আমেরিকা মহাদেশে ডানপন্থী নেতাদের জয়ের ধারায় নতুন সংযোজন হয়েছেন কেইকো ফুজিমোরি। তিনি পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট ও কঠোর শাসক আলবার্তো ফুজিমোরির মেয়ে।
৫১ বছর বয়সী কেইকো ফুজিমোরি প্রায় ২ কোটি ভোটের মধ্যে মাত্র কয়েকশ ভোটের ব্যবধানে বামপন্থী প্রার্থী রবার্তো সানচেজকে হারিয়েছেন। তার জয়ের ব্যবধান ছিল ৫০ দশমিক ০০২ শতাংশেরও কম।
পেরুতে এই ফলাফলের পর আমেরিকা মহাদেশে এখন শুধু উরুগুয়ে, কলম্বিয়া ও ব্রাজিলে মধ্যপন্থী সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এই প্রতিযোগিতায় ফুজিমোরির জন্য শেষ বড় সুবিধাটি এসেছে প্রবাসীদের দেওয়া ভোট থেকে।
তিনি প্রায় ৬০০টি বেশি ভোট পেয়েছেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, সানচেজ দেশের অভ্যন্তরীণ ভোট গণনায় ৫০.২১ শতাংশ পেয়ে এগিয়ে থাকলেও, ফুজিমোরি প্রবাসীদের দেওয়া বিপুল ভোটের ব্যবধানে, অর্থাৎ ৬৩.৪২ শতাংশ পেয়ে এগিয়ে আছেন।
সামান্য ব্যবধানের কারণে বিতর্কিত ব্যালটগুলো এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং ফলাফল নিশ্চিত হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এই বিভক্ত নির্বাচন দেশে ও বিদেশে থাকা পেরুভিয়ানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। গণনার সময় প্রাথমিকভাবে শান্ত থাকার আহ্বান জানালেও পরে বামপন্থী প্রার্থী রবার্তো সানচেজ তার অবস্থান বদলান।
তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অদ্ভুত, অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেন এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি এক্সে লেখেন, ‘আমাদের জনগণ সতর্ক আছে, ভোট ও গণতন্ত্রকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে।’
তার দল লিমা অঞ্চলের এক হাজার ৭৫১টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫৭টি ভোটকেন্দ্রের ফল বাতিলের জন্য মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনী সামগ্রী পরিবহনে অবহেলা করা হয়েছে। দলটি আরো দাবি করেছে, বিশ্লেষণে শত শত গণনাপত্রে সন্দেহজনক মিল পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তারা বলেছে, দেশব্যাপী এক হাজার ৭৫১টি ভোটকেন্দ্রে ৫৮৪ ধরনের হুবহু পুনরাবৃত্তি শনাক্ত করা হয়েছে বলে লা রিপাবলিকা জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে পেরুর পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্লোস পারেহা বলেন, বিদেশি ব্যালটে কোনো অনিয়ম হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও বলেছেন, রবিবারের নির্বাচন বড় কোনো সমস্যা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। সানচেজ নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুজিমোরির জন্য শাসন করা কঠিন হতে পারে, কারণ তারা একটি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক বিরোধী দলের মুখোমুখি হতে পারেন।
কেইকো ফুজিমোরি কে?
কেইকো ফুজিমোরি ১৯ বছর বয়সে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি তার বাবা, সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির ফার্স্ট লেডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আলবার্তো ফুজিমোরি একজন স্বৈরশাসক হিসেবে পরিচিত। তিনি ২০০০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। পরে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তিনি পদত্যাগ করেন এবং জাপানে পালিয়ে যান।
পরবর্তীতে আলবার্তো ফুজিমোরি মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। বিশেষ করে ‘তে গ্রুপো কোলিনা’ নামের ডেথ স্কোয়াডকে গণহত্যাসহ নানা হত্যাকাণ্ড চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে তাকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পেরু শাসন করেছিলেন। কেইকো ফুজিমোরি ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং প্রতিবারই দ্বিতীয় দফার ভোটে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হন। চাঁদাবাজি, অবৈধ স্বর্ণখনন এবং কোকেন পাচার বৃদ্ধির সম্মুখীন দেশটির অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলো মোকাবিলার লক্ষ্যে তিনি সহিংস অপরাধ দমন, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সম্পন্ন কারাগার নির্মাণ এবং অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ফুজিমোরি তার বাবার অনেক স্বৈরাচারী প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করলেও তার কিছু কঠোর নীতি বজায় রেখেছেন।
তার বাবা ক্ষমতায় থাকার জন্য কংগ্রেস ভেঙে দিয়েছিলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের গ্রেপ্তার করেছিলেন এবং জালিয়াতিমূলক কাজ করেছিলেন। তবে তিনি বলেছেন, পেরুর এক মেয়াদের নির্ধারিত সময়ের বাইরে তিনি ক্ষমতায় থাকবেন না।