• ই-পেপার

উক্তি

তারেক রহমানের সরকারের ৫ মাস

অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি গড়ার চেষ্টা

মাহমুদুল হাসান
অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি গড়ার চেষ্টা

দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস পূর্ণ করেছে বিএনপি সরকার। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার এই স্বল্প সময়ে অর্থনীতি, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ও বৈদেশিক সম্পর্কোন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। দেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে সরকারের সামনে রয়ে গেছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো বড় চ্যালেঞ্জ।

ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিপর্যস্ত অর্থনীতি টেনে তুলে মজবুত ভিত্তি দিতে চায় এই সরকার। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মাসে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জোর দেন তিনি। নির্বাচনী অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ছিল অন্যতম অর্জন। এই কার্ডধারীরা সুফল পাচ্ছেন এবং সরকারের কাছে তাঁদের কৃতজ্ঞতাও তাঁরা নানাভাবে প্রকাশ করছেন। এ ছাড়া কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে সুদসহ ঋণ মওকুফের উদ্যোগে। খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, ক্রীড়া কার্ড বিতরণের উদ্যোগও প্রশংসা কুড়িয়েছে। বন্ধ শিল্প-কারখানা (যেমনবন্ধ চিনিকল, পাটকল ও স্পিনিং মিল) পুনরায় চালু ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া সরকার বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে নির্ভরযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে উপযোগী সব পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য সামনে রেখে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট সংসদে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাজেট অনুমোদনের পর চট্টগ্রামে একটি অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ যেভাবে আকর্ষণ করা হচ্ছে, তাতে এক ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে দেশ।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরি কালের কণ্ঠকে বলেন, যে পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে, সেই পরিস্থিতি খুবই জটিল ছিল। বলা চলে, ফেব্রুয়ারির আগের সময়টায় অর্থনীতি একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। বিভিন্ন সমস্যা, বিশেষ করে গত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণউভয় পরিস্থিতিই খুবই প্রতিকূল ছিল এবং সেই প্রতিকূল অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়েছিল, সেগুলো কিন্তু তারাই সমাধান করতে সক্ষম হয়নি। ফলে এই নির্বাচিত সরকার যখন ক্ষমতা নেয়, তখন কিন্তু একটা সমস্যাসংকুল অর্থনীতি তারা ইনহেরিট করে। এই পাঁচ মাসের মধ্যে সরকার সেই সমস্যাগুলো সমাধানের প্রস্তুতিটা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের ১৮০ দিনের যে কর্মপরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দেওয়া হয়েছিল তার বহুলাংশে সফল হয়েছে।

এদিকে পর্যবেক্ষক মহল বলছে, গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক সংস্কার বিষয়ে বিরোধী দলের অপকৌশল রুখে দিয়েছে তারেক রহমানের দক্ষ নেতৃত্ব। কোনো ইস্যুতেই হালে পানি পায়নি বিরোধী পক্ষ। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়নে কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জনগণের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির সংযোগ ঘটাতে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছেন। দল ও দলের বাইরের অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই গতিকে রকেট গতির সঙ্গে তুলনা করছেন। ছুটির দিনেও দাপ্তরিক কাজ করছেন তিনি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পায়। পরে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার যাত্রা শুরু হয়।

সম্পতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠকগুলোয় দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। শিল্প, অবকাঠামো, জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে মত বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। চীনের বেইজিংয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ শীর্ষক সেমিনারে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা সহজ করতে শিগগির দেশটিতে (চীন) বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় চালু করা হবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে বাংলাদেশ সরকার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। সরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, সরকারি সেবার ডিজিটাইজেশন, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ জোরদারে পদক্ষেপ নিয়েছে।

সেই ধারাবাহিকতায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা সহজ ও সমন্বিত করতে গত বুধবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী দিন জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬ পাস হয়।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টিরও বেশি খাদ্যপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানো হয়েছে ট্যাক্স হ্রাস করার মাধ্যমে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগনির্ভর এবং কর্মসংস্থানে প্রাধান্য দিয়ে ডি-রেগুলেশন ইকোনমিক লিবারালাইজেশন এবং ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কার্যক্রম গতিশীল হচ্ছে।

সেনাপ্রধান

সেনাবাহিনী ১১ লাখের বেশি বৃক্ষরোপণ করবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেনাবাহিনী ১১ লাখের বেশি বৃক্ষরোপণ করবে
ওয়াকার-উজ-জামান

