সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট (এসিএলইডি) বলেছে, নতুন প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, মার্চের শেষ দিকে নতুন সামরিক প্রধান দায়িত্ব নেওয়ার পর সেনাবাহিনীর কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। ওই সময় আগের সামরিক প্রধান মিন অং হ্লাইং রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এসিএলইডির দাবি, সামরিক কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠনের পর থেকে বেসামরিক মানুষ আরো বেশি দমন-পীড়ন ও তীব্র বিমান হামলার শিকার হচ্ছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে দুই থেকে পাঁচটি যুদ্ধবিমান নিয়ে বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। এসব দল একই লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি মিয়ানমার সরকার। এসিএলইডি জানিয়েছে, তারা গণমাধ্যম, স্থানীয় সহযোগী, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এবং স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণ করে মিয়ানমারের সংঘাত পরিস্থিতির প্রতিবেদন তৈরি করে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর, যেখানে বেশিরভাগ বিরোধী দল অংশ নিতে পারেনি, মিন অং হ্লাইং রাষ্ট্রপতি হওয়ার কয়েক দিন আগে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক গোয়েন্দা প্রধান ইয়ে উইন উ-কে সেনাবাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর সেনাবাহিনী দেশের কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় নতুন করে অভিযান শুরু করেছে। এসব এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও বাণিজ্য পথ রয়েছে।
এসিএলইডি বলেছে, মিন অং হ্লাইং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর সামরিক সরকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ফলে বেসামরিক মানুষের জন্য পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা খুবই কম। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বেসামরিক মানুষের ওপর সামরিক বাহিনীর হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এসিএলইডি আরো জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে তারা মিয়ানমারে এক ডজনের বেশি গণহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এসব ঘটনায় ৪৫০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের প্রায় ৪০ শতাংশই দেশের মধ্যাঞ্চলের শুষ্ক আনিয়ার অঞ্চলের বাসিন্দা।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে শত শত সেনা বাগানের প্রাচীন মন্দির এলাকার কাছে নদীতীরবর্তী মিত চায় শহরে অভিযান চালায়। স্থানীয় তিন বাসিন্দার দাবি, ওই অভিযানে অন্তত ৪০ জন নিহত হন। স্থানীয় বাসিন্দা ইয়ে নাউং রয়টার্সকে বলেন, প্রায় ৭০০ সেনা শহরে ঢুকে মানুষের জিনিসপত্র লুট করে এবং অনেককে মারধর ও হত্যা করে। তবে রয়টার্স এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। এসিএলইডির তথ্যভান্ডারে ঘটনাটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং স্থানীয় গণমাধ্যমে অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এসিএলইডির মতে, ২০২৬ সালে সামরিক বাহিনীর কৌশলে কিছু পরিবর্তন এলেও বেসামরিক মানুষের ওপর নির্যাতন কমেনি। বরং হামলার ধরন আরো বদলে গেছে। এদিকে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশটিকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। এর অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতি মিন অং হ্লাইং সম্প্রতি ভারত ও চীন সফর করেছেন।
মিয়ানমারের নতুন প্রশাসন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ান-এর সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর আসিয়ান মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে দেয়নি। তবে সম্প্রতি দুই পক্ষের মধ্যে সীমিত পরিসরে আবার যোগাযোগ শুরু হয়েছে।
কূটনৈতিক স্বীকৃতি বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মিন অং হ্লাইং আগামী ৬ ও ৭ আগস্ট থাইল্যান্ডে সরকারি সফর করবেন। এই সফরে দুই দেশের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।