বাজেটে মধ্যবিত্তের উপস্থিতি আছে, কিন্তু প্রাধান্য নেই। করসুবিধা ও কিছু সীমিত স্বস্তির উদ্যোগ থাকলেও মূল্যস্ফীতির প্রধান অভিঘাত বহনকারী এই শ্রেণির জন্য কোনো সুস্পষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক সুরক্ষা কাঠামো দেখা যায় না। বাজেটে মূল জোর দেওয়া হয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে। মূল্যস্ফীতিকে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সরকারি লক্ষ্যই বলে দেয় যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকট এখনো কাটেনি, বরং এটি অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হিসেবেই রয়ে গেছে।
ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে পৌনে তিন লাখ টাকায় উন্নীত করা মধ্যবিত্তের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এই স্বস্তি আংশিক, কারণ করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পর করহার আগের ৫ শতাংশের পরিবর্তে এখন ১০ শতাংশ থেকে শুরু হচ্ছে। ফলে কর কাঠামো কিছুটা পূর্বানুমানযোগ্য হলেও বাস্তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর চাপ পুরোপুরি কমছে না। নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য এই সীমা আরো বেশি রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরের জন্য করকাঠামোর পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এগুলো চাকরিজীবী ও নিম্নমধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি দেবে, তবে বর্তমান মূল্যস্ফীতির তুলনায় এই স্বস্তি খুব বড় নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎস কর কমিয়ে ০.৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দিয়েছে। চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, গবাদিপশু, ভোজ্যতেল, চিনি—এ ধরনের পণ্যে এই কর হ্রাস বাজারে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে। একই সঙ্গে কিডনি ডায়ালিসিস ফিল্টার, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত কিছু পণ্য, বৈদ্যুতিক বাস-ট্রাক, কিছু কম্পিউটার পণ্য ইত্যাদিতে কর কমানোর প্রস্তাবও আছে। এসব পদক্ষেপ মধ্যবিত্তের জন্য কিছুটা পরোক্ষ স্বস্তি তৈরি করতে পারে।
তবে বাজেটের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। ফ্যামিলি কার্ড, ভাতা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, মাতৃ-শিশু সহায়তা—এসব মূলত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক। মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সংকট হলো তারা ভর্তুকি বা ভাতার আওতায় পড়ে না, আবার বাজারদরের ধাক্কাও পুরোপুরি সহ্য করতে পারে না। বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণার বিষয়টি আছে, কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবী, ছোট ব্যবসায়ী, শহুরে ভাড়াটিয়া, শিক্ষিত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার—এই বড় অংশের জন্য আলাদা সুরক্ষা খুব কম।
সুতরাং বাজেট থেকে যে বার্তাটি পাওয়া যায় তা হলো মধ্যবিত্ত কিছু কর স্বস্তি ও পরোক্ষ মূল্য স্বস্তি পাচ্ছে, কিন্তু তাদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা প্যাকেজ নেই। বাস্তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে মধ্যবিত্তকে গুরুত্ব দিতে হলে আরো কিছু পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, খাদ্য, নিত্যপণ্য ও নগরজীবনের ব্যয় কমাতে সরাসরি বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। শুধু উৎস কর কমালেই হবে না; আমদানি, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে অস্বাভাবিক মুনাফা ও কারসাজি ঠেকাতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাসাভাড়া, পরিবহন ও স্বাস্থ্য ব্যয় এখন মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় চাপ—এ খাতে নগরভিত্তিক সহায়তা বা কর-রেয়াত দরকার। তৃতীয়ত, মধ্যবিত্তের সঞ্চয় রক্ষায় ব্যাংক আমানতে বাস্তব ইতিবাচক সুদ নিশ্চিত করা জরুরি, না হলে মূল্যস্ফীতিতে তাদের সঞ্চয় ক্ষয়ে যায়। চতুর্থত, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য করছাড়, চিকিৎসা ব্যয়ে কর-রিবেট, শিক্ষা ব্যয়ে রেয়াত চালু করা উচিত। পঞ্চমত, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় স্থিতিশীল রাখা দরকার, কারণ এগুলোর ধাক্কা সরাসরি খাদ্যমূল্যে যায়। বাজেট বক্তৃতাতেও মধ্যপ্রাচ্য সংকটজনিত জ্বালানি-চাপের কথা বলা হয়েছে, তাই এ ঝুঁকি বাস্তব।
এই বাজেট মধ্যবিত্তকে আংশিক স্বস্তি দিয়েছে, কিন্তু অগ্রাধিকার দেয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় মধ্যবিত্তের জন্য কর-স্বস্তি, নগর ব্যয় সহায়তা, স্বাস্থ্য-শিক্ষা রেয়াত এবং বাজারদর নিয়ন্ত্রণ—এই চারটি স্তম্ভে আলাদা নীতি দরকার।
লেখক : চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ