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন সেনানিবাস, ডিওএইচএস ও জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প এলাকায় ১১ লাখ ৩৬ হাজার বৃক্ষরোপণ করা হবে। সেনাবাহিনী শুধু বৃক্ষরোপণ করে না, বৃক্ষগুলো সংরক্ষণ করে, যত্ন করে এবং এর ফলে সেনানিবাসগুলো বৃক্ষে পরিপূর্ণ থাকে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা সেনানিবাসের নির্ঝর আবাসিক এলাকায় বৃক্ষরোপণ অভিযান-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি সেখানে নিমগাছের একটি চারা রোপণ করেন।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ প্রতিপাদ্যে সেনাবাহিনীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। উপযুক্ত স্থানগুলোতে ফলদ, বনজ ও ঔষধি প্রজাতির বৃক্ষসহ সৌন্দর্যবর্ধক গাছের চারা রোপণ করা হবে। এই কর্মসূচি আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত চলমান থাকবে।

দেশের বনজ সম্পদ বৃদ্ধি ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে সবাইকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করাই এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।   সেনাপ্রধানের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সেনাসদর ও ঢাকা অঞ্চলের ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা, বিভিন্ন পর্যায়ের সামরিক ও অসামরিক সদস্য এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার ঘাতক মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার ঘাতক মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তার
মোজাফফর হোসেন

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও মূল ঘাতক সাবেক মেজর মোজাফফর হোসেন গ্রেপ্তার হয়েছেন। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা এই আসামিকে গত বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আটক করে। পরে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে কোর্ট মার্শাল সম্পন্ন করার জন্য তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হামলা চালিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেন। এই হত্যাযজ্ঞে সরাসরি অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর মোজাফফর হোসেন, মেজর এস এম খালেদ ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন ছিলেন অন্যতম। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য ও মামলাসংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী মেজর মোজাফফর হোসেনই প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাঁকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর তিনিই চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোন করে জানান, দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড

হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে মঞ্জুর নিহত হন। ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন গ্রেপ্তার হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তখন মেজর মোজাফফর হোসেন ও মেজর এস এম খালেদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ সময় ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। অবশেষে ৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে আটক করতে সক্ষম হয়।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর ওই বছরের ৪ আগস্ট পুস্তক আকারে যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়, তাতে ওই হত্যাকাণ্ডে মেজর মোজাফফর হোসেনের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার কথা বলা আছে।

মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.) বীরবিক্রম তাঁর এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য বইয়ে এই মর্মে উল্লেখ করেন যে ১৯৮৯-৯৩ সালে তিনি যখন থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত, তখন জিয়াউর রহমান হত্যায় অন্যতম পলাতক আসামি মেজর খালেদ ব্যাঙ্ককে ছিলেন। অন্য পলাতক আসামি মেজর মোজাফফর ছিলেন ভারতে। ভারত থেকে এসে মেজর মোজাফফর খালেদকে নিয়ে ব্যাঙ্ককে আমার সঙ্গে দেখা করেন। জিয়াউর রহমান হত্যার বিষয়ে সে সময় ওই পলাতক খুনিদের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলোচনা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মেজর মোজাফফরকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত অধ্যায়ে নতুন অগ্রগতি এলো। সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখন তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর মো. মোজাফফর হোসেনকে বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। দীর্ঘ ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর তাঁকে আটক করা হলো। আটকের পর তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

নানা আয়োজনে শহীদ আবু সাঈদ স্মরণ

‘জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে’ রায় দ্রুত কার্যকর চান আবু সাঈদের মা-বাবা পেকুয়ায় শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রীর

রংপুর অফিস ও চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
নানা আয়োজনে শহীদ আবু সাঈদ স্মরণ

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেছেন, সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কাজ করছে। একই সঙ্গে জুলাই সনদকে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করাই সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগ শুধু ইতিহাস নয়, এটি আগামী দিনের গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণা।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে রংপুর নগরীর জুলাই চত্বরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, দুই বছর আগে আজকের এই দিনে জুলাই আন্দোলনে রংপুরের কৃতী সন্তান আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। তাঁর আত্মত্যাগ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে সরকার ১৬ জুলাইকে জাতীয় জুলাই শহীদ দিবস ঘোষণা করেছে। আজ সারা দেশে গভীর শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনা হচ্ছে গণতন্ত্রকে সুসংহত করা, দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া এবং শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা। আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরামসহ প্রায় এক হাজার ৪০০ শহীদের আত্মত্যাগ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। তাঁদের রক্তের বিনিময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে পথ তৈরি হয়েছে, সেটিকে আরো শক্তিশালী করাই এখন আমাদের দায়িত্ব।

