করলেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৭০৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৫১১ ও ৫৫৫)

বানভাসি মানুষের সহযোগিতা : বানভাসি মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহৎ কাজ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে। এ অবস্থায় তাদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক দায়িত্ব এবং একটি বড় ইবাদত। অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা মানুষদের প্রতি মহান আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ ও সাহায্য বর্ষণ করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যতক্ষণ একজন মানুষ অন্য মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকবে, আল্লাহ তাআলাও তার কল্যাণে রত থাকবেন। (মুসলিম, হাদিস : ৬৭৪৬)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মহান আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি ব্যয় করো, আমিও তোমার প্রতি ব্যয় করব। (বুখারি, হাদিস : ৫৩৫২)।

বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন : বর্ষায় বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বৃক্ষ ও তরুলতা প্রকৃতির প্রাণ হিসেবে কাজ করে; এগুলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বায়ু বিশুদ্ধকরণ, মাটিক্ষয় রোধ, বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্ষাকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় গাছের চারা সহজে বেড়ে ওঠে। তাই এ সময়কে বৃক্ষরোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশগত কাজ নয়; বরং এটি একটি সওয়াবপূর্ণ ইবাদতও বটে। একটি গাছ বহু বছর ধরে মানুষকে ফল, ছায়া ও অক্সিজেন প্রদান করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে; তত দিন গাছ রোপণকারীর সওয়াবও চলমান থাকে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে মুসলমান কোনো বৃক্ষ রোপণ করে, তারপর তা থেকে কোনো মানুষ, পশু বা পাখি ভক্ষণ করে, এর বিনিময়ে কিয়ামতে তার জন্য একটি সদকার সওয়াব রয়েছে। (মুসলিম, হাদিস : ৪০৫৩)

পরিশেষে বলা যায়, বন্যা মোকাবেলায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, বানভাসি মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা এবং বৃক্ষরোপণ ও বনায়নের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও মানবকল্যাণমূলক কাজ। এসব কাজ একদিকে সামাজিক দায়িত্ব, অন্যদিকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের পুরস্কার লাভের অন্যতম মাধ্যম। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে যেমন দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে, তেমনি একটি মানবিক, কল্যাণমুখী ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠন করা সহজ হবে।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

অপরাধপ্রবণতা কমাতে নবীজি (সা.)-এর পাঁচ নীতি | কালের কণ্ঠ