পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় গত কয়েক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি ভেঙে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সবসময় আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার বার্তা দিয়ে দুই দেশই একে অপরের প্রতি পাল্টা অভিযোগ চালিয়ে যেত। এর মধ্যে আফগান সীমান্তে এক দিনেই দুবার ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। এতে অন্তত ৩৯ জনের প্রাণহানি হয়েছে।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার জানিয়েছে, পাকিস্তানি বিমান হামলায় কুনার, খোস্ত ও পাকতিকা প্রদেশে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১১ শিশু, একজন নারী এবং একজন বৃদ্ধ রয়েছেন বলে দাবি করেছেন তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ।
অন্যদিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছেন, সীমান্তবর্তী চারটি লক্ষ্যবস্তুতে ‘পরিকল্পিত ও নির্দিষ্ট’ হামলা চালানো হয়েছে। তার দাবি, এসব হামলায় ২৬ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও গোলাবারুদের গুদাম ধ্বংস করা হয়েছে।
বুধবার এক বিবৃতিতে তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ বলেন, সাম্প্রতিক পাকিস্তানে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার জবাব হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সীমান্তের ওপারে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি ও নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে।
তবে পাকিস্তান সবসময় আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চেয়েছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে স্পষ্ট জানান তিনি।
পাল্টাপাল্টি দোষারোপ
দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আশ্রয় পায় এবং সেখান থেকে পাকিস্তানে হামলা চালানো হয়। তবে তালেবান সরকার এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
কাবুল স্পষ্ট জানিয়েছে, আফগান ভূখণ্ড কোনো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে না। একই সঙ্গে অন্য দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করার অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক তীব্র উত্তেজনার মধ্যে পড়ে। পরে গত অক্টোবর মাসে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, যার ফলে কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল।
তবে সর্বশেষ বিমান হামলার ঘটনায় সেই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল ইতোমধ্যে দুই দেশকে সংযম প্রদর্শন এবং উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে।
উন্মুক্ত যুদ্ধ
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক হামলা আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে চলমান তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতিকে ভেঙে দিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে দুই দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত ছিল।
বার্তা সংস্থা ডয়েচে ভেলে বলছে, ফেব্রুয়ারিতে ইসলামাবাদ ঘোষণা দেয় যে তারা কাবুলের সঙ্গে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধে’ রয়েছে। পাকিস্তানের দাবি, দেশটির ভেতরে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর জঙ্গি হামলা বেড়ে যাওয়ার পেছনে আফগানিস্তানে আশ্রয় নেওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দায়ী।
পাকিস্তান অভিযোগ করে যে আফগানিস্তান তাদের ভূখণ্ডে হামলা চালানো জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। তবে তালেবান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ সমস্যা সম্পূর্ণ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
এর পর মার্চ মাসে চীনের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনায় দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এদিকে জাতিসংঘের গত মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এই সংঘাতে অন্তত ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও ৩৯৭ জন আহত হয়েছেন।
সম্পর্কে উত্তেজনা
আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, স্পেরা জেলায় একটি বাড়িতে হামলা চালানো হলে নয়জন নিহত এবং আরও ১০ জন আহত হন।
প্রতিবেশী পাকতিকা প্রদেশে স্থানীয় বাসিন্দারা এএফপিকে জানান, বারমাল জেলায় আরেকটি হামলায় তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। সেখানকার এক বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, বিমান হামলাটি একটি বাড়িতে আঘাত হানে এবং নিহতদের মধ্যে শিশু ছিল।
বার্তা সংস্থা আলজাজিরা জানায়, এই হামলাগুলোর ঠিক একদিন আগে আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ার হাসান খেল এলাকায় সন্দেহভাজন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিদের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালানো হয়।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলার পর তীব্র বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়, যাতে ফেডারেল কনস্ট্যাবুলারির (পাকিস্তানের প্রধান আধা-সামরিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী) ছয় সদস্য নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হন।
২০২১ সালে তালেবান দ্বিতীয়বারের মতো আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আফগানিস্তান পাকিস্তানের বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালানোর পর দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আরো তীব্র আকার ধারণ করে।
সব মিলিয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছে, সর্বশেষ এই হামলা দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।