সব জল্পনা-কল্পনা, তীব্র আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার কালো মেঘ কাটিয়ে অবশেষে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে পর্দা উঠছে ২৩তম কমনওয়েলথ গেমসের। ২৩ জুলাই ওভো হাইড্রো অ্যারেনায় জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় এই আয়োজন। আগামী ২ আগস্ট পর্যন্ত টানা ১১ দিন গ্লাসগোর মাঠে লড়াইয়ে নামবেন কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সেরা অ্যাথলেটরা।
২০১৪ সালের সফল আয়োজনের মাত্র এক দশকের মাথায় আবারও গ্লাসগোতেই ফিরল এই বৈশ্বিক আসর। মূল আয়োজক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্য অতিরিক্ত বাজেটের অজুহাতে হঠাৎ সরে দাঁড়ালে এবং পরবর্তীতে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর না করে দিলে গেমসের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে। সেই সংকটকালে আসরটি টিকিয়ে রাখতে গ্লাসগো এগিয়ে আসে। তবে তা আয়োজনের খরচ ও ভেন্যু ব্যাপকভাবে কাটছাঁট করে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও সাশ্রয়ী মডেল গ্রহণের শর্তে।
খরচ আয়ত্তে রাখতে এবারের আসরে ইভেন্ট সংখ্যা ও ভেন্যু দুটোতেই বড় ছাঁটাই করা হয়েছে। ২০১৪ সালের আসরে ১৭টি খেলা থাকলেও এবার তা কমিয়ে আনা হয়েছে ১০টি খেলায়। এতে হকি ও সব ধরনের র্যাকেট স্পোর্টসের মতো জনপ্রিয় ইভেন্ট বাদ পড়ায় ক্রীড়ামোদী ও অ্যাথলেটদের মাঝে কিছুটা হতাশা দেখা গেছে। তবে আয়োজকরা জানিয়েছেন, বাজেট কমলেও গেমসের উত্তেজনা কমানো হয়নি; ৭৪টি দেশের প্রতিযোগীরা মোট ২১৫টি স্বর্ণপদকের জন্য চার প্রধান ভেন্যুতে লড়াইয়ে নামছেন।
যে ১০টি খেলা নির্বাচিত হয়েছে সেগুলো হলো, অ্যাথলেটিক্স এবং প্যারা-অ্যাথলেটিক্স (শুধুমাত্র ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড), সাঁতার এবং প্যারা-সাঁতার, শৈল্পিক জিমন্যাস্টিকস, ট্র্যাক সাইক্লিং এবং প্যারা-ট্র্যাক সাইক্লিং, নেটবল, ভারোত্তোলন এবং প্যারা-পাওয়ারলিফটিং, বক্সিং, জুডো, বোল এবং প্যারা-বোল, ৩x৩ বাস্কেটবল এবং ৩x৩ হুইলচেয়ার বাস্কেটবল।
ভেন্যুর বিচারেও এবার দেখা গেছে বড় পরিবর্তন। খরচের হিসাব মেলাতে ঐতিহ্যবাহী বড় স্টেডিয়ামের বদলে অপেক্ষাকৃত ছোট ও কার্যকর ভেন্যুকে বেছে নেওয়া হয়েছে। অ্যাথলেটিক্সের মতো সবচেয়ে বড় ড্র-কার্ড প্রতিযোগিতাটি এবার ৫২ হাজার ধারণক্ষমতার হাম্পডেন পার্কের বদলে মাত্র ১১ হাজার আসনবিশিষ্ট স্কটসটাউন স্টেডিয়ামে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সাঁতারের জন্য টলক্রস সুইমিং সেন্টার, সাইক্লিংয়ের জন্য স্যার ক্রিস হয় ভেলোড্রোম এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতার জন্য স্কটিশ ইভেন্ট ক্যাম্পাসকে প্রস্তুত করা হয়েছে।
এদিকে মাঠের খেলার পাশাপাশি টিভি সম্প্রচার ও টিকিটের চড়া দাম নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে দেখা গেছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। ১৯৫৪ সাল থেকে টানা ১৮টি আসর বিনা মূল্যে টিভিতে সম্প্রচার করে আসা দ্য ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি) এবার স্বত্ব হারিয়েছে। সর্বোচ্চ দর হেঁকে সব খেলা সম্প্রচারের দায়িত্ব পেয়েছে পে-টিভি চ্যানেল ‘টিএনটি স্পোর্টস’। ফলে সরাসরি খেলা দেখতে দর্শকে ফি গুনে ‘এইচবিও ম্যাক্স’ অ্যাপে চোখ রাখতে হচ্ছে।
টিকিটের দামের ক্ষেত্রে আয়োজকরা জানিয়েছেন, পদকবিহীন সেশনগুলোর জন্য টিকিটের মূল্য ১৭ পাউন্ড এবং পদকপ্রাপ্ত ইভেন্টগুলোর জন্য ২৬ পাউন্ড থেকে শুরু হবে। অন্যদিকে সীমিত আসনের কারণে অ্যাথলেটিক্সের মতো জনপ্রিয় ইভেন্টগুলোর টিকিটের দাম হাঁকানো হচ্ছে তিন অঙ্কে।
সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এখন নজর কেবলই খেলার মাঠে। গ্লাসগোর আইকনিক ফিনিয়েস্টন ক্রেনের আদলে নির্মিত কাল্পনিক ইউনিকর্ন ‘ফিনি’-কে মাস্কট করে আয়োজিত এই ছোট বাজেটের গেমস যদি সফল হয়, তবে তা ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের জন্য অলিম্পিক বা কমনওয়েলথের মতো বড় আসর আয়োজনের ক্ষেত্রে এক নতুন অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করবে বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা।