• ই-পেপার

মধ্যবিত্তের উপস্থিতি আছে প্রাধান্য নেই

  • এম মাশরুর রিয়াজ

বিনিয়োগ সহায়ক বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

তাসকীন আহমেদ

বিনিয়োগ সহায়ক বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে। সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে এই বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে সরকারের আকাশচুম্বী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ঘোষিত নীতিগত সংস্কারগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য।

বাজেটের কাঠামো ও এডিপি : এই বাজেট বিগত বছরের তুলনায় ১৯.০৪ শতাংশ বেশি। অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩০.৩৪ শতাংশ বাড়ানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এ ছাড়া বাজেটের ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার এবং বেসরকারি বিনিয়োগে ঋণপ্রবাহ সচল রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে না। তবে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যমাত্রাটি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক।

অন্যদিকে তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) গত বছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি হলেও, চলতি বছরের মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হার আমাদের দুর্বল সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। তাই শুধু বড় বাজেট ও এডিপি ঘোষণা নয়, বরং সফল বাস্তবায়নের ওপর সরকারকে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।

 

কর ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার

এবারের বাজেটে কর ব্যবস্থাপনায় বড় কিছু সংস্কার দেখা গেছে। উৎস করকে চূড়ান্ত করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করায় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি বড় দাবি পূরণ হয়েছে। শিল্পের কাঁচামালে উৎস কর ৪ শতাংশে হ্রাস, ৬০টি নিত্যপণ্যে ০.৫ শতাংশ উৎস কর, পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ইলেকট্রিক যানবাহন খাতে করছাড় অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

বিশেষ করে ৪৮ ঘণ্টায় কম্পানি নিবন্ধন, সাত দিনে লাইসেন্স প্রদান, রিস্ক বেসড অডিট, আইবাস প্লাস প্লাস, ই-রিটার্ন, ই-ভ্যাট এবং ইআরপি অনুমোদন কার্যকর হলে ব্যাবসায়িক পরিপালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং ত্রৈমাসিক অনলাইন ভ্যাট রিটার্নের বিধানকে আমরা স্বাগত জানাই। এ ছাড়া ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে পিওএস মেশিন আমদানিতে শুল্ক হ্রাস ও আগাম কর শূন্য করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

তবে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখা এবং সর্বোচ্চ আয়কর ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হতাশাজনক। আমরা করমুক্ত সীমা পাঁচ লাখ টাকা করার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহবান জানাই।

 

সিএমএসএমই খাতের উন্নয়ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমই খাতে ৬ শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া সাধুবাদযোগ্য। এসএমই উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ টাকা এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখা এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-লোন (ব-খড়ধহ) চালু করার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ফ্ল্যাট রেট টার্নওভার কর ও আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম কর ব্যবস্থাপনাকে অনেক সহজ করবে।

 

শিল্প, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজীকরণ

বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি ও প্রযুক্তিপণ্যে কর হ্রাস দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে। ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপনের উদ্যোগ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রসারে সহায়ক হবে। স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক ও ই-বাইক উৎপাদনে শুল্ক ও ভ্যাট সুবিধা এবং ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তও সময়োপযোগী। তবে প্লাস্টিক পণ্যে ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ এবং নির্মাণ খাতে ১০ শতাংশে উন্নীত করা স্থানীয় শিল্পের জন্য নেতিবাচকআমরা এটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছি।

বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে সিঙ্গল উইন্ডো বাধ্যতামূলক করা, ওয়ার্ক পারমিট সাত দিনে ও বিনিয়োগকারী ভিসা ১০ দিনে প্রদান, বিদেশি ঋণের সুদে উৎস কর ১০ শতাংশে হ্রাস এবং উৎস কর কর্তনজনিত ব্যয় অগ্রহণযোগ্যতার বিধান বাতিল কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত

