জার্মানির একটি আদালত ইরাকে দুই ইয়াজিদি কিশোরীকে দাসত্বে বাধ্য করার অপরাধে এক ইরাকি দম্পতিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। মিউনিখের উচ্চ আঞ্চলিক আদালত তাদের ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবেও দোষী ঘোষণা করেছেন।
জার্মানির গোপনীয়তা আইনের কারণে টোয়ানা এইচ.এস. নামে পরিচিত ওই ব্যক্তিকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং শিশুদের ওপর গুরুতর যৌন নির্যাতনসহ একাধিক অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তার স্ত্রী, এশিয়া আর. এ.-কে সাড়ে নয় বছরের কিশোর-কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই দম্পতিকে ২০২৪ সালে বাভারিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
আদালত জানান, এই দম্পতি আইএসের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দুই ইয়াজিদি মেয়েকে বন্দি করে দাসত্বে রেখেছিলেন এবং তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন। মামলাটি আইএসের হাতে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিচার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কুর্দিভাষী সংখ্যালঘু ইয়াজিদিরা ২০১৪ সালে আইএসের ব্যাপক হামলার শিকার হয়। সে সময় সশস্ত্র গোষ্ঠীটি সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে। উত্তর ইরাকে ইয়াজিদিদের আবাসভূমিতে হামলা চালিয়ে আইএস হাজার হাজার পুরুষকে হত্যা করে এবং নারী ও শিশুদের দাসত্বে বাধ্য করে। অনেক নারী ও শিশুকে যৌন নির্যাতনেরও শিকার হতে হয়। জার্মানি এসব কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ফেডারেল পাবলিক প্রসিকিউটরের কার্যালয় জানায়, অভিযুক্ত দুজন ইয়াজিদি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত আইএসের পরিকল্পিত অভিযানের অংশ ছিল। টোয়ানা এইচ.এস. ২০০০-এর দশকের শুরুতে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে জার্মানিতে আসেন। তিনি মিউনিখে একজন হেয়ারড্রেসার হিসেবে কাজ করতেন এবং তার একটি সন্তান ছিল।
জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডের স্পিগেল-এর তথ্য অনুযায়ী, তার আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও একজন জার্মান সন্তানের বাবা হওয়ায় তাকে দেশটিতে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ডের স্পিগেল জানায়, সে ২০১৫ সালে ইরাকে ফিরে যায়।
অভিযোগকারীরা বলেন, টোয়ানা এইচ. এস. এবং এশিয়া আর. এ. সেখানে ইসলামী আইন অনুযায়ী বিয়ে করেন এবং ২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ইসলামিক স্টেটের সদস্য হন।
তারা বলেন, ২০১৫ সালের শরৎকালে, টোয়ানা এইচ. এস. তার স্ত্রীর অনুরোধে মসুলের একটি বাজার থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক ইয়াজিদি মেয়েকে দাসী হিসেবে কেনেন।
২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে এই দম্পতি বারো বছর বয়সী এক ইয়াজিদি মেয়েকে কেনেন। অভিযোগকারীরা বলেন, টোয়ানা এইচ. এস. উভয় শিশুকে বারবার ধর্ষণ করেছেন। তাদের বাড়ির কাজ ও শিশু পরিচর্যায় বাধ্য করতেন এবং তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনে নিষেধ করতেন। শিশুদের মারধরও করা হতো।
প্রসিকিউটররা বলেছেন, এশিয়া আর. এ. ছোট মেয়েটির হাতে গরম পানি দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়েছিলেন। বিআর নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচার চলাকালীন আদালত ইয়াজিদি মেয়েটির সাক্ষ্য শুনেছেন। সে মারধর, জোরপূর্বক শ্রম এবং বারবার ধর্ষণের বর্ণনা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় ইয়াজিদি কিশোরীটির এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
জার্মানিতে এই মামলার বিচার হয়েছে ‘সার্বজনীন বিচারব্যবস্থা’ নীতির আওতায়। এই আইনের মাধ্যমে বিদেশে সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও জার্মান আদালতে করা যায়।
বিচার চলাকালে এশিয়া আর. এ. বর্তমানে টোয়ানা এইচ. এস.-এর থেকে আলাদা হয়ে গেছেন, আদালতের কাছে ক্ষমা চান। চূড়ান্ত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি দুঃখিত।’ অন্যদিকে, টোয়ানা এইচ. এস. আদালতে কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।




