১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যশোরে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয় মশিউর রমহান সর্দারের (পুটে সর্দার) বাড়ির সামনে (বর্তমান সার্কিট হাউসের সামনের মুজিব সড়কের পাশের বাড়ি)। পুটে সর্দার মুসলিম লীগ করতেন। তাঁর বাধার কারণে পরের বছর কোতোয়ালি থানার সামনে চৌরাস্তায় মধু সুইটস হোটেলসংলগ্ন ফাঁকা স্থানে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। কিন্তু অবাঙালি পুলিশ সদস্যদের আপত্তির মুখে এই শহীদ মিনারও ভেঙে ফেলা হয়। তখন যে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছিল সেটির আকার-আকৃতি এখনকার শহীদ মিনারের মতো ছিল না। প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিলেন ভাষাসৈনিক ডা. জীবন রতন ধর, আলমগীর সিদ্দিকী, আফসার আহম্মেদ সিদ্দিকী প্রমুখ। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪ সালে মাইকেল মধুসূদন কলেজের পুরনো ক্যাম্পাসে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। ১৯৬২ সালে খড়কি এলাকার মাইকেল মধুসূদন কলেজের নতুন ভবন প্রাঙ্গণে স্থায়ীভাবে শহীদ মিনার নির্মিত হয়। ‘শহীদ মিনার থেকে সুরবিতান’ নামের আজিজুল হকের একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ষাটের দশকের গোড়ার দিকে এই শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন কলেজের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আব্দুল হাই ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও সংগ্রামী ছাত্রনেতা প্রয়াত আলমগীর সিদ্দিকী।’ এই শহীদ মিনারই যশোরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। এবার নতুন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে যশোর এম এম কলেজের ছাত্রী পুরনো কসবা এলাকার বাসিন্দা হামিদা রহমান ১০ জুলাই ভারত থেকে প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা পত্রিকা’য় প্রথম একটি চিঠি লিখে নতুন রাষ্ট্রের ভাষা হবে বাংলা বলে দাবি তোলেন। সেই পুরনো কসবায় যশোরের কেন্দ্রীয় এই শহীদ মিনারটি নির্মাণ করছে যশোর পৌরসভা। কাজ শেষের দিকে। নতুন এই শহীদ মিনারটি ইতিহাসনির্ভর ব্যতিক্রমধর্মী অনন্য স্থাপনাশৈলীর অন্য রকম এক শহীদ মিনার। শহীদ মিনারের নকশা তৈরি করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী নাজমুস সাকিব। তিনি জানান, মূূল শহীদ মিনারের প্ল্যাটফর্ম ৫ বাই ২১ ফুট। মিনারে ওঠার সাতটি সিঁড়ি। প্রথম সিঁড়ি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, দ্বিতীয় সিঁড়ি ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, তৃতীয় সিঁড়ি ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন, চতুর্থ সিঁড়ি ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, পঞ্চম সিঁড়ি ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ষষ্ঠ সিঁড়ি ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান আর শেষ সিঁড়ি ১৯৭১ সালের বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। শহীদ মিনারের পাঁচটি স্তম্ভ। ছোটটি ৯ ফুট। এটি ১৯৭১ সালের ৯ মাসের যুদ্ধ। দ্বিতীয় স্তম্ভের উচ্চতা ১১ ফুট। লাল বৃত্তের ব্যাসও ১১ ফুট, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর নির্দেশ করে। মঞ্চের বড় স্তম্ভ দুই ভাগে বিভক্ত। ১৬ ফুট ও ৫ ফুট। যার ১৬ ফুট ১৬ ডিসেম্বরের মহান বিজয় দিবস। বাকি ৫ ফুটসহ মোট ২১ ফুট একুশে ফেব্রুয়ারি। প্ল্যাটফর্মের কালো মার্বেলে ১৯৫২ সালের কালো অধ্যায়, সাদা মার্বেলে ১৯৭১-এর বিজয়, পরবর্তী কালো মার্বেলে ১৯৭৫-এর শোকের ১৫ আগস্ট, পরবর্তী সাদা মার্বেলে ডিজিটাল বাংলাদেশ উপস্থাপন করা হয়েছে।