kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

ওয়াকফ করার শর্ত ও পদ্ধতি

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

১২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ওয়াকফ করার শর্ত ও পদ্ধতি

ওয়াকফ শুধু মুসলিমদের বৈশিষ্ট্য। রাসুল (সা.)-এর সাহাবিদের যাঁদেরই সামর্থ্য ছিল তাঁরা সবাই ওয়াকফ করেছেন। ওয়াকফের শাব্দিক অর্থ কোনো কিছু আটকে রাখা, উৎসর্গ করা। আর পারিভাষিক অর্থে, বস্তুর মূল স্বত্ব ধরে রেখে (মালিকানায় রেখে) এর উপকারিতা ও সুবিধা প্রদান করা।

১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের মুসলমান ওয়াকফ বৈধকরণ আইনে প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী ওয়াকফ অর্থ কোনো মুসলমান কর্তৃক তার সম্পত্তির কোনো অংশ এমন কাজের জন্য স্থায়ীভাবে দান করা, যা মুসলিম আইনে ‘ধর্মীয়, পবিত্র বা সেবামূলক’ হিসেবে স্বীকৃত।

ওয়াকফ ইসলামের প্রমাণিত ও নির্দেশিত একটি বিষয়। এটি রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ ও উম্মতের ইজমার  দ্বারা প্রমাণিত। হাদিসে এসেছে, ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) খায়বারে কিছু জমি লাভ করেন। তিনি এ জমির ব্যাপারে পরামর্শের জন্য রাসুল (সা.)-এর কাছে এলেন এবং বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি খায়বারে এমন উত্কৃষ্ট কিছু জমি লাভ করেছি, যা এর আগে আর কখনো পাইনি। আপনি আমাকে এ ব্যাপারে কী আদেশ দেন?’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি ইচ্ছা করলে জমির মূল স্বত্ব ওয়াকফে আবদ্ধ করতে এবং উৎপন্ন বস্তু সদকা করতে পারো।’ বর্ণনাকারী ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ওমর (রা.) এ শর্তে তা সদকা (ওয়াকফ) করেন যে তা বিক্রি করা যাবে না, তা দান করা যাবে না এবং কেউ এর উত্তরাধিকারী হবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ২৫৮৬)

ফলে ওমর (রা.) উৎপন্ন বস্তু অভাবগ্রস্ত, আত্মীয়-স্বজন, দাসমুক্তি, আল্লাহর রাস্তায়, মুসাফির ও মেহমানদের জন্য সদকা করে দেন।

ওয়াকফের প্রকারভেদ

ওয়াকফ তিন ধরনের। এক. ওয়াকফ ফি লিল্লাহ অর্থাৎ সর্বসাধারণের জন্য ওয়াকফ। দুই. ওয়াকফ আলাল আওলাদ অর্থাৎ ব্যক্তিগত ওয়াকফ। তিন. মিশ্র ওয়াকফ। শুধু ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে সৃষ্ট ওয়াকফকে ওয়াকফ ফি লিল্লাহ বলা হয়। উৎসর্গকারীর নিজের জন্য বা পরিবার বা বংশধরদের উপকারের জন্য যখন প্রভূতভাবে উৎসর্গ করা হয় তখন তাকে ওয়াকফ আলাল আওলাদ বলা হয়।

মিশ্র ওয়াকফে ধর্মীয় ও দাতব্য প্রকৃতির সর্বজনীন উদ্দেশ্যের পাশাপাশি উৎসর্গকারীর, তাঁর পরিবার ও বংশধরদের ভরণ-পোষণ উভয় উদ্দেশ্যই কাজ করে।

যেসব জিনিস ওয়াকফ করা যায়

ওয়াকফের স্থান তথা যেসব জিনিস ওয়াকফ করা যায় তা হলো মূল্যবান স্থাবর সম্পত্তি, যা ব্যক্তির মালিকানায় বর্তমান আছে। যেমন—জমি, ঘর-বাড়ি ইত্যাদি অথবা স্থানান্তরযোগ্য জিনিস। যেমন—বই, কাপড়, অস্ত্র ইত্যাদি। কেননা রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আর খালিদ ইবন ওয়ালিদ (রা.)-এর ওপর তোমরা অবিচার করছ। কেননা সে তার বর্ম এবং অন্যান্য সস্পদ আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩৯৯)

আলেমরা একমত যে মসজিদে মাদুর ও মোমবাতি ওয়াকফ করা নিন্দনীয় নয়।

পরিধানের জন্য গয়না ওয়াকফ করা ও ধার দেওয়া জায়েজ। কেননা এগুলো উপকারী জিনিস। সুতরাং জায়গা-জমির মতো এগুলোও ওয়াকফ করা যাবে।

ওয়াকফের শর্ত

ওয়াকফকারীর মধ্যে কতিপয় শর্ত থাকতে হবে, নতুবা তার ওয়াকফ করা জায়েজ হবে না। শর্তগুলো হচ্ছে,

১. ওয়াকফকারী দান করার যোগ্য হতে হবে। অতএব, জবরদখলকারী ও যার মালিকানা এখনো স্থির হয়নি এমন লোকদের পক্ষ থেকে ওয়াকফ করা জায়েজ হবে না।

২. ওয়াকফকারী বিবেকবান (জ্ঞানসম্পন্ন) হতে হবে। অতএব, পাগল ও বিকারগ্রস্ত ব্যক্তির ওয়াকফ শুদ্ধ হবে না।

৩. বালিগ তথা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। অতএব, শিশুর ওয়াকফ শুদ্ধ হবে না, চাই সে ভালো-মন্দ পার্থক্যকারী হোক বা না হোক।

৪. বুদ্ধিমান হওয়া। অতএব, নির্বোধ লোকের ওয়াকফ শুদ্ধ হবে না।

ওয়াকফকৃত বস্তুর শর্ত

ওয়াকফকৃত বস্তুর মধ্যে যাতে ওয়াকফ বাস্তবায়ন করা যায় সে জন্য ওয়াকফকৃত বস্তুর মধ্যে কিছু শর্ত আছে। সেগুলো হচ্ছে :

১. ওয়াকফকৃত বস্তুর মূল্য থাকতে হবে। যেমন—জায়গা-জমি ইত্যাদি।

২. ওয়াকফকৃত বস্তু নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্ঞাত থাকা।

৩. ওয়াকফকৃত বস্তু ওয়াকফের সময় ওয়াকফকারীর মালিকানায় থাকা।

৪. ওয়াকফকৃত বস্তু সুনির্দিষ্ট হবে, অ্যাজমালি সম্পত্তি হতে পারবে না। অতএব, বহু মানুষের মালিকানাধীন কোনো বস্তুর একাংশ ওয়াকফ করা শুদ্ধ হবে না।

৫. ওয়াকফকৃত বস্তুতে অন্যের অধিকার সম্পৃক্ত না থাকা।

৬. ওয়াকফকৃত বস্তু দ্বারা ‘উরফ তথা প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী উপকার গ্রহণে সক্ষম হওয়া।

৭. ওয়াকফকৃত বস্তুতে বৈধ উপকার থাকা।

ওয়াকফকৃত বস্তু থেকে উপকৃত হওয়ার পদ্ধতি

নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে ওয়াকফকৃত বস্তু থেকে উপকার অর্জন করা যায় :

ঘর-বাড়িতে বসবাস করে, আরোহণকারী পশু ও যানবাহনে আরোহণ করে, জীবজন্তুর পশম, দুধ, ডিম, লোম সংগ্রহ করে উপকার নেওয়া যায়।

ওয়াকফ ও অসিয়তের মধ্যে পার্থক্য

ওয়াকফ হলো মূল স্বত্ব নিজের রেখে বস্তুর উপকার দান করা, অন্যদিকে অসিয়ত হলো দানের মাধ্যমে মৃত্যুর পরে বস্তুগত বা অবস্তুগত (উপকার) জিনিসের মালিক বানানো।

বেশির ভাগ আলেমের মতে, ওয়াকফ করলে তা বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে এবং ওয়াকফ ফেরত নেওয়া যায় না। কেননা রাসুল (সা.) ওমর (রা.)-কে বলেছেন, ‘তুমি ইচ্ছা করলে জমির মূল স্বত্ব ওয়াকফে আবদ্ধ রেখে উৎপন্ন বস্তু সদকা করতে পার।’ (বুখারি, হাদিস : ২৫৮৬)

অন্যদিকে অসিয়ত করলে বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যকীয় হলেও অসিয়তকারী তার অসিয়তের পুরোটাই বা আংশিক ফেরত নিতে পারবে।

ওয়াকফকৃত বস্তু কারো মালিকানায় প্রবেশ করা থেকে বেরিয়ে যাবে, শুধু বস্তুর উপকার যাদের জন্য ওয়াকফ করা হয়েছে তাদের জন্য নির্ধারিত হবে। পক্ষান্তরে, অসিয়তের বস্তু যাদের জন্য অসিয়ত করা হয়েছে তাদের মালিকানায় যাবে বা এর উপকার অসিয়তকৃতদের জন্য নির্ধারিত হয়ে যাবে।

ওয়াকফের উপকারের মালিকানা যাদের জন্য ওয়াকফ করা হয়েছে তারা ওয়াকফকারীর জীবদ্দশায়ই পাবে এবং তার মৃত্যুর পরও ভোগ করবে। কিন্তু অসিয়তের মালিকানা অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর ছাড়া ভোগ করতে পারবে না।

ওয়াকফের সর্বোচ্চ সীমা নির্দিষ্ট নয়; পক্ষান্তরে অসিয়তের সর্বোচ্চ সীমা ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত। আর তা হলো মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ। তবে ওয়ারিশের অনুমতি সাপেক্ষে এর বেশিও করা যায়।

ওয়ারিশের জন্য ওয়াকফ করা জায়েজ, কিন্তু ওয়ারিশের অনুমতি ছাড়া ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত করা জায়েজ নেই।