kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নৃশংসতায় হতবাক জাতি

দিরাইয়ে একের পর এক প্রতিপক্ষ ফাঁসানো হত্যাকাণ্ড

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দিরাইয়ে একের পর এক প্রতিপক্ষ ফাঁসানো হত্যাকাণ্ড

সুনামগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত দিরাইয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গা শিউরানো নিষ্ঠুর খুনের ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে। অন্যকে ফাঁসানোর চেষ্টায় চালানো এমন সর্বশেষ নৃশংসতার ঘটনায় খুন করা হয় উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের খেজাউড়া গ্রামের সাড়ে পাঁচ বছরের শিশু তুহিনকে। শিশুটিকে গভীর রাতে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে জবাই করে দুই কান ও লিঙ্গ কেটে গাছে ঝুলিয়ে চরম বর্বরতার নমুনা দেখিয়েছেন তার জন্মদাতা পিতা, চাচা ও চাচাতো ভাই। একই ইউনিয়নে এর আগে আরো দুটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এ ছাড়া উপজেলার অন্যান্য এলাকায়ও অতীতে এমন প্রতিপক্ষ ফাঁসানোর পৈশাচিক খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে অনেকে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত হলে নিষ্পাপ শিশু তুহিনকে হয়তো এমন পরিণতির শিকার হতে হতো না।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষ করে গ্রাম্য কোন্দলের জের ধরে মামলা ও আধিপত্য বিস্তার সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এরই মধ্যে একাধিক পরিকল্পিত খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দুটি ঘটনা দেশজুড়ে সবচেয়ে বেশি তোলপাড় তোলে। এর একটি হলো ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে এসএসসি পরীক্ষার্থী হোমায়রা আক্তার মুন্নী হত্যা। মুন্নীকে দিরাই পৌর শহরের আনোয়ারপুরের নিজ বাসভবনে নৃশংসভাবে খুন করা হয় আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সাকিতপুর গ্রামের বখাটে মাদরাসাছাত্র এহিয়া সরদার বসতঘরে গিয়ে মুন্নীর পেটে ধারালো ছুরির উপর্যুপরি আঘাতে নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলে তার। এ সময় মুন্নীর শরীরে ছুরিটি আটকে গেলে এহিয়া পালিয়ে যায়। দ্বিতীয় চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি হচ্ছে গত ১৫ অক্টোবরের তুহিন হত্যাকাণ্ড। নিজ সন্তানের ওপর জন্মদাতা পিতার বর্বরতার সীমা ছাড়ানো এ ঘটনাও জাতিকে হতবাক করে দিয়েছে।

উপজেলার বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিরাই উপজেলার রায় বাঙালি গ্রামে দুই পক্ষের পুরনো দ্বন্দ্বের জের ধরে একাধিক সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে। প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নিজে বৈঠক ডেকে ও সালিস বসিয়েও গ্রামের কোন্দল নিরসন করতে ব্যর্থ হন। এ এলাকায় ২০০৮ সালে চমক আলী (৭৫) নামের এক বৃদ্ধ খুন হন। এলাকাবাসী জানিয়েছে, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই চমক আলীকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছিল।

একই উপজেলার রাজানগর গ্রামে ২০০৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর শিশুদের ক্যারম খেলা নিয়ে সংঘর্ষ হয়। এতে আহতদের সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর তাদের মধ্যে ইসমাইল নামের একজন মারা যান। পরের দিন সকালে গ্রামের মোস্তফা মিয়ার গৃহকর্মী বেগম বিবি তাঁর বাড়িতে খুন হন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংঘর্ষে নিহত ইসমাইল মিয়ার খুনের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মোস্তফা-আয়েজ আলী-মরতুজা গং পরিকল্পিতভাবে বেগমকে হত্যা করে। মামলায় বাদী করা হয় বেগম বিবির স্বামী কালু মিয়াকে। পরবর্তী সময়ে বেগম বিবির পিতা কিতাব আলী কোর্টে মোস্তফা-মরতুজাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ বেগমের পিতার করা মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে স্বামীর দায়ের করা মামলার পক্ষে চার্জশিট দেয়। এতে নিরপরাধ লোকজনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে এখনো আদালতে শুনানি হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এর আগে ১৯৯৮ সালে একই গ্রামের রহিমা নামের এক নারীর সঙ্গে ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি বিবাহিত মরতুজা সম্পর্কে জড়ান। একপর্যায়ে রহিমার গর্ভে সন্তান আসে। ওই সন্তানের যখন তিন বছর বয়স তখন তাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করে গ্রামের আবুল কালাম গ্রুপের লোকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরে রহিমা আদালতে মরতুজার বিরুদ্ধে তাঁর সন্তানকে হত্যার অভিযোগ করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই মামলায় আদালতের রায়ে মর্তুজা দণ্ডিত হয় এবং আবুল কালাম গং রেহাই পায়।

বেগম বিবি হত্যা মামলাটিরও যথাযথ তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ আছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতাদের প্রভাবে পরিকল্পিত খুনের ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে নিরপরাধ মানুষজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছিল বলে ভুক্তভোগীরা জানান। বর্তমানে চার্জ গঠন শেষে মামলাটির শুনানি চলছে। মামলার আসামি জহিরুল ইসলাম জুয়েল চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘বেগম বিবিকে মোস্তফা গং নিজের বাড়িতে হত্যা করে তাঁর স্বামীকে দিয়ে আবুল কালাম গংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছিল। এই মামলায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই নিরপরাধ ৩৩ জনকে আসামি করা হয়। বিএনপির তখনকার দুজন দাপুটে নেতার প্রভাবে মামলাটির যথাযথ তদন্ত হয়নি। নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘জুডিশিয়াল বা নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এটা যে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড তা প্রমাণিত হবে।’

দিরাই উপজেলার আইনজীবী ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুল ইসলাম রতন বলেন, ‘দিরাইয়ে অন্যকে ফাঁসানোর জন্য একাধিক নির্মম খুনের ঘটনা ঘটছে। রায় বাঙালি, রাজানগরসহ সর্বশেষ খেজাউড়া গ্রামেও অন্যকে ফাঁসানোর জন্য পরিকল্পিত খুনের ঘটনা ঘটেছে। যথাযথ তদন্ত না হওয়ায় এতে অনেক নিরপরাধ মানুষও ফেঁসে গেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তুহিন হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও প্রকৃত আসামিদের কঠোর শাস্তি চাই।’

এদিকে সুনামগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ‘তুহিন হত্যা মামলায় বাবা, চাচা ও চাচাতো ভাইসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আসামিদের সামনে নিয়ে আসার শেষ পর্যায়ে আছি।’ তিনি বলেন, ‘গ্রাম্য কোন্দল ও মামলার জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই এমন নিষ্ঠুর খুনের ঘটনা ঘটেছে। এই মামলায় কোনো নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি হবে না।’

উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর ভোররাতে তুহিনকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে জবাই করে তার বাবা বাছির ও চাচা নাসির। পরে তুহিনের কান ও লিঙ্গ কেটে পেটে দুটি ছুরি বিদ্ধ করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয় গাছে। এ ঘটনায় বাবা আব্দুল বাছির, চাচা জমসেদ ও মাওলানা আব্দুল মোছাব্বিরকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আরেক চাচা নাসির ও চাচাতো ভাই শাহরিয়ার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা