• ই-পেপার

নিষেধাজ্ঞার ২৪ বছর পরও ৯৮ শতাংশ দোকানিতে চলছে পলিথিনের ব্যবহার

সঞ্চয়পত্রে দ্বিগুণ কর, কমছে রেয়াত

আগে কর দিলে প্রণোদনা, দেরিতে জরিমানা মোটরযানে বাড়বে করের পরিমাণ বিলাসী গাড়ির অগ্রিম আয়কর দ্বিগুণ ভিন্ন মোড়কে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ কর না দিলে খোলা যাবে না ব্যাংক হিসাব হেলিকপ্টারে ১০ লাখ টাকা অগ্রিম কর খুচরা বিক্রেতাও আসবেন করের আওতায়

মো. জাহিদুল ইসলাম
সঞ্চয়পত্রে দ্বিগুণ কর, কমছে রেয়াত

সম্পদশালী মানুষের সম্পদে বাড়ানো হচ্ছে না করের হার। তবে আইনের মারপ্যাঁচে গরিব-মধ্যবিত্তের টিকে থাকার সম্বল সঞ্চয়পত্রে দ্বিগুণ হারে কর বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বাজেটে। এতে পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের মালিককে তাঁর সুদ আয়ের ওপর অন্তত ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আগে একই পরিমাণ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলে তিনি ৫ শতাংশ হারে কর দিতেন। সেই হিসাবে তাঁকে আগের তুলনায় দ্বিগুণ হারে কর দিতে হবে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই ঘোষণা আসবে। আজ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে এই প্রস্তাব রাখবেন।

বর্তমানে ১০ লাখ টাকার পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র থাকলে নির্দিষ্ট সময়ে মুনাফা পাওয়ার সময় মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হয়। এর চেয়ে বেশি অঙ্কের সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে উৎসে করের হার ১০ শতাংশ। আয়কর আইন অনুযায়ী, পুরো অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের ক্রেতা যে পরিমাণ টাকা মুনাফা হিসেবে পান, তা চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ এই মুনাফার ওপর আর কোনো কর দিতে হয় না।

নতুন বাজেটে মুনাফার ওপর আয় ক্রেতার চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচিত হবে না। এই আয়ের ওপর আবার কর দিতে হবে তাঁর নির্ধারিত আয়ের স্ল্যাব অনুযায়ী। আগে উৎসে কর হিসেবে যে টাকা কেটে রাখা হতো, এখন তা অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সাধারণত সিসিভেদে গাড়ির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর কেটে নেওয়া হয়। আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় তা প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। এবার একই পদ্ধতিতে সঞ্চয়পত্রের ক্রেতাদের সঞ্চয়পত্রের সুদ থেকে প্রাপ্ত আয় সমন্বয় করতে হবে।

ধরা যাক, একজন করদাতার পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র আছে। তিনি প্রতি তিন মাসে ১৪ হাজার ৩৬ টাকা সুদ বাবদ আয় করেন। এই টাকার বিপরীতে তাঁর কাছ থেকে উৎসে কর কেটে নেওয়া হয় ৭৩৮ টাকা ৭৫ পয়সা। একই হারে সুুদ পেলে বছর শেষে তাঁর আয় ৫৬ হাজার ১৪৫ টাকা। বছর শেষে তাঁর কাছ থেকে কেটে নেওয়া করের পরিমাণ দুই হাজার ৯৫৫ টাকা। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, তিনি যখন রিটার্ন দেবেন, তাঁকে এই আয়ের বিপরীতে আর কোনো ধরনের কর দিতে হয় না। কারণ সঞ্চয়পত্রের আয় চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচিত।

কিন্তু বর্তমান নিয়মে এই করহার ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিগুণ হবে। কারণ সঞ্চয়পত্রের সুদ বাবদ আয় চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচিত হবে না। এই করকে অগ্রিম আয়কর হিসেবে ধরা হবে। সেই হিসাবে পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের ক্রেতার দেওয়া দুই হাজার ৯৫৫ টাকা কর হবে অগ্রিম আয়কর। অন্যদিকে আগামী করবর্ষে করদাতাদের জন্য সর্বনিু স্ল্যাব ১০ শতাংশ। তাই সঞ্চয়পত্রের ক্রেতার যদি করযোগ্য আয় তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি হয়, তাহলে তাঁকে কর দিতে হবে ১০ শতাংশ হারে। এর চেয়ে বেশি হলে তাঁর কর আরো বেড়ে দাঁড়াবে ১৫ শতাংশে।

কর রেয়াত কমছে : সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, জীবন বীমার প্রিমিয়ামসহ বর্তমানে ৯টি খাতে বিনিয়োগে করদাতারা কর রেয়াত পান। মোট আয়ের ৩ শতাংশ, মোট অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকাÑএর মধ্যে যেটি কম, সেটি রেয়াত হিসেবে চূড়ান্ত কর থেকে বাদ দেওয়া হয়। আগামী বছর অনুমোদিত বিনিয়োগ সীমা ১০ শতাংশ ও সর্বোচ্চ সীমা সাড়ে সাত লাখ টাকা করা হয়েছে। এই হিসাবে প্রতি এক লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে পাঁচ হাজার টাকা কম ছাড় পাবেন করদাতা। অবশ্য বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের খাত একই থাকছে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করলেও কর রেয়াত সুবিধা পাওয়া যাবে। ডিপিএসের ওপর বার্ষিক সর্বোচ্চ এক লাখ ২০ হাজার টাকার ওপর এই করছাড় দেওয়া আছে।

আগে কর দিলে প্রণোদনা, দেরিতে জরিমানা : এখন ৩০ নভেম্বর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ দিন হলেও দফায় দফায় সময় বাড়ানো হয়। এবারের বাজেটে করা হয়েছে ভিন্ন নিয়ম। ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দিলে মিলবে ৫ শতাংশ প্রণোদনা। তবে তা ২৫ হাজার টাকার বেশি হবে না। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দিলে প্রণোদনা পাওয়া যাবে না, অতিরিক্ত করও দিতে হবে না। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দিলে ২ শতাংশ জরিমানা দিতে হবে। তবে তা তিন হাজার টাকার বেশি হবে না। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন দিলে ৫ শতাংশ জরিমানা দিতে হবে। তবে এর সর্বোচ্চ সীমা পাঁচ হাজার টাকা। নতুন করদাতাদের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা ৩০ জুন।

মোটরযানে বাড়বে করের পরিমাণ : এসি ডবলডেকার/স্লিপার বাসে অগ্রিম কর দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা। ২০ টন বা তার বেশি পেলোড ক্যাপাসিটির ট্রাক, ডাম্প ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, প্রাইম মুভার, লরি বা ট্যাংক লরি, ক্রেন, এক্সকাভেটর, ড্রেজার, রোলার, কংক্রিট মিক্সচারসহ সব হেভি মোটর ভেহিকল বা স্পেশাল পারপাস ভেহিকলের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা।

খরচ বাড়বে ইটভাটায় : এক লাখ আট হাজার ঘনফুট আয়তনের কম ইটভাটার জন্য অগ্রিম আয়কর ছিল ৮০ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে হবে এক লাখ টাকা। এক লাখ আট হাজারের বেশি তবে এক লাখ ২৪ হাজার ঘনফুট আয়তনের কম ইটভাটার জন্য অগ্রিম আয়কর ছিল এক লাখ ২০ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে হবে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। এক লাখ ২৪ হাজারের বেশি ঘনফুট আয়তনের বেশি ইটভাটার জন্য অগ্রিম আয়কর ছিল এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে হবে দুই লাখ টাকা। এর চেয়ে বেশি আয়তনের ইটভাটার ক্ষেত্রে আগে অগ্রিম আয়কর ছিল দুই লাখ ২০ হাজার টাকা। এখন তা তিন লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিলাসী গাড়ির অগ্রিম আয়কর দ্বিগুণ : এখন সাড়ে তিন হাজার সিসির একটি গাড়ির জন্য দুই লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। তবে আগামী বাজেটে এই গাড়ির জন্য দিতে হবে চার লাখ টাকা। সাড়ে চার হাজার সিসির ক্ষেত্রে এই করের অঙ্ক দাঁড়াবে পাঁচ লাখ টাকা। তিন হাজার সিসির বেশি তবে সাড়ে তিন হাজার সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে প্রতিবছর এক লাখ ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারিত আছে। আগামী বাজেটে এই হার আরো বেড়ে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। আড়াই হাজার সিসির বেশি তবে তিন হাজার সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে প্রতিবছর এক লাখ ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারিত আছে। আগামী বাজেটে এই হার বেড়ে আড়াই লাখ টাকা হতে পারে। দুই হাজার ৫০০ সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে করহারের কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এ ছাড়া মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে আগে কর ছিল ৩০ হাজার টাকা। এখন মাইক্রোবাস ও ডবল কেবিন পিকআপের জন্য গুনতে হবে ৪০ হাজার টাকা।

বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে করছাড় : আগের নিয়মে সিসির সঙ্গে কিলোওয়াটের হিসাবের জটিলতায় বৈদ্যুতিক গাড়িতে অনেক বেশি হারে অগ্রিম কর পরিশোধ করতে হতো। ১৭৫ কিলোওয়াটের গাড়িতে অগ্রিম করের পরিমাণ ছিল দুই লাখ টাকা। এবারের বাজেটে এর পরিবর্তন আনা হয়েছে। এবারের বাজেটে ২০০ কিলোওয়াটের নিচে থাকা বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য অগ্রিম কর ২৫ হাজার টাকা। ২০০ কিলোওয়াটের বেশি তবে ৩০০ কিলোওয়াটের কম হলে ৫০ হাজার টাকা। ৩০০ কিলোওয়াটের বেশি তবে ৪০০ কিলোওয়াটের কম হলে ৭৫ হাজার টাকা। ৪০০ কিলোওয়াটের বেশি হলে এক লাখ টাকা।

ভিন্ন মোড়কে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ : বরাবরের মতো আগামী বাজেটেও থাকছে প্রশ্নহীন কালো টাকা সাদা করার সুযোগ। তবে এবার কিছুটা বদলে গেছে প্রেক্ষাপট। কোনো করদাতার জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে দলিলমূল্য কম হলে তিনি অপ্রদর্শিত টাকার ওপর ব্যক্তিশ্রেণির জন্য প্রযোজ্য নিয়মিত হারে আয়কর দেবেন। আগে এই হার ছিল ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া করদাতার জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রয়ের প্রকৃত মূল্য দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি হলে তিনি অপ্রদর্শিত অঙ্কের ওপর মূলধনী মুনাফার জন্য প্রযোজ্য হারে কর দেবেন।

তবে করদাতার ঘোষণার আগে আয়কর আইনের অধীনে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কার্যক্রম নেওয়া হলে অপ্রদর্শিত অর্থের ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর দিতে হবে। এ ছাড়া করদাতার ঘোষণার আগে তাঁর বিরুদ্ধে দেশের কোনো আদালতে অপরাধমূলক কার্যকলাপের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হলে বা কোনো মামলা চলমান থাকলে এই সুবিধা পাবেন না।

রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা : নতুন করে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ (পিএসআর) দেওয়ার ক্ষেত্র বাড়ানো হয়েছে। ১৫০ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের নিবন্ধন-মালিকানা পরিবর্তন বা ফিটনেস নবায়নের সময় পিএসআর দিতে হবে। এ ছাড়া যেকোনো ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলেও লাগবে পিএসআর। তবে স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট, নো-ফ্রিল্র অ্যাকাউন্ট ও টিআইএন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্তদের পিএসআর লাগবে না।

রপ্তানি প্রণোদনার ওপর উৎসে কর কমল : রপ্তানিমুখী শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি প্রণোদনা দিয়ে আসছে সরকার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য ও তথ্য-প্রযুক্তি খাত মূলত এই প্রণোদনার বড় সুবিধাভোগী। একদিকে ভর্তুকির আদলে প্রণোদনা দিয়ে অন্যদিকে এর বিপরীতে ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়। এবারের বাজেটে এই হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হবে।

কিডনি, হৃদরোগ, চক্ষু চিকিৎসায় স্বস্তি আনছে নতুন বাজেট

প্রতি ডায়ালিসিসে খরচ কমবে ৮০০ টাকা হার্টের স্টেন্টের দাম কমবে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চোখের লেন্সের দাম কমবে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির ৯টি নতুন কাঁচামালে শুল্ক-ভ্যাট মওকুফ

শিমুল মাহমুদ
কিডনি, হৃদরোগ, চক্ষু চিকিৎসায় স্বস্তি আনছে নতুন বাজেট

চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য খাতে একাধিক কর ও শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কিডনি রোগী, হৃদরোগী, চক্ষুরোগী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চিকিৎসা ব্যয় কমার পাশাপাশি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের স্থানীয় উৎপাদনও উৎসাহিত হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা হবে। এবারের বাজেটে ডায়ালিসিস ফিল্টার আমদানির ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে হেমোডায়ালিসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর আরোপিত ৭.৫ শতাংশ আগাম করও মওকুফের প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে প্রতি ডায়ালিসিসে রোগীদের ব্যয় প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৮০ লাখ। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ডায়ালিসিসের খরচ বহন করতে গিয়ে ৯২ শতাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। প্রায় ২০ শতাংশ রোগী প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডায়ালিসিসও নিতে পারেন না।

হৃদরোগ ও চক্ষু চিকিৎসার ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে আমদানি করা হার্টের রিং বা স্টেন্ট এবং চোখের ইনট্রাওকুলার লেন্সের সরবরাহ পর্যায়ে আরোপিত ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে একটি স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং একটি ইনট্রাওকুলার লেন্সের দাম প্রায় পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।

দেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতিশিল্পের বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক রেয়াতের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালসহ জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে আগাম কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ওষুধশিল্পের বিকাশে বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা রাখা হয়েছে। ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদনের জন্য নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং ওষুধশিল্পের আরো ১৭টি কাঁচামালে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এতে দেশীয় ওষুধশিল্প আরো শক্তিশালী হবে এবং ওষুধের উৎপাদন ব্যয় কমবে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যও একাধিক সুবিধা রাখা হয়েছে। তাদের ব্যবহারের জন্য ২১ ধরনের সহায়ক যন্ত্রপাতি আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫টি পণ্যের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে এবারের বাজেটে। নিকোটিন পাউচ ও নিকোটিন গ্র্যানুলস আমদানিতে ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হবে। একই সঙ্গে সিগারেটের বিভিন্ন স্তরে মূল্যবৃদ্ধি এবং তামাকপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যবেক্ষণে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাজেট প্রসঙ্গে গতকাল স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ইতিহাসের অন্যতম বড় বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। তিনি জানান, দেশের সব মানুষকে ধীরে ধীরে একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ই-হেলথ কার্ড চালুর মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা, ওষুধ ও পরীক্ষার তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, যা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা কমাবে।

তিনি আরো বলেন, দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে অন্তত ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার মধ্যে ৮০ হাজারই নারী। চিকিৎসক সংকট দূর করতে বড় পরিসরে নতুন ডাক্তার নিয়োগের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

ঋণনির্ভর বাজেটে চাপ বাড়বে উদ্যোক্তাদের

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৪.৭ শতাংশে আসছে ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার নতুন বাজেট সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতি ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ১.১২ লাখ কোটি টাকা চলতি অর্থবছরেই ব্যাংকঋণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে ১০ মাসে সরকারের ব্যাংকঋণ বেড়েছে প্রায় ১.১ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকার বেশি

মো. জয়নাল আবেদীন
ঋণনির্ভর বাজেটে চাপ বাড়বে উদ্যোক্তাদের

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে মোট বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মেটাতে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।

ঘাটতি অর্থায়নের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে আসন্ন অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে আরো ৪৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ বাড়বে।

এ বিষয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য কঠিন হবে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা বেসরকারি খাতের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। কারণ সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কমে যাবে, যা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বদলে সংকোচন ঘটাতে পারে।’

ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আদায়ের দুর্বল অবস্থার কারণে সরকার যদি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না করে ঋণের বোঝা বাড়ায়, তাহলে তা উল্টো অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।’

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। তবে অর্থবছরের জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত সরকার এরই মধ্যে নিট এক লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা, যা ১০ মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৬০ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায়। এই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক উভয় উৎস থেকে ঋণ নেওয়া বেড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকারের প্রধান আয়ের উৎস রাজস্ব খাত হলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থরতা ও আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে।

তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, সরকার এভাবে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে থাকলে তাঁদের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে ঋণের সুদের হারেও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে এখন ৪.৭ শতাংশে নেমেছে, যা চরম বিনিয়োগ মন্দার প্রমাণ। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ চার হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এই সময় লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা, বিপরীতে আদায় হয়েছে তিন লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১০.৬০ শতাংশ। 

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি প্রায় ১১৩ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণও দ্রুত বাড়ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা

করে পিষ্ট জনগণ, ঋণে কাবু দেশ

এম সায়েম টিপু
করে পিষ্ট জনগণ, ঋণে কাবু দেশ

প্রায় দুই দশক পর বিএনপি জোট ক্ষমতায়। নেতৃত্বেও আমূল পরিবর্তন। দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্থলে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে তারেক রহমান। দীর্ঘ এই সময়ে অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পর দলটি চালকের আসনে। তাই রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণের অপার সুযোগ তাদের সামনে। মানুষের জন্য কত কী যে করার ইচ্ছা! কিন্তু বাদ সেধেছে সক্ষমতা। অনেকটাই ভঙ্গুর অর্থনীতির বোঝা। এর মধ্যেই এলো বাজেট। তহবিলে টানাটানি। তাতে কি? প্রবৃদ্ধি টেনে তুলতে হলে খরচ তো করতে হবে। তাই আগের ঋণের বোঝার পরও সরকার আরো ঋণ নেওয়ায় সাহসী হয়েছে। ফলে ঋণে ভর করেও ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মহা বাজেটের পরিকল্পনা। 

