মরুভূমির দেশ হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবের জন্য বালি যেন সবচেয়ে সহজলভ্য একটি জিনিস হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো। দেশটি প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বালি বিদেশ থেকে আমদানি করে, যা অনেকের কাছেই অবাক করার মতো বিষয়।
এর পেছনে মূল কারণটি প্রাকৃতিক নয়, বরং বৈজ্ঞানিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, মরুভূমিতে থাকা বালির কণা দীর্ঘ সময় ধরে বাতাসের ঘর্ষণে ঘষে ঘষে অনেকটা গোল ও মসৃণ হয়ে যায়। এই কারণে সেই বালি নির্মাণকাজে ব্যবহার করা যায় না।
নির্মাণ শিল্পে যে বালি প্রয়োজন, তা মূলত ভিন্ন ধরনের। সেখানে দরকার হয় খসখসে ও কোণাযুক্ত কণা, যা একে অপরের সঙ্গে ভালোভাবে আটকে থাকে। সাধারণত নদী, হ্রদ বা প্রবাহমান পানির নিচে এই ধরনের বালি তৈরি হয়। পানির স্রোত ও পাথরের সঙ্গে ঘর্ষণের কারণে কণাগুলো ভাঙা ও রুক্ষ হয়, যা সিমেন্টের সঙ্গে মিশে শক্ত কাঠামো তৈরি করতে সাহায্য করে।
এই কারণে সৌদি আরবের মতো মরুভূমিনির্ভর দেশগুলোকে নির্মাণকাজের জন্য বিদেশ থেকে বালির ওপর নির্ভর করতে হয়। ২০২৩ সালে সৌদি আরব অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ডলারের বালি আমদানি করেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
দেশটির বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিশেষ করে নতুন শহর 'নিয়োম' গড়ার কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রীর প্রয়োজন হচ্ছে। এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বিদেশি বালির ওপর নির্ভরতা আরো বাড়ছে।
শুধু সৌদি আরব নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশও অস্ট্রেলিয়া থেকে বালি আমদানি করছে। অস্ট্রেলিয়ার নদী ও হিমবাহ অঞ্চলে তৈরি হওয়া বালি এসব দেশের নির্মাণখাতের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টন বালি নদীখাত থেকে উত্তোলন করা হয়। ১৯৭৬ সালের পর থেকে এই ব্যবহার প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। পানির পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রাকৃতিক সম্পদ এখন বালি।
গত পাঁচ দশকে বালির বৈশ্বিক চাহিদা বছরে গড়ে প্রায় ৩.২ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই বিশাল ব্যবহার এতটাই বেশি যে, যদি সব বালি একত্র করা হতো, তাহলে তা দিয়ে পৃথিবীর চারপাশে ২৭ মিটার উঁচু ও ২৭ মিটার পুরু বিশাল দেয়াল তৈরি করা সম্ভব হতো বলে ধারণা করা হয়।
তবে এই চাহিদার বিপরীতে প্রাকৃতিক সরবরাহ সীমিত। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নদী থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন বাড়ছে। এতে পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হচ্ছে, ভাঙন বাড়ছে এবং কিছু এলাকায় বন্যার ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি উপকূলীয় ছোট দ্বীপও বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উপায় খোঁজা হচ্ছে। কোথাও পাথর ভেঙে কৃত্রিম বালি তৈরি করা হচ্ছে, আবার পুরনো ভবন ও অবকাঠামো পুনর্ব্যবহার করেও সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে এখনো কার্যকর ও টেকসই সমাধান না আসায় বালির চাহিদা ও সংকট- দুটিই বিশ্বজুড়ে বাড়ছে।