পরে মন্ত্রী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর জুলাই আন্দোলনের আলোকচিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত স্মৃতিচারণামূলক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু সাঈদের স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, এটা আবু সাঈদ চত্বর। আমি ধারণা করেছিলাম, আজ এই চত্বরে যত গরমই থাকুক না কেন, আবু সাঈদকে স্মরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকারা একত্র হবেন। তিল ধারণের জায়গা থাকবে না। কিন্তু আবু সাঈদের সহপাঠীরা এই আয়োজনকে কেন চমৎকার করে তুললেন না? কেন অর্ধেক চেয়ার খালি? শুধু আমার জন্য নয়, এটা আপনাদের সবার জন্যও কষ্টের।

মন্ত্রী বলেন, আজ যদি এই চত্বর লোকে লোকারণ্য থাকত, আবু সাঈদ কবর থেকে শান্তি পেত। আবু সাঈদ কবর থেকে হয়তো বলত, আমার সহপাঠীরা ১৬ জুলাই আমাকে স্মরণ করছে।

আহমেদ আযম খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার জুলাই অভ্যুত্থানকে লালন করে ধারণ করে। জুলাইকে লালন করে বলেই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় জুলাই চেতনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য আবু সাঈদ, ওয়াসিম, মুগ্ধ, মারুফসহ দুই হাজারের মতো শহীদের রক্ত দিয়ে যে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করেছে, যেভাবে ফ্যাসিবাদকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে, সেই চেতনা, সেই বিজয়কে বাস্তবায়ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় জুলাই অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেছে।

মন্ত্রী বলেন, জুলাই অধিদপ্তরের মধ্য দিয়ে জুলাই চেতনার প্রতিটি দাবি বাস্তবায়ন করা হবে, কথা দিয়ে যাচ্ছি। এই সরকার আপনাদের ভোটে নির্বাচিত সরকার, যার বয়স মাত্র পাঁচ মাস। এই পাঁচ মাসে এই রংপুরসহ নানা প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন।

স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, সংরক্ষিত সংসদ সদস্য রেজেকা সুলতানা ফেন্সি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী প্রমুখ।

এর আগে সকাল সাড়ে ৭টায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলীর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করে। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় লাল ব্যাজ ধারণ করে ক্যাম্পাস থেকে একটি র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি পার্ক মোড়, আবু সাঈদ চত্বর ঘুরে ক্যাম্পাসে শেষ হয়। পরে পার্ক মোড়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে নির্মিত আবু সাঈদ স্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

শ্রদ্ধা জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামুসহ অনেকে।

এদিকে গতকাল দুপুরে আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এ সময় দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চল সংগঠক সারজিস আলম, মুখপাত্র নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ দলের অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

দুপুরে কবর জিয়ারত করেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।

বিকেলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শহীদ আবু সাঈদের বাবার হাতে ৫০ হাজার টাকার আর্থিক অনুদান তুলে দেন।

জাতীয় জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে গতকাল সকাল থেকেই রংপুরের জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শহীদ পরিবারের সদস্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানায়। দিনব্যাপী স্মৃতিচারণা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনাসভার মধ্য দিয়ে রংপুরে দিবসটি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় পালিত হয়।

 

রায় দ্রুত কার্যকর চান আবু সাঈদের মা-বাবা : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদের আত্মত্যাগের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল।

এদিন বিকেলে আবু সাঈদের বাড়িতে তাঁর মা-বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলে তাঁদের দাবি ছিল অতিদ্রুত রায় কার্যকর হোক।

আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৯ এপ্রিল রায় ঘোষণা করেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। তবে রায় ঘোষণার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তা কার্যকর না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদ আবু সাঈদের মা-বাবা, পরিবারের সদস্য এবং তাঁর সহযোদ্ধারা। তাঁদের একটাই দাবি, দ্রুত রায় কার্যকর করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।

 

পেকুয়ায় শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রীর : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেছেন, দুই বছরেও ওয়াসিম হত্যা মামলার বিচার না হওয়া বিচার বিভাগের দুর্বলতা। চব্বিশের জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত শেষে ওয়াসিম হত্যার বিচার নিয়ে এই মন্তব্য করেন তিনি।

গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা মুরাপাড়ায় শহীদ ওয়াসিমের কবরে ফুলের শ্রদ্ধা নিবেদন ও জিয়ারত শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে আমিও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। শেখ হাসিনা রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে নানা অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। তবে দেশের জনগণই তা প্রতিহত করবে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন।

শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, দুই বছরেও মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। হত্যাকাণ্ডের যিনি নির্দেশদাতা তিনিও সমানভাবে অপরাধী। তাঁরও বিচার হতে হবে।

নাছির উদ্দিন বলেন, খুনি হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করতে পারলেই জুলাই-আগস্টের সব শহীদের আত্মা শান্তি পাবে।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুরের ষোলশহর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম।