হিজরি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। এর প্রসার ও প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ইসলামের প্রথম যুগের মুসলমান এবং মুসলিম শাসকরা এটিকে তাঁদের প্রধান ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত তারিখ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করতেন। এখনো মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশে হিজরি সনকে বর্ষপঞ্জি হিসেবেই ব্যবহার করা হয়।
হিজরি সনের বৈশিষ্ট্য
পৃথিবীর সব বর্ষপঞ্জির নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। ঠিক তেমনি হিজরি সনেরও কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো—
১. অনন্য সূচনা : পৃথিবীতে প্রচলিত বর্ষপঞ্জিগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায় যে সেগুলোর সূচনা হয়েছে কোনো বড় ব্যক্তি ও শাসকের জন্ম বা মৃত্যু কেন্দ্র করে অথবা বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে। কিন্তু হিজরি সনের সূচনা হয়েছে একটি জাতির অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাস কেন্দ্র করে। মুসলমানরা দ্বিন ও ইসলামের স্বার্থে প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে এসেছিল। মাতৃভূমি ত্যাগ করা যেকোনো ব্যক্তির জন্য অনেক বড় আত্মত্যাগ, মানুষ আমৃত্যু মাতৃভূমিকে ভুলতে পারে না। মহানবী (সা.) হিজরতের সময় মক্কাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, ‘হে মক্কা! তুমি কতই পবিত্র ও প্রিয়। যদি আমার গোত্র আমাকে বের করে না দিত আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’ (তিরমিজি)
২. চান্দ্রবর্ষ : হিজরি সন গণনা করা হয় চাঁদের হিসাবে। চাঁদের ওপর ভিত্তি করে এর মাস ও বছর গণনা করা হয়। বহু প্রচলিত খ্রিস্ট বা গ্যাগরিয়ান বর্ষপঞ্জি এর বিপরীত, কেননা তাতে সূর্যের ওপর নির্ভর করে দিন গণনা করা হয় এবং তা অনেকাংশে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল।
৩. প্রাকৃতিক নিয়মের প্রতিফলন : দিন-রাতের পরিবর্তন এবং পৃথিবী ও চাঁদের আবর্তনের মাধ্যমে বছর ও মাসের যে প্রাকৃতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান, হিজরি সন সম্পূর্ণরূপে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চান্দ্র বছর প্রকৃত অর্থেই একটি বাস্তব ও স্বাভাবিক বছর। চাঁদ যখন পৃথিবীর চারদিকে একবার পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করে, তখন একটি মাস পূর্ণ হয়; আর ১২ বার আবর্তন সম্পন্ন করলে একটি বছর শেষ হয়। পক্ষান্তরে খ্রিস্টীয় (ইংরেজি) সনের ক্ষেত্রে এমন কোনো স্বাভাবিক ও নির্দিষ্ট ভিত্তি নেই। খ্রিস্টীয় বছরে ৩৬৫ দিন এবং প্রায় ৬ ঘণ্টা থাকে। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে বছরের সমাপ্তি ঘটে শেষ দিনেরও এক-চতুর্থাংশ অতিক্রান্ত হওয়ার পর। ফলে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে নয়, বরং দিনের মাঝপথেই বছরের সমাপ্তি ঘটে।
৪. অবিকৃত : হিজরি সন তার প্রবর্তনের শুরু থেকেই নিজস্ব মূল ও প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী অবিকৃতভাবে চলে আসছে; এতে কোনো সংশোধন বা পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়নি। ইসলামী ক্যালেন্ডারের এটি এমন একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা সম্ভবত পৃথিবীর অন্য কোনো প্রচলিত ক্যালেন্ডারে নেই। এমনকি খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারও এ বৈশিষ্ট্য থেকে বঞ্চিত।
৫. পৃথিবীর প্রাচীন বর্ষপঞ্জি : প্রচলন ও ব্যবহারের দিক থেকেও হিজরি সন বিশ্বের বেশির ভাগ প্রচলিত সনের তুলনায় অধিক প্রাচীন। যদিও অন্যান্য প্রচলিত সনের সংখ্যাগত হিসাব দেখে সেগুলো হিজরি সনের চেয়ে পুরনো বলে মনে হতে পারে।
হিজরি সনের গুরুত্ব
মুসলমানের কর্তব্য হলো ইসলামী হিজরি বর্ষপঞ্জি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং দৈনন্দিন জীবনে এই বর্ষপঞ্জিকে গুরুত্ব দেওয়া। যদিও বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করা পাপ নয় এবং শরিয়তের দৃষ্টিতেও তা নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু যদি সৌর ক্যালেন্ডারের ব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে আমরা ইসলামী হিজরি সনকে পুরোপুরি ভুলে যাই, তবে তা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। কারণ ইসলামী হিজরি ক্যালেন্ডার সংরক্ষণ করাও মুসলমানদের একটি দায়িত্ব। এ ছাড়া নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখা একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) এ বিষয়ে লেখেন, “যেহেতু শরিয়তের বিধানগুলোর ভিত্তি চান্দ্র হিসাবের ওপর নির্ভরশীল, তাই এ হিসাব সংরক্ষণ করা ‘ফরজে কিফায়া’। অতএব, যদি সমগ্র উম্মাহ অন্য কোনো তারিখ পদ্ধতিকেই নিজেদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করে এবং এর ফলে চান্দ্র হিসাব বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে সবাই গুনাহগার হবে। আর যদি চান্দ্র হিসাব সংরক্ষিত থাকে, তবে অন্য হিসাব ব্যবহার করাও বৈধ। তবে তা অবশ্যই পূর্বসূরি মনীষীদের সুন্নত ও রীতির পরিপন্থী। আর চান্দ্র হিসাবের ব্যবহার যেহেতু ফরজে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত, তাই তা নিঃসন্দেহে অধিক উত্তম ও শ্রেয়।” (বয়ানুল কোরআন)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বিনের ব্যাপারে সচেতনতা দান করুন। আমিন।