অর্থনীতি ও ব্যবসা-বিনিয়োগ যখন খাদের কিনারে, রাজস্ব আদায় হচ্ছে না ঠিকমতো, তার পরও বিপুল কর আদায়ের উচ্চাকাক্সক্ষা। কর থেকেই প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা জোগাড়ের লক্ষ্য। আর তাই ঋণ ও করের সম্মিলিত তহবিলে বাজেটটি বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা আজই সংসদে তুলে ধরবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ওই পরিকল্পনার নথি ও আগাম তথ্য কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। সেটি পর্যালোচনা করে জানা যায়, তারেক রহমানের সরকারের জনকল্যাণমুখী প্রচেষ্টা থাকছে বাজেটে। কিন্তু সক্ষমতা সীমিত। তাই ধারকর্জ আর রাজস্বের উচ্চাভিলাষী আদায়ের ওপর ভরসা করেই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও ইচ্ছা পূরণ করতে চায় সরকার। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক ঋণের চাপের মধ্যে ঘোষিত এই বাজেট বাস্তবায়নই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বত্তৃদ্ধতা থেকে জানা যায়, ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধির দ্বৈত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নীতিনির্ধারকদের আশা, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন গতি ফিরে আসবে।

এবারের বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘নতুন ব্যবসা, নতুন ধারণা ও নতুন প্রজš§’কে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা। প্রথমবারের মতো ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’কে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ করা হচ্ছে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ডিজিটাল কনটেন্ট, সংস্কৃতি, গবেষণা, স্টার্টআপ ও জ্ঞানভিত্তিক শিল্পকে আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে বাজেটে এসেছে ‘বিনিয়ন্ত্রণ’ বা ডিরেগুলেশনের ধারণা। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদার স্বাধীনতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের মতে, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

জনজীবনের চাপ কমাতে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর ঘোষণা আসছে। বাজারে সরবরাহ ও প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি। সরকারের ধারণা, ডিজিটালভিত্তিক এই কর্মসূচিগুলো সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থাকে আরো লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর করবে।

উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, গবেষণা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রাজস্ব আহরণ। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি এরই মধ্যে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, করজাল সম্প্র্রসারণ, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক উৎস থেকেও উল্লেখযোগ্য ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ব্যাংকব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ এক লাখ ২৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য অস্থিরতার মধ্যে এই ব্যয়কে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য মনে করছে সরকার।

সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিএনপি সরকারের জন্য যেমন অর্থনৈতিক পথনকশা, তেমনি রাজনৈতিক সক্ষমতারও প্রথম বড় পরীক্ষা। সৃজনশীল অর্থনীতি, বিনিয়ন্ত্রণ, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হতে পারে। তবে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, বড় বাজেট ঘাটতি এবং ঋণনির্ভর অর্থায়নের বাস্তবতা সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকবে।

সর্বোচ্চ বরাদ্দের ১০ মন্ত্রণালয় : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর তালিকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রায় ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪৯ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, মানুষের আয় কমেছে, কিন্তু নতুন করদাতা সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ফলে একই করদাতাই বারবার করের বোঝা বহন করছেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বর্তমানে পুরো অর্থনীতি নানা ধরনের চাপের মুখে রয়েছে, আর ব্যবসায়ীরাও কঠিন সময় পার করছেন। তাই ব্যবসা সহজীকরণের পাশাপাশি অর্থনীতিকে আরো উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং বাস্তবসম্মত একটি বাজেট প্রণয়ন জরুরি। আর্থিক খাতও প্রত্যাশিত অবস্থানে নেই। এ কারণে ব্যবসা, সামগ্রিক অর্থনীতি এবং মানুষের ব্যয়ক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখে নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রয়োজন হলে উপযুক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থাও করা উচিত।

রাজস্ব খাত বিশ্লেষক ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, আগামী অর্থবছরে এনবিআরের ছয় লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জোরালো কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। তাঁর মতে, ভ্যাট ও আয়করে বিদ্যমান করছাড় যৌক্তিকীকরণ এবং বিপুল পরিমাণ বকেয়া রাজস্ব আদায়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ভ্যাট ও করপোরেট করহার বাস্তবসম্মত করা, উৎসে কর কর্তনের কার্যকর তদারকি, রিটার্ন দাখিলে পরিপালন নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। লক্ষ্য বাড়ানোর চেয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণ, নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তি, কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং কর প্রশাসনের ডিজিটাল সক্ষমতা জোরদার করাই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

শেষ পর্যন্ত এই বাজেটের সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণার জৌলুসে নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতায়। কারণ আজকের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের দলিল নয়, এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের যাত্রার প্রথম বড় পরীক্ষা।