বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে অ্যান্টিবায়োটিক বা ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারিয়েছে। অর্থাৎ এগুলো জীবাণু ধ্বংস করতে পারছে না। এতে রোগী মারা যাওয়ার হারও বাড়ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর কারণে দেশে প্রতিবছর এক লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এমন প্রেক্ষাপটে আরো একটি গবেষণার ফলাফল আমাদের শঙ্কা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এখন ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের বড় উৎস হয়ে উঠেছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় রোগীর শরীরে ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া না থাকলেও আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা এসব জীবাণুতে আক্রান্ত হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি মারা গেছে।
আইসিডিডিআরবি পরিচালিত দুটি নতুন গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা দুটি আন্তর্জাতিক সাময়িকী মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোলে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় ঢাকার একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ৩৭৩ গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগী এবং একই হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (এনআইসিইউ) ৩৬৩ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেকের (৪৮.৫ শতাংশ) অন্ত্রে সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ প্রতিরোধী গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া ছিল। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভর্তি হওয়ার সময় এসব জীবাণু থেকে মুক্ত থাকা ১৯৮ জন রোগীর মধ্যে ১০৫ জনই (৫৩ শতাংশ) আইসিইউতে থাকার সময় এই ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। গবেষকদের মতে, এটি হাসপাতালের ভেতরেই জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার স্পষ্ট প্রমাণ।
গবেষণায় বিশেষভাবে চার ধরনের গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলো হলো ইশেরিশিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি, অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি এবং সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা। এসব ব্যাকটেরিয়া নিউমোনিয়া, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মূত্রনালির সংক্রমণ ও ক্ষতের সংক্রমণের মতো গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। যেহেতু এগুলো প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী, তাই চিকিৎসাও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। একই গবেষকদলের আরেকটি গবেষণা কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করে। ঢাকার একটি এনআইসিইউতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী হাত পরিষ্কার রাখা, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়মিত প্রশিক্ষণ চালুর পর মাত্র সাত মাসে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার কারণে মৃত্যু ত্বরান্বিত হচ্ছে। এই অবস্থায় হাসপাতালের আইসিইউয়ের মতো স্থানও যদি সংক্রমণের উৎস হয়, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? আমরা চাই, হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত নজরদারি এবং অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করা হোক।

