kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

নওমুসলিমের কথা

মুসলিমভ্রাতৃত্ব মুগ্ধ করেছিল নৃবিজ্ঞানী মিল্লিমাকে

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুসলিমভ্রাতৃত্ব মুগ্ধ করেছিল নৃবিজ্ঞানী মিল্লিমাকে

নেদারল্যান্ডসের নাগরিক আর এল মিল্লিমা একজন নৃবিজ্ঞানী, লেখক ও বুদ্ধিজীবী ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি আমস্টারডামে অবস্থিত ট্রপিক্যাল মিউজিয়ামের ইসলাম বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুসলিম হন। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান ভ্রমণের সময় স্থানীয় মুসলমানদের আচার-আচরণ ও সৌহার্দ্যবোধ তাঁকে মুগ্ধ করে। Wayang Puppets, Grondwet van Pakistan, Een Interpretatie van de Islam  তাঁর উল্লেখযোগ্য বই। নিজের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন—

 

১৯১৯ সালে আমি ইউনিভার্সিটি অব লিডেনে প্রাচ্য ভাষা অধ্যয়ন শুরু করি এবং বিখ্যাত আরববিদ অধ্যাপক সি. ইসনুুক হারগোনজের আলোচনা শুনি। আমি আরবি শিখি এবং কোরআনের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘তাফসিরে বায়দাবি’র অনুবাদ এবং ইমাম গাজালির ‘ইহয়াউ উলুমিদ্দিনে’র অনুবাদ পাঠ করি। আরবি ছাড়াও আমি সংস্কৃত, মালয় ও জাভানিজ ভাষা শিখি। ১৯২৭ সালে আমি নেদারল্যান্ডস ছেড়ে ইন্দোনেশিয়া যাই জাপানিজ ভাষা শিখতে এবং ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাস জানতে। বিশেষত, প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনসমৃদ্ধ ইন্দোনেশিয়ার গোগিয়ার্তা দ্বীপ ছিল আমার লক্ষ্য।

১৫ বছরের প্রচেষ্টায় আমি নিজেকে জাপানিজ ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করি। এ সময় ইসলামের সঙ্গেও আমার সামান্য পরিচয় ঘটে। জাপানে একজন যুদ্ধবন্দি হিসেবে জীবনের কঠিনতম দিনগুলো কাটানোর পর ১৯৪৬ সালে নেদারল্যান্ডসে ফিরে এসে ‘দ্য রয়েল ট্রপিকাল ইনস্টিটিউটে’ চাকরি নিই। এখানে এসে ‘জাভায় ইসলামচর্চার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা’ শীর্ষক প্রতিবেদন তৈরির সময় আমি পুনরায় ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাই। ১৯৫৪-৫৫ সালের শীতে পাকিস্তান সফরের পর নতুন এই ইসলামী রাষ্ট্র নিয়ে পড়তে শুরু করি।

ইউরোপীয় লেখকদের কাছ থেকে ইসলাম সম্পর্কে যা জেনেছিলাম, লাহোরে এসে তার ভিন্নরূপ দেখতে পাই। মুসলিম বন্ধুদের কাছে তাদের সঙ্গে জুমার নামাজে অংশগ্রহণের সুযোগ চাইলে তারা আমাকে সুযোগ করে দেয়। তখন আমি ইসলামের মহান মূল্যবোধ আবিষ্কার করি। লাহোরের মসজিদের যাওয়ার পর এবং মুসলিম ভাই-বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার পর থেকে নিজেকে মুসলিম বলেই মনে হতো। আমার সে সময়ের অভিজ্ঞতার কথা আমি ত্রৈমাসিক পাকিস্তানের (ভলিয়ম ১/৪, ১৯৫৫) এক সংখ্যায় লিখিও।

আমরা যে ছোট মসজিদ পরিদর্শনে যাই, সেখানে যিনি আলোচনা করছিলেন, তিনি খুব সাবলীল ইংরেজি বলতে পারেন। তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব পদে কর্মরত ছিলেন। আলোচনার পর ইমামের নেতৃত্বে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা হয়। এরপর অন্যরা নীরবে আরো কয়েক রাকাত নামাজ আদায় করেন।

আমি বের হয়ে যেতে চাচ্ছিলাম। ইমাম আমার দিকে ফিরে বলেন, উপস্থিত মুসল্লিরা আমার কাছ থেকে কিছু শুনতে চায় এবং তিনি তাদের ইংরেজিতে ভাষান্তর করে শোনাবেন। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, আমি যে দূরদেশ থেকে এসেছি, সেখানে খুব সামান্যসংখ্যক মুসলিম বসবাস করে। আমি মসজিদে উপস্থিত মুসলিম ভাইদের অভিনন্দন জানাতে চাই, যারা সাত বছর ধরে নিজেদের মুসলিম দেশে বসবাস করছে। এই সামান্য সময়ে তারা একটি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছাতে পেরেছে। একটি কঠিন সূচনার পর তাদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। আমি তাদের কাছে অঙ্গীকার করছি প্রতিটি স্তরে পাকিস্তানি মুসলমানদের পক্ষ থেকে যে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সম্মান পেয়েছি, তা আমার দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দেব।

এই শব্দগুলো ভাষান্তরিত হওয়ার পর এক অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া হয়। তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে আমি হতবাক ও বিস্মিত। আমি দেখলাম শত শত মুসল্লি আমার সঙ্গে হাত মেলাতে এবং আমাকে অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে আসছে। যুবক ও বৃদ্ধ সবাই আমাকে সীমাহীন আন্তরিকতায় বুকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু যে বিষয় আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে যায়, তা হলো তাদের চোখের বিকিরণ। আমি অনুভব করি, আমি বৈশ্বিক মুসলিমভ্রাতৃত্বে আবদ্ধ হয়েছি। আমি অবর্ণনীয় সুখ অনুভব করি। পাকিস্তানের মানুষ আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল ইসলাম বিধি-বিধানের ঊর্ধ্বে আরো কিছু। ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধই প্রথম অর্জন করতে হয়। এটাই বিশ্বাসের শেকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে সাহায্য করে।

সূত্র : ইসলামিক ওয়েব ও ইসলাম আওয়ার চয়েজ মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর

 



সাতদিনের সেরা