বয়সের চাকা থামানো যায় না, নিয়তির লেখাও নয়। গত জুনে ৩৯-এ পা দেওয়া লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ যাত্রাটা তাই শেষ হলো বিষাদের অশ্রুতে। ২০৩০-এর বিশ্বমঞ্চে যখন শান দেওয়া হবে, ততদিনে মহাতারকার বয়স ছুঁয়ে ফেলবে ৪৩। একজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের জন্য ওই বয়সে বিশ্বকাপের আগুনে লড়াই খেলাটা প্রায় অসম্ভব বললেই চলে।
রবিবার রাতের মহামঞ্চের আগে পর্যন্ত কোটি ভক্তের বুকে আশা ছিল, কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের চার বছর পর এবার হয়তো টানা দ্বিতীয়বার সোনার ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরবেন মেসি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শেষটা হলো কান্নায়। অথচ এবারের আসরে স্বপ্নিল পথেই হেঁটেছিলেন এলএমটেন। একই সঙ্গে গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল, বিশ্বকাপের স্বপ্নের দিকে ছুঁটে যাচ্ছিলেন তিনি। তবে এক রাতের ব্যবধানে সব স্বপ্ন ভেঙে গেল এই মহাতারকার। সেই সঙ্গে শঙ্কায় নিজের নবম ব্যালন ডি’অরও।
বিশ্বকাপে নিজের মোট গোল সংখ্যা ২১-এ নিয়ে গিয়ে সর্বোচ্চ স্কোরারের তালিকায় শীর্ষে বসেছিলেন। তবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে তাকে টপকে যান কিলিয়ান এমবাপে। ২২ গোল নিয়ে বিশ্বমঞ্চের সর্বকালের একক সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড।
২০২৬ বিশ্বকাপে ৮টি গোল আর ৪টি অ্যাসিস্ট করে প্রায় একাই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালের টিকিট এনে দিয়েছিলেন মেসি। পুরো টুর্নামেন্টে শুধু এমবাপ্পেই (১০ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট) ছিলেন তার চেয়ে সামান্য এগিয়ে। ফাইনালে দুটি গোল আর একটি অ্যাসিস্ট পেলেই গোল্ডেন বুটও চলে আসত মেসির ঝুলিতে। তবে তা আর মেলেনি।
বুটের রেস হাতছাড়া হলেও ভক্তরা বুক বেঁধেছিলেন গোল্ডেন বলের আশায়। ২০১৪ ও ২০২২-এর পর বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে রেকর্ড তৃতীয়বারের মতো সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা মেসির হাতেই দেখতে চেয়েছিলেন সবাই। পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার ত্রাতা তো তিনিই ছিলেন! কোয়ার্টার-ফাইনাল থেকে সেমি পর্যন্ত প্রতি ম্যাচে বিপদের মুখ থেকে বারবার দলকে টেনে তুলেছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনাকে ৭ মিনিটের ব্যবধানে দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্টে জয় এনে দিয়েছিলেন মেসিই।
তবে সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের খেতাব ‘গোল্ডেন বল’ জিতে নেন স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি। কোন গোল বা অ্যাসিস্ট না করেই এই পুরস্কার জেতায় শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক।
তবে তার এই খেতাব জয়ের গল্পটাও রূপকথার চেয়ে কম নয়! ২০২৫ সালের মে মাসে হাঁটুর অস্ত্রোপচারের পর প্রায় আট মাস মাঠের বাইরে ছিলেন ম্যানচেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডার। সেই ঘোর অন্ধকার কাটিয়ে ফিরে এসেই স্পেনকে এনে দিলেন তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।
পুরস্কার হাতে আবেগে ভেসে রদ্রি বলেন, ‘সময়টা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। আমি শুধু নতুন প্রজন্মকে দেখাতে চাই, পড়ে গেলে কীভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হয়। এটাই আমার জীবনের দর্শন। সব দিন ভালো যাবে না, কিন্তু মন থেকে ইতিবাচকতা হারানো যাবে না।’
পুরো আসরে রদ্রির নামের পাশে কোনো গোল বা অ্যাসিস্টের খাতা নেই! তবে গোল-অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যান দিয়ে কি আর রদ্রির অবদান মাপা যায়? স্পেনের পজেশন-ভিত্তিক ফুটবলের আসল ইঞ্জিনটাই ছিলেন তিনি। পুরো আসরে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ৭৫৩টি নিখুঁত পাস (৯৪ শতাংশ নির্ভুলতা) খেলেছেন এই স্প্যানিশ তারকা। ফিফার তথ্যমতে, তিনি রেকর্ড ১,৮০৩টি প্লে-তে সরাসরি যুক্ত ছিলেন! যা অন্য যেকোনো ফুটবলারের চেয়ে প্রায় ২০০টি বেশি!
ফিফা তাদের অফিসিয়াল মূল্যায়নে স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘এই মিডফিল্ডার পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের মাঝমাঠের আসল কান্ডারি ছিলেন। আক্রমণ আর রক্ষণের মাঝে তৈরি করেছিলেন ইস্পাতকঠিন সাঁকো। বিশেষ করে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ১-০ ব্যবধানের জয়ে তিনিই ছিলেন ব্যবধান গড়ে দেওয়া নায়ক।’
ফাইনালে ১০৫টি পাসের মধ্যে ১০১টিই ছিল নিখুঁত, সঙ্গে ৮০ শতাংশ ডুয়েল জিতেছেন এবং দুটি গোলের দারুণ সুযোগ তৈরি করেছেন। মাঝমাঠে রদ্রির এই অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকার কারণেই পুরো বিশ্বকাপে ৮টি ম্যাচ খেলে মাত্র ১টি গোল হজম করেছে চ্যাম্পিয়ন স্পেন! আর মেসি হারিয়েছে তার টুর্নামেন্ট সেরার সম্ভাব্য শেষ পুরস্কার।