অভিনয় ছেড়ে রাজনীতি শুরু করার মাত্র দুই বছরের মাথায় একেবারে মুখ্যমন্ত্রী বনে গিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, যিনি থালাপাতি বিজয় নামেই বেশি পরিচিত। ভক্তরা ভালোবেসে তাকে থালাপাতি বা অধিনায়ক হিসেবে ডাকে। সেই ডাক সত্যি হয়েছে, তিনি এখন ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের অধিনায়ক।
তবে মহানায়ক থেকে জননায়ক হওয়ার পথে ফুল বিছানো ছিল না, ছিল পথে পথে কাটা। সবচেয়ে বড় কাটাটা বিছানো ছিল তামিলনাড়ুর কারুর জেলায়। ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এক জনসভায় অংশ নিতে কারুর যান বিজয়। কিন্তু তাকে একনজর দেখতে আসা মানুষের প্রচণ্ড ভিড় আর হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে নারী ও শিশুসহ ৪১ জন মানুষ মারা যায়। সেই ঘটনায় অনেক চড়াই-উতরাই পেরুতে হয়েছে বিজয়কে। কিন্তু আটকানো যায়নি বিজয়ের বিজয়রথ। গত এপ্রিলের নির্বাচনে ডিএমকে আর এআইএডিএমকে, এই দুই দ্রাবিড় দলের ৫৯ বছরের পালাবদলের বৃত্ত ভেঙে ক্ষমতায় আসে বিজয়ের নেতৃত্বাধীন টিভিকে জোট। গত ১০ মে চেন্নাইয়ের জওহারলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তামিলনাড়ুর ২২তম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর শুক্রবার বিজয় কারুরে যান। সে মর্মান্তিক ঘটনার ১০ মাস পর কারুরে এসে সেদিনের ঘটনার জন্য গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা, যা এখনও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।’ সেদিনের ঘটনার জন্য পুলিশ এবং তখনকার ক্ষমতাসীন ডিএমকের তীব্র সমালোচনা করেন বিজয়।
সেদিন পুলিশ তাকে বিভ্রান্ত করেছে বলে অভিযোগ করে বিজয় বলেন, ‘আমি তাদের বিশ্বাস করে সমাবেশে এগিয়ে গিয়েছিলাম। আমি যখন কারুরে প্রবেশ করেছিলাম, তখন তারা (পুলিশ) তো আমাকে থামাতে পারত, তাই না? তারা আমাদের সতর্ক করতে পারত, বলতে পারত যে ভিড় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে।’
তিনি বলেন, ‘এমনকি সমাবেশটি বাতিল করারও পূর্ণ অধিকার তাদের ছিল। কিন্তু তারা তা করেনি, তারা আমাকে ভেতরে নিয়ে গিয়েছিল। তখন আমি পুলিশকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলাম এবং এমনকি মিটিংয়ে তাদের ধন্যবাদও জানিয়েছিলাম। আমি এই নাটকের বিষয়ে কিছু জানতাম না। কিন্তু এর জন্য আসলে কে দায়ী... এর পেছনে কার হাত ছিল?’ তিনি প্রশ্ন তোলেন। তার ইঙ্গিত ছিল তখন রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা ডিএমকে ও তখনকার মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনের দিকে।
‘নিষ্পাপ, দেবদূতের মতো শিশুদের’ হারানোর জন্য শোক প্রকাশ করার পাশাপাশি, ঘটনার পর তার নীরবতা নিয়ে যে সমালোচনা হয়েছিল, তারও জবাব দেন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ্যে কোনো কথা না বলার কারণে বিজয় এবং তার দল টিভিকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল। কালো পোশাক পরিহিত বিজয় বলেন, ‘আপনারা আমাকে নিয়ে উপহাস করেছেন... যখন আমি বাড়িতে বিধ্বস্ত ও যন্ত্রণার মধ্যে ছিলাম, আপনারা তখন বলেছিলেন আমি লুকিয়ে আছি।’
বিজয় আরো ইঙ্গিত দেন, গত এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে ডিএমকে এবং পুলিশ ‘ষড়যন্ত্র’ করে এই পদদলিত হওয়ার ঘটনাটি ঘটিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘পুলিশ কি পর্যাপ্ত কর্মী মোতায়েন করেছিল? তারা নির্লজ্জভাবে আমাকে দোষারোপ করেছে এবং এম কে স্টালিন রাজনীতি করেছেন।’
কারুরের ঘটনায় নিহত ৪১ পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তামিলনাড়ু সরকার। কিন্তু ডিএমকে সরকারের এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আদালতের দ্বারস্থ হয়। ডিএমকের দাবি, সরকারের এই পদক্ষেপ চলমান তদন্তে সাক্ষীদের প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু আদালত তাদের আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালত প্রশ্ন তোলে, ‘আপনারা ঠিক কী বলতে চাচ্ছেন? আপনারা কি চান একজন মুখ্যমন্ত্রী কী করবেন, তা আদালত ঠিক করে দিক?’
শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের কারুর সফরের আগে ডিএমকে এ মামলায় সাক্ষীদের বক্তব্য সুরক্ষিত রাখার জন্য আদালত কর্তৃক নিযুক্ত তদারকি কমিটি এবং এই ঘটনার তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এর কাছে আবেদন জানায়। কিন্তু এর আগে, বিজয়ের কারুর পৌঁছানোর প্রায় এক ঘণ্টা আগে, মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চ নিহতদের পরিবারের সদস্যদের চাকরি দেয়ার সিদ্ধান্তকে সরকারের ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে অভিহিত করে, এতে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং নিয়োগপত্র বিতরণের অনুমতি দেয়। তবে আদালত নির্দেশ দিয়েছে, এ নিয়োগ আপাতত সাময়িক থাকবে। মামলার চূড়ান্ত রায়ের পর তাদের চাকরির ব্যাপারে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।