বৈদ্যুতিক যানবাহনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি, নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর হ্রাস এবং চার্জিং নেটওয়ার্ক আমদানিতে কর শূন্য করা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তবে নতুন কূপ খননের যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আমদানিনির্ভর জ্বালানিতে যদি সুনির্দিষ্ট মূল্য কাঠামো না থাকে, তবে স্বল্পমেয়াদি ভর্তুকি বিনিয়োগের পরিবর্তে শুধু অপচয়ই বাড়াবে। তাই স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি মূল্য কাঠামো প্রণয়নের জন্য আমি সরকারের কাছে জোর আহবান জানাচ্ছি।

লেখক : সভাপতি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান

মামুন রশীদ

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান

জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিফলন। নির্বাচনের পর প্রথম বাজেট সাধারণত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ এর মধ্য দিয়েই নতুন সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রূপরেখা তুলে ধরে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটও সেই অর্থে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা বহন করছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই উচ্চাভিলাষী বাজেটের অর্থায়ন কতটা বাস্তবসম্মত?

অন্তর্বর্তী সরকারের চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে তুলনায় নতুন বাজেটের আকার প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়ের উৎস কি সরকার নিশ্চিত করতে পারবে?

এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে অর্থের সংস্থান। আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। বাস্তবতা হলো, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় পাঁচ লাখ কোটি টাকাও অতিক্রম করবে না বলে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারাই ধারণা করছেন। অর্থাৎ প্রকৃত আদায় এবং আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ব্যবধান প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আগামী অর্থবছরে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের প্রকৃত আদায় ছিল মাত্র তিন লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সংস্থাটির রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই বাস্তবতায় রাজস্ব আদায়ে প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হয়।

সমস্যা শুধু রাজস্বে নয়, বাজেটের ব্যয়কাঠামোও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। নির্বাচনী পতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ অবশ্যই একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, বরাদ্দ বৃদ্ধি সব সময় উন্নত সেবা নিশ্চিত করে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের তুলনায় বাস্তবায়নের সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নতুন বরাদ্দের কার্যকারিতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

একই সময়ে সরকারকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের ভর্তুকির চাপও বহন করতে হবে। কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ রয়েছে। ফলে একদিকে ভর্তুকি ব্যয়, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় দুই দিক থেকেই সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়বে।

অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে সরকার দেশি ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। কিন্তু এখানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু একই সময়ে যদি সরকার সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি গ্রহণ করে, তাহলে নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়বে।

বাজেটের সাফল্য কখনোই তার আকার দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতাই একটি বাজেটের কার্যকারিতা নির্ধারণ করে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও উপেক্ষা করা যায় না।

নতুন বাজেট নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। এতে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ইতিবাচক লক্ষ্য রয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত হলো টেকসই অর্থায়ন। রাজস্ব সংগ্রহে মৌলিক সংস্কার, ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত না করা গেলে এই বৃহৎ বাজেট অর্থনীতির জন্য প্রত্যাশিত সুফলের পরিবর্তে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাজেট ঘোষণা নয়, বরং এর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, বরাদ্দের অভাবে নয়, বরং দুর্বল পরিকল্পনা, ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে অনেক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। ফলে আগামী বাজেটে অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক

অগ্রাধিকার নির্ধারণ সঠিক হয়েছে তবে...

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান

অগ্রাধিকার নির্ধারণ সঠিক হয়েছে তবে...

দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ এবং কর্মসংস্থান সংকটসহ বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, এই বাস্তবতায় বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ মোটের ওপর সঠিক হয়েছে, তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর।

এবারের বাজেট তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে। প্রথমত, বৈদেশিক খাতের কয়েকটি সূচক ছাড়া প্রায় সব সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকই ছিল চাপে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল ছিল, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ছিল উচ্চ পর্যায়ে। দ্বিতীয়ত, নতুন সরকার জনগণের প্রত্যাশা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আলোকে বাজেট প্রণয়নের চাপের মুখে ছিল। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও সরকারকে নিতে হয়েছে।

বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আহরণ। সরকার সংশোধিত বাজেটের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু প্রকৃত আদায়ের ভিত্তিতে হিসাব করলে এই প্রবৃদ্ধির হার আরো অনেক বেশি, এমনকি ৩০ শতাংশের কাছাকাছিও হতে পারে। ফলে এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারের বড় ধরনের উদ্যোগ ও প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োজন হবে।

বাজেটে আমদানি-প্রতিস্থাপক ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিভিন্ন করসুবিধা, বন্ড সুবিধা, অগ্রিম কর (এআইটি) প্রত্যাহার, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক হ্রাসের মতো যৌক্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব কারণে কিছু খাতে রাজস্ব আয় কমতে পারে। ফলে করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন ও এনবিআরের সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়বে।

শুধু নীতিগত ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, কর প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনতে হবে, যা অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রিয় নাও হতে পারে। তবু রাজস্ব আহরণের স্বার্থে সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

স্বাস্থ্যসহ কয়েকটি খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হলেও অতীতে এসব খাত বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় করতে পারেনি। ফলে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ বাড়বে। এতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্টার্টআপ, কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো, একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা প্রদানের উদ্যোগ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া  ইতিবাচক দিক।

অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে করসুবিধা দেওয়ার ফলে স্বল্প মেয়াদে রাজস্ব কিছুটা কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে তা সহায়ক হবে। একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় থোক বরাদ্দ থেকে যেসব প্রকল্প নেওয়া হবে, সেগুলো কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্বাচন করতে হবে।

বাজেটের অগ্রাধিকার ও নীতিগত দিকনির্দেশনা যথাযথ রয়েছে। তবে রাজস্ব আহরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যয়ের দক্ষতা ও ঘাটতি অর্থায়নের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করবে বাজেটের প্রকৃত সফলতা। বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকলে ভালো উদ্যোগগুলোর সুফলও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পাওয়া যাবে না।

লেখক : সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

ব্যয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা

ড. জাহিদ হোসেন

ব্যয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি উচ্চাভিলাষী কিছু লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা। ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সরকার এসব লক্ষ্য অর্জনে অগ্রাধিকার নির্ধারণের চেষ্টা করেছে। তবে এর ভেতরে কিছু কঠিন আপসও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মোট সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলেও এর বড় অংশই চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রশাসনিক ব্যয় এবং অন্যান্য নিয়মিত খাতে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বা নতুন সেবায় ব্যয়ের জন্য সরকারের প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিসর তুলনামূলকভাবে সীমিত রয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা সরাসরি উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে ব্যয়ের অগ্রাধিকারে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক কল্যাণ, প্রাথমিক ও কারিগরি শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘ মেয়াদে এটি জীবনমান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এই বাড়তি বরাদ্দ কতটা বাস্তব ফল বয়ে আনতে পারবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, বরং সেই অর্থ কতটা দক্ষভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় তখনই কার্যকর হবে, যখন তা সেবার মানোন্নয়নে প্রতিফলিত হবে। যেমন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, ওষুধ সরবরাহ ও উন্নত সেবা নিশ্চিতকরণ। একইভাবে শিক্ষা খাতে ব্যয় তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন তা শিক্ষার মান ও কর্মসংস্থানের উপযোগিতা বাড়াবে। সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমও তখনই কার্যকর হবে, যখন সহায়তা সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাবে। প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়েও একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকার একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে চায়। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্বলতার বড় অংশই সরবরাহজনিত, যেমনজ্বালানি সংকট, ঋণ প্রাপ্তির জটিলতা, আমদানি সীমাবদ্ধতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা। এই প্রেক্ষাপটে শুধু সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে যথেষ্ট না-ও হতে পারে, যদি না উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এসব বাধা দূর করা যায়।

পরিশেষে নাগরিকরা বাজেটকে ব্যয়ের অঙ্ক দিয়ে নয়, বরং এর ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করবে। হাসপাতালের সেবা, শিক্ষার মান, সামাজিক সহায়তার কার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধিএসব ক্ষেত্রেই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে। ব্যয়ের পরিকল্পনা সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে, কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষা হলোএই বরাদ্দ বাস্তবে মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।

লেখক : বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